সোহেল ও স্বপ্নার মৃত্যুদণ্ড

৪ কার্যদিবসে রামিসা ধর্ষণ ও হত্যা মামলার রায়

আদালত প্রতিবেদক
Printed Edition
সোহেল রানা (৩১) এবং তার স্ত্রী স্বপ্না খাতুন (২৬)
সোহেল রানা (৩১) এবং তার স্ত্রী স্বপ্না খাতুন (২৬)

নজিরবিহীন দ্রুততম বিচারিক প্রক্রিয়া : টাইমলাইন

এই মামলাটি নিষ্পত্তির ক্ষেত্রে রাষ্ট্রপক্ষ, আইন প্রয়োগকারী সংস্থা এবং আদালত এক নজিরবিহীন ও ঐতিহাসিক সমন্বয় দেখিয়েছে, যা দেশের বিচারব্যবস্থার ইতিহাসে একটি মাইলফলক :

১৯ মে : সকাল ৯টা ৩০ মিনিটে হত্যাকাণ্ড সংঘটিত এবং সকাল ১০টা ৩০ মিনিটে লাশ উদ্ধার।

২০ মে : পল্লবী থানায় হত্যা মামলা দায়ের এবং তথ্যপ্রযুক্তির সাহায্যে ফতুল্লা থেকে প্রধান আসামি সোহেল রানা গ্রেফতার।

২৪ মে : মাত্র পাঁচ দিনের মাথায় তদন্ত কর্মকর্তা পল্লবী থানার এসআই অহিদুজ্জামান আদালতে সুনির্দিষ্ট চার্জশিট (অভিযোগপত্র) দাখিল করেন।

১ জুন : ঢাকা মহানগর শিশু সহিংসতা দমন ট্রাইব্যুনালে আসামিদের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ গঠন। (ঈদুল আজহার ছুটির মধ্যেও আদালতের কাজ বিশেষ ব্যবস্থাপনায় সচল রাখা হয়)।

২ জুন : মাত্র ১ দিনে মামলার বাদিসহ মোট ১৬ জন গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষীর সাক্ষ্যগ্রহণ ও জেরা সম্পন্ন করা হয়।

৩ জুন : ফৌজদারি কার্যবিধির ৩৪২ ধারায় আসামিদের আত্মপক্ষ সমর্থনের শুনানি। (এখানে সোহেল নিজের অপরাধ স্বীকার করে ক্ষমা চায়; কিন্তু স্বপ্না নিজেকে নির্দোষ দাবি করে)।

৪ জুন : রাষ্ট্রপক্ষ ও আসামিপক্ষের অত্যন্ত সংক্ষিপ্ত ও জোরালো চূড়ান্ত যুক্তিতর্ক (আর্গুমেন্ট) উপস্থাপন শেষ হয়।

৭ জুন : অভিযোগ গঠনের মাত্র ৪ কার্যদিবসের মাথায় মামলার চূড়ান্ত রায় ও দণ্ড ঘোষণা করা হয়।

রাজধানীর মিরপুরের পল্লবীতে আট বছরের শিশু রামিসা আক্তারকে ধর্ষণের পর নৃশংসভাবে হত্যা ও লাশ টুকরো করার চাঞ্চল্যকর মামলায় প্রধান আসামি সোহেল রানা (৩১) এবং তার স্ত্রী স্বপ্না খাতুন (২৬) উভয়কেই মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন আদালত। একই সাথে আসামিদের যথাক্রমে ৫ লাখ ও ২ লাখ টাকা অর্থদণ্ড করা হয়েছে। জরিমানার এই টাকা ভিকটিম রামিসার আইনগত উত্তরাধিকারীরা পাবেন। আসামিরা ক্ষতিপূরণ না দিলে তাদের স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি নিলামে বিক্রি করে ভিকটিমের পরিবারকে দেয়ার নির্দেশ দিয়েছেন আদালত।

বাংলাদেশের বিচারিক ইতিহাসে অভিযোগ গঠনের পর মাত্র চার কার্যদিবসের মধ্যে এবং ঘটনার মাত্র ১৭ দিনের মাথায় কোনো শিশু ধর্ষণ ও হত্যা মামলার রায় ঘোষণার ঘটনা এটিই প্রথম, যা বিচারব্যবস্থায় এক যুগান্তকারী ও ঐতিহাসিক নজির সৃষ্টি করেছে।

গতকাল রোববার ঢাকার মহানগর শিশু সহিংসতা দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক মাসরুর সালেকীন জনাকীর্ণ আদালতে এই রায় ঘোষণা করেন। বেলা ১১টা থেকে শুরু করে প্রায় ৪১ মিনিট ধরে রায় পাঠ শেষে বেলা ১১টা ৪১ মিনিটে চূড়ান্ত আদেশ দেয়া হয়।

কাঠগড়ায় আসামিদের আচরণ ও আদালতের নিরাপত্তা : গতকাল সকাল থেকেই আদালত প্রাঙ্গণ ও ট্রাইব্যুনাল এলাকায় সাধারণ মানুষ ও আইনজীবীদের ভিড় ছিল চোখে পড়ার মতো। রায় ঘোষণাকে কেন্দ্র করে আদালত প্রাঙ্গণে অতিরিক্ত তিন প্লাটুনসহ শতাধিক পুলিশ ও গোয়েন্দা সদস্য মোতায়েন করা হয়েছিল। কড়া নিরাপত্তায় সকাল সাড়ে ১০টার পর আসামিদের ট্রাইব্যুনালের এজলাসে আনা হয়।

আদালত সূত্র জানায়, এজলাসে প্রবেশের সময় প্রধান আসামি সোহেল রানা প্রথমে মুখ নিচু করে রাখলেও পরে তার স্ত্রী স্বপ্নার দিকে তাকিয়ে থাকেন। রায় ঘোষণার পুরো সময় সোহেল রানা কাঠগড়ার পাশে দেয়ালে হেলান দিয়ে নির্বিকার দাঁড়িয়ে ছিলেন এবং স্বপ্না খাতুন একটি টুলে বসে কাঁদছিলেন। রায় ঘোষণার পর তাদের মুখে চরম হতাশা ও আতঙ্ক ফুটে ওঠে।

রায়ের ঐতিহাসিক পর্যবেক্ষণ : সমাজ ও রাষ্ট্রের প্রতি বার্তা

রায়ের পর্যবেক্ষণে বিচারক মাসরুর সালেকীন সমাজ ও বিচারব্যবস্থার প্রতি কিছু অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও কঠোর বার্তা দিয়েছেন। পর্যবেক্ষণে তিনি বলেন: ‘এই মামলাটি কেবল একটি সাধারণ ফৌজদারি অপরাধের বিচার নয়; এটি আমাদের সমাজের সামগ্রিক বিবেক, আইনের শাসন এবং মানবতার এক কঠিন পরীক্ষা। একটি নিষ্পাপ শিশুকে যেভাবে নির্মমভাবে নিভিয়ে দেয়া হলো, তা পুরো রাষ্ট্র ও সমাজকে মারাত্মকভাবে আহত করেছে। শিশুদের অধিকার রক্ষা করা রাষ্ট্রের মৌলিক উদ্দেশ্যের একটি। ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে রক্ষা করতে এই ধরনের ন্যক্কারজনক অপরাধে কোনো অনুকম্পা না দেখিয়ে সর্বোচ্চ সাজা দেয়া আবশ্যক।’

বিচারক আরো উল্লেখ করেন, বর্তমানে তার ট্রাইব্যুনালে এক হাজার ৮০০-এরও বেশি শিশু নির্যাতনের মামলা বিচারাধীন রয়েছে। রামিসা হত্যার দ্রুত তদন্ত ও দ্রুত বিচার যেভাবে সম্পন্ন হয়েছে, তা বাংলাদেশের ইতিহাসে একটি ‘অনুসরণীয় মডেল’ বা দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে। তিনি পুলিশ ও প্রসিকিউশনকে দ্রুততম সময়ে নিখুঁত তদন্ত ও প্রমাণ হাজির করার জন্য ধন্যবাদ জানিয়ে বলেন, কোনো আবেগের বশবর্তী হয়ে নয়, বরং শতভাগ বস্তুনিষ্ঠ ডিজিটাল-ফরেনসিক প্রমাণ, পারিপার্শ্বিক আলামত এবং আসামির আত্মস্বীকৃত জবানবন্দীর ভিত্তিতেই এই সর্বোচ্চ সাজার রায় দেয়া হয়েছে।

স্ত্রী স্বপ্নার মৃত্যুদণ্ড : সুনির্দিষ্ট আইনি ব্যাখ্যা

অনেকের মনেই প্রশ্ন জেগেছিল- ধর্ষণ ও সরাসরি হত্যাকাণ্ড সোহেল রানা ঘটালেও তার স্ত্রী স্বপ্না খাতুনকে কেন সমপরিমাণ শাস্তি অর্থাৎ মৃত্যুদণ্ড দেয়া হলো? চার্জশিট এবং আদালতের সংক্ষিপ্ত পর্যবেক্ষণ বিশ্লেষণ করে এর সুনির্দিষ্ট আইনি ভিত্তি স্পষ্ট করেছেন বিচারক।

ফৌজদারি কার্যবিধি ও বাংলাদেশের দণ্ডবিধি অনুযায়ী, কেউ সরাসরি খুন না করলেও যদি অপরাধের পরিকল্পনা, প্ররোচনা এবং অপরাধের পর আলামত গোপন বা আসামিকে রক্ষায় প্রত্যক্ষ ভূমিকা রাখে, তবে তাকে সমান অপরাধী গণ্য করা হয়।

আদালত বলেন, স্বপ্না খাতুন এই অপরাধের নীরব দর্শক ছিলেন না, বরং একজন সক্রিয় অংশীদার ছিলেন। প্রথমত, তিনি শিশুটিকে কৌশলে ঘরে ডেকে আনতে সাহায্য করেছিলেন। দ্বিতীয়ত, ঘরের ভেতরে যখন এত বড় নৃশংসতা ঘটছিল এবং লাশ টুকরো করা হচ্ছিল, তখন তিনি সেখানে উপস্থিত ছিলেন। তিনি পুলিশ বা প্রতিবেশীদের খবর না দিয়ে লাশ গুমের প্রক্রিয়ায় স্বামীকে ‘সচেতন সহায়তা’ দিচ্ছিলেন। এমনকি দরজার বাইরে শিশুর জুতো পড়ে থাকা সত্ত্বেও ভেতর থেকে দরজা বন্ধ করে রেখে তিনি আলামত নষ্টের ও অপরাধী স্বামীকে বাঁচানোর চেষ্টা করছিলেন। এই পারিপার্শ্বিক প্রমাণ ও অপরাধমূলক আচরণের কারণেই তাকেও মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত করা হয়েছে।

আদালত প্রাঙ্গণে কান্নার রোল : রাষ্ট্র ও আসামিপক্ষের প্রতিক্রিয়া

রায় ঘোষণার পর আদালত প্রাঙ্গণে এক আবেগঘন পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। মামলার বাদি ও রামিসার বাবা আব্দুল হান্নান মোল্লা কান্নায় ভেঙে পড়েন। তিনি রায়ে শতভাগ সন্তোষ প্রকাশ করে বলেন, ‘আমরা কাক্সিক্ষত ও প্রত্যাশিত রায় পেয়েছি। প্রধানমন্ত্রীর দেয়া নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যেই আমরা বিচার পেয়েছি। বিপদকালীন সময়ে পাশে থাকার জন্য আমি বিচারক, পুলিশ প্রশাসন, সাংবাদিকসহ দেশবাসীর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি। এখন আমি দ্রুততম সময়ে এই রায় কার্যকর দেখতে চাই, যেন আর কোনো বাবার বুক এভাবে খালি না হয়।’

ঢাকা আইনজীবী সমিতির সাধারণ সম্পাদক আবুল কালাম খান এই রায়ের পর বলেন, ‘শিশুদের ওপর এমন নির্মমতায় দেশবাসী আতঙ্কিত ছিল। এই দ্রুত রায়ের ফলে অপরাধীদের মধ্যে কঠোর ভীতির সৃষ্টি হবে।’

রাষ্ট্রপক্ষের স্পেশাল পিপি আজিজুর রহমান দুলু বলেন, ‘ডিউ প্রসেস অব ল (আইনগত প্রক্রিয়া) অনুযায়ী মামলাটি এখন উচ্চ আদালতে যাবে। তবে পারিপার্শ্বিক আলামত এবং আসামির নিজস্ব জবানবন্দী এতই জোরালো যে, আমরা আত্মবিশ্বাসী উচ্চ আদালতেও এই ফাঁসির রায় বহাল থাকবে।’

অন্যদিকে, রাষ্ট্রীয় খরচে নিযুক্ত আসামিপক্ষের আইনজীবী অ্যাডভোকেট মুসা আলিমুল্লাহ এই রায়কে ন্যায়বিচারের অংশ হিসেবে অভিহিত করে এক নজিরবিহীন মন্তব্য করেন। তিনি বলেন, ‘সোহেল রানা কোনো সাফাই সাক্ষী দেয়নি, সে নিজেই আত্মস্বীকৃত অপরাধী। সে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় এবং পরবর্তীতে ৩৪২ ধারায় আত্মপক্ষ সমর্থনের সময়ও নিজের দোষ স্বীকার করে ক্ষমা চেয়েছিল। বাংলাদেশের বিচারিক ইতিহাসে এত অল্প সময়ে এমন আলোচিত মামলার নিষ্পত্তির নজির নেই। এর মাধ্যমে সমাজের কাছে বার্তা গেছে যে, অপরাধী পার পাবে না।’ তবে আসামিপক্ষ উচ্চ আদালতে আপিল করার আইনি অধিকার প্রয়োগ করবে বলে জানা গেছে।

কী ঘটেছিল সেই নৃশংস দিনে?

মামলার বিবরণী ও পুলিশি তদন্ত অনুযায়ী, নিহত রামিসা আক্তার পল্লবীর সেকশন-১১ এলাকার একটি অ্যাপার্টমেন্টে পরিবারের সাথে বসবাস করত। সে স্থানীয় পাস্টার (পুলের) মডেল হাই স্কুলের দ্বিতীয় শ্রেণীর শিক্ষার্থী ছিল। একই ভবনের একটি ফ্ল্যাটের একটি কক্ষ সাবলেট নিয়ে থাকতেন পোশাককর্মী সোহেল রানা ও তার স্ত্রী স্বপ্না খাতুন।

গত ১৯ মে সকাল সাড় ৯টার দিকে রামিসা ঘর থেকে বের হলে প্রতিবেশী স্বপ্না খাতুন কৌশলে তাকে ডেকে নিজেদের কক্ষে নিয়ে যান। তদন্ত ও স্বীকারোক্তি অনুযায়ী, মাদকাসক্ত সোহেল রানা শিশুটিকে প্রথমে বাথরুমে আটকে রেখে ধর্ষণ করে। রামিসা চিৎকার শুরু করলে ঘটনা ধামাচাপা দিতে ওড়না দিয়ে মুখ বেঁধে তাকে গলা কেটে হত্যা করা হয়। নৃশংসতার চরম পর্যায়ে, অপরাধের আলামত গোপন ও লাশ গুম করার উদ্দেশ্যে ধারালো ছুরি দিয়ে রামিসার মাথা শরীর থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন করা হয় এবং হাত ও কাঁধের অংশ আংশিক কেটে ফেলা হয়। দেহটি খাটের নিচে লুকিয়ে রাখা হয় এবং কাটা মাথাটি বাথরুমের একটি প্লাস্টিকের বালতিতে লুকিয়ে রাখা হয়। এর পরপরই ঘাতক সোহেল জানালার গ্রিল কেটে কৌশলে পালিয়ে যায়।

যেভাবে উদঘাটিত হলো অপরাধ

সকাল সাড় ১০টার দিকে রামিসাকে স্কুলে পাঠানোর জন্য তার মা খোঁজাখুঁজি শুরু করেন। কোথাও না পেয়ে তিনি ভবনের বিভিন্ন তলায় যান। একপর্যায়ে সাবলেট থাকা সোহেল ও স্বপ্নার ঘরের দরজার সামনে রামিসার জুতো জোড়া পড়ে থাকতে দেখেন।

সন্দেহ হওয়ায় রামিসার মা ডাকাডাকি করলেও ভেতর থেকে দরজা খোলা হচ্ছিল না। পরে তার চিৎকারে প্রতিবেশীরা জড়ো হয়ে দরজা ভেঙে ভেতরে প্রবেশ করতেই খাটের নিচে রক্তাক্ত ও মাথাবিহীন দেহ এবং বাথরুমে বালতিভর্তি বিচ্ছিন্ন মাথা দেখতে পান। বিস্ময়কর বিষয় হলো, এই পুরো সময়টাতে সোহেল পালিয়ে গেলেও স্ত্রী স্বপ্না খাতুন ঘরের ভেতরেই অবস্থান করছিলেন এবং আলামত আড়াল করার চেষ্টা করছিলেন। ওই রাতেই তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তায় নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লা এলাকা থেকে পলাতক সোহেল রানাকে গ্রেফতার করে পুলিশ। রাতেই পল্লবী থানায় হত্যা মামলা দায়ের করেন রামিসার বাবা আব্দুল হান্নান মোল্লা।