রফতানি আয় সময়মতো দেশে না আনলে বাংলাদেশ ব্যাংকের রফতানি উন্নয়ন তহবিল (ইডিএফ) থেকে কোনো সহযোগিতা করা হবে না। পাশাপাশি সময়মতো পরিশোধ না করলেও একই সিদ্ধান্ত নেয়া হবে খেলাপি ঋণগ্রহীতাদের বিরুদ্ধে। রফতানির আড়ালে দেশ থেকে অর্থ পাচার বন্ধ করতে এমন সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে গতকাল এ বিষয়ে এক মাস্টার সার্কুলার জারি করা হয়েছে।
ব্যাংকাররা জানিয়েছেন, বাংলাদেশ ব্যাংকের এমন সিদ্ধান্তের কারণে পণ্য রফতানি করে অসাধু ব্যবসায়ীদের দেশে অর্থ ফিরে না আনার প্রবণতা কমবে। একই সাথে ইডিএফ থেকে ঋণ নিয়ে তা পরিশোধ করার হার বাড়বে।
জানা গেছে, বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে অসাধু কিছু ব্যবসায়ী গ্রুপ রাষ্ট্রযন্ত্র ব্যবহার করে নানা উপায়ে দেশ থেকে অর্থ পাচার করত। এর মধ্যে অন্যতম ছিল পণ্য রফতানি করে রফতানি আয় দেশে না এনে বিদেশে পাচার। এভাবে একপর্যায়ে বকেয়া রফতানি আয়ের পরিমাণ ১৪ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছায়। যদিও গত অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের কঠোর পদক্ষেপের কারণে রফতানি আয় দেশে না আনার পরিমাণ অনেক কমে আসে। পাশাপাশি রফতানি উন্নয়ন তহবিল থেকে ঋণ নিয়ে তা ফেরত দেয়া হতো না। আবার কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ওই সব ওলিগার্ক ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থাও নেয়া যেত না। অন্তর্বর্তী সরকারের ধারাবাহিকতায় বর্তমানে রফতানি আয় দেশে আনা ও যথাসময়ে ঋণ পরিশোধের বিষয়ে কঠোর পদক্ষেপ নিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এরই অংশ হিসেবে গতকাল বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে এই মাস্টার সার্কুলার জারি করা হয়। এ বিষয়ে বলা হয়, যেসব রফতানিকারক নির্ধারিত সময়ের মধ্যে রফতানি আয় দেশে আনতে ব্যর্থ হয়েছেন, তারা ইডিএফ সুবিধা পাবেন না। একইভাবে কোনো ব্যাংক সময়মতো বাংলাদেশ ব্যাংকের ইডিএফ ঋণ পরিশোধ করতে না পারলে সেই ব্যাংকও বকেয়া পরিশোধ না করা পর্যন্ত নতুন ইডিএফ সুবিধা থেকে বঞ্চিত থাকবে। এ ছাড়া একক ঋণগ্রহীতা সীমা মেনে চলাও বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের নতুন নীতিমালায় সুদের হারও স্পষ্টভাবে নির্ধারণ করা হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংক ইডিএফ থেকে ব্যাংকগুলোকে দেয়া মার্কিন ডলার ঋণের ওপর ৬ মাসের জামানতের বিপরীতে ব্যাংকগুলোর মধ্যে এক দিনের ঋণের মানদণ্ড বা এসওএফআরের সাথে অতিরিক্ত ০.৫০ শতাংশ সুদ নেবে। অন্য দিকে ব্যাংকগুলো রফতানিকারকদের কাছ থেকে এসওএফআরের সাথে অতিরিক্ত ১.৫০ শতাংশ পর্যন্ত সুদ আদায় করতে পারবে। এ ছাড়া আমদানি মূল্য পরিশোধ থেকে ইডিএফ পুনঃঅর্থায়ন পাওয়ার মধ্যবর্তী সময়ে সর্বোচ্চ ১ শতাংশ অতিরিক্ত সুদ নেয়ার সুযোগ রাখা হয়েছে। নির্ধারিত সময়ে ঋণ পরিশোধ না করলে প্রচলিত সুদের ওপর অতিরিক্ত ৪ শতাংশ হারে জরিমানা সুদ আরোপ করা হবে।
ঋণ পরিশোধের ক্ষেত্রেও নতুন নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। সাধারণভাবে ইডিএফ ঋণ ১৮০ দিনের মধ্যে পরিশোধ করতে হবে। তবে বিশেষ প্রয়োজনে বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুমোদন সাপেক্ষে এই সময়সীমা সর্বোচ্চ ২৭০ দিন পর্যন্ত বাড়ানো যাবে। সময় বাড়ানোর আবেদন করতে হলে ঋণের মেয়াদ শেষ হওয়ার কমপক্ষে ১০ দিন আগে আবেদন জমা দিতে হবে এবং কেন সময় বাড়ানো প্রয়োজন তার যথাযথ ব্যাখ্যা ও প্রয়োজনীয় কাগজপত্র দাখিল করতে হবে।
ঋণের সর্বোচ্চ সীমা নির্ধারণেও খাতভিত্তিক সীমা বহাল রাখা হয়েছে। তৈরী পোশাক খাতের বিজিএমইএ সদস্যদের জন্য সর্বোচ্চ দুই কোটি মার্কিন ডলার, বিকেএমইএ সদস্যদের জন্য এক কোটি ৫০ লাখ ডলার এবং ফুটওয়্যার, লেদারগুডস ও অ্যাকসেসরিজ এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন সদস্যদের জন্যও এক কোটি ৫০ লাখ ডলার পর্যন্ত ইডিএফ সুবিধা পাওয়া যাবে। এ ছাড়া সাইকেল, আসবাবপত্র, হিমায়িত খাদ্য ও অন্যান্য খাতের জন্যও আলাদা সীমা নির্ধারণ করা হয়েছে।
স্থানীয়ভাবে মধ্যবর্তী পণ্য উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্যও বিশেষ সুবিধা রাখা হয়েছে। বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশন, ডাইড ইয়ার্ন এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন, প্যাকেজিং, প্লাস্টিক ও সিরামিক প্রস্তুতকারকদের জন্য কাঁচামাল আমদানিতে পৃথক ঋণসীমা নির্ধারণ করা হয়েছে। একই সাথে গত ১২ মাসের রফতানি পারফরম্যান্সের ভিত্তিতে অতিরিক্ত সহায়তা পাওয়ার সুযোগও রাখা হয়েছে। তবে একজন রফতানিকারক একাধিক খাতের সদস্য হলেও সর্বোচ্চ একটি খাতের নির্ধারিত সীমার বেশি সুবিধা নিতে পারবেন না।
বাংলাদেশ ব্যাংক আবেদন প্রক্রিয়াও আরো সুশৃঙ্খল করেছে। অনুমোদিত ডিলার ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়কে নির্ধারিত ফর্ম-এ ব্যবহার করে আবেদন করতে হবে। আবেদনপত্রে দুইজন ক্ষমতাপ্রাপ্ত কর্মকর্তার স্বাক্ষর থাকতে হবে এবং ঋণের মেয়াদ শেষ হলে প্রয়োজনীয় অর্থ বাংলাদেশ ব্যাংক যেন সরাসরি সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের বৈদেশিক মুদ্রা ক্লিয়ারিং হিসাব থেকে সমন্বয় করতে পারে সেই অনুমোদনও আবেদনপত্রে থাকতে হবে। ঋণ পরিশোধের হিসাব অনলাইন ব্যবস্থার মাধ্যমে জমা দিতে হবে।
ব্যাংকারদের মতে, বিভিন্ন সময়ে জারি করা একাধিক সার্কুলার অনুসরণ করতে গিয়ে ব্যাংকগুলোকে জটিলতার মুখে পড়তে হতো। নতুন একীভূত নির্দেশনা সেই জটিলতা অনেকাংশে দূর করবে। একই সাথে সুস্পষ্ট যোগ্যতার মানদণ্ড, সময়মতো রফতানি আয় দেশে আনার বাধ্যবাধকতা এবং বকেয়া ঋণের ক্ষেত্রে কঠোর অবস্থান ইডিএফ তহবিল ব্যবস্থাপনায় আরো শৃঙ্খলা আনবে।



