দুর্নীতি দমন কমিশনকে (দুদক) আরো কার্যকর ও শক্তিশালী প্রতিষ্ঠানে রূপ দিতে নতুন আইন প্রণয়নের উদ্যোগের কথা জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ। তিনি বলেছেন, আগের অধ্যাদেশ গ্রহণ না করার পেছনে উদ্দেশ্য ছিল আরো শক্তিশালী কমিশন গঠন করা। তবে সার্চ কমিটি গঠনে বিভিন্ন পক্ষের সহযোগিতা না পাওয়ায় প্রক্রিয়াটি বিলম্বিত হয়েছে। একই সাথে তিনি জানান, মধ্যবর্তী ব্যবস্থা হিসেবে আগের আইন অনুযায়ী সার্চ কমিটির মাধ্যমে দ্রুত দুদককে কার্যকর করা হবে এবং পরবর্তীতে সংসদে নতুন বিল এনে আরো শক্তিশালী আইন প্রণয়ন করা হবে।
গতকাল সোমবার জাতীয় সংসদে ২০২৫-২৬ অর্থবছরের সম্পূরক বাজেটে দুদকের জন্য বরাদ্দকৃত অর্থের ওপর ছাঁটাই প্রস্তাবের আলোচনায় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এ কথা বলেন। ছাঁটাই প্রস্তাবের আলোচনায় সরকার ও বিরোধীদলের সদস্যদের বক্তব্যে দুদকের স্বাধীনতা, জবাবদিহিতা, রাজনৈতিক প্রভাব এবং দুর্নীতি দমনে সরকারের আন্তরিকতা নিয়ে আলোচনা হয়।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহ উদ্দিন আহমেদ বলেন, সরকার দুদকের চেয়ারম্যান ও কমিশনার নিয়োগের জন্য সার্চ কমিটি গঠনে শুরু থেকেই আন্তরিক ছিল। কিন্তু প্রয়োজনীয় সহযোগিতা সময়মতো পাওয়া যায়নি। তিনি জানান, প্রধান বিচারপতির প্রতিনিধি মনোনয়ন বিলম্বিত হওয়ায় সার্চ কমিটি গঠনের কাজ পিছিয়ে যায়। এখন সেই জট কেটে গেছে এবং দ্রুত সার্চ কমিটি গঠন করে দুদককে কার্যকর করা হবে।
তিনি বলেন, এটি একটি অন্তর্বর্তী ব্যবস্থা। পরবর্তীতে সংসদে নতুন দুদক আইন পাস হলে আরো শক্তিশালী ও কার্যকর কমিশন প্রতিষ্ঠা করা হবে।
‘নখদন্তহীন বাঘ’ দুদক, স্বাধীনতা কাগজে-কলমে সীমাবদ্ধ
ছাঁটাই প্রস্তাবের আলোচনায় অংশ নিয়ে পটুয়াখালী-২ আসনের সংসদ সদস্য ড. শফিকুল ইসলাম মাসুদ অভিযোগ করেন, দীর্ঘ দিন ধরেই দুদকের স্বাধীনতা কেবল কাগজে-কলমে সীমাবদ্ধ। বাস্তবে প্রতিষ্ঠানটির ওপর রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক প্রভাব বিস্তার করা হয়। তিনি বলেন, চেয়ারম্যান ও কমিশনার নিয়োগে স্বচ্ছ ও অংশগ্রহণমূলক সার্চ কমিটির পরিবর্তে নির্দিষ্ট দৃষ্টিভঙ্গি ও পছন্দের ভিত্তিতে নিয়োগ দেয়া হয়। ফলে তদন্ত ও মামলা পরিচালনায় প্রভাবমুক্ত পরিবেশ নিশ্চিত হয় না এবং কমিশনের জবাবদিহিতাও অনুপস্থিত।
‘চুনোপুঁটি ধরা পড়ে, রুই-কাতলা বেরিয়ে যায়’
দুদকের কার্যক্রমের সমালোচনা করে শফিকুল ইসলাম মাসুদ বলেন, বর্তমানে ছোটখাটো দুর্নীতিবাজরা আইনের আওতায় এলেও বড় প্রভাবশালী ব্যক্তি সহজেই পার পেয়ে যাচ্ছেন। রাজনৈতিক নেতা, সরকারি কর্মকর্তা, ব্যবসায়ী কিংবা প্রভাবশালী গণমাধ্যম ব্যক্তিত্ব সবার ক্ষেত্রে সমানভাবে আইন প্রয়োগ নিশ্চিত করার আহ্বান জানান তিনি।
তার মতে, সরকারের সদিচ্ছার অভাব এবং প্রভাব বিস্তারের সংস্কৃতির কারণেই বিদেশে পাচার হওয়া অর্থ ফেরত আনা সম্ভব হচ্ছে না। দুদকের তদন্তে সাক্ষী ও তথ্যদাতাদের পর্যাপ্ত নিরাপত্তা না থাকায় সাধারণ মানুষ তথ্য দিতে ভয় পায় বলে মন্তব্য করেন শফিকুল ইসলাম মাসুদ। তিনি একটি স্বাধীন ‘অভিযোগ মূল্যায়ন বোর্ড’ গঠনের দাবি জানান, যাতে অভিযোগ যাচাই ও তদন্ত প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা যায়।
৩০ লাখ কোটি টাকা ফিরিয়ে আনতে সবার সহযোগিতা চাইল সরকার
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের শ্বেতপত্র অনুযায়ী ব্যাংকিং খাতের লুটপাট ও রাজনৈতিক বিবেচনায় দেয়া ঋণের অর্থ দিয়ে ২৪টি পদ্মা সেতু নির্মাণ করা সম্ভব ছিল। তিনি জানান, দেশ থেকে পাচার হওয়া প্রায় ৩০ লাখ কোটি টাকা ফিরিয়ে আনতে সরকার আন্তরিক এবং এ কাজে জাতীয় ঐকমত্য ও সবার সহযোগিতা প্রয়োজন।
‘ধর্ষণের ছোট-বড় সংজ্ঞা হতে পারে না’
আলোচনায় ধর্ষণ প্রসঙ্গও উঠে আসে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, আইনের দৃষ্টিতে যেমন দুর্নীতির কোনো ছোট বা বড় সংজ্ঞা নেই, তেমনি ধর্ষণের ক্ষেত্রেও কোনো ভেদাভেদ হতে পারে না। সব ধর্ষণই সমান অপরাধ এবং প্রতিটি ঘটনার সমান বিচার নিশ্চিত করা হবে।
রুমিন ফারহানার প্রশ্ন : দুর্নীতি দমনে সরকার কতটা আন্তরিক?
স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য ব্যারিস্টার রুমিন ফারহানা বলেন, গুগলের তথ্য অনুযায়ী দুর্নীতিতে সবচেয়ে এগিয়ে থাকা পেশাগুলোর মধ্যে রাজনীতিবিদ ও আমলারা শীর্ষে রয়েছেন। তিনি অভিযোগ করেন, আওয়ামী লীগ সরকারের সময় বালিশ কেলেঙ্কারি, ব্যাংক লুটসহ নানা দুর্নীতির পরও বর্তমান সরকার দুদককে শক্তিশালী করতে প্রয়োজনীয় আইন সংস্কার করেনি।
তার ভাষায়, দুদককে ‘নখদন্তহীন বাঘ’ থেকে কার্যকর প্রতিষ্ঠানে রূপান্তরের যে প্রত্যাশা ছিল, বাস্তবে তা পূরণ হয়নি।
স্থানীয় সরকার নির্বাচন নিয়েও প্রশ্ন
রুমিন ফারহানা স্থানীয় সরকার নির্বাচন কবে হবে এবং কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা সেই নির্বাচনে অংশ নিতে পারবেন কি না- এ বিষয়ে সরকারের স্পষ্ট অবস্থান জানতে চান। জবাবে স্থানীয় সরকারমন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, নির্বাচন যথাসময়ে অনুষ্ঠিত হবে। তবে আওয়ামী লীগের অংশগ্রহণের বিষয়ে কোনো মন্তব্য করেননি।
ডিসি নিয়োগ ও অর্থনীতি নিয়েও সমালোচনা
রুমিন ফারহানা অভিযোগ করেন, সাম্প্রতিক জেলা প্রশাসক নিয়োগ দলীয় বিবেচনায় হয়েছে। পাশাপাশি দেশের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি তুলে ধরে তিনি বলেন, উচ্চ মূল্যস্ফীতি, খেলাপি ঋণ, ব্যাংকিং খাতের দুর্বলতা ও বাণিজ্য ঘাটতির মধ্যে বাজেট বাস্তবায়ন বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। গত ১৫ বছরে বিপুল পরিমাণ অর্থ পাচার ও রাজনৈতিক প্রভাবে ব্যাংক খাত ব্যবহারের অভিযোগও তিনি সংসদে উত্থাপন করেন।


