প্রতি বছর জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) বাজেটে উচ্চাভিলাষী রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্য নির্ধারণ করলেও অর্থবছর শেষে বড় অঙ্কের ঘাটতি এখন প্রায় নিয়মিত ঘটনায় পরিণত হয়েছে। সরকার উন্নয়ন ব্যয়, সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি ও ঋণের সুদ পরিশোধে রাজস্ব আয়ের ওপর নির্ভরশীল হলেও কাঙ্ক্ষিত আদায় হচ্ছে না। অর্থনীতিবিদদের মতে, অর্থনৈতিক মন্দা বা আমদানি কমে যাওয়ার মতো কারণ থাকলেও রাজস্ব ঘাটতির অন্যতম প্রধান কারণ বৃহৎ শিল্পগোষ্ঠী ও করপোরেট প্রতিষ্ঠানের কর ফাঁকি, অপ্রদর্শিত আয়, ট্রান্সফার প্রাইসিংয়ের অপব্যবহার এবং দুর্বল কর প্রশাসন।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এনবিআরের অডিট ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা, ঝুলে থাকা কর ফাঁকির মামলা এবং তথ্যপ্রযুক্তিনির্ভর নজরদারির ঘাটতির কারণে প্রতি বছর হাজার হাজার কোটি টাকার রাজস্ব হাতছাড়া হচ্ছে। তাদের মতে, কর ফাঁকি রোধে কার্যকর ব্যবস্থা নেয়া গেলে নতুন কর আরোপ ছাড়াই সরকারের রাজস্ব আয় উল্লেখযোগ্য হারে বাড়ানো সম্ভব।
এনবিআরের সর্বশেষ পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) রাজস্ব আদায়ে লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ঘাটতি হয়েছে প্রায় ৮৮ হাজার কোটি টাকা। গত অর্থবছরে পাঁচ লাখ তিন হাজার কোটি টাকার লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে রাজস্ব আদায় হয়েছে চার লাখ ১৫ হাজার কোটি টাকা। তবে লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে অনেক পিছিয়ে থাকলেও ২০২৪-২৫ অর্থবছরের তুলনায় আদায় বেড়েছে ১২ শতাংশের বেশি। বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রবৃদ্ধি কিছুটা কমে যাওয়া বা আমদানি হ্রাসের কারণে রাজস্ব আদায় কমতে পারে, কিন্তু এত বড় ঘাটতি কর প্রশাসনের দুর্বলতারই প্রতিফলন।
কর বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দেশের বড় শিল্পগোষ্ঠী ও করপোরেট প্রতিষ্ঠানের একটি অংশ আইনগত ফাঁকফোকর ব্যবহার করে করযোগ্য আয় কমিয়ে দেখায়। অনেক প্রতিষ্ঠান কৃত্রিমভাবে উৎপাদন ব্যয় বাড়িয়ে, ভুয়া ক্রয়-বিক্রয় দেখিয়ে, অবচয় ব্যয় অতিরঞ্জিত করে কিংবা সহযোগী প্রতিষ্ঠানের সাথে কাগুজে লেনদেনের মাধ্যমে প্রকৃত মুনাফা আড়াল করে। আবার অনেক কোম্পানি বিদেশী সহযোগী প্রতিষ্ঠানে রয়্যালটি, ব্যবস্থাপনা ফি, কারিগরি সহায়তা বা পরামর্শ ফি বাবদ অতিরিক্ত ব্যয় দেখিয়ে বাংলাদেশে করযোগ্য মুনাফা কমিয়ে দেয়। ফলে মুনাফা বিদেশে স্থানান্তরিত হলেও দেশে কর আদায় কমে যায়।
এনবিআরের কর্মকর্তারা স্বীকার করছেন, দক্ষ জনবল, আন্তর্জাতিক কর বিশেষজ্ঞ এবং উন্নত তথ্য বিশ্লেষণ সফটওয়্যারের অভাবে ট্রান্সফার প্রাইসিং অডিট এখনো সীমিত পর্যায়ে রয়েছে। ফলে বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানের শত শত আন্তর্জাতিক লেনদেন নিয়মিত যাচাই করা সম্ভব হচ্ছে না।
সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) এক গবেষণায় বলা হয়েছে, ২০২২-২৩ অর্থবছরে কর ফাঁকি ও কর পরিহারের কারণে সরকার প্রায় দুই লাখ ২৬ হাজার ২৩৬ কোটি টাকার সম্ভাব্য রাজস্ব হারিয়েছে। এর বড় অংশই করপোরেট আয়কর, ভ্যাট এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্য সংশ্লিষ্ট কর খাতে। গবেষণায় বলা হয়, কর প্রশাসনের দুর্বলতা, সীমিত অডিট এবং রাজনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক প্রভাবের কারণে অনেক বড় করদাতা কার্যত জবাবদিহির বাইরে থেকে যাচ্ছে।
সিপিডির সম্মানীয় ফেলো অধ্যাপক ড. মোস্তাফিজুর রহমান নয়া দিগন্তকে বলেন, বাংলাদেশের কর-জিডিপি অনুপাত দীর্ঘদিন ধরেই দক্ষিণ এশিয়ার সর্বনিম্ন পর্যায়ে রয়েছে। নতুন কর আরোপের পরিবর্তে বিদ্যমান কর সঠিকভাবে আদায়, ডিজিটাল অডিট ব্যবস্থা চালু এবং উচ্চ ঝুঁকির করদাতাদের ওপর নজরদারি বাড়ানোই হওয়া উচিত সরকারের অগ্রাধিকার। কর প্রশাসনে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত না করলে রাজস্ব ঘাটতি
কমবে না।
তিনি বলেন, বর্তমানে ঝুঁকিভিত্তিক অডিট ব্যবস্থার আওতায় কয়েক হাজার আয়কর রিটার্ন এবং ভ্যাট নিবন্ধিত প্রতিষ্ঠানকে অডিটের জন্য নির্বাচন করা হলেও দেশে রিটার্ন দাখিলকারীর তুলনায় এ সংখ্যা খুবই কম। ফলে বড় কর ফাঁকিবাজদের একটি বড় অংশ কার্যত অডিটের বাইরে থেকে যাচ্ছে।
তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, গত পাঁচ বছরে আয়কর গোয়েন্দা ও তদন্ত ইউনিট (আইটিআইআইইউ), কাস্টমস এনবিআরের সাবেক চেয়ারম্যান ড. মুহাম্মদ আবদুল মজিদ নয়া দিগন্তকে বলেন, অনেক ক্ষেত্রে কর নির্ধারণ হলেও দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়ার কারণে তা আদায় করা সম্ভব হচ্ছে না। তার ভাষায়, 'বাংলাদেশের করব্যবস্থার সবচেয়ে বড় সমস্যা কর আইন নয়, আইনের প্রয়োগ। করদাতাদের একটি অংশ নিশ্চিত থাকে যে মামলা করলে বছরের পর বছর বিষয়টি ঝুলে থাকবে। ফলে কর ফাঁকির প্রবণতা কমছে না।' তিনি বলেন, বড় করদাতাদের জন্য বিশেষায়িত অডিট ইউনিট, আন্তর্জাতিক তথ্য বিনিময়ব্যবস্থা এবং স্বয়ংক্রিয় তথ্য বিশ্লেষণ প্রযুক্তি ছাড়া কর প্রশাসনকে কার্যকর করা সম্ভব নয়।
সম্প্রতি আয়কর গোয়েন্দা ও তদন্ত ইউনিট জানিয়েছে, মাত্র সাত মাসের অভিযানে এক হাজার ৮৭৪ কোটি টাকার কর ফাঁকির তথ্য উদ্ঘাটন করা হয়েছে। তবে এই অর্থের সবটুকু এখনো আদায় হয়নি। কর প্রশাসনের কর্মকর্তারা বলছেন, বড় করদাতাদের বিরুদ্ধে মামলা পরিচালনা এবং আদালতে সেগুলো টিকিয়ে রাখতে দক্ষ আইনজীবী ও কর বিশেষজ্ঞেরও ঘাটতি রয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, রাজস্ব বাড়াতে নতুন কর আরোপের চেয়ে কর ফাঁকি বন্ধ করাই বেশি জরুরি। কর প্রশাসনের সংস্কার ছাড়া রাজস্ব আহরণে স্থায়ী উন্নতি সম্ভব নয়। এনবিআরকে রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক প্রভাবমুক্ত রেখে ঝুঁকিভিত্তিক অডিট, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক ডাটা অ্যানালিটিক্স, ব্যাংক হিসাব, সম্পদ নিবন্ধন এবং আন্তর্জাতিক তথ্য বিনিময়ব্যবস্থাকে সমন্বিত করতে হবে।



