ঢাকায় আসার সময় ফাতিমা ভেবেছিলেন, পাঁচ বছর পর সাদা অ্যাপ্রন গায়ে চিকিৎসক হয়ে নিজের শহর দিল্লিতে ফিরবেন। রাজস্থানের মুসকান বানুও একই স্বপ্ন নিয়ে সীমান্ত পেরিয়েছিলেন। পরিবার সঞ্চয়ের টাকা খরচ করেছে, স্বজনদের ছেড়ে বছরের পর বছর কাটিয়েছেন বাংলাদেশে। কিন্তু এখন তাদের সবচেয়ে বড় প্রশ্ন, এত বছরের পড়াশোনা শেষে যদি সেই ডিগ্রিই নিজ দেশে স্বীকৃতি না পায়, তাহলে এই দীর্ঘ পথচলার মূল্য কোথায়?
রাজধানীর আদ্-দ্বীন উইমেন্স মেডিক্যাল কলেজের করিডোরে বসে এই প্রশ্নই বারবার ঘুরে ফিরে আসে ফাতিমা, মুসকান বানু, ইযরিন কান্থ, মীর আইশা জাবেদ কিংবা তাবিয়া ভাটদের কথায়। হাসপাতালের লাইসেন্স বাতিলের পর শুধু একটি হাসপাতালের কার্যক্রমই বন্ধ হয়নি; অনিশ্চয়তায় আটকে গেছে শত শত বিদেশী শিক্ষার্থীর ভবিষ্যৎ। চার-পাঁচ বছর ধরে চিকিৎসাশাস্ত্রে অধ্যয়ন করেও এখন তারা জানেন না, শেষ পর্যন্ত তাদের ডিগ্রি আদৌ কাজে লাগবে কি না।
গত ২৭ মে আদ্-দ্বীন হাসপাতালে তিন ঘণ্টার ব্যবধানে ছয় নবজাতকের মৃত্যুর ঘটনার পর তদন্ত শেষে হাসপাতালের লাইসেন্স বাতিল করে সরকার। এর পর থেকে হাসপাতালের স্বাভাবিক কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়ে মেডিক্যাল কলেজের ক্লিনিক্যাল শিক্ষা ও ইন্টার্নশিপ কার্যক্রমে।
সবচেয়ে বেশি সঙ্কটে পড়েছেন ভারতীয় শিক্ষার্থীরা। কলেজ কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, প্রতিষ্ঠানটিতে বর্তমানে প্রায় ২৯৫ জন বিদেশী শিক্ষার্থী রয়েছেন। তাদের অধিকাংশই ভারতের জম্মু-কাশ্মির, দিল্লি ও রাজস্থান থেকে এসেছেন। আরো প্রায় ৮৬ জন ইন্টার্ন চিকিৎসক রয়েছেন, যাদের বেশির ভাগই ভারতীয়।
ফাতিমা ও মুসকান বানু এখন পঞ্চম বর্ষের শিক্ষার্থী। চিকিৎসক হওয়ার স্বপ্ন পূরণে চার বছরের বেশি সময় তারা বাংলাদেশে কাটিয়েছেন। কিন্তু এখন তাদের সামনে নতুন দুশ্চিন্তা।
ফাতিমা বলেন, যদি ডিগ্রিই ইনভ্যালিড হয়ে যায়, তবে এখানে থাকার মানে কী? আমরা চার বছরেরও বেশি সময় ধরে এখানে আছি। শুধু একটা ডিগ্রির জন্য এত দূরে এসেছি। এখন বলা হচ্ছে অন্য কলেজে মাইগ্রেট করতে হবে।
মুসকানের কণ্ঠেও একই হতাশা। তিনি বলেন, ভারতের ন্যাশনাল মেডিক্যাল কমিশনের (এনএমসি) নিয়ম অনুযায়ী একই মেডিক্যাল কলেজ থেকে পড়াশোনা শেষ করে একই প্রতিষ্ঠানের হাসপাতালেই ১২ মাসের ইন্টার্নশিপ সম্পন্ন করতে হয়। অন্য হাসপাতালে ইন্টার্ন করলে ভারতে সেই ডিগ্রি নিয়ে নিবন্ধন পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। ফলে চার বছরের পড়াশোনা শেষ করেও তারা এখনো নিশ্চিন্তে ডিগ্রি তুলতে পারছেন না।
শুধু পরীক্ষা দিয়ে চিকিৎসক হওয়া যায় না। চিকিৎসাশাস্ত্রের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো রোগীর পাশে দাঁড়িয়ে শেখা। কিন্তু সেই সুযোগই এখন হারিয়ে ফেলেছেন শিক্ষার্থীরা।
চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী ইযরিন কান্থ বলেন, ‘আমরা শুধু পড়ছি আর পরীক্ষা দিচ্ছি। কিন্তু এমবিবিএসের মূল বিষয়ই হলো ক্লিনিক্যাল এক্সপোজার। রোগীর ইতিহাস নেয়া, পরীক্ষা করা, চিকিৎসকের সাথে ওয়ার্ডে কাজ শেখা- এসব কিছুই এখন হচ্ছে না।’ তিনি বলেন, হাসপাতাল বন্ধ থাকায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শেখার সময়টাই যেন হারিয়ে যাচ্ছে। বইয়ের জ্ঞান অর্জন করা সম্ভব হলেও বাস্তব অভিজ্ঞতা ছাড়া একজন চিকিৎসক হিসেবে নিজেকে প্রস্তুত করা অসম্ভব। এই সঙ্কট শুধু বিদেশী শিক্ষার্থীদের নয়, বাংলাদেশী শিক্ষার্থীদেরও সমানভাবে নাড়া দিয়েছে।
শিক্ষার্থী ফারিহা জামান পূর্বাশা বলেন, আদ্-দ্বীনের বড় রোগীসেবা ব্যবস্থা এবং ক্লিনিক্যাল পরিবেশ দেখেই তারা এখানে ভর্তি হয়েছিলেন। এখন হাসপাতাল বন্ধ থাকায় সেই পরিবেশ পুরোপুরি ভেঙে পড়েছে। নিয়মিত ক্লাস চললেও চিকিৎসাশিক্ষার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
এ দিকে স্বাস্থ্য শিক্ষা অধিদফতর আদ্-দ্বীন মেডিক্যাল কলেজকে অন্য হাসপাতালের সাথে সমন্বয় করে ক্লিনিক্যাল ক্লাস ও ইন্টার্নশিপ চালানোর নির্দেশনা দিয়েছে। কিন্তু এই সিদ্ধান্তই ভারতীয় শিক্ষার্থীদের নতুন উদ্বেগে ফেলেছে। কারণ ভারতের ফরেন মেডিক্যাল গ্রাজুয়েট লাইসেনশিয়েট রেগুলেশন, ২০২১ অনুযায়ী, একই প্রতিষ্ঠানে পড়াশোনা ও ইন্টার্নশিপ সম্পন্ন না করলে দেশে ফিরে স্থায়ী নিবন্ধন পাওয়ার সুযোগ নাও থাকতে পারে। ফলে অন্য হাসপাতালে পাঠানো হলে চার-পাঁচ বছরের পরিশ্রম বৃথা যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
এই অনিশ্চয়তা নিয়ে কয়েকজন শিক্ষার্থী ঢাকায় ভারতীয় দূতাবাসেও যান। তাঁরা আশা করেছিলেন, হয়তো কূটনৈতিক পর্যায়ে কোনো সমাধান বের হবে। কিন্তু দূতাবাস জানিয়ে দেয়, এটি বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়; তারা এতে হস্তক্ষেপ করতে পারবে না। এরপর থেকেই অনেক শিক্ষার্থী মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছেন। কেউ কেউ ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগে পড়াশোনায় মনোযোগ হারিয়ে ফেলছেন।
আদ্-দ্বীন ফাউন্ডেশনের সহকারী পরিচালক (আদ্-দ্বীন মেডিক্যাল কলেজসমূহ) মো: সিদ্দিকুর রহমান সুমন বলেন, এর মধ্যে বিদেশ শিক্ষার্থী আছে ২৯৫ জন। এখন সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হচ্ছে এই ফরেন স্টুডেন্টরা। কারণ ইন্ডিয়ান যে কাউন্সিল, তাদের নির্দেশনা হচ্ছে একই মেডিক্যাল কলেজে গ্র্যাজুয়েট কমপ্লিট করতে হবে, পাশাপাশি ওই কলেজেই ইন্টার্নশিপ করতে হবে। অন্য মেডিক্যাল কলেজে ওদের দিলে ওই দেশে অ্যালাও করা হবে না। সে কারণে ওরা বেশি উৎকণ্ঠায় আছে। একই সাথে এটা আমাদের দেশের ভাবমূর্তির জন্যও একটি প্রশ্নবোধক হয়ে গেছে। হাসপাতাল বন্ধ হওয়ায় এদের মাইগ্রেশন করে অন্য হাসপাতালে যেতে হবে। অন্য হাসপাতালে ইন্টার্ন করলে ইন্ডিয়ান অথরিটি কোনোভাবেই তাদের লাইসেন্স এক্সসেপ্ট করবে না। কারণ তাদের আইন অনুযায়ী এক মেডিক্যালে পড়ালেখা, অন্য মেডিক্যালে ইন্টার্ন গ্রহণযোগ্য নয়। ইন্ডিয়ান অ্যাম্বাসিও এ ব্যাপারে সাহায্য করতে পারবেন না।
তিনি বলেন, আমরা সরকারের কাছে উদাত্ত আহবান রাখব, আমাদের যে অনাকাক্সিক্ষত ঘটনাটা ঘটেছে, তদন্ত যেহেতু হয়েছে, শাস্তিমূলক ব্যবস্থা, যা দরকার সেটা করুক, পাশাপাশি হাসপাতালটা খুলে দেয়া হোক। বিদেশী এসব শিক্ষার্থীর অভিভাবকরা প্রতি মুহূর্তে আমাদেরকে ফোন করছেন। একই সাথে আমাদের লোকাল শিক্ষার্থীরাও একটা উৎকণ্ঠার মধ্যে আছেন। তারা এখানকার পরিবেশ এবং পেশেন্ট ফ্লো দেখে সবকিছু বিবেচনা করেই ভর্তি হয়েছেন। এই পরিস্থিতিতে আমরা খুবই উদ্বিগ্ন অবস্থায় রয়েছি।
আদ্-দ্বীন হাসপাতালের পরিচালক (এইচআর অ্যান্ড কোম্পানি অ্যাফেয়ার্স) তরিকুল ইসলাম মুকুল বলেন, এমবিবিএস একটি প্রতিষ্ঠানে করে আরেক প্রতিষ্ঠানে ইন্টার্ন করলে ভারতে গ্রহণযোগ্য হয় না বলে ছাত্রীরা জানিয়েছেন। আমরা সরকারের সাথে যোগাযোগ করে বিষয়টি সমাধানের চেষ্টা করছি। তিনি বলেন, হাসপাতালের লাইসেন্স বাতিলের সিদ্ধান্ত স্থগিত রেখে চিকিৎসাধীন রোগীদের সেবা কার্যক্রম অব্যাহত রাখার অনুমতি চেয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। তবে এখনো কোনো জবাব পাওয়া যায়নি। আশা করছি, একটি সমাধান পাবো আমরা।
ভারতীয় শিক্ষার্থীদের বিষয়টি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে ইব্রাহিম কার্ডিয়াক হাসপাতালের ভাসকুলার সার্জারি বিভাগের বিভাগীয় প্রধান অধ্যাপক ডা: সাকলায়েন রাসেল বলেন, আদ্-দ্বীন উইমেন্স মেডিক্যাল কলেজের লাইসেন্স বাতিল হওয়ায় ভয়ঙ্কর বিপদে বিদেশী শিক্ষার্থীরা। অজানা এক আতঙ্কে কাটছে তাদের প্রতিদিন। বিশেষ করে ভারতীয় শিক্ষার্থীরা, সংখ্যায় এরা অনেক বেশি। তিনি আরো জানান, হাসপাতাল বন্ধ হওয়ায় তাদের মাইগ্রেশন করে অন্য হাসপাতালে যেতে হবে। অন্য হাসপাতালে ইন্টার্ন করলে ইন্ডিয়ান অথরিটি কোনোভাবেই তাদের লাইসেন্স এক্সসেপ্ট করবে না। কারণ তাদের আইন অনুযায়ী এক মেডিক্যালে পড়ালেখা, অন্য মেডিক্যালে ইন্টার্ন গ্রহণযোগ্য নয়। ইন্ডিয়ান অ্যাম্বাসিও এ ব্যাপারে সাহায্য করতে পারবেন না। তিনি বলেন, খোঁজ নিয়ে দেখলাম, সরকারের সংশ্লিষ্ট মহল বিষয়টি সম্পর্কে অবগত আছেন এবং একটি যৌক্তিক সমাধানের জন্য বেশ আন্তরিক। তবে যত দ্রুত সমাধান হবে, তবে দ্রুত মানসিক এক যন্ত্রণা থেকে মুক্তি পাবে এসব শিক্ষার্থী।
আদ্-দ্বীনের ইস্যুতে দেশের মেডিক্যালে বিদেশী শিক্ষার্থী ভর্তির ক্ষেত্রে নতুন করে নেতিবাচক পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে বলেও মনে করছেন অনেকে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে স্বাস্থ্য অধিদফতরের একজন কর্মকর্তা নয়া দিগন্তকে বলেন, আদ্-দ্বীন উইমেন্স মেডিক্যাল কলেজের মতো প্রথম সারির একটি প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরীণ একটি সঙ্কটের কারণে বিদেশী শিক্ষার্থীরা যেভাবে ভোগান্তিতে পড়েছেন, তার প্রভাব পুরো খাতের ওপর পড়বে। এই সঙ্কটের কারণে ভারতীয় শিক্ষার্থীদের মধ্যে একটি নেতিবাচক বার্তা যাবে যে বাংলাদেশে তাদের ডিগ্রি গ্রহণ ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে। তিনি বলেন, নিয়ম মেনে ভারতীয় এসব শিক্ষার্থীর কোর্স ও ইন্টার্নশিপ সম্পন্ন করার বাধ্যবাধকতা প্রধানত সংশ্লিষ্ট কলেজের। তবে এতে যেহেতু সরকারপক্ষও জড়িয়ে পড়েছে, সরকারকেও দেশের চিকিৎসা শিক্ষার স্বার্থে ব্যবস্থা গ্রহণ করা প্রয়োজন। কেননা এই ঘটনায় আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের চিকিৎসা শিক্ষার ভাবমূর্তি মারাত্মক সঙ্কটে পড়বে।
এ দিকে আদ্-দ্বীন কর্তৃপক্ষকে শিক্ষার্থী ও ইন্টার্ন চিকিৎসকদের অন্য স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানে ক্লিনিক্যাল ক্লাসের ব্যবস্থা প্রসঙ্গে দেয়া চিঠির জবাব পর্যালোচনাধীন রয়েছে বলে স্বাস্থ্য শিক্ষা অধিদফতর সূত্রে জানা গেছে। এ বিষয়ে অধিদফতরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (চিকিৎসা শিক্ষা) অধ্যাপক ডা: রুবীনা ইয়াসমিন গণমাধ্যমকে বলেন, স্বাস্থ্য শিক্ষা অধিদফতর থেকে আদ্-দ্বীন উইমেন্স মেডিক্যাল কলেজকে যে চিঠি দেয়া হয়েছিল, সেটির জবাব তারা দিয়েছে। আমরা সেটি দেখব।
এসব সঙ্কট আছে জেনেও প্রতিদিন কলেজে আসেন ফাতিমারা। ক্লাস করেন, পরীক্ষা দেন, আবার অপেক্ষা করেন একটি সুখবরের। চার বছরের বেশি সময় ধরে যে স্বপ্ন তারা বয়ে বেড়িয়েছেন, সেটি যেন শেষ মুহূর্তে এসে ভেঙে না যায়, এই প্রার্থনাই এখন তাদের সবচেয়ে বড় ভরসা।
ফাতিমার শেষ কথাতেই যেন ধরা পড়ে শত শত বিদেশী শিক্ষার্থীর অজানা ভবিষ্যতের ছবি, ‘কলেজ কর্তৃপক্ষ আমাদের শুধু বলে, ‘ইনশা আল্লাহ সব ঠিক হয়ে যাবে।’ আমরাও সেই আশাতেই আছি। কারণ এই চার বছরের পরিশ্রম হারিয়ে গেলে আমাদের জীবনের সবচেয়ে বড় স্বপ্নটাই ভেঙে যাবে।’



