এবার দোভাল-গোর বৈঠক সমীকরণ নিয়ে নজর সবার

হাসিনার প্রত্যর্পণ নিয়ে ঢাকার চাপের মধ্যেই দিল্লিতে ভারত-যুক্তরাষ্ট্র নিরাপত্তা সংলাপ : প্রত্যর্পণ আবেদন পর্যালোচনা করার কথা জানালেন জয়সওয়াল : দিল্লি যেতে পারেন তারেক রহমান

বৈঠকের তাৎপর্য অবশ্য শুধু দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এর সময়কাল বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশ ও ভারতের সম্পর্ক পুনর্গঠনের চেষ্টা, শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ নিয়ে ঢাকার চাপ এবং একই সময়ে দক্ষিণ এশিয়ায় চীন-ভারত-যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত প্রতিযোগিতার প্রেক্ষাপটে দোভাল-গোর বৈঠকটি আঞ্চলিক পর্যবেক্ষকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। এই বৈঠক অনুষ্ঠানের সময় বাংলাদেশে নিযুক্ত ভারতীয় হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদী দিল্লিতে ছিলেন। তবে তিনি এ বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন কি না, তা জানা যায়নি।

বিশেষ সংবাদদাতা
Printed Edition

নয়াদিল্লিতে ভারতের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত দোভাল ও ভারতে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত সার্জিও গোরের বৈঠক ঘিরে দক্ষিণ এশিয়ার কূটনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে আগ্রহ তৈরি হয়েছে। গতকাল মঙ্গলবার অনুষ্ঠিত বৈঠকের পর প্রকাশ্যে আসা তথ্যানুযায়ী, আলোচনার মূল বিষয় ছিল ভারত-যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত সম্পর্ক এবং দুই দেশের সহযোগিতা আরো গভীর করা। তবে বৈঠকের নির্দিষ্ট এজেন্ডা বা কোনো গোপন সমঝোতার বিস্তারিত প্রকাশ করা হয়নি বলে জানিয়েছে টাইমস অব ইন্ডিয়া।

বৈঠকের তাৎপর্য অবশ্য শুধু দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এর সময়কাল বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশ ও ভারতের সম্পর্ক পুনর্গঠনের চেষ্টা, শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ নিয়ে ঢাকার চাপ এবং একই সময়ে দক্ষিণ এশিয়ায় চীন-ভারত-যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত প্রতিযোগিতার প্রেক্ষাপটে দোভাল-গোর বৈঠকটি আঞ্চলিক পর্যবেক্ষকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। এই বৈঠক অনুষ্ঠানের সময় বাংলাদেশে নিযুক্ত ভারতীয় হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদী দিল্লিতে ছিলেন। তবে তিনি এ বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন কি না, তা জানা যায়নি।

এ দিকে ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে প্রত্যর্পণে বাংলাদেশের অনুরোধ ‘প্রতিষ্ঠিত প্রক্রিয়া’ অনুযায়ী পর্যালোচনা করছে বলে জানিয়েছে ভারত। গতকাল দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল এ কথা জানান। একই সাথে ঢাকায় ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র শরিফ ওসমান হাদি হত্যা মামলার দুই প্রধান সন্দেহভাজনকে বাংলাদেশে ফেরত পাঠানোর বিষয়টিকে ‘আইনি বিষয়’ হিসেবে উল্লেখ করেছে নয়াদিল্লি।

ঘোষিত আলোচ্য : কৌশলগত সহযোগিতা

বৈঠকের পর মার্কিন রাষ্ট্রদূত সার্জিও গোর ভারত-যুক্তরাষ্ট্র কৌশলগত সহযোগিতা আরো শক্তিশালী করার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন। ভারতীয় নিরাপত্তা কাঠামোর সবচেয়ে প্রভাবশালী ব্যক্তিদের একজন দোভালের সাথে মার্কিন রাষ্ট্রদূতের এ ধরনের যোগাযোগ দুই দেশের নিরাপত্তা ও কৌশলগত সম্পর্কের ধারাবাহিকতারই অংশ বলে মনে করা হচ্ছে।

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ভারত-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্ক প্রতিরক্ষা, প্রযুক্তি, সরবরাহ-শৃঙ্খল, গুরুত্বপূর্ণ খনিজ, সামুদ্রিক নিরাপত্তা এবং ইন্দো-প্যাসিফিক কৌশলসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে বিস্তৃত হয়েছে। ফলে জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা পর্যায়ের যোগাযোগকে কেবল আনুষ্ঠানিক কূটনৈতিক সৌজন্য হিসেবে দেখার সুযোগ কম। তবে এ বৈঠকে বাংলাদেশ বা শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ নিয়ে আলোচনা হয়েছে কি না, সেটি জানানো হয়নি।

বৈঠকের সময়টাই গুরুত্বপূর্ণ

দোভাল-গোর বৈঠকের এক দিন আগে ঢাকায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সাথে ভারতের হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদীর বৈঠক হয়। ওই আলোচনায় বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের জন্য ‘অনুকূল পরিবেশ’ তৈরির প্রয়োজনীয়তার পাশাপাশি শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণের বিষয়টি গুরুত্ব পায় বলে জানা গেছে। এ বৈঠকে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে দ্বিপক্ষীয় সফরে ভারত যাওয়ার জন্য আমন্ত্রণ জানানো হয়। এই আমন্ত্রণ গ্রহণের বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় বা পররাষ্ট্র্র মন্ত্রণালয় থেকে নিশ্চিতভাবে কোনো কিছু জানানো হয়নি। তবে দুই সপ্তাহের মধ্যে এ সফর অনুষ্ঠিত হতে পারে বলে একটি সূত্র জানিয়েছে। নয়াদিল্লির পক্ষ থেকে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে প্রথম বিদেশ সফর হিসেবে দিল্লিকে বেছে নেয়ার জন্য আমন্ত্রণ জানানোর কথা বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশ হলেও তিনি প্রথম বিদেশ সফরে যান মালয়েশিয়ায় এবং এরপর চীনে।

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দিল্লি সফরে গেলে দুই দেশের সম্পর্কের নানা বিষয় নিয়ে আলোচনার পাশাপাশি শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণের বিষয়টিও আসতে পারে। ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানায়, শেখ হাসিনাকে প্রত্যর্পণের জন্য বাংলাদেশের অনুরোধ ভারত ‘প্রতিষ্ঠিত প্রক্রিয়া’ অনুযায়ী পর্যালোচনা করছে; অর্থাৎ দিল্লি এখনো প্রত্যর্পণের বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত ঘোষণা করেনি; বরং বিষয়টি আইনি ও প্রশাসনিক যাচাইয়ের পর্যায়ে রয়েছে।

পররাষ্ট্র দফতরের একই ব্রিফিংয়ে শরিফ ওসমান হাদি হত্যা মামলার ভারতে আটক দুই প্রধান সন্দেহভাজনকে বাংলাদেশে হস্তান্তরের বিষয়টিকেও ভারত ‘আইনি বিষয়’ হিসেবে বর্ণনা করেছে। ফলে একই সময়ে ঢাকা ও দিল্লির মধ্যে দু’টি সংবেদনশীল প্রত্যর্পণ ইস্যু আলোচনার কেন্দ্রে রয়েছে।

বাংলাদেশ কি আলোচনার আড়ালে?

এখানেই দোভাল-গোর বৈঠকের কৌশলগত গুরুত্ব নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়। দক্ষিণ এশিয়ায় বাংলাদেশের অবস্থান এখন শুধু ঢাকা-দিল্লি সম্পর্কের বিষয় নয়; এর সাথে চীন, ভারত ও যুক্তরাষ্ট্রের বৃহত্তর ভূরাজনৈতিক স্বার্থও যুক্ত।

বাংলাদেশের সাথে ভারতের সম্পর্কের টানাপড়েনের সময়েই চীনের সাথে ঢাকার অর্থনৈতিক ও কৌশলগত যোগাযোগ বাড়ার সম্ভাবনা নিয়ে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে আলোচনা চলছে। একই সাথে যুক্তরাষ্ট্র দক্ষিণ এশিয়ায় তার কৌশলগত উপস্থিতি এবং ভারতকে গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার হিসেবে ধরে রাখার নীতি অব্যাহত রেখেছে।

তবে এর অর্থ এই নয় যে দোভাল-গোর বৈঠকে বাংলাদেশ নিয়ে কোনো সিদ্ধান্ত হয়েছে; বরং বলা যায়, বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশিয়ার পরিবর্তিত ভূরাজনৈতিক পরিবেশ এমন একটি বৃহত্তর কৌশলগত প্রেক্ষাপট তৈরি করেছে, যার মধ্যে ভারত-যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা সংলাপকে পড়তে হবে।

দিল্লির জন্য তিনটি সমীকরণ

বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান পরিস্থিতিতে ভারতের সামনে অন্তত তিনটি সমীকরণ গুরুত্বপূর্ণ- বাংলাদেশের সাথে সম্পর্ক পুনর্গঠন, চীনের ক্রমবর্ধমান আঞ্চলিক প্রভাব মোকাবেলা এবং যুক্তরাষ্ট্রের সাথে কৌশলগত অংশীদারত্ব বজায় রাখা।

বাংলাদেশের সাথে সম্পর্ক স্বাভাবিক করতে হলে হাসিনার প্রত্যর্পণ ইস্যুতে ঢাকার অবস্থানকে বিবেচনায় নিতে হবে। আবার ভারতের দৃষ্টিকোণ থেকে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক পরিবর্তন এবং চীনের সম্ভাব্য প্রভাবও নিরাপত্তা হিসাবের অংশ।

অন্য দিকে ওয়াশিংটনের কাছে ভারত ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার। ফলে ভারত-যুক্তরাষ্ট্র নিরাপত্তা সংলাপ যত গভীর হবে, দক্ষিণ এশিয়ার অন্য দেশগুলোর ওপর তার প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ প্রভাবের সম্ভাবনাও তত বাড়বে।

এখন নজর ঢাকার দিকে

দোভাল-গোর বৈঠক থেকে বাংলাদেশসংক্রান্ত কোনো প্রত্যক্ষ সিদ্ধান্তের তথ্য না থাকলেও এর রাজনৈতিক সময়কাল উপেক্ষা করার মতো নয়। এক দিকে ঢাকা হাসিনার প্রত্যর্পণে চাপ বাড়াচ্ছে, অন্য দিকে দিল্লি বিষয়টি ‘প্রতিষ্ঠিত প্রক্রিয়া’ অনুযায়ী পর্যালোচনার কথা বলছে। একই সময়ে ভারত-যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা যোগাযোগও সক্রিয় রয়েছে।

তাই আপাতত সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন বৈঠকে কী গোপন সিদ্ধান্ত হয়েছে তা নয়; বরং ভারত তার বাংলাদেশ নীতি, যুক্তরাষ্ট্রের সাথে কৌশলগত অংশীদারত্ব এবং দক্ষিণ এশিয়ায় চীনের প্রভাব- এই তিনটি সমীকরণ কিভাবে একসাথে সামলায়।

এই সমীকরণে আগামী দিনগুলোতে ঢাকার প্রতি দিল্লির অবস্থান কতটা নমনীয় হয়, হাসিনার প্রত্যর্পণ প্রশ্নে ভারতের আইনি প্রক্রিয়া কোন দিকে এগোয় এবং বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক পুনর্গঠনে ওয়াশিংটনের কোনো পরোক্ষ ভূমিকা তৈরি হয় কি না- সে দিকেই এখন নজর থাকবে।

বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীকে দ্বিপক্ষীয় সফরে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে

কূটনৈতিক প্রতিবেদক জানান, বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে ভারতে দ্বিপক্ষীয় সফর এবং বিমসটেকের চেয়ারপারসন হিসেবে আসন্ন ব্রিকস শীর্ষ সম্মেলনের আউটরিচ সেশনে অংশগ্রহণ- এই দুইভাবেই আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে বলে জানিয়েছেন ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে মুখপাত্র রণধীর জয়সোয়াল।

গতকাল দিল্লিতে নিয়মিত ব্রিফিংয়ে একজন সাংবাদিক গত সোমবার বাংলাদেশে নিযুক্ত ভারতের হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদীর প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সাথে সাক্ষাতের প্রসঙ্গ তুলে সেখানে কী কী বিষয়ে আলোচনা হয়েছে এবং প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ভারতে আসতে রাজি হয়েছেন কি না, তা জানতে চান।

জবাবে জয়সোয়াল বলেন, সোমবার বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর সাথে আমাদের হাইকমিশনারের সাক্ষাৎ হয়েছে। এতে দুই পক্ষই পারস্পরিক স্বার্থসংবলিত বিষয় নিয়ে কথা বলেছে।

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে আমন্ত্রণ জানানো প্রসঙ্গে তিনি বলেন, দ্বিপক্ষীয় সফরের জন্য আমরা আমন্ত্রণ জানিয়েছি, সেই সাথে দিল্লিতে অনুষ্ঠেয় ব্রিকস আউটরিচ সেশনে অংশগ্রহণের জন্যও আমন্ত্রণ জানিয়েছি।

আগামী ১২ ও ১৩ সেপ্টেম্বর দিল্লিতে অষ্টাদশ ব্রিকস শীর্ষ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হবে। ওই সম্মেলনের আউটরিচে যোগ দিতে বিমসটেকের চেয়ারপারসন হিসেবে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে আমন্ত্রণ জানিয়েছেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। এর আগে গত ফেব্রুয়ারিতে তারেক রহমান বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করার পর তাকে ভারতে দ্বিপক্ষীয় সফরের জন্য আমন্ত্রণ জানান নরেন্দ্র মোদি।