গুলির ক্ষত দেখিয়ে ন্যায়বিচার দাবি সাক্ষীর

ভেবেছিলাম পুলিশ লাশ গুম করবে তাই কালেমা পড়ে আম্মুর নম্বর বলি

Printed Edition

নিজস্ব প্রতিবেদক

  • জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের বিচার
  • মানবতাবিরোধী অপরাধ

আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের এজলাস কক্ষ তখন থমথমে। এজলাসের কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে আছেন সাবেক উপদেষ্টা সালমান এফ রহমান ও সাবেক আইনমন্ত্রী আনিসুল হক। বিচারক প্যানেলের সামনে মাইক্রোফোনে নিজের পঙ্গুত্ব এবং ২০২৪ সালের আগস্টের সেই রক্তাক্ত অভিজ্ঞতার বর্ণনা দিচ্ছিলেন ২৩ বছরের ক-গেজেটভুক্ত জুলাইযোদ্ধা মো: শাকিল আহমেদ। একপর্যায়ে কাঠগড়ার দিকে ফিরে ক্ষোভ আর কান্নাভেজা কণ্ঠে তিনি বলে ওঠেন, ‘ভেবেছিলাম পুলিশ আমার লাশ গুম করে ফেলবে। তাই বাঁচার আশা ছেড়ে দিয়ে কালেমা পড়ছিলাম আর পাশে থাকা ভাইদের আম্মুর নম্বরটা বলছিলাম, যেন অন্তত পরিবার খবর পায়।’

গতকাল রোববার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১-এর সদস্য বিচারপতি মো: শফিউল আলম মাহমুদের নেতৃত্বাধীন দুই সদস্যের বিচারিক প্যানেলে এই চাঞ্চল্যকর জবানবন্দী দেন সাক্ষী শাকিল। বিচারিক প্যানেলের অপর সদস্য ছিলেন বিচারক মো: মোহিতুল হক এনাম চৌধুরী।

এর আগে সকালে কঠোর নিরাপত্তায় সালমান এফ রহমান ও আনিসুল হককে আদালতে হাজির করা হলে বিচারকাজ শুরুর প্রথমেই এজলাসের পরিবেশ উত্তপ্ত হয়ে ওঠে অতিরিক্ত সাক্ষী হাজির করাকে কেন্দ্র করে। প্রসিকিউটর গাজী এম এইচ তামীম বিচার নিশ্চিত করতে অতিরিক্ত সাতজন সাক্ষীর জবানবন্দী নেয়ার আবেদন জানান এবং ১২ নম্বর সাক্ষী হিসেবে শাকিলকে হাজির করেন। এর তীব্র বিরোধিতা করে আসামিপক্ষের আইনজীবী পলাশ চন্দ্র রায় বলেন, ১১ জন সাক্ষীর সাক্ষ্য গ্রহণের পর নতুন সাক্ষী আনা ন্যায়বিচারকে বাধাগ্রস্ত করার নামান্তর। উভয় পক্ষের যুক্তিতর্কের একপর্যায়ে ট্রাইব্যুনাল সাফ জানিয়ে দেন, ন্যায়বিচারের স্বার্থে মামলার যেকোনো পর্যায়ে অতিরিক্ত তথ্য-প্রমাণ বা অ্যাভিডেন্স গ্রহণ করার এখতিয়ার ট্রাইব্যুনালের রয়েছে। পরে আসামিপক্ষের আইনজীবী সময় প্রার্থনা করলে বিচারিক প্যানেল তা বিবেচনায় নেন এবং সাক্ষীর বক্তব্য গ্রহণ শুরু হয়।

জবানবন্দীতে সাক্ষী শাকিল আন্দোলনের শুরু থেকে ক্রমান্বয়ে ঘটে যাওয়া নির্মমতার বিস্তারিত বিবরণ তুলে ধরেন। শ্যামলী আইডিয়াল পলিটেকনিক্যাল ইনস্টিটিউটের এই ছাত্র জানান, ১৫ জুলাই ঢাবিতে হামলা ও ১৬ জুলাই আবু সাঈদ নিহত হওয়ার পর তিনি রাজপথে নামেন। ১৮ জুলাই বিকেলে মিরপুর-১০ নম্বরে গিয়ে দেখতে পান পুলিশ, ছাত্রলীগ ও যুবলীগ আন্দোলনকারীদের ওপর হামলা ও গুলি চালাচ্ছে। পরদিন ১৯ জুলাই আবারো আন্দোলনে গেলে স্টেডিয়ামের সামনে পুলিশ পিস্তল ঠেকিয়ে হুমকি দেয়। পরে গলির ভেতর গিয়ে দেখেন পুলিশের পাশাপাশি ক্ষমতাসীন দলের ক্যাডাররা বৃষ্টির মতো গুলি চালাচ্ছে। সেখানে চোখের সামনে মোক্তাকিন বিল্লাহ নামের এক তরুণের মাথায় গুলি লেগে খুলি উড়ে যেতে দেখেন তিনি। তাকে উদ্ধার করতে গিয়ে শাকিল নিজেও মাথায় ও ডান পায়ের হাঁটুতে ছররা গুলিতে আহত হন।

বাসায় কিছুদিন চিকিৎসাধীন থাকার পর ৩ ও ৪ আগস্ট আবার রাজপথে নামেন শাকিল। ৪ আগস্টের ঘটনা বর্ণনা করতে গিয়ে তিনি জানান, রাজপথে প্রতি ১০ সেকেন্ড পরপর একেকজন আন্দোলনকারী গুলিবিদ্ধ হয়ে পড়ছিল। চার দিকে রক্তের বন্যা দেখে তিনি ফুটপাতের একটি খাটের নিচে আশ্রয় নেন। সেখান থেকে বের হওয়ার মুহূর্তেই একটি গুলি তার বাম নিতম্ব দিয়ে ঢুকে পেটের ভেতর ডান রানের গোড়া দিয়ে বের হয়ে যায়। এতে তার অন্ত্র ও পায়খানার রাস্তা ছিঁড়ে মাংসসহ বেরিয়ে আসে। শরীর থেকে অঝোরে রক্ত ঝরতে থাকলে তিনি ভাবেন পুলিশ হয়তো তার লাশ গুম করে ফেলবে। তাই বাঁচার আশা ছেড়ে দিয়ে কালেমা পড়তে পড়তে পাশে থাকা আন্দোলনকারীদের কাছে নিজের মায়ের ফোন নম্বর মুখস্থ বলতে থাকেন, যেন অন্তত পরিবার খবর পায়। আশঙ্কাজনক অবস্থায় প্রথমে সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালে নেয়া হলে রাতে অস্ত্রধারী ক্যাডাররা সেখানেও হামলা চালাতে আসে, তবে নার্স ও স্বজনদের আকুতিতে সে যাত্রা প্রাণ বাঁচে তার।

জবানবন্দীর এ পর্যায়ে সাক্ষী শাকিল ট্রাইব্যুনালের বিচারকদের সামনে তার শরীরের বিভিন্ন স্থানে থাকা বুলেটের ক্ষতচিহ্ন একে একে প্রদর্শন করলে পুরো এজলাসে এক আবেগঘন নীরবতা নেমে আসে। তিনি জানান, দেশে-বিদেশে মোট ১৪টি অপারেশনের পরও তার মলদ্বার স্বাভাবিক হয়নি। প্রতিদিন যন্ত্রণাদায়ক ‘ডায়লেশন’ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে তাকে কাজ চালাতে হয় এবং মিষ্টি খাওয়া চিরতরে বন্ধ হয়ে গেছে। জবানবন্দীর শেষভাগে শাকিল পেনড্রাইভের মাধ্যমে আদালতে একটি ভিডিও ফুটেজ প্রদর্শন করেন (যা বস্তু প্রদর্শনী-৩ হিসেবে যুক্ত হয়)। স্ক্রিনে দেখা যায়, রক্তাক্ত শাকিলকে ধরাধরি করে নিয়ে যাওয়ার সময় তার কণ্ঠে মায়ের নম্বর ও পেছনে মুহুর্মুহু গুলির শব্দ। সাক্ষী অভিযোগ করেন, ‘কারফিউ জারি করে আন্দোলনকারীদের শেষ করে দিতে হবে’ সালমান এফ রহমান ও আনিসুল হকের এই পরামর্শেই শেখ হাসিনা নির্বিচারে গুলি চালিয়ে গণহত্যা চালায়। এই পঙ্গুত্ব ও সব হত্যাকাণ্ডের জন্য তিনি আসামিদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি ও আর্থিক ক্ষতিপূরণ দাবি করেন।

২০২৫ সালের ৪ ডিসেম্বর অভিযোগ আমলে নেয়ার পর চলতি বছরের ১২ জানুয়ারি সালমান ও আনিসুলের বিরুদ্ধে নীতিগত সিদ্ধান্তে গণহত্যা, মারণাস্ত্র ব্যবহারে প্ররোচনা ও কারফিউ জারির মাধ্যমে ২৮ জনকে হত্যার পাঁচটি মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগ গঠন করা হয়।