এডিপি কাটছাঁট, মন্ত্রণালয় কমানো ও রফতানি প্রণোদনা শূন্যে নামাতে হবে

পে-কমিশন রিপোর্ট বাস্তবায়নে অর্থ সংস্থানে জাকির খান কমিশনের সুপারিশ

সরকারের পরিচালন বাজেটের আওতাভুক্ত আবর্তক ব্যয়ের মধ্যে বেতনভাতা ছাড়াও বিভিন্ন ধরনের ব্যয়ের খাত আছে। এর মধ্যে দেশীয় ও বৈদেশিক প্রশিক্ষণ, ভ্রমণ, পেট্রল, অয়েল ও লুব্রিকেন্ট, মেরামত ও সংরক্ষণ খাতে যে ব্যয় হয় তা যৌক্তিকীকরণের যথেষ্ট সুযোগ আছে। এই যৌক্তিকীকরণের মাধ্যমে যে ব্যয় সাশ্রয় হবে তা বেতনকাঠামো বাস্তবায়নে ব্যবহার করা যেতে পারে।

সৈয়দ সামসুজ্জামান নীপু
Printed Edition

সরকারি চাকুরেদের জন্য পে-কমিশন বাস্তবায়নে যে বর্ধিত ব্যয় হবে তা সঙ্কুলানের জন্য জাকির আহমেদ খানের নেতৃত্বে কমিশন বেশ কয়েকটি সুপারিশ প্রদান করে গেছে। এই সুপারিশের মধ্যে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) কাটছাঁট, আবর্তক ব্যয় যৌক্তিকীকরণ (কমানো) এবং সরকারের মন্ত্রণালয় ও বিভাগ কমানো এবং রফতানিতে নগদ প্রণোদনা শূন্যে নামিয়ে আনার সুপারিশও রয়েছে।

ব্যয়ের অগ্রাধিকার পর্যালোচনা বিষয়ে জাকির খান কমিশন তাদের প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছে, ‘সীমিত সম্পদ ব্যবহার করে প্রত্যাশিত ফল লাভের জন্য ব্যয়ের অগ্রাধিকার পর্যালোচনা একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। বিশেষত, উন্নয়ন ব্যয়ের ক্ষেত্রে এ বিষয়টি অধিকতর গরত্বপূর্ণ। বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির মধ্যে যেসব প্রকল্প ধীরগতিসম্পন্ন এবং যেসব প্রকল্প থেকে প্রত্যাশিত ফিরতি (রিটার্ন) সন্তোষজনক নয় সেসব প্রকল্পে বরাদ্দ হ্রাস করলে অন্যান্য অগ্রাধিকার পূরণের জন্য তা ব্যবহার করা সম্ভব। অন্য দিকে দ্রুত ফলদায়ক প্রকল্প থেকে যে রিটার্ন পাওয়া যাবে তা দিয়ে বেতনভাতাসহ বিভিন্ন অগ্রাধিকারপূর্ণ খাতে সম্পদ সঞ্চালন করা যেতে পারে।

আবর্তক ব্যয় যৌক্তিকীকরণ : সরকারের পরিচালন বাজেটের আওতাভুক্ত আবর্তক ব্যয়ের মধ্যে বেতনভাতা ছাড়াও বিভিন্ন ধরনের ব্যয়ের খাত আছে। এর মধ্যে দেশীয় ও বৈদেশিক প্রশিক্ষণ, ভ্রমণ, পেট্রল, অয়েল ও লুব্রিকেন্ট, মেরামত ও সংরক্ষণ খাতে যে ব্যয় হয় তা যৌক্তিকীকরণের যথেষ্ট সুযোগ আছে। এই যৌক্তিকীকরণের মাধ্যমে যে ব্যয় সাশ্রয় হবে তা বেতনকাঠামো বাস্তবায়নে ব্যবহার করা যেতে পারে।

মন্ত্রণালয়/বিভাগের সংখ্যা পুনর্বিন্যাস বিষয়ে কমিশন বলেছে, জনপ্রশাসন সংস্কার কমিশন বর্তমানে মন্ত্রণালয়ের বিভাগগুলোর সংখ্যা যুক্তিসঙ্গতভাবে হ্রাস করার সুপারিশ করেছে। ওই সুপারিশ অনুযায়ী মন্ত্রণালয়ের সংখ্যাকে হ্রাস করা হলে এক দিকে যেমন প্রশাসনে গতিশীলতা আসবে অপর দিকে এ থেকে সরকারের আবর্তক ব্যয় অনেকাংশে সাশ্রয় করা সম্ভব হবে।

অন্যান্য সংস্কার : সরকার জ্বালানি, রফতানি, রেমিট্যান্স ও কৃষি খাতে সংশ্লিষ্ট লক্ষ্যগোষ্ঠীর কল্যাণের জন্য ভর্তুকি প্রদান করে। তবে এই ভর্তুকি কাঠামো নিয়মিত পর্যালোচনা করে তা লক্ষ্যগোষ্ঠীর কতটুকু উপকারে আসছে নিশ্চিত হওয়া দরকার। যেসব ক্ষেত্রে ভর্তুকি অর্থনৈতিক দক্ষতাকে খর্ব করছে তা প্রত্যাহার করে যতটুকু অর্থ সাশ্রয় হবে তা অতিরিক্ত সম্পদ সঞ্চালনকে জোরদার করবে। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল এবং বিশ্ব ব্যাংকের সুপারিশ অনুযায়ী তরল জ্বালানির জন্য বাজারভিত্তিক মূল্য নির্ধারণ, বিদ্যুৎ খাতে ধাপে ধাপে ট্যারিফ সমন্বয় এবং দরিদ্রদের জন্য সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি- এই তিনটি পদক্ষেপ একসাথে বাস্তবায়ন করলে সরকারি ব্যয় ও ভর্তুকির চাপ হ্রাস পাবে এবং সম্পদ সঞ্চালনে তা গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখবে। উল্লেখ্য যে, বিনিয়ম হার এখন তুলনামূকলভাবে স্থিতিশীল থাকায় রফতানির জন্য নগদ প্রণোদনা আর অপরিহার্য নয়। এই পরিপ্রেক্ষিতে আগামী ১২-১৪ মাসে ধাপে ধাপে নগদ প্রণোদনা শূন্যে নামিয়ে আনা যেতে পারে। এতে যথেষ্ট ব্যয় সাশ্রয় হবে।

দক্ষিণ এশিয়াসহ অন্যান্য উন্নয়শীল দেশগুলোর কর-জিডিপির অনুপাতের সাথে তুলনা করলে দেখা যায় যে, বাংলাদেশের কর-জিডিপি অনুপাত সর্বনিম্ন পর্যায়ে রয়েছে। এর অর্থ হচ্ছে, সংগৃহীত রাজস্ব সরকারের ক্রমবর্ধমান উন্নয়ন চাহিদা এবং ক্রমহ্রাসমান বৈদেশিক সহায়তার কারণে সৃষ্ট পরিস্থিতি মোকাবেলার জন্য যথেষ্ট নয়। অন্য দিকে অতীতে সরকার কর্তৃক গৃহীত ঋণ পরিশোধের দায় বেড়ে যাওয়ায় সরকারের রাজস্ব-পরিসর আরো সঙ্কুচিত হচ্ছে বলে কমিশন তার রিপোর্টে উল্লেখ করেছে।

উল্লেখ্য, নবম জাতীয় পে-কমিশন সরকারি চাকরিজীবীদের সর্বনিম্ন মূল বেতন আট হাজার ২৫০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ২০ হাজার এবং সর্বোচ্চ বেতন ৭৮ হাজার থেকে এক লাখ ৬০ হাজার টাকা করার সুপারিশ করেছিল। ২০ গ্রেডের এই নতুন কাঠামো বাস্তবায়নে অতিরিক্ত প্রায় এক লাখ ছয় হাজার কোটি টাকা প্রয়োজন হবে বলে কমিশন জানিয়েছিল। বর্তমানে প্রায় ১৪ লাখ কর্মকর্তা-কর্মচারী ও ৯ লাখ পেনশনারের পেছনে সরকারের ব্যয় প্রায় এক লাখ ৩১ হাজার কোটি টাকা।