মধ্যবিত্তে করের বোঝা

কর বিশেষজ্ঞদের মতে, এই পরিবর্তনের সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়বে বেসরকারি চাকরিজীবী ও মধ্যবিত্ত পরিবারের ওপর। কারণ দেশের অধিকাংশ বেতনভোগী কর্মী এমনিতেই উচ্চ মূল্যস্ফীতি, বাসাভাড়া বৃদ্ধি, চিকিৎসা ব্যয়, শিক্ষায় খরচ এবং নিত্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধির কারণে আর্থিক চাপে রয়েছেন। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী মূল্যস্ফীতি এখনো প্রায় ১০ শতাংশের কাছাকাছি অবস্থান করছে; কিন্তু বেসরকারি খাতে অধিকাংশ কর্মীর বেতন বৃদ্ধি সেই হারে হয়নি। ফলে বাস্তব আয় কমে যাওয়ার এই সময়ে করের বোঝা বৃদ্ধি তাদের জীবনযাত্রাকে আরো কঠিন করে তুলবে।

আশরাফুল ইসলাম
Printed Edition

রাসেল আহমেদ, চাকরি করেন বেসরকারি একটি ব্যাংকে। ১০ লাখ টাকার করযোগ্য আয়ের ওপর চলতি অর্থবছরে ৩৭ হাজার ৫০০ টাকা আয়কর দিতেন। আগামী অর্থবছরের জন্য নতুন কাঠামোয় তাকে প্রায় ৪৮ হাজার ৭৫০ টাকা কর দিতে হবে। অর্থাৎ করের পরিমাণ বেড়ে যাচ্ছে প্রায় ১১ হাজার ২৫০ টাকা, যা শতকরা হিসাবে ৩০ ভাগ। একইভাবে ১৫ লাখ টাকা করযোগ্য আয়ের ক্ষেত্রে করের পরিমাণ এক লাখ পাঁচ হাজার টাকা থেকে বেড়ে দাঁড়াবে এক লাখ ৩০ হাজার টাকায়, যা প্রায় ২৪ শতাংশ বৃদ্ধি। মূল্যস্ফীতি যেখানে ১০ শতাংশ বেড়েছে, সেখানে আয় বাড়েনি। উপরন্তু বাড়তি কর পরিশোধ করতে হবে ৩০ শতাংশ। এর ফলে জীবন ধারণ ব্যয়, পরিবার ও সন্তানের ভরণপোষণ, শিক্ষা, চিকিৎসার মতো নিত্যপ্রয়োজনীয় খাতে জোগান দেয়া কষ্টকর হয়ে পড়বে। পাশাপাশি সঞ্চয়/নির্দিষ্ট খাতে বিনিয়োগ করে করযোগ্য আয়ের ওপর কর রেয়াত নেয়া অসম্ভব বিষয় হয়ে দাঁড়াবে।

রাসেল আহমেদের মতো বেশির ভাগ মধ্যবিত্ত চাকরিজীবীকে কঠিন জীবন ধারণ করতে হবে প্রস্তাবিত বাজেটের কারণে। তারা জানিয়েছেন, জাতীয় বাজেট ২০২৫-২৬-এ ব্যক্তি-শ্রেণীর করমুক্ত আয়সীমা ২৫ হাজার টাকা বাড়িয়ে তিন লাখ ৭৫ হাজার টাকা করার প্রস্তাবকে সরকার সাধারণ মানুষের জন্য একটি স্বস্তির পদক্ষেপ হিসেবে তুলে ধরেছে। তবে বাজেটের বিস্তারিত বিশ্লেষণ বলছে, করমুক্ত আয়সীমা বাড়লেও নতুন কর কাঠামোর কারণে বেসরকারি চাকরিজীবী, পেশাজীবী ও মধ্যবিত্ত করদাতাদের বড় একটি অংশকে আগের তুলনায় উল্লেখযোগ্য হারে বেশি কর পরিশোধ করতে হবে। ফলে অনেকের কাছেই এই বাজেট ‘কর ছাড়ের ঘোষণা, কিন্তু করের বোঝা বৃদ্ধির বাস্তবতা’ হিসেবে প্রতীয়মান হচ্ছে।

সরকারের ঘোষণায় করমুক্ত আয়সীমা তিন লাখ ৫০ হাজার টাকা থেকে তিন লাখ ৭৫ হাজার টাকায় উন্নীত করা হয়েছে। প্রথম দৃষ্টিতে এটি করদাতাদের জন্য ইতিবাচক পদক্ষেপ বলে মনে হলেও করের স্তর ও হার পরিবর্তনের কারণে বাস্তবে এর সুফল অনেকটাই ম্লান হয়ে যাচ্ছে। নতুন কাঠামোয় করযোগ্য আয়ের প্রথম ধাপ এক লাখ টাকার ওপর করহার ৫ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ১০ শতাংশ করা হয়েছে। একইভাবে পরবর্তী চার লাখ টাকার ওপর করহার ১০ শতাংশ থেকে ১৫ শতাংশে উন্নীত করা হয়েছে। অর্থাৎ করমুক্ত সীমা সামান্য বাড়ানো হলেও করযোগ্য আয়ের ওপর করের চাপ উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে।

কর বিশেষজ্ঞদের মতে, এই পরিবর্তনের সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়বে বেসরকারি চাকরিজীবী ও মধ্যবিত্ত পরিবারের ওপর। কারণ দেশের অধিকাংশ বেতনভোগী কর্মী এমনিতেই উচ্চ মূল্যস্ফীতি, বাসাভাড়া বৃদ্ধি, চিকিৎসা ব্যয়, শিক্ষায় খরচ এবং নিত্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধির কারণে আর্থিক চাপে রয়েছেন। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী মূল্যস্ফীতি এখনো প্রায় ১০ শতাংশের কাছাকাছি অবস্থান করছে; কিন্তু বেসরকারি খাতে অধিকাংশ কর্মীর বেতন বৃদ্ধি সেই হারে হয়নি। ফলে বাস্তব আয় কমে যাওয়ার এই সময়ে করের বোঝা বৃদ্ধি তাদের জীবনযাত্রাকে আরো কঠিন করে তুলবে।

এ দিকে কর রেয়াত বা কর ছাড়ের ক্ষেত্রেও নতুন শর্ত আরোপ করা হয়েছে। আগে করযোগ্য আয়ের ২০ শতাংশ নির্দিষ্ট খাতে বিনিয়োগ করলেই কর রেয়াত পাওয়া যেত। নতুন বাজেটে সেই সীমা বাড়িয়ে ৩০ শতাংশ করা হয়েছে। পাশাপাশি কর রেয়াতের হার ১৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১০ শতাংশ করা হয়েছে। অর্থাৎ একজন করদাতাকে আগের তুলনায় বেশি অর্থ সঞ্চয় বা বিনিয়োগ করতে হবে; কিন্তু কর ছাড়ের সুবিধা পাবেন কম। এতে দীর্ঘমেয়াদি সঞ্চয় ও বিনিয়োগে নিরুৎসাহিত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

ব্যাংকার রাসেল আহমেদের আরেকটি বড় অভিযোগ হলো- সরকারি ও বেসরকারি চাকরিজীবীদের মধ্যে বিদ্যমান করবৈষম্য। বেসরকারি চাকরিজীবীদের ক্ষেত্রে মূল বেতনের পাশাপাশি বাড়িভাড়া, চিকিৎসা ভাতা, যাতায়াত ভাতা এবং অন্যান্য সুবিধা করযোগ্য আয়ের আওতায় পড়ে। অন্য দিকে সরকারি চাকরিজীবীদের অনেক ভাতা ও সুবিধা করমুক্ত থাকে। ফলে একই ধরনের আয় থাকা সত্ত্বেও দুই খাতের কর্মীদের করভার সমান হয় না। দীর্ঘদিন ধরে এই বৈষম্য দূর করার দাবি জানিয়ে আসছেন বেসরকারি খাতের করদাতারা।

অর্থনীতিবিদদের মতে, সরকারের রাজস্ব আহরণ বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তা অস্বীকার করার সুযোগ নেই। উন্নয়ন ব্যয়, সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি এবং অবকাঠামো খাতে অর্থায়নের জন্য রাজস্ব সংগ্রহ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তবে নতুন করদাতা অন্তর্ভুক্ত করা, কর ফাঁকি কমানো এবং প্রশাসনিক দক্ষতা বৃদ্ধির পরিবর্তে বিদ্যমান করদাতাদের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করলে তা দীর্ঘমেয়াদে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। এতে কর প্রদানের প্রতি অনীহা বাড়ার পাশাপাশি সঞ্চয় ও বিনিয়োগও কমে যেতে পারে।

কর বিশেষজ্ঞদের একটি অংশ মনে করেন, কর ব্যবস্থা আরো মানবিক ও ন্যায়সঙ্গত করতে হলে মূল্যস্ফীতির বাস্তবতা বিবেচনায় করমুক্ত আয়সীমা আরো বাড়ানো প্রয়োজন। একই সাথে সরকারি ও বেসরকারি খাতের কর ব্যবস্থায় সমতা আনা, কর রেয়াত সুবিধা যৌক্তিক রাখা এবং নতুন করদাতা সৃষ্টির মাধ্যমে রাজস্ব বাড়ানোর উদ্যোগ গ্রহণ করা উচিত।

সংশ্লিষ্টদের মতে, দেশের মধ্যবিত্ত শ্রেণীই অর্থনীতির প্রধান চালিকাশক্তি। এই শ্রেণীর ওপর অতিরিক্ত করের চাপ সৃষ্টি হলে তাদের ভোগক্ষমতা, সঞ্চয় এবং বিনিয়োগ কমে যেতে পারে, যা সামগ্রিক অর্থনীতিতেও প্রভাব ফেলবে। তাই বাজেটের চূড়ান্ত অনুমোদনের আগে ব্যক্তি-শ্রেণীর করদাতাদের উদ্বেগ ও বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়ে কর কাঠামো পুনর্বিবেচনার দাবি জোরালো হয়ে উঠেছে। করদাতাদের প্রত্যাশা, রাজস্ব আহরণের প্রয়োজনীয়তা ও সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার সক্ষমতার মধ্যে একটি ন্যায্য ভারসাম্য প্রতিষ্ঠা করা জাতীয় বাজেট ২০২৫-২৬-এ ব্যক্তি-শ্রেণীর করমুক্ত আয়সীমা ২৫ হাজার টাকা বাড়িয়ে তিন লাখ ৭৫ হাজার টাকা করার প্রস্তাবকে সরকার সাধারণ মানুষের জন্য একটি স্বস্তির পদক্ষেপ হিসেবে তুলে ধরেছে। তবে বাজেটের বিস্তারিত বিশ্লেষণ বলছে, করমুক্ত আয়সীমা বাড়লেও নতুন কর কাঠামোর কারণে বেসরকারি চাকরিজীবী, পেশাজীবী ও মধ্যবিত্ত করদাতাদের বড় একটি অংশকে আগের তুলনায় উল্লেখযোগ্য হারে বেশি কর পরিশোধ করতে হবে। ফলে অনেকের কাছেই এই বাজেট কর ছাড়ের ঘোষণা; কিন্তু করের বোঝা বৃদ্ধির বাস্তবতা হিসেবে প্রতীয়মান হচ্ছে।