হাসিনাসহ ৩১ জনের বিরুদ্ধে পরোয়ানা

শাপলা চত্বর ‘জেনোসাইড’ মামলায় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে চার্জ গ্রহণ

Printed Edition
হাসিনাসহ ৩১ জনের বিরুদ্ধে পরোয়ানা
হাসিনাসহ ৩১ জনের বিরুদ্ধে পরোয়ানা

নিজস্ব প্রতিবেদক

রাজধানীর মতিঝিলের শাপলা চত্বরে ২০১৩ সালের ৫ মে হেফাজতে ইসলামের মহাসমাবেশে সংঘটিত ঘটনাকে ‘জেনোসাইড’ (গণহত্যা) ও মানবতাবিরোধী অপরাধ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর মো: আমিনুল ইসলাম। দীর্ঘ তদন্ত শেষে এই নারকীয় হত্যাকাণ্ডের অভিযোগে ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ ৪১ জন ‘হেভিওয়েট’ আসামির বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ (ফরমাল চার্জ) দাখিল করেছে প্রসিকিউশন। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল অভিযোগটি আমলে নিয়ে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ ৩১ জন পলাতক আসামির বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করেছেন এবং কারাবন্দী ১০ আসামিকে আগামী ১৬ আগস্ট আদালতে হাজির করার নির্দেশ দিয়েছেন।

গতকাল সোমবার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২-এর চেয়ারম্যান বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের বিচারিক প্যানেল এ আদেশ দেন। প্যানেলের অপর দুই সদস্য হলেন- বিচারক মো: মঞ্জুরুল বাছিদ এবং বিচারক নূর মোহাম্মদ শাহরিয়ার কবীর।

এর আগে বেলা পৌনে ১১টায় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের রেজিস্ট্রারের কাছে মামলার ফরমাল চার্জ দাখিল করে প্রসিকিউশন। এতে উপস্থিত ছিলেন- প্রসিকিউটর জহিরুল আমিন, মঈনুল করিম, তারেক আবদুল্লাহ, মার্জিনা রায়হান ও ফারুক আহাম্মদ। পরে প্রসিকিউশনের পক্ষে শুনানি পরিচালনা করেন চিফ প্রসিকিউটর আমিনুল ইসলাম।

ফরমাল চার্জ দাখিলের পর দুপুরে নিজ কার্যালয়ের সংবাদ সম্মেলনকক্ষে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে চিফ প্রসিকিউটর মো: আমিনুল ইসলাম বলেন, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের দায়িত্বভার নেয়ার পর আমি শাপলা চত্বরের হত্যাকাণ্ডের মামলাটি অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে দেখেছি। কোনো রাজনৈতিক বা আদর্শিক ভিন্নতার কারণে শিশুসহ আলেমদের ওপর নির্বিচারে গুলি চালিয়ে হত্যা করার ঘটনা দেশের ইতিহাসে নজিরবিহীন। এটি একটি পরিকল্পিত ‘জেনোসাইড’ বা গণহত্যা ছিল।

চিফ প্রসিকিউটর আরো জানান, তৎকালীন সরকার কিছু ব্লগার বা নাস্তিকদের দ্বারা প্রভাবিত হয়ে একটি নির্দিষ্ট ধর্মীয় বা ইসলামিক শ্রেণীকে নির্মূল করার উদ্দেশ্যে পুলিশ, বিজিবি, র‌্যাব এবং তৎকালীন সরকারি দল আওয়ামী লীগ, ছাত্রলীগ ও যুবলীগ মিলে এই নারকীয় হত্যাযজ্ঞ চালায়। ঘটনার পর দীর্ঘ সময় পার হলেও তৎকালীন সরকার কোনো তদন্তকাজ করতে দেয়নি। বহু চেষ্টা করেও হেফাজতে ইসলাম বিচার পায়নি।

প্রসিকিউশনের তদন্তে পাওয়া তথ্যের উল্লেখ করে তিনি বলেন, আমরা মোট ৬১ জন শহীদের তালিকা পেয়েছিলাম। এর মধ্যে তদন্ত সংস্থা ৫৮ জনের নাম-ঠিকানা শনাক্ত করেছে। চার স্থানে নিহত ৫৮ জনের মধ্যে ঢাকায় ৩২, নারায়ণগঞ্জে ২০, চট্টগ্রামে পাঁচ এবং কুমিল্লায় একজন। সোমবার মূলত দু’টি নির্দিষ্ট ঘটনামূলের ওপর চার্জ দাখিল করা হয়েছে, একটি ৫ মে মধ্যরাতে শাপলা চত্বরে ৩২ জন এবং অন্যটি ৬ মে নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জে ২০ জন হত্যার ঘটনা। এই দু’টি অভিযোগে সরাসরি সম্পৃক্ত ৪১ জন আসামির বিরুদ্ধে আমরা চার্জ এনেছি।

আদালতে শুনানিকালে চিফ প্রসিকিউটর ট্রাইব্যুনালকে জানান, এটি তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারের উচ্চপর্যায়ের সুপরিকল্পিত হত্যাযজ্ঞ ছিল। এই পরিকল্পনা বাস্তবায়নে তৎকালীন মন্ত্রী ও প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা বৈঠক করে শাপলা চত্বরে গ্রেনেড এবং ভারী মারণাস্ত্র ব্যবহারের সিদ্ধান্ত নেন। এরপরই শিশু ও আলেমদের ওপর চালানো হয় চরম বর্বরতা।

প্রসিকিউশনের আবেদন পর্যালোচনা করে ট্রাইব্যুনাল-২ অভিযোগ আমলে নেন। এরপর ইতোমধ্যে অন্য মামলায় কারাবন্দী থাকা ১০ আসামিকে আগামী ১৬ আগস্ট ট্রাইব্যুনালে প্রডিউস করার নির্দেশ দেন এবং শেখ হাসিনাসহ পলাতক ৩১ জনের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করেন।

প্রসিকিউশনের আনীত ৪১ জন আসামির তালিকায় রয়েছেন- তৎকালীন সরকারের প্রভাবশালী মন্ত্রী, সংসদ সদস্য, রাজনৈতিক নেতা, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর শীর্ষ কর্মকর্তা, সাংবাদিক ও সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা।

রাজনীতিবিদ ও তৎকালীন সরকারের মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীদের মধ্যে রয়েছেন- শেখ হাসিনা (সাবেক প্রধানমন্ত্রী); ড. মহিউদ্দিন খান আলমগীর (তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী); অ্যাডভোকেট শামসুল হক টুকু (তৎকালীন স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী); হাসানুল হক ইনু (তৎকালীন তথ্যমন্ত্রী ও জাসদ সভাপতি); ড. আব্দুর রাজ্জাক (তৎকালীন খাদ্যমন্ত্রী); ড. হাছান মাহমুদ (তৎকালীন তথ্যমন্ত্রী); শেখ ফজলুল করিম সেলিম (আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য); মাহবুবউল আলম হানিফ (আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক); আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম (আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক); জাহাঙ্গীর কবির নানক (আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক); আব্দুল লতিফ সিদ্দিকী (সাবেক মন্ত্রী); ডা: দীপু মনি (সাবেক মন্ত্রী); মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়া (সাবেক মন্ত্রী); অ্যাডভোকেট মৃণাল কান্তি দাস (সাবেক প্রতিমন্ত্রী); ওমর ফারুক চৌধুরী (তৎকালীন যুবলীগ চেয়ারম্যান); সালাউদ্দিন মাহমুদ (সাবেক সংসদ সদস্য)।

আইনশৃঙ্খলাবাহিনী ও সেনাবাহিনীর শীর্ষ কর্মকর্তাদের মধ্যে রয়েছেন- হাসান মাহমুদ খন্দকার (সাবেক আইজিপি); এ কে এম শহীদুল হক (সাবেক আইজিপি); ড. মোহাম্মদ জাবেদ পাটোয়ারী (সাবেক আইজিপি); বেনজীর আহমেদ (সাবেক আইজিপি ও তৎকালীন র‌্যাব ডিজি); মো: মোখলেছুর রহমান (তৎকালীন র‌্যাব মহাপরিচালক); জেনারেল আজিজ আহমেদ (সাবেক সেনাপ্রধান); মেজর জেনারেল (অব:) জিয়াউল আহসান; লেফটেন্যান্ট জেনারেল মো: মজিবুর রহমান (তৎকালীন র‌্যাবের অতিরিক্ত মহাপরিচালক-অপস); আব্দুল জলিল মণ্ডল (সাবেক ডিআইজি); শেখ মুহাম্মাদ মারুফ হাসান (সাবেক অতিরিক্ত আইজিপি); মাহবুব হোসেন (সাবেক অতিরিক্ত আইজিপি-এসবি); মনিরুল ইসলাম (সাবেক অতিরিক্ত আইজিপি-এসবি); মো: আনোয়ার হোসেন (তৎকালীন ডিএমপির ডিসি-সদর দফতর); আশরাফুজ্জামান (তৎকালীন ডিএমপির ডিসি-ট্রাফিক দক্ষিণ); এস এম মেহেদী হাসান (তৎকালীন ডিএমপির এডিসি-মতিঝিল জোন); হারুন-অর-রশীদ (সাবেক ডিআইজি); বিপ্লব কুমার সরকার (সাবেক ডিআইজি); সৈয়দ নুরুল ইসলাম (সাবেক ডিআইজি); মো: আসাদুজ্জামান (তৎকালীন ডিএমপির এডিসি-মতিঝিল বিভাগ); এস এম শিবলী নোমান (অবসরপ্রাপ্ত অতিরিক্ত পুলিশ সুপার); বি এম ফরমান আলী (তৎকালীন মতিঝিল থানার ওসি)।

নাগরিক সমাজ, অনলাইন অ্যাক্টিভিস্ট ও সংবাদকর্মীদের মধ্যে রয়েছেন- ডা: ইমরান এইচ সরকার (গণজাগরণ মঞ্চের আহ্বায়ক ও মুখপাত্র), শাহরিয়ার কবির (ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির সভাপতি); মোজাম্মেল হক বাবু (৭১ টিভির ব্যবস্থাপনা পরিচালক); ফারজানা রুপা (সাংবাদিক)।

বর্তমানে এই মামলায় আটজন আসামি গ্রেফতার হয়ে কারাগারে রয়েছেন। তারা হলেন- সাবেক মন্ত্রী ডা: দীপু মনি, সাবেক প্রতিমন্ত্রী শামসুল হক টুকু, সাবেক সেনা কর্মকর্তা জিয়াউল আহসান, সাবেক আইজিপি এ কে এম শহীদুল হক, ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির সভাপতি শাহরিয়ার কবির, সাবেক ডিআইজি আবদুল জলিল মণ্ডল, সাংবাদিক ফারজানা রুপা এবং মোজাম্মেল হক বাবু।

অন্য মামলায় দণ্ডপ্রাপ্ত ও গ্রেফতার হয়ে কারাগারে আছেন হাসানুল হক ইনু এবং ড. আব্দুর রাজ্জাক। শেখ হাসিনাসহ তালিকার বাকি ৩১ জন আসামি বর্তমানে পলাতক রয়েছেন।