ছয় মাস না পেরোতেই নানামুখী সঙ্কটে পড়েছে সরকার। বিদ্যুৎ-জ্বালানি সঙ্কট, দ্রব্যমূল্যের অনিয়ন্ত্রিত ঊর্ধ্বগতি এবং ক্ষমতাসীনদের চাঁদাবাজির কারণে জনমনে চরম অসন্তোষ সৃষ্টি হয়েছে। এর মধ্যে বিভিন্ন দাবিতে রাজপথ গরম করতে যাচ্ছে বিরোধী জোট। বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় ঐক্য আগামী ৫ সেপ্টেম্বর ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম অভিমুখে প্রথম লংমার্চ কর্মসূচি ঘোষণা করেছে। বিশ্লেষকদের মতে, বিরোধী জোটের এ আন্দোলন মাঠে গড়ালে ক্ষমতাসীন সরকার নতুন করে বড় ধরনের রাজনৈতিক চাপে পড়তে পারে।
গত বৃহস্পতিবার জাতীয় সংসদের তৃতীয় অধিবেশনের প্রথম দিনই সরকারি দল বিশেষ করে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদকে চেপে ধরে বিরোধীরা। জামায়াত-এনসিপির সংসদ সদস্যদের আইনশৃঙ্খলার অবনতি সংক্রান্ত বক্তব্যের জবাব দিতে গিয়ে পল্টন-শাহবাগের বক্তব্যের তুলনা করে বিরোধী সংসদ সদস্যদের তোপের মুখে পড়েন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। শেষমেশ সংসদেই বক্তব্য প্রত্যাহার করে নিতে বাধ্য হন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। এদিন বিরোধী দলীয় নেতাও ছিলেন যেন কড়া মুডে। অনেকটা শাসনের সুরেই বক্তব্য রাখেন তিনি।
নতুন সরকার আসার পর বিরোধী জোট দেশের বিভিন্ন স্থানে সভা-সমাবেশ করেছে। এবার রাজপথে বড় কর্মসূচি পালন করতে যাচ্ছে তারা। বিশেষ করে জুলাই সনদ বাস্তবায়ন ও সংবিধান সংস্কার প্রশ্নে যেন তারা অনড়। এ দাবিতে ৫ সেপ্টেম্বর ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম অভিমুখে প্রথম লংমার্চ কর্মসূচি বাস্তবায়নে ইতোমধ্যে প্রস্তুতি প্রায় সম্পন্ন করেছে ১১ দল। সেপ্টেম্বর ও অক্টোবর জুড়ে পর্যায়ক্রমে ঢাকা-রংপুর (১৯ সেপ্টেম্বর), ঢাকা-খুলনা (১০ অক্টোবর) এবং ঢাকা-সিলেট (২৪ অক্টোবর) রুটে আরো তিনটি লংমার্চ কর্মসূচি পালন করবে তারা। সবশেষে আগামী ১৪ নভেম্বর ঢাকায় মহাসমাবেশ আয়োজনের মাধ্যমে এ আন্দোলনের বড় ধরনের সমাপ্তি টানা হবে বলে জানিয়েছে ১১ দলীয় জোট।
মতিঝিল থেকে যাত্রা, লালদীঘিতে শেষ
রাজধানীর মগবাজারে দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে সম্প্রতি আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে লংমার্চের প্রস্তুতি ও সার্বিক চিত্র তুলে ধরেন জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার। তিনি জানান, ৫ সেপ্টেম্বর সকাল ৭টায় ঢাকার মতিঝিল শাপলা চত্বর থেকে চট্টগ্রাম অভিমুখে যাত্রা শুরু হবে। অন্তত এক হাজার যানবাহনের সুবিশাল বহর নিয়ে এ লংমার্চটি নারায়ণগঞ্জ, মুন্সীগঞ্জ, কুমিল্লা ও ফেনী হয়ে চট্টগ্রামের ঐতিহাসিক লালদীঘি ময়দানে গিয়ে শেষ হবে। রাজধানীর শাপলা চত্বরে জনসভা, শাপলা টু লালদীঘি পর্যন্ত মানবপ্রাচীর রচনা, চিটাগাং রোড (নারায়ণগঞ্জ), কুমিল্লার পদুয়ার বাজার বিশ্বরোড, ফেনীর মহিপাল ও চট্টগ্রামের মিরসরাইয়ে পথসভা এবং লালদীঘিতে সর্বশেষ জনসভা অনুষ্ঠিত হবে।
জনদুর্ভোগ এড়াতে বিশেষ পদক্ষেপ ও প্রস্তুতি
লংমার্চ চলাকালে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের স্বাভাবিক যান চলাচল যাতে একেবারে স্থবির না হয়ে পড়ে, সে জন্য মহাসড়কের একটি লেন সাধারণ যানবাহনের জন্য উন্মুক্ত রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে জোটটি। বিশাল যানবাহন বহরের কারণে সম্ভাব্য যানজট ও সাময়িক ভোগান্তির কথা বিবেচনা করে জামায়াত ও ১১ দলীয় জোটের পক্ষে আগেই দেশবাসীর কাছে বিনয়ের সাথে দুঃখ প্রকাশ করা হয়েছে। এ ছাড়া কর্মসূচি সফল ও সুশৃঙ্খল রাখতে অভ্যর্থনা, চিকিৎসা, পরিবহন, প্রচার, আইটি, নিরাপত্তা ও স্বেচ্ছাসেবকসহ একাধিক কার্যকরী উপকমিটি গঠন করা হয়েছে। সার্বিক আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় গত ২৪ আগস্ট জোট নেতারা আইজিপি ও পুলিশ প্রশাসনের সাথে বৈঠক করে লিখিত রুট ম্যাপ জমা দিয়েছেন।
১১ দলীয় ঐক্যের প্রধান ৬ দফা দাবি
বিরোধী জোট মূলত ৬ দফা দাবি আদায়ের লক্ষ্যে এই রাজপথের আন্দোলনের ডাক দিয়েছে : ১. গণভোটের গণরায় অবিলম্বে বাস্তবায়ন করা। ২. জুলাই গণহত্যার দ্রুত ও দৃশ্যমান বিচার সম্পন্ন করা। ৩. বিদ্যুৎ, তেল, গ্যাস এবং বর্তমান তীব্র সারসঙ্কট নিরসন করা। ৪. নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যমূল্যের উর্ধ্বগতি রোধে বাজার কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা। ৫. দেশের অবনতিশীল আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির দ্রুত উন্নতি ঘটানো এবং ৬. প্রশাসনের সর্বস্তরে রাজনৈতিক দলীয়করণ বন্ধ করা।
সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ
ক্ষমতার প্রথম ছয় মাসেই নিত্যপণ্যের চড়া দাম, বিদ্যুৎ-জ্বালানি ঘাটতি এবং বাজার সিন্ডিকেটের পাশাপাশি সরকারি দলের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে ওঠা চাঁদাবাজির অভিযোগে সাধারণ মানুষের ওপর প্রভাব পড়েছে। ফলে সরকারের যে জনপ্রিয়তা ছিল, তাতে কিছুটা ভাটা দেখা যাচ্ছে। এ অবস্থায় বিরোধী জোটের এই সমন্বিত লংমার্চ আন্দোলন মাঠপর্যায় পর্যন্ত বিস্তৃত হলে দেশের রাজনীতির সমীকরণ নতুন মোড় নিতে পারে।



