গণপূর্ত অধিদফতরের প্রধান প্রকৌশলী মো: খালেকুজ্জামান চৌধুরীর বিরুদ্ধে বদলি ও পদায়ন ও সরকারি দরপত্র প্রক্রিয়ায় অনিয়ম, ক্ষমতার অপব্যবহার, সাংবাদিকদের হুমকি এবং প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ উঠেছে। এসব অভিযোগের বিষয়ে তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়ার দাবি জানিয়ে দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) আবেদন করা হয়েছে।
এ ছাড়া ভুয়া পিএইচডি সনদ দেখিয়ে উচ্চতর শিক্ষা ছুটিতে প্রেষণ ভোগের ঘটনায় বিভাগীয় মামলা হয় তার বিরুদ্ধে। বিভাগীয় তদন্তে জালিয়াতি ও অসদাচরণের বিষয়টি প্রমাণিত হওয়ায় তিনি দোষ স্বীকার করে নেন। তবে গুরু পাপে লঘুদণ্ড হয় এ কর্মকর্তার। পেছনে কাজ করে ফ্যাসিস্ট ও কার্যক্রম নিষিদ্ধ রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য সৈয়দা সাজেদা চৌধুরীর সাথে আত্মীয়তার সম্পর্ক। এত বড় অপরাধ করার পরও মাত্র এক বছরের জন্য বন্ধ রাখা হয় বেতন বৃদ্ধি। প্রভাবশালী রাজনৈতিক নেতার আত্মীয়তায় পরিচয়ে জ্যেষ্ঠতা ডিঙিয়ে পদোন্নতি
গণপূর্ত অধিদফতরের কর্মকর্তা তালিকা ও পার্সোনাল ডাটা শিট (পিডিএস) পর্যালোচনায় দেখা যায়, খালেকুজ্জামান চৌধুরী ক্ষমতার পালাবদলের সুযোগ বারবার কাজে লাগিয়েছেন। ১৯৮৯ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত চাকরিজীবনে সরকারি প্রেষণ ও ছুটির সুযোগে তিনি প্রায় ১১ বছর অস্ট্রেলিয়ায় ছিলেন। পদোন্নতির সুযোগ তৈরি হলেই দেশে ফিরে এসেছেন।
নথি অনুযায়ী, প্রেষণে যেতে তিনি ভুয়া অফার লেটার ও জাল কাগজপত্র তৈরি করেছিলেন। এতে বিদেশে দেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণœ হয়। এ ঘটনায় ২০১৬ সালের ২৩ আগস্ট তৎকালীন গণপূর্ত সচিব মো: শহীদ উল্লা খন্দকার তার এক বছরের বেতন বৃদ্ধি স্থগিত করেন। আওয়ামী লীগ নেত্রী সৈয়দা সাজেদা চৌধুরীর সুপারিশে গুরুদণ্ড এড়িয়ে সে যাত্রায় এ লঘুদণ্ড পান তিনি।
বিভাগীয় মামলার তিন বছরের মধ্যেই এ আওয়ামী লীগ নেত্রীর লিখিত সুপারিশে খালেকুজ্জামান একই বছরে দুই দফা পদোন্নতি পান। তখন সাজেদা চৌধুরীকে ‘ফুফু’ ডাকতেন তিনি।
সরকারি চাকরির সার্ভিস রেকর্ড বলছে, ২০১৯ সালের ২২ জুলাই খালেকুজ্জামান চৌধুরী নিয়মিত পদোন্নতি পান তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী পদে। এর কয়েক মাসের মাথায় ১৫ ডিসেম্বর পদোন্নতি পান অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী হিসেবে। রীতি ভেঙে তখন এ পদোন্নতি দেয়া হয় তাকে।
অভ্যুত্থানের পক্ষের দলটির সুপারিশে গত ২৭ অক্টোবর পাঁচজন জ্যেষ্ঠ প্রকৌশলীকে ডিঙিয়ে বসেন প্রধান প্রকৌশলীর (চলতি) চেয়ারে। এর আগে তাকে গোপালগঞ্জ থেকে দেয়া হয়েছিল ঢাকা মেট্রো জোনের দায়িত্ব।
খালেকুজ্জামানের বাড়ি ফরিদপুর জেলার নগরকান্দা উপজেলার তালমা গ্রামে। অভ্যুত্থানের পক্ষের দলের এক শীর্ষ নেতার পরিচয় কাজে লাগান খালেকুজ্জামান। এ আত্মীয়তার সুবাদে গত অন্তর্বর্তী সরকারের সময় জ্যেষ্ঠতা লঙ্ঘন করে পদোন্নতি পান। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পরে বিএনপি সরকার গঠন করলে পরিবর্তন করেন রাজনৈতিক ঠিকানা। এবার বসে পড়েন বিএনপির ঘাড়ে! হয়ে যান বিএনপি সরকারের সাবেক পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শ্যামা ওবায়েদ ইসলামের ঘনিষ্ঠ ও আত্মীয়।
জ্যেষ্ঠদের বাদ দিতে সাজানো মামলা তালিকা
প্রধান প্রকৌশলী পদ স্থায়ী করতে সুপিরিয়র সিলেকশন বোর্ডের (এসএসবি) বৈঠকের জন্য পাঠানো তালিকাতেও প্রশাসনিক জ্যেষ্ঠতা লঙ্ঘনের অভিযোগ উঠেছে। গত ৬ জুলাই গণপূর্ত মন্ত্রণালয় থেকে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয় পাঁচজন অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলীর তালিকার বেশিরভাগই জুনিয়র। বিষয়টি নিয়ে গণপূর্তে চাপা ক্ষোভ চলছে সিনিয়র কর্মকর্তাদের মধ্যে।
জ্যেষ্ঠতার হিসেবে তিন নম্বরে থাকা খালেকুজ্জামান চৌধুরী নিজেকে তালিকার এক নম্বরে বসাতে সমর্থ হয়েছেন। বর্তমানে অধিদফতরের দাফতরিক জ্যেষ্ঠতার তালিকায় শীর্ষে আছেন অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী মো: আবুল খায়ের (ঢাকা জোন) ও উৎপল কুমার দে (রিজার্ভ)। তালিকায় আরো আছেন মো: শহিদুল আলম (স্বাস্থ্য উইং) এবং ড. মোহাম্মদ গিয়াসউদ্দিন হায়দার (প্রেষণে মহাপরিচালক, এইচআরআই)।
নথিপত্র বলছে, জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের তালিকা থেকে স্থায়ীভাবে বাদ দেয়ার পথ তৈরি করতে জুলাই অভ্যুত্থানের পর রামপুরা থানায় দায়ের হওয়া একটি মামলার আসামির তালিকায় কৌশলে কয়েকজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তার নামসহ মোট ৪৭ জন প্রকৌশলীর নাম অন্তর্ভুক্ত করা হয়। পরবর্তী সময়ে ওই মামলার নথি এসএসবি কমিটির কাছে জমা দিয়ে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের অবস্থান দুর্বল করার চেষ্টা করা হয়। ফলে জ্যেষ্ঠতার তালিকায় তৃতীয় অবস্থানে থাকা মো: খালেকুজ্জামান চৌধুরীর প্রধান প্রকৌশলীর পদে যাওয়ার পথে সম্ভাব্য বাধা দূর করার সুযোগ তৈরি হয়।
কমিশন না দেয়ায় টেন্ডার বাতিল করেন প্রকৌশলী
বড় প্রকল্পের দরপত্র পুনর্মূল্যায়নের নামেও কমিশন বাণিজ্যের অভিযোগ উঠেছে প্রধান প্রকৌশলী মো: খালেকুজ্জামান চৌধুরীর বিরুদ্ধে।
অভিযোগ অনুযায়ী, ঢাকা গণপূর্ত বিভাগ-১, ঢাকা গণপূর্ত বিভাগ-৩ এবং শেরেবাংলা নগর গণপূর্ত বিভাগ-২-এর আওতাধীন বড় অঙ্কের পাঁচটি দরপত্র কমিশনসংক্রান্ত অসন্তোষের কারণে পুনর্র্মূল্যায়নের জন্য ফেরত পাঠানো হয়। সংশ্লিষ্ট প্রক্রিয়ায় পাবলিক প্রকিউরমেন্ট রুলস (পিপিআর) ২০২৫-এর বিভিন্ন ত্রুটিকে কারণ হিসেবে দেখানো হলেও দফতর সংশ্লিষ্টদের দাবি, নতুন পিপিআর কার্যকর হওয়ার পর সংশ্লিষ্ট প্রকৌশলীদের প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ দেয়া হয়েছিল। ফলে নিয়মগত ত্রুটির কারণ দেখিয়ে দরপত্রগুলো পুনর্মূল্যায়নে পাঠানোর যৌক্তিকতা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। অভিযোগকারীদের দাবি, নির্ধারিত ‘কমিশন’ না পাওয়ার কারণেই পুনর্মূল্যায়নের অজুহাতে এসব দরপত্রের প্রক্রিয়া দীর্ঘায়িত বা আটকে রাখা হয়েছিল।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক অধিদফতরের একাধিক প্রকৌশলী ও ঠিকাদারের দাবি, সাবেক প্রধান প্রকৌশলী শামীম আখতারকে সরিয়ে দেয়ার পরও গণপূর্ত অধিদফতরে অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগ বন্ধ হয়নি। বরং তাদের অভিযোগ, মো: খালেকুজ্জামান চৌধুরীর নেতৃত্বে নতুন একটি প্রভাবশালী বলয় বা ‘সিন্ডিকেট’ গড়ে উঠেছে, যার সাথে আর্থিকভাবে সমঝোতা করতে সক্ষম কর্মকর্তারাই সুবিধাজনক পদে বহাল থাকার সুযোগ পাচ্ছেন।
এ দিকে খালেকুজ্জামান চৌধুরীর বিরুদ্ধে দুর্নীতি, নথি জালিয়াতি, জ্যেষ্ঠতা লঙ্ঘন এবং দেশ-বিদেশে অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগ তুলে তথ্য-প্রমাণসহ লিখিত আবেদন দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) জমা পড়েছে বলে জানা গেছে। অভিযোগকারীদের দাবি, একাধিক ভুক্তভোগী কর্মকর্তা ও ঠিকাদার সরাসরি দুদকে হাজির হয়ে বিভিন্ন নথি ও দালিলিক প্রমাণও জমা দিয়েছেন।
শীর্ষ পদে বসে বদলি বাণিজ্য শুরু করেন
২০২৫ সালের ২৭ অক্টোবর গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের এক প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে মো: খালেকুজ্জামান চৌধুরীকে গণপূর্ত অধিদফতরের প্রধান প্রকৌশলীর রুটিন দায়িত্ব দেয়া হয়। পরবর্তী সময়ে তাকে একই পদে চলতি দায়িত্ব দেয়া হয়। দায়িত্ব গ্রহণের পরপরই অধিদফতরের বিভিন্ন পর্যায়ে বদলি ও পদায়নকে কেন্দ্র করে তার বিরুদ্ধে অনিয়ম ও ‘বদলি বাণিজ্যের’ ওঠে। পছন্দের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের গুরুত্বপূর্ণ পদে পদায়ন এবং আর্থিক সুবিধার বিনিময়ে বদলি করেন এ শীর্ষ কর্মকর্তা।
জানা গেছে, গণপূর্ত অধিদফতরের বিভিন্ন পর্যায়ের অন্তত ৬৫ জন প্রকৌশলী ও কর্মকর্তাকে পছন্দের কর্মস্থলে বদলি বা পদায়নের সুযোগ করে দিতে ১০ লাখ থেকে এক কোটি টাকা পর্যন্ত অর্থ লেনদেনের ঘটনা ঘটেছে। এসব লেনদেনের মাধ্যমে রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী বা আওয়ামী লীগপন্থ’ী হিসেবে পরিচিত কিছু কর্মকর্তাকে গুরুত্বপূর্ণ পদে পুনর্বাসনের সুযোগ করে দেয়ার অভিযোগও রয়েছে।
চলতি বছরের ৩ মার্চ পৃথক কয়েকটি প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে একদিনেই গণপূর্ত অধিদফতরের অর্ধ শতাধিক নির্বাহী প্রকৌশলী, উপবিভাগীয় প্রকৌশলী ও উপসহকারী প্রকৌশলীকে বদলির নির্দেশ দেয়া হয়। এত বড় পরিসরে বদলি-পদায়নের আগে মন্ত্রণালয়কে অবহিত না করার অভিযোগ ওঠার পর বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়। পরে গৃহায়ন ও গণপূর্তমন্ত্রী প্রধান প্রকৌশলী মো: খালেকুজ্জামান চৌধুরীকে তলব করে এ বিষয়ে ব্যাখ্যা চান বলে জানা গেছে। একসাথে বিপুলসংখ্যক প্রকৌশলীকে বদলির সিদ্ধান্তের পেছনে প্রশাসনিক প্রয়োজনীয়তা ও প্রক্রিয়াগত নিয়ম যথাযথ অনুসরণ করা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে।
তবে প্রধান প্রকৌশলীর ব্যাখ্যা সন্তোষজনক না হওয়ায় ৫ ও ৮ মার্চ পৃথক আদেশে আগের গণবদলির অধিকাংশই বাতিল করা হয় বলে জানা গেছে। এরপরও ছোট পরিসরে বদলি-পদায়নের ক্ষেত্রে অনিয়ম ও আর্থিক লেনদেনের মাধ্যমে সিদ্ধান্ত প্রভাবিত করার অভিযোগ ওঠে। এর মধ্যে একটি ঘটনায় দুর্নীতির অভিযোগে বরখাস্ত হওয়া প্রকৌশলী মো: সাইফুজ্জামানকে পুনরায় গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে আনার সুযোগ করে দিতে আগের তারিখ দেখিয়ে বদলির আদেশ জারির অভিযোগ করা হয়েছে। অভিযোগে আরো বলা হয়েছে, সাইফুজ্জামান তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারের গণপূর্তমন্ত্রী শরিফ আহমেদের ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত ছিলেন।
এ ঘটনাকে ঘিরে সরকারি নথিতে সময়ের অসামঞ্জস্যের অভিযোগও উঠেছে। গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয় গত ৩ ফেব্রুয়ারি এক আদেশে দুর্নীতির অভিযোগে প্রকৌশলী মো: সাইফুজ্জামানকে বরখাস্ত করে। ওই আদেশে তাকে লালমনিরহাটের নির্বাহী প্রকৌশলী হিসেবে উল্লেখ করা হয়। কিন্তু গণপূর্ত অধিদফতরের ওয়েবসাইটে ১৫ ফেব্রুয়ারি প্রকাশিত অপর একটি আদেশে দেখা যায়, বরখাস্তের আগের দিন অর্থাৎ ২ ফেব্রুয়ারি তাকে ঢাকায় রিজার্ভে বদলি দেখানো হয়েছে। ফলে প্রশ্ন উঠেছে, ৩ ফেব্রুয়ারি বরখাস্ত হওয়া একজন কর্মকর্তাকে তার আগের দিন কিভাবে ঢাকায় বদলির আদেশ দেয়া হলো এবং সে আদেশ ১৫ ফেব্রুয়ারি কেন প্রকাশ করা হলো। দফতর সংশ্লিষ্ট কয়েকজন এ সময়গত অসামঞ্জস্যকে নথি জালিয়াতির সম্ভাব্য ইঙ্গিত হিসেবে দেখছেন।
সাংবাদিকদের হুমকি
গণপূর্ত অধিদফতরের প্রধান প্রকৌশলী মো: খালেকুজ্জামান চৌধুরীর বিরুদ্ধে নানা অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানতে ফোন করার পর প্রাণনাশের হুমকি দেয়ার অভিযোগ করেছেন এক গণমাধ্যমকর্মী। এ ঘটনায় তিনি রাজধানীর মতিঝিল থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেছেন।
এসব অভিযোগের বিষয় জানতে চেয়ে প্রধান প্রকৌশলী মো: খালেকুজ্জামান চৌধুরীকে ফোন করা হলে তিনি তা রিসিভ করেননি। পরবর্তীতে পরিচয় দিয়ে খুদেবার্তা পাঠানো হলে গণপূর্তের নির্বাহী প্রকৌশলী মো: মাসুদ রানার ফোন নম্বর দিয়ে প্রতিবেদককে ফোন করেন প্রধান প্রকৌশলী। এ সময় তিনি প্রতিবেদককে নিউজটি করার প্রয়োজন আছে কি না জানতে চান এবং আরিফ নামে এক কর্মচারী যোগাযোগ করবে বলে নিউজটি না করার অনুরোধ জানান।



