রাজনৈতিক অঙ্গনে ফের উত্তাপ ও চাঞ্চল্য সৃষ্টি

সরকার ও বিরোধী জোটের রাজপথের মহড়া আজ

একই দিনে দেশের প্রধান দুই রাজনৈতিক শিবিরের এই কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে সাধারণ মানুষের মাঝে যেমন উৎকণ্ঠা বাড়ছে, তেমনই দেশের রাজনীতিবিদ, বুদ্ধিজীবী ও রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মধ্যে শুরু হয়েছে নানা সমীকরণ ও চুলচেরা বিশ্লেষণ। তাদের মতে, বিএনপির কর্মসূচিটি আলোচনা সভা হলেও এটি একপর্যায়ে সামবেশে রূপ নেবে। কারণ রাজধানীর এই অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি থাকবেন দলের চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। এ ছাড়া এই অনুষ্ঠান ঘিরে বিএনপি ও অঙ্গ দলগুলোর নেতাকর্মীরা নিজেদের শক্তি জানান দিতে শক্তির মহড়াও প্রদর্শন করবে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, আজকের সরকার ও বিরোধী জোটের কর্মসূচিকে ঘিরে দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে ফের বড় ধরনের উত্তাপ ও চাঞ্চল্য সৃষ্টি হয়েছে।

মোহাম্মদ জাফর ইকবাল
Printed Edition

ঘোষিত কর্মসূচি অনুযায়ী আজ শনিবার সকালে জামায়াতে ইসলামী নেতৃত্বাধীন ১১-দলীয় জোটের ঢাকা-চট্টগ্রাম লংমার্চ এবং বিকেলে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে ক্ষমতাসীন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর আলোচনা সভা। একই দিনে দেশের প্রধান দুই রাজনৈতিক শিবিরের এই কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে সাধারণ মানুষের মাঝে যেমন উৎকণ্ঠা বাড়ছে, তেমনই দেশের রাজনীতিবিদ, বুদ্ধিজীবী ও রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মধ্যে শুরু হয়েছে নানা সমীকরণ ও চুলচেরা বিশ্লেষণ। তাদের মতে, বিএনপির কর্মসূচিটি আলোচনা সভা হলেও এটি একপর্যায়ে সামবেশে রূপ নেবে। কারণ রাজধানীর এই অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি থাকবেন দলের চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। এ ছাড়া এই অনুষ্ঠান ঘিরে বিএনপি ও অঙ্গ দলগুলোর নেতাকর্মীরা নিজেদের শক্তি জানান দিতে শক্তির মহড়াও প্রদর্শন করবে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, আজকের সরকার ও বিরোধী জোটের কর্মসূচিকে ঘিরে দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে ফের বড় ধরনের উত্তাপ ও চাঞ্চল্য সৃষ্টি হয়েছে।

২০২৪ সালের ঐতিহাসিক ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানের পর গঠিত অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মাধ্যমে রাষ্ট্রক্ষমতায় আসে বিএনপি। তবে নির্বাচনের পর থেকেই প্রধান বিরোধী শক্তি বিশেষ করে জামায়াতে ইসলামী এবং নবগঠিত জাতীয় নাগরিক পার্টিসহ (এনসিপি) ১১-দলীয় জোটের সাথে সরকারের দূরত্ব তৈরি হয়। মূলত সংবিধানে ৪৮টি পরিবর্তন এনে ‘গণভোটের রায়’ বাস্তবায়ন, জুলাই সনদের আইনি ভিত্তি নিশ্চিত করা এবং শাসনব্যবস্থায় আনুপাতিক প্রতিনিধিত্ব ব্যবস্থা চালুসহ বেশ কয়েকটি দাবিতে ১১-দলীয় জোট গত কয়েক মাস ধরে ধারাবাহিক আন্দোলন করে আসছে। অন্য দিকে ক্ষমতাসীন বিএনপি তাদের নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী শাসনকার্য পরিচালনার দাবি করলেও বিরোধী জোটের অভিযোগ- সরকার মাত্রাতিরিক্ত দলীয়করণ করছে এবং গণভোটের রায় বাস্তবায়নে অনীহা দেখাচ্ছে। এই রেষারেষির চূড়ান্ত রূপ হিসেবেই আজ শনিবারের এই সকাল-বিকেলের রাজপথের মহড়া।

জানা গেছে, আজ সকাল থেকেই ঢাকা টু চট্টগ্রামের রাজপথের নিয়ন্ত্রণ নিতে যাচ্ছে জামায়াত নেতৃত্বাধীন ১১-দলীয় জোট। জোটের লিয়াজোঁ কমিটির সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, সকাল ৭টায় মতিঝিল শাপলা চত্বরের সামনে সমাবেশ শেষে চট্টগ্রাম অভিমুখে এই বিশাল লংমার্চ শুরু হবে। জোটের সমন্বয়ক ও জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল হামিদুর রহমান আযাদ জানিয়েছেন, এই লংমার্চে প্রায় ১,৫০০ যান অংশ নেবে। মিছিলটি ঢাকার কাঁচপুর ট্রাক স্ট্যান্ড, কুমিল্লার পদুয়ার বাজার বিশ্বরোড, ফেনীর মহিপাল এবং চট্টগ্রামের মীরসরাই হয়ে চট্টগ্রামের ঐতিহাসিক লালদীঘি ময়দানে গিয়ে জনসভার মাধ্যমে শেষ হবে। প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ ট্রাফিক পয়েন্টে পথসভা করা হবে।

বিরোধী জোটের মূল দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছে, সংবিধানে সংস্কার এনে যে গণভোটের রায় দেয়া হয়েছিল তা অবিলম্বে সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত করা। ২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থানের শহীদদের পরিবারকে পুনর্বাসন এবং খুনিদের দৃষ্টান্তমূলক বিচার। গ্যাস, বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও সারের দাম কমানো এবং “ভুতুড়ে বিল” বন্ধ করা। রাষ্ট্রীয় প্রশাসনে বিএনপির একক আধিপত্য ও সঙ্কীর্ণ দলীয়করণের অবসান।

এ দিকে গত ১ সেপ্টেম্বর দলের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী থাকলেও দলটি আজ আনুষ্ঠানিকভাবে রাজধানীতে আলোচনার কর্মসূচি পালন করবে। এ ছাড়া দেশের অন্যান্য স্থানেও প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর আলোচনা অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। জানা গেছে, বিরোধী জোটের সকালের কর্মসূচির জবাব দিতেই যেন বিকেলে মাঠে নামছে ক্ষমতাসীন বিএনপি। দলটির ৪৮তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী এবং সমসাময়িক রাজনৈতিক পরিস্থিতির আলোকে তৃণমূল পর্যায় পর্যন্ত নেতাকর্মীদের চাঙ্গা রাখতেই এই বিকেলের শোডাউনের ডাক দেয়া হয়েছে। তবে দলটির নীতিনির্ধারকদের মতে, এটি কোনো “পাল্টা কর্মসূচি” নয় এটি দলের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর কর্মসূচি। প্রতি বছরই বিএনপি দিবসটিকে ঘিরে বেশ কয়েক দিন ধরে কর্মসূচি পালন করে থাকে। এবারেরটিও সেই রকমই।

বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায় নয়া দিগন্তকে বলেন, একটি মহল অযৌক্তিক দাবি তুলে দেশে অস্থিতিশীলতা সৃষ্টি করতে চাইছে। রাজপথে শান্তিপূর্ণ কর্মসূচি করার অধিকার সবার আছে, তবে আন্দোলনের নামে যদি জনদুর্ভোগ সৃষ্টি করা হয় বা আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটানো হয়, তবে দেশের মানুষ তা বরদাশত করবে না।

লংমার্চ বাস্তবায়ন কমিটির প্রধান এবং জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল, সাবেক এমপি অধ্যাপক মিয়া গোলাম পরওয়ার সরকারি দলের এই বক্তব্যকে নাকচ করে দিয়ে বলেন, আমরা সরকারকে উৎখাত করার জন্য এই আন্দোলন করছি না। আমরা জনগণের মৌলিক অধিকার, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের লাগামহীন মূল্যবৃদ্ধি এবং গণভোটের রায় বাস্তবায়নের দাবি জানাচ্ছি। সরকারের একগুঁয়েমি এবং বিরোধী মতকে দমনের চেষ্টার কারণেই আজ আমরা রাজপথে নামতে বাধ্য হয়েছি। আমরা শান্তিপূর্ণভাবে লংমার্চ সফল করতে প্রশাসনের সহযোগিতা কামনা করছি।

একই দিনে দুই পক্ষের এই বড় শোডাউনকে দেশের সুশীলসমাজ ও রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বেশ গুরুত্বের সাথে দেখছেন। তাদের মতে, এটি বাংলাদেশের বহুদলীয় গণতন্ত্রের জন্য যেমন একটি পরীক্ষা, তেমনই বড় ধরনের সঙ্ঘাতের আশঙ্কারও জন্ম দেয়। অধ্যাপক ড. আসিফ নজরুল গণমাধ্যমে বলেছেন, একই দিনে দুই পক্ষের রাজপথে থাকা গণতান্ত্রিক অধিকারের অংশ। তবে সকাল ও বিকেলের টাইমিংয়ের মধ্যে যদি কোনো ওভারল্যাপিং হয়, তবে ঢাকার ট্রাফিক ও নিরাপত্তা ব্যবস্থা ভেঙে পড়তে পারে। সরকারের উচিত বিরোধী দলকে শান্তিপূর্ণভাবে কর্মসূচি করতে দেয়া এবং দমনমূলক নীতি পরিহার করা।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) সাবেক ভিসি ড. আনোয়ার উল্লাহ চৌধুরী বলেন, আমি মনে করি আলাপ-আলোচনার মাধ্যমেই এসব সমস্যা ও মতবিরোধের সমাধান করা সম্ভব। তার মতে, এটাই হওয়া উচিত।

অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ বলেন, এখন যারা সরকারে এবং বিরোধী দলে আছেন তাদের আচার-আচরণ রাজনৈতিক ভূমিকা কিংবা এজেন্ডা নির্ধারণের ক্ষেত্রে এটা বিবেচনার মধ্যে রাখা উচিত, যাতে আর নতুন কোনো অস্থিতিশীলতা কিংবা জনগণের দুর্ভোগ সৃষ্টি না হয়। সরকারের কিছু এজেন্ডা আছে। বিরোধী দলেরও এজেন্ডা আছে। সেগুলো যতটা সম্ভব আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে সমাধান করার চেষ্টা করতে হবে।

সুশাসনের জন্য নাগরিক-সুজন সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার বলেন, একজন নাগরিক হিসেবে অনৈক্য বা অস্থিতিশীল পরিস্থিতি কোনোভাবেই আমাদের প্রত্যাশা নয়। মতবিরোধে সবচেয়ে বেশি দরকার আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে সমস্যার সমাধান করা। এ ব্যাপারে সরকারি ও বিরোধী দলকে সম্মিলিতভাবে চেষ্টা করতে হবে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. সাব্বির আহমেদের মতে, বিএনপি সরকারে আছে। এখানে অবশ্যই বিএনপির দায়িত্ব বেশি। তিনি বলেন, জুলাই সনদের বিষয়টা সাংবিধানিক প্রক্রিয়া। তাই সংবিধান সংস্কার পরিষদের প্রক্রিয়ার মধ্য থেকেই সমাধান করার সুযোগ রয়েছে।

বিরোধী জোটের আন্দোলনের বিষয়ে জানতে চাইলে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী নয়া দিগন্তকে বলেন, রাজপথে আন্দোলনের হুমকি না দিয়ে সমস্যা সমাধানে বিরোধী দলের উচিত হবে জাতীয় সংসদে পরামর্শ দেয়া। গ্যাস ও বিদ্যুৎ সঙ্কট আন্তর্জাতিক যুদ্ধ ও বিগত সরকারের ভুল পরিকল্পনার জন্য হয়েছে। তিনি বলেন, সংসদে বিরোধী দলের সদস্যদের কথা বলার সুযোগ রয়েছে। সরকারের সমালোচনা ও সংসদের বাইরে কর্মসূচি পালন গণতন্ত্রের স্বাভাবিক চর্চা হলেও সঙ্কট মোকাবেলায় পরামর্শ দেয়াও প্রয়োজন।

সরকারের দুই রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের কর্মসূচি ঘিরে আগামী দিনের রাজনৈতিক পরিস্থিতি ঘোলাটে হচ্ছে কিনা, এমন আলোচনা হচ্ছে। এক্ষেত্রে বিরোধী দল মনে করে, তারা জনগণের অধিকার আদায়ের জন্য গঠনমূলক কর্মসূচি পালন করছে। রাজপথ উত্তপ্ত করা তাদের উদ্দেশ্য নয়। তবে এক্ষেত্রে সরকার কী ধরনের আচরণ করে, সেটি দেখার বিষয়। আর ক্ষমতাসীন দল মনে করে, বিরোধী দল তাদের আন্দোলন করতেই পারে। তবে সরকার যেসব বিষয়ে সমস্যা অনুভব করছে, এর প্রকৃত কারণও বিরোধী দলকে জনগণের কাছে বলতে হবে।

রাজনীতিবিদ ও বিশ্লেষকদের মতে, আজকের দিনটি যদি শান্তিপূর্ণভাবে পার হয়ে যায়, তবে তা দেশের গণতান্ত্রিক সহনশীলতার এক নতুন দৃষ্টান্ত স্থাপন করবে। আর যদি কোনো কারণে সঙ্ঘাত বা সহিংসতা ছড়ায়, তবে তা দেশের সদ্য অর্জিত রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতাকে বড় ধরনের ঝুঁকির মুখে ফেলে দিতে পারে। তাই সবার চোখ এখন সরকার ও বিরোধী জোটের রাজপথের কর্মসূচির দিকে।