সংসদ প্রতিবেদক
বাংলাদেশে সংঘটিত গুম, গোপন আটক, নির্যাতন ও বিচারবহির্ভূত হত্যার সত্য উদঘাটন, দায়ীদের বিচার, ভুক্তভোগী ও পরিবারের ন্যায়বিচার এবং গুম প্রতিরোধে স্বাধীন তদন্তব্যবস্থা ও কার্যকর আইন প্রণয়নের দাবিতে স্পিকারের কাছে স্মারকলিপি দিয়েছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় নির্বাচনী ঐক্য।
গতকাল আন্তর্জাতিক গুম প্রতিরোধ দিবস উপলক্ষে এ স্মারকলিপি দেয় তারা। এর আগে সংসদ অভিমুখে পদযাত্রা ও গণসমাবেশ করে তারা। বিকেল পৌনে ৪টার দিকে রাজধানীর বাংলামোটর মোড় থেকে পদযাত্রাটি শুরু হয়। পরে বিকেল সাড়ে ৪টার দিকে মিছিলটি সংসদ ভবনের সামনে মানিক মিয়া অ্যাভিনিউয়ে গিয়ে পৌঁছায়। পরে নেতারা স্পিকারের কাছে স্মারকলিপি দেন।
পদযাত্রার আগে বেলা ৩টার দিকে বাংলামোটরের রূপায়ণ ট্রেড সেন্টারের সামনে সংক্ষিপ্ত সমাবেশ হয়। ‘বাংলাদেশ গুম প্রতিরোধ দিবস পালন জাতীয় কমিটি’ আয়োজিত সমাবেশে সভাপতিত্ব করেন আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে গুমের শিকার সাবেক সেনা কর্মকর্তা হাসিনুর রহমান।
কর্মসূচিতে জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার, সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল রফিকুল ইসলাম খান, ১১ দলীয় জোটের সমন্বয়ক এ এইচ এম হামিদুর রহমান আযাদ, মেজর (অব:) আখতারুজ্জামান, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের মহাসচিব মাওলানা জালালুদ্দীন আহমদ, জাগপার মুখপাত্র ও সহসভাপতি রাশেদ প্রধান, লেবারপার্টির চেয়ারম্যান মোস্তাফিজুর রহমান ইরান, খেলাফত আন্দোলনের মহাসচিব মুফতি ফখরুল ইসলাম, গুমের শিকার ঢাকা-১৪ আসনের সংসদ সদস্য ব্যারিস্টার মীর আহমদ বিন কাসেম আরমান, জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) আতিকুর রহমান মুজাহিদ এমপি, রোকেয়া বেগম এমপি, ব্যারিস্টার শাহরিয়ার কবির, মোবারক হোসাইন, সেলিম উদ্দিন, ড. শফিকুল ইসলাম মাসুদ এমপি প্রমুখ বক্তৃতা ও অংশ নেন। এ ছাড়া আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে গুমের শিকার ব্যক্তিদের স্বজন ও ভুক্তভোগীরাও পদযাত্রায় অংশ নেন।
সমাবেশে বক্তারা অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে প্রণীত গুম প্রতিরোধ অধ্যাদেশ দ্রুত পূর্ণাঙ্গ আইনে পরিণত করার দাবি জানান। হাসিনুর রহমান বলেন, অধ্যাদেশে যেসব বিধান রয়েছে, সেগুলো কোনো পরিবর্তন না করে আইনে রূপান্তর করতে হবে। এ ছাড়া গুমের শিকার ব্যক্তিদের রাষ্ট্রীয় মর্যাদা ও পুনর্বাসনের দাবি জানানো হয়।
সমাবেশ শেষে শুরু হয় সংসদ অভিমুখে পদযাত্রা। এ সময় অংশগ্রহণকারীরা ‘বাংলাদেশে আয়নাঘর, থাকবে না রে থাকবে না’, ‘আমার ভাই কবরে, খুনি কেন ভারতে’ এবং ‘ঘেরাও ঘেরাও হবে, সংসদ ভবন ঘেরাও হবে’- এমন বিভিন্ন স্লোগান দেন। এ সময় ‘নারায়ে তাকবির, আল্লাহু আকবার’ স্লোগানও দেয়া হয়।
স্মারকলিপিতে বলা হয়, দীর্ঘ ফ্যাসিবাদী শাসনামলে রাজনৈতিক বিরোধী নেতাকর্মী, মতপ্রকাশকারী, ব্যবসায়ী, সাংবাদিক, অধিকারকর্মীসহ বহু মানুষকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী ও নিরাপত্তা বাহিনীর পরিচয়ে তুলে নেয়া, গোপন স্থানে আটক রাখা, নির্যাতন করা এবং পরবর্তীতে তাদের অবস্থান অস্বীকার করার অভিযোগ দেশে-বিদেশে নথিভুক্ত হয়েছে। ২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থানের পর গঠিত গুম সংক্রান্ত তদন্ত কমিশন এই ঘটনাগুলোকে বিচ্ছিন্নভাবে সংঘটিত অপরাধ হিসেবে দেখেনি। কমিশনের চূড়ান্ত প্রতিবেদনে গত ১৫ বছরের গুমকে ব্যবস্থাগত, প্রাতিষ্ঠানিক ও রাজনৈতিকভাবে পরিচালিত অপরাধ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। কমিশনের কাছে এক হাজার ৯১৩টি অভিযোগ জমা পড়ে; যাচাইয়ের পর এক হাজার ৫৬৯টি ঘটনাকে গুম হিসেবে শনাক্ত করা হয় এবং ২৮৭টি ঘটনা ‘নিখোঁজ ও মৃত’ শ্রেণীতে অন্তর্ভুক্ত হয়। কমিশনের সদস্যদের মতে প্রকৃত সংখ্যা আরো বেশি হতে পারে।
এতে আরো বলা হয়, ‘আয়নাঘর’ আজ বাংলাদেশের ইতিহাসে গোপন আটক, নিপীড়ন ও গুমের একটি প্রতীকী নাম। বহু ভুক্তভোগীর বর্ণনায় উঠে এসেছে তাদের চোখ বেঁধে অজ্ঞাত স্থানে নিয়ে যাওয়া হয়েছে, দীর্ঘ দিন পরিবার ও আইনজীবীদের কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন রাখা হয়েছে এবং শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন করা হয়েছে।
স্মারকলিপিতে বলা হয়, আমরা নতুন আইন প্রণয়নের বিরোধিতা করছি না। বরং আমাদের দাবি নতুন আইন অবশ্যই আগের চেয়ে শক্তিশালী, কার্যকর ও ভুক্তভোগীবান্ধব হতে হবে।



