- ১৭ হাজার কর্মসংস্থানের স্বপ্নে ২৩.৭৭ কোটি টাকার প্রকল্প
- ৫৬টি পল্লীতে নির্দিষ্ট পণ্য উৎপাদন, ২৮০ উদ্যোক্তা
দেশের পল্লী অঞ্চলের হাজারো মানুষের হাতে কাজ তুলে দিতে আর গ্রামীণ পণ্যকে বাজারের মূল ধারায় নিয়ে আসতে সরকার হাত দিয়েছে এক উচ্চাভিলাষী প্রকল্পে। জাপানের বিখ্যাত ‘ওয়ান ভিলেজ ওয়ান প্রোডাক্ট’ এবং থাইল্যান্ডের ‘ওয়ান তাম্বন ওয়ান প্রোডাক্ট’ মডেলের আদলে তৈরি হয়েছে বাংলাদেশের নিজস্ব সংস্করণ-‘ওয়ান পল্লী ওয়ান প্রোডাক্ট (ওপিওপি): পণ্যভিত্তিক জীবিকায়ন পল্লী প্রকল্প’। গ্রামের অর্থনীতি বদলাতে এই ধারণাকে সামনে রেখে নতুন প্রকল্প নিয়েছে সরকার। লক্ষ্য- কোনো পল্লী হবে নির্দিষ্ট একটি পণ্যের উৎপাদনকেন্দ্র, কোথাও তৈরি হবে দক্ষ কারিগর, কোথাও গড়ে উঠবে উদ্যোক্তা। পৌনে ২৪ কোটি টাকা ব্যয়ের এই প্রকল্পটি ৫৬টি পল্লীতে ২৮০ উদ্যোক্তা তৈরির লক্ষ্য বলে উদ্যোগী মন্ত্রণালয় পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় বিভাগের প্রকল্প দলিল থেকে জানা গেছে।
প্রকল্প দলিলের তথ্য বলছে, বর্তমানে দেশের পল্লী অঞ্চলের উন্নয়নের ভাবনাকে বাস্তবে রূপদান অত্যন্ত জরুরি। পল্লী অর্থনীতির উন্নয়নকল্পে দেশের পল্লী অঞ্চলে বসবাসরত ৬১.৮২ শতাংশ (বিশ্বব্যাংক-২০২০) জনগোষ্ঠীর জীবনমান উন্নয়ন ও জীবনযাত্রার আধুনিকায়নসহ সব সুযোগ-সুবিধার সম্প্রসারণই সামগ্রিক পল্লী উন্নয়নের মূল প্রতিপাদ্য। এ লক্ষ্যে পল্লীর সম্ভাবনাগুলোকে কাজে লাগিয়ে পল্লী উৎপাদন বৃদ্ধি, ব্যবস্থাপনা উন্নয়ন এবং বিপণন সংযোগ স্থাপন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। প্রকল্পটির মোট ব্যয় ২৩ কোটি ৭৭ লাখ ৪৯ হাজার টাকা, যার পুরোটাই সরকারি অর্থায়নে বাস্তবায়ন করা হবে। পরিকল্পনামন্ত্রী গত ২৫ আগস্ট ২০২৬ প্রকল্পটি অনুমোদন করেন। অনুমোদনপত্র অনুযায়ী প্রকল্পের বাস্তবায়নকাল ১ আগস্ট ২০২৬ থেকে ৩০ জুন ২০২৮। প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করবে বাংলাদেশ পল্লী উন্নয়ন বোর্ড (বিআরডিবি)। উদ্যোগী মন্ত্রণালয় পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় বিভাগ। প্রকল্পের মূল লক্ষ্য- পল্লী পণ্যের প্রসার ঘটিয়ে পল্লী অর্থনীতিকে শক্তিশালী করা। পাশাপাশি কর্মসংস্থান, উদ্যোক্তা তৈরি, দক্ষ মানবসম্পদ গড়ে তোলা এবং উৎপাদন ও বিপণনব্যবস্থার উন্নয়ন করা।
৫৬টি পল্লী, ৫৬ পণ্য : প্রকল্প নথি বলছে, প্রকল্পের সবচেয়ে আকর্ষণীয় দিক হলো- দেশের বিভিন্ন এলাকায় ৫৬টি পণ্যভিত্তিক জীবিকায়ন পল্লী গড়ে তোলা হবে। প্রতিটি পল্লীর সম্ভাবনাময় পণ্য চিহ্নিত করে তার উৎপাদন, মানোন্নয়ন, প্রযুক্তি ব্যবহার এবং বাজারজাতকরণের ব্যবস্থা গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে। সরকারি হিসাব অনুযায়ী, আগামী ২০২৭ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে এই ৫৬টি পল্লীতে বিভিন্ন ট্রেডে ২৮০ জন সফল উদ্যোক্তা এবং দুই হাজার ২৪০ জন দক্ষ উৎপাদনকর্মী তৈরি করার লক্ষ্য রয়েছে। একই সাথে ৫৬টি পল্লীর পণ্যের উৎপাদন বাড়ানো এবং গুণগত মান উন্নয়নের লক্ষ্যমাত্রাও নির্ধারণ করা হয়েছে। তবে প্রকল্পের সবচেয়ে বড় লক্ষ্য আরো উচ্চাভিলাষী- ১৭ হাজার কর্মসংস্থান সৃষ্টি। অর্থাৎ ৫৬টি পল্লীকে কেন্দ্র করে গ্রামীণ অর্থনীতিতে কর্মসংস্থানের একটি নতুন বলয় তৈরি করতে চায় সরকার।
সরকারের প্রকল্প নথিতেই স্বীকার করা হয়েছে, গ্রামীণ এলাকায় উন্নয়ন ও সেবা দেয়ার বর্তমান ব্যবস্থা অনেকটাই বিক্ষিপ্ত। বিভিন্ন সংস্থার উদ্যোগের মধ্যে যথেষ্ট সমন্বয় নেই। ফলে গ্রামের মানুষের কাক্সিক্ষত আর্থসামাজিক পরিবর্তন হচ্ছে না। এর সাথে যুক্ত হয়েছে আরো কয়েকটি সমস্যা- সনাতন উৎপাদনপদ্ধতি, আধুনিক প্রযুক্তির সীমিত ব্যবহার, মূলধনের অপ্রতুলতা ও অপরিকল্পিত ব্যবহার, পণ্যের বহুমুখীকরণের অভাব এবং দুর্বল বিপণনব্যবস্থা। ফলে গ্রামে পণ্য উৎপাদিত হলেও অনেক সময় উৎপাদক ন্যায্যমূল্য পান না। তাই উৎপাদন, মূল্য সংযোজন ও বিপণনের পুরো শৃঙ্খলকে শক্তিশালী করাই এই উদ্যোগের অন্যতম উদ্দেশ্য।
জাপান-থাইল্যান্ডের মডেল থেকে শিক্ষা : মন্ত্রণালয় সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এই ধারণা অবশ্য একেবারে নতুন নয়। প্রকল্প নথিতে বলা হয়েছে, জাপানের ‘ওয়ান ভিলেজ ওয়ান প্রোডাক্ট’ (ওভিওপি) এবং থাইল্যান্ডের ওয়ান তাম্বন ওয়ান প্রোডাক্ট’ (ওটিওপি) মডেল থেকে অভিজ্ঞতা নেয়া হয়েছে। বাংলাদেশেও এর পরীক্ষামূলক প্রয়োগের নজির রয়েছে। বিআরডিবির বাস্তবায়নাধীন ‘গাইবান্ধা সমন্বিত দারিদ্র্য বিমোচন প্রকল্পের’ আওতায় ‘এক পণ্য এক পল্লী’ ধারণায় ১৭টি জীবিকায়নভিত্তিক পল্লী প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। সেই অভিজ্ঞতার ভিত্তিতেই এবার দেশজুড়ে ৫৬টি পল্লী নিয়ে নতুন প্রকল্পটি নেয়া হয়েছে। পরিকল্পনাটি সফল হলে পরবর্তী সময়ে পাইলট প্রকল্পের মূল্যায়নের ভিত্তিতে সারা দেশে এটি সম্প্রসারণের কথা বলা হয়েছে।
কোথায় কত খরচ হবে ২৩.৭৭ কোটি টাকা : প্রকল্পের মোট ব্যয়ের বড় অংশই যাচ্ছে রাজস্ব খাতে। অনুমোদিত ডিপিপি অনুযায়ী মোট ব্যয় ২৩ কোটি ৭৭ লাখ ৪৯ হাজার টাকা। এর পুরো অর্থই জিওবি বা সরকারি অর্থায়ন। এর মধ্যে রাজস্ব ব্যয় : ২৩ কোটি ৩৫.০৬ লাখ টাকা এবং মূলধন ব্যয়: ৪২.৪৩ লাখ টাকা অর্থাৎ প্রকল্পের মোট ব্যয়ের প্রায় পুরোটাই সরাসরি কার্যক্রম ও সেবা খাতে রাখা হয়েছে। মূলধন ব্যয়ের অংশ তুলনামূলকভাবে খুবই কম।
ঘূর্ণায়মান তহবিল ১২.৮৮ কোটি টাকার : নথির তথ্য বলছে, প্রকল্পের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো ঘূর্ণায়মান তহবিল বা ঋণ। এ খাতে রাখা হয়েছে ১২ কোটি ৮৮ লাখ টাকা। ৫৬টি পল্লীর জন্য এই অর্থ ব্যবহার করা হবে। এর সাথে বাজারসংযোগ তৈরির জন্য বিশেষ অনুদান হিসেবে রাখা হয়েছে ১৪ লাখ টাকা। আর ৫৬টি পল্লীতে যন্ত্রাংশ, প্রযুক্তি ও কাঁচামাল ক্রয় বা সংগ্রহে প্রণোদনার জন্য রাখা হয়েছে এক কোটি ৬৮ লাখ টাকা। উৎসাহ বোনাস বা কল্যাণ তহবিলে রয়েছে আরো ২৮ লাখ টাকা। অর্থাৎ শুধু প্রশিক্ষণ দিয়ে থেমে থাকার বদলে উৎপাদনে প্রয়োজনীয় অর্থ, প্রযুক্তি ও বাজারের সাথে সংযোগ তৈরির একটি কাঠামো দাঁড় করানোর চেষ্টা রয়েছে প্রকল্পে।
প্রশিক্ষণেই বড় বরাদ্দ : নথির তথ্যানুযায়ী, দক্ষ জনবল তৈরির জন্য অভ্যন্তরীণ প্রশিক্ষণ খাতে বরাদ্দ রাখা হয়েছে পাঁচ কোটি ৭৯ লাখ ৫৪ হাজার টাকা। নথিতে প্রশিক্ষণের জন্য পাঁচ হাজার ৪৪২ জন-এর উল্লেখ রয়েছে। প্রশিক্ষণের লক্ষ্য শুধু শ্রমিক তৈরি নয়, উদ্যোক্তা তৈরি এবং উৎপাদনশীলতা বাড়ানোও এর উদ্দেশ্য। প্রকল্পের নির্দিষ্ট লক্ষ্যগুলোর মধ্যে পল্লীতে উদ্যোক্তা সৃষ্টি এবং দক্ষ মানবসম্পদ তৈরির বিষয়টি স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে। পণ্যকে বাজারে পরিচিত করতে ব্র্যান্ডিং, র্যালি, পোস্টার, লিফলেটসহ প্রচার ও বিজ্ঞাপন ব্যয়ের জন্য ২৯ লাখ টাকা রাখা হয়েছে। প্রকল্পের দর্শনটি শুধু উৎপাদন বাড়ানো নয়, উৎপাদিত পণ্যকে বাজারে পৌঁছে দেয়াও। গ্রামীণ উৎপাদক যাতে মধ্যস্বত্বভোগীর ওপর পুরোপুরি নির্ভরশীল না থাকেন, সে জন্য বাজারসংযোগকে প্রকল্পের অন্যতম উপাদান করা হয়েছে।
দেশের নানা প্রান্তে পল্লী : প্রকল্প এলাকা নির্বাচনের ক্ষেত্রে শুধু একটি নির্দিষ্ট ভৌগোলিক অঞ্চলকে বেছে নেয়া হয়নি। প্রকল্প নথিতে বলা হয়েছে, দেশের সব বিভাগ থেকে অন্তত একটি জেলা অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। উপকূলীয় অঞ্চল, বরেন্দ্র ও খরাপ্রবণ এলাকা, হাওর ও আকস্মিক বন্যাপ্রবণ এলাকা, পার্বত্য চট্টগ্রাম, নদী ও মোহনা অঞ্চল এবং নগর এলাকার পাশাপাশি দেশের সর্বাধিক দরিদ্র জেলাগুলোকেও বিবেচনায় নেয়া হয়েছে। বিভিন্ন জেলার পাশাপাশি উপজেলা পর্যায়েও সম্ভাবনাময় পণ্যের তালিকা সংগ্রহ করে পণ্য নির্বাচন করার কথা বলা হয়েছে। অর্থাৎ কোথায় কোন পণ্যকে ঘিরে পল্লী গড়ে উঠবে। তা স্থানীয় সম্ভাবনা বিবেচনায় নেয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।
সরকারি প্রকল্পের লক্ষ্যগুলোর দিকে তাকালে সংখ্যাগুলো যথেষ্ট আশাব্যঞ্জক- ৫৬টি পণ্যভিত্তিক পল্লী, ২৮০ উদ্যোক্তা, দুই হাজার ২৪০ দক্ষ উৎপাদনকর্মী এবং ১৭ হাজার কর্মসংস্থান। কিন্তু বাস্তবায়ন নিয়ে বিভিন্ন প্রশাœ। এর আগের সরকারের আমলে একটি বাড়ি একটি খামার প্রকল্পটি নিয়েও অনেক প্রশ্ন ও দুর্নীতির তথ্য প্রকাশ পেয়েছে। এখন প্রকল্পটির আসল পরীক্ষা হবে মাঠে। কারণ প্রকল্প নথিতেই যে সমস্যাগুলোর কথা বলা হয়েছে- প্রযুক্তির সীমিত ব্যবহার, মূলধনের অপ্রতুলতা, পণ্যের মানোন্নয়নের ঘাটতি এবং দুর্বল বিপণন- সেগুলোই যদি শেষ পর্যন্ত কাটিয়ে ওঠা না যায়, তবে নতুন পল্লী তৈরি হলেও কাক্সিক্ষত পরিবর্তন আসবে না।
পরিকল্পনা কমিশনের সংশ্লিষ্ট বিভাগ বলছে, সরকারি অর্থে পল্লী গড়ে তোলা সহজ; কিন্তু সেই পল্লীকে টেকসই উৎপাদনকেন্দ্র, লাভজনক ব্যবসা এবং বাজারমুখী উদ্যোক্তা তৈরির কেন্দ্র করে তোলা কঠিন। ২৩.৭৭ কোটি টাকার এই প্রকল্প তাই কেবল একটি উন্নয়ন প্রকল্প নয়- গ্রামীণ অর্থনীতিকে উৎপাদন থেকে বাজার পর্যন্ত একটি নতুন কাঠামোয় নিয়ে যাওয়ার পরীক্ষা। দুই বছরের মেয়াদে সেই পরীক্ষার ফল কতটা আসে, নজর থাকবে সেদিকেই।
এই প্রকল্পের ব্যাপারে প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনাবিষয়ক উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর সম্প্রতি বলেছেন, এক গ্রাম এক পণ্য (বা এক পল্লী এক পণ্য) ধারণার আলোকে সারা দেশে কাজ করার এবং কর্মসংস্থান তৈরির বড় পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে সরকার। মূল উদ্দেশ্য: শুধু প্রচলিত চাকরির সংখ্যা বাড়ানোই সরকারের লক্ষ্য নয়, বরং প্রতিটি গ্রাম পর্যায়ে মানুষের জন্য টেকসই ও নির্ভরযোগ্য আয়ের সুযোগ নিশ্চিত করা।
গ্রামীণ যুব ও নারী সমাজকে নির্দিষ্ট প্রশিক্ষণের মাধ্যমে দক্ষ করে তোলা হবে, যাতে তারা চাকরি খোঁজার পাশাপাশি নিজেরাই উদ্যোক্তা হিসেবে গড়ে উঠতে পারেন।



