ছায়া আবরণে নদী হত্যা : দখল ও বালু মহালের গোপন সাম্রাজ্য

অনেক নদ-নদীর নাব্যতা নিয়ন্ত্রণ করছে এখন রাজনৈতিক প্রভাবশালী ও ভূমিদস্যুরা। তাদের কাছে নদ-নদী এখন ‘সোনার খনি’। সর্বোচ্চ আদালত নদীকে ‘আইনি ব্যক্তি’ ঘোষণার পর তা রক্ষার দায়িত্ব জাতীয় নদী রক্ষা কমিশনকে (এনআরসিসি) দিলেও, মাঠপর্যায়ের চিত্র ভয়াবহ। সরকারি তথ্য মতেই, দেশজুড়ে অন্তত ৬৫ হাজার দখলদার নদী গিলে খাচ্ছে, ঢাকা ও এর আশেপাশে অন্তত ৪৬ হাজার ৭৪২ জন নদীখেকো সক্রিয় রয়েছে। অনুসন্ধানে দেখা গেছে, রাজনৈতিক ক্ষমতার পালাবদলের সাথে নদী দখলের সিন্ডিকেটও পাল্টে যায়, কেবল কুশীলবদের চেহারা পাল্টায়।

আব্দুল কাইয়ুম
Printed Edition

দেশজুড়ে ৬৫ হাজার দখলদার গিলে খাচ্ছে নদী

দখলদারদের প্রায় ২৬.৩২ শতাংশই রাজনৈতিক প্রভাবশালী

হাউজিং ও শিল্পায়নের থাবায় মৃতপ্রায় প্রাণপ্রবাহ

অনেক নদ-নদীর নাব্যতা নিয়ন্ত্রণ করছে এখন রাজনৈতিক প্রভাবশালী ও ভূমিদস্যুরা। তাদের কাছে নদ-নদী এখন ‘সোনার খনি’। সর্বোচ্চ আদালত নদীকে ‘আইনি ব্যক্তি’ ঘোষণার পর তা রক্ষার দায়িত্ব জাতীয় নদী রক্ষা কমিশনকে (এনআরসিসি) দিলেও, মাঠপর্যায়ের চিত্র ভয়াবহ। সরকারি তথ্য মতেই, দেশজুড়ে অন্তত ৬৫ হাজার দখলদার নদী গিলে খাচ্ছে, ঢাকা ও এর আশেপাশে অন্তত ৪৬ হাজার ৭৪২ জন নদীখেকো সক্রিয় রয়েছে। অনুসন্ধানে দেখা গেছে, রাজনৈতিক ক্ষমতার পালাবদলের সাথে নদী দখলের সিন্ডিকেটও পাল্টে যায়, কেবল কুশীলবদের চেহারা পাল্টায়।

অভিযোগ, জেলা প্রশাসন ও ভূমি জরিপ কর্মকর্তাদের ম্যানেজ করে প্রভাবশালীদের জমি বৈধ করতে নদীর মূল সীমানা থেকে ১০০ থেকে ১৫০ ফুট ভেতরে খুঁটি বসানো হচ্ছে। নির্ধারিত লিজ এলাকার শতগুণ বাইরে গিয়ে নদীর বুক থেকে বালু উত্তোলন চলছে। আইনের তোয়াক্কা না করে ব্রিজ, কালভার্ট বা বাঁধের এক কিলোমিটারের মধ্যে ড্রেজার বসিয়ে বালু তোলা হচ্ছে। তবে নদী দখলদারদের প্রায় ২৬ দশমিক ৩২ শতাংশই রাজনৈতিকভাবে অত্যন্ত প্রভাবশালী ব্যক্তি। এই রাজনৈতিক ছত্রছায়া এনফোর্সমেন্ট কর্মকর্তাদের হাত বেঁধে রাখে এবং আইনের নিরপেক্ষ প্রয়োগকে অসম্ভব করে দেয়।

বিভিন্ন নদীর বাস্তব চিত্র

অনুসন্ধানে দেখা গেছে, রাজধানী ঢাকার চারপাশের চারটি নদী- বুড়িগঙ্গা, তুরাগ, বালু ও শীতলক্ষ্যা বর্তমানে সবচেয়ে বেশি ভরাট ও দখলের শিকার। এ ছাড়া খুলনার ময়ূর নদী, নেত্রকোনার সোমেশ্বরী, সুনামগঞ্জের যাদুকাটা এবং সাভারের বংশী নদী ভরাট হয়ে এখন মৃতপ্রায়। সুনামগঞ্জের যাদুকাটা নদীতে বিএনপি ও আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী নেতাদের সমন্বয়ে গঠিত একটি সিন্ডিকেট প্রতি রাতে শত শত অবৈধ ড্রেজার বা ‘বোমা মেশিন’ চালিয়ে বালু লুট ও পাড় ভরাট করছে।

তদন্তে উঠে এসেছে, ঢাকার বুড়িগঙ্গা নদীর মূল প্রবাহের একটি বিশাল অংশ (ছয় কিলোমিটার) এখন পুরোপুরি বন্ধ হওয়ার পথে। তুরাগ ও বালু নদ এখন কেবল সরু খালে পরিণত হয়েছে। বিশেষ করে টঙ্গী ও রূপগঞ্জ এলাকায় বালু নদীর ১৮ কিলোমিটার এলাকা এখন দখলদারদের কব্জায়। সোমেশ্বরী নদীতে প্রতিদিন ৫০০ থেকে ৬০০টি খননযন্ত্র দিয়ে বালু তুলে নদীটিকে কার্যত হত্যা করা হচ্ছে।

সরকারি তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে, আমিন মোমিন হাউজিং, চন্দ্রিমা উদ্যান হাউজিং, ড্যানিশ হাউজিং, উত্তরা সিটি, গ্লোবাল সিটি, জলসিঁড়ি আবাসন প্রকল্প এবং কপোতাক্ষ সিটি এই সাতটি বড় প্রকল্প তুরাগ ও বালু নদের সীমানার ভেতরে বালু ফেলে ভরাট করে গড়ে উঠেছে। এ ছাড়াও বুড়িগঙ্গার তীরে মধু সিটির মতো প্রকল্পগুলো নদী গিলে খাচ্ছে।

মুন্সীগঞ্জে ধলেশ্বরী ও শীতলক্ষ্যার সঙ্গমস্থলে শাহ সিমেন্টের বিরুদ্ধে নদী দখলের সুনির্দিষ্ট তথ্য সরকারি নথিতে রয়েছে। নির্দিষ্টভাবে আরএস দাগ নং ১৮৪ এবং ৩০১-৩০৮ এর নদীভুক্ত জমি ভরাট করে তারা স্থাপনা নির্মাণ করেছে। এ ছাড়া তুরাগ ও বালুর তীরে এমবিসি ইটভাটা, মীর আক্তার সিমেন্ট রেডি মিক্স, এনডিও রেডি মিক্স (সেভেন রিংস সিমেন্ট) এবং প্যারাডাইস গ্রুপের মতো বড় শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলো দখলদার হিসেবে চিহ্নিত।

নেত্রকোনার সোমেশ্বরী নদীতে প্রতিদিন ৫০০ থেকে ৬০০ খননযন্ত্র ব্যবহার করে নদীটিকে কার্যত হত্যা করা হচ্ছে। নিয়ম অনুযায়ী ব্রিজ বা কালভার্টের এক কিলোমিটারের মধ্যে বালু তোলা নিষিদ্ধ হলেও, খোদ রাজধানীতেই সুলতানা কামাল ও টঙ্গী রেল ব্রিজের নিচে অবৈধ উত্তোলনের ফলে কাঠামোটি ঝুঁকির মুখে পড়েছে। এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, দেশের বাজারে ব্যবহৃত বালুর ৬০ থেকে ৭০ শতাংশই অবৈধভাবে উত্তোলিত।

একই চিত্র দেখা গেছে খুলনার ময়ূর নদীতে। সেখানে দখলদাররা প্রভাব খাটিয়ে নদী ভরাট করে আবাসন ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছে, যার ফলে বর্ষায় সামান্য বৃষ্টিতেই মহানগরীর ৮০ শতাংশ রাস্তা হাঁটু থেকে কোমর সমান পানিতে ডুবে থাকে। এ ছাড়া যাদুকাটা ও সোমেশ্বরী নদীর তলদেশ গভীর হয়ে যাওয়ায় ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নিচে নেমে যাচ্ছে এবং কৃষি জমিতে ধস নামছে।

কমে আসছে নদীর আয়তন

আগেকার নথিপত্র এবং ২০২৬ সালের প্রেক্ষাপট বিশ্লেষণ করলে নদীর আয়তন ও সংখ্যা নিয়ে অনুসন্ধানে প্রাপ্ত পরিসংখ্যান আঁতকে ওঠার মতো। চার দশক আগে দেশে নদ-নদীর সংখ্যা ছিল প্রায় ৭০০টি। কিন্তু চলতি বছরের সরকারি ও বেসরকারি বিভিন্ন গবেষণা তথ্য অনুযায়ী, এই সংখ্যা কমে দাঁড়িয়েছে মাত্র ৪০৫টিতে। অর্থাৎ প্রায় ৩০০টি নদী মানচিত্র থেকে মুছে গেছে।

বাংলাদেশের স্বাধীনতার সময় নদ-নদী ও জলপথের মোট দৈর্ঘ্য ছিল প্রায় ২৪ হাজার কিলোমিটার। বর্তমানে তা হ্রাস পেয়ে মাত্র তিন হাজার কিলোমিটারে ঠেকেছে। বর্তমান ২০২৬ সালের পরিসংখ্যান ও পূর্বাভাস বলছে, ঢাকার জলাভূমির পরিমাণ ২০৩১ সাল নাগাদ ১০ শতাংশের নিচে নেমে আসবে। ঢাকার পার্শ্ববর্তী এলাকার জলাভূমি ২০৩৪ সালে তা মাত্র আট দশমিক শূন্য দুই শতাংশে নেমে আসবে।

অর্থনৈতিক ক্ষতি

নদী দখলের প্রভাব কেবল মানচিত্রে সীমাবদ্ধ নয়, এর ক্ষত স্থানীয় অর্থনীতি ও বাস্তুসংস্থানে দীর্ঘমেয়াদি। একটি তুলনামূলক অর্থনৈতিক মডেলে দেখা যায়, নদী ও সংলগ্ন এলাকা থেকে স্বল্পমেয়াদি উন্নয়ন মুনাফা যদি হয় ১২ দশমিক চার বিলিয়ন ডলার, তবে দীর্ঘমেয়াদি পরিবেশগত ও দুর্যোগজনিত ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়ায় ৪৫ দশমিক আট বিলিয়ন ডলারে। অর্থাৎ এই দখলদারিত্বের ফলে রাষ্ট্রের নিট আর্থিক ক্ষতি ৩৩ দশমিক চার বিলিয়ন ডলার। এই বিশাল অর্থনৈতিক ঘাটতিই প্রমাণ করে যে, স্বল্পমেয়াদি লাভ আসলে জাতীয় অর্থনীতির জন্য আত্মঘাতী।

পরিবেশের ক্ষতি

অপরিকল্পিত বালু উত্তোলনের ফলে নদীর তলদেশ অস্বাভাবিক গভীর হচ্ছে। ফলে পানির বেগ ১৫ দশমিক ৪০ শতাংশ বৃদ্ধি পায় এবং বন্যার উচ্চতা এক দশমিক দুই থেকে তিন দশমিক এক মিটার পর্যন্ত বেড়ে যায়, যা পাড় ভাঙনকে ত্বরান্বিত করে। এতে করে বাস্তুচ্যুত হচ্ছে হাজার হাজার পরিবার। রাতের বেলা নদী ভরাট করে সেখানে কথিত উন্নয়ন প্রকল্পের নামে স্থাপনা তৈরি হচ্ছে। নদী ও জলাশয় ভরাটের ফলে ঢাকার তাপমাত্রা পার্শ্ববর্তী এলাকার তুলনায় অন্তত দুই ডিগ্রি বৃদ্ধি পেয়েছে এবং জলাবদ্ধতা এখন স্থায়ী সমস্যায় রূপ নিয়েছে।

বিশেষজ্ঞদের মত

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্রশাসনিক সদিচ্ছার অভাবেই নদী রক্ষা কার্যক্রম এক চোর-পুলিশ খেলায় পরিণত হয়েছে। জরিপ ছাড়াই জেলা প্রশাসকের নেতৃত্বাধীন কমিটি নদ-নদীকে বালুমহাল ঘোষণা করে ব্যবসায়ীদের হাতে তুলে দিচ্ছে। যদিও বিআইডব্লিউটিএ রাজধানী থেকে ১৮ হাজারের বেশি অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ করেছে, কিন্তু বড় দখলদাররা রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় দ্রুতই ফিরে আসে। প্রশাসনিক সদিচ্ছার অভাবেই নদী রক্ষা কার্যক্রম এক ‘চোর-পুলিশ খেলা’য় পরিণত হয়েছে।

তবে আশার আলো দেখাচ্ছে প্রস্তাবিত ‘জাতীয় নদী রক্ষা কমিশন (সংশোধন) আইন, ২০২৬’। খসড়া আইনে নদী দখলকে ফৌজদারি অপরাধ হিসেবে গণ্য করে পাঁচ বছরের কারাদণ্ড ও ১৫ লাখ টাকা জরিমানার বিধান রাখা হয়েছে।

জাতীয় নদী রক্ষা কমিশনের চেয়ারম্যান মকসুমুল হাকিম চৌধুরী নয়া দিগন্তকে বলেন, নদী রক্ষা কমিশনের মূল লক্ষ্য ও দায়িত্ব হলো দেশের নদীগুলোকে দখল ও দূষণমুক্ত রাখা। আমরা বর্তমানে নদী রক্ষায় বিভিন্ন বহুমুখী কার্যক্রম চলছে। বিশেষ করে অবৈধভাবে বালু উত্তোলন আমাদের অন্যতম উদ্বেগের কারণ, কারণ এর ফলে নদীর পাড় ভেঙে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়। এই ধরনের কার্যক্রম রোধ করা এবং নদীর স্বাভাবিক স্বাস্থ্য বজায় রাখা আমাদের পেশাগত দায়িত্বের অংশ। নদী দখলদারদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে। যদিও বিগত সময়ে বিভিন্ন রাজনৈতিক পরিস্থিতির কারণে এসব কাজে কিছু সীমাবদ্ধতা ছিল, তবে বর্তমানে আমরা নদী রক্ষায় এবং দখলদারদের উচ্ছেদে বদ্ধপরিকর।

জাতীয় নদী রক্ষা কমিশনের সাবেক চেয়ারম্যান এবং প্রাক্তন ভূমি সচিব ড. মুজিবুর রহমান হাওলাদার নয়া দিগন্তকে বলেন, বর্তমানে নদী দখল ও বালু মহাল সিন্ডিকেটের যে দৌরাত্ম্য চলছে, তা অনেক চেষ্টা করেও থামানো যাচ্ছে না। এর মূল কারণ হলো আইন প্রয়োগে অনীহা। প্রশাসনের অনেকের আইন প্রয়োগ করার ইচ্ছা নেই, আবার যাদের ইচ্ছা আছে তাদের পর্যাপ্ত কর্তৃত্ব নেই। আমরা নদী দখলদারদের একটি তালিকা তৈরি করেছিলাম যেখানে ৬৫ হাজার দখলদারের নাম এসেছিল। আমার মেয়াদে মাত্র ছয় মাসের মধ্যে ৩৩ হাজারের বেশি অবৈধ দখল উচ্ছেদ করতে সক্ষম হয়েছিলাম। কিন্তু পরবর্তী সময়ে এই উচ্ছেদ অভিযান আর তেমন গতি পায়নি। তিনি বলেন, জাতীয় নদী রক্ষা কমিশন একটি দন্তহীন বাঘে পরিণত হয়েছে। হাইকোর্টের চমৎকার সব নির্দেশনা এবং সংবিধানে পাবলিক প্রপার্টি রক্ষার স্পষ্ট বিধান থাকা সত্ত্বেও নদী উদ্ধারে প্রশাসনিক সদিচ্ছার চরম অভাব পরিলক্ষিত হচ্ছে।

তিনি বলেন, শীতলক্ষ্যা নদীর পাড়ে গড়ে ওঠা অসংখ্য শিল্প কারখানা নদী দখল করে তৈরি হয়েছে। এমনকি বুড়িগঙ্গা এবং মানিকগঞ্জের নদীগুলোর পাড়েও একই অবস্থা। মেঘনা গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজ প্রায় ৮৫ একর নদী ও জলাশয় দখল করে রেখেছে বলে আমাদের তদন্তে উঠে এসেছিল। এমনকি প্রভাবশালী রাজনীতিবিদ ও তৎকালীন মন্ত্রীরাও নদী দখলের সাথে জড়িত ছিলেন, যাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে গিয়ে আমাদের বাধার সম্মুখীন হতে হয়েছে। নদী ও পরিবেশ রক্ষায় আমাদের একটি সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন।