দক্ষিণ চট্টগ্রামের তিন ক্ষেত্র থেকে ৭৬ বছরেও উত্তোলন হয়নি গ্যাস

পাহাড়ে-ঝিরিতে এখনো জ্বলছে আগুন

Printed Edition
পটিয়ার হাইদগাঁও পাহাড়জুড়ে ভাসছে গ্যাস। নিচে ছড়ায় জ্বলছে আগুন : নয়া দিগন্ত
পটিয়ার হাইদগাঁও পাহাড়জুড়ে ভাসছে গ্যাস। নিচে ছড়ায় জ্বলছে আগুন : নয়া দিগন্ত

এস এম রহমান দক্ষিণ চট্টগ্রাম

দক্ষিণ চট্টগ্রামের পটিয়া, বাঁশখালী ও লোহাগাড়ায় কয়েক দশক আগে আবিষ্কৃত তিনটি প্রাকৃতিক গ্যাসক্ষেত্র আজও বাণিজ্যিকভাবে কাজে লাগানো হয়নি। স্থানীয় বাসিন্দাদের দাবি, এসব এলাকায় বিভিন্ন স্থানে এখনো প্রাকৃতিকভাবে গ্যাস নির্গত হয়ে জ্বলছে কিংবা ঝিরি-ঝরনায় বুদবুদ আকারে বের হচ্ছে। অথচ দীর্ঘ ৭৬ বছরেও এসব ক্ষেত্র থেকে গ্যাস উত্তোলনের কার্যকর উদ্যোগ বাস্তবায়িত হয়নি। জ্বালানি সঙ্কটের এই সময়ে নতুন করে অনুসন্ধান ও উত্তোলনের দাবি জোরালো হয়েছে।

দক্ষিণ চট্টগ্রামের বহুল আলোচিত গ্যাসক্ষেত্রগুলো হলো পটিয়া উপজেলার হাইদগাঁওয়ের বুদবুদিছড়া, বাঁশখালীর জলদি ইউনিয়নের দোচাইল্যা পাহাড় এবং লোহাগাড়া উপজেলার বড়হাতিয়ার কুমিরাঘোনা এলাকা। স্থানীয়দের ভাষ্য, বছরের পর বছর ধরে এসব স্থানে প্রাকৃতিকভাবে গ্যাস নির্গত হয়ে অপচয় হচ্ছে। তাদের আশা, আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে পুনরায় অনুসন্ধান চালানো হলে দেশের জ্বালানি খাতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখা সম্ভব হবে।

সম্প্রতি জাতীয় সংসদে চট্টগ্রাম-১৫ (সাতকানিয়া-লোহাগাড়া) আসনের সংসদ সদস্য আলহাজ শাহজাহান চৌধুরী লোহাগাড়ার বড়হাতিয়া কুমিরাঘোনা ও বাঁশখালীর গ্যাসক্ষেত্র পুনরায় পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে গ্যাস উত্তোলনের উদ্যোগ নেয়ার দাবি জানান। তিনি বলেন, জাতীয় স্বার্থে এবং ক্রমবর্ধমান গ্যাসের চাহিদা পূরণে দেশীয় জ্বালানি সম্পদের সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করা জরুরি।

তথ্য অনুযায়ী, ১৯৫০ সালে পটিয়ার হাইদগাঁওয়ের শ্রীমাই বুদবুদিছড়ায় প্রথম গ্যাসের অস্তিত্ব শনাক্ত হয়। এরপর ১৯৬০ সালে বাঁশখালীর দোচাইল্যা পাহাড় এলাকায় সাতটি এবং ১৯৬৮ সালে লোহাগাড়ার বড়হাতিয়ার কুমিরাঘোনায় আরেকটি গ্যাসক্ষেত্রের সন্ধান পাওয়া যায়। পাকিস্তান আমল থেকে শুরু করে স্বাধীনতার পরও বিভিন্ন সময়ে এসব এলাকায় একাধিক জরিপ পরিচালিত হলেও কোনো ক্ষেত্র থেকেই বাণিজ্যিকভাবে গ্যাস উত্তোলন শুরু হয়নি।

দৈনিক নয়া দিগন্তে ২০০৮ সালের ১৬ মার্চ প্রথম এসব গ্যাসক্ষেত্র নিয়ে একটি সচিত্র প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। প্রতিবেদনের পর তৎকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের নির্দেশে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম এক্সপ্লোরেশন অ্যান্ড প্রোডাকশন কোম্পানি লিমিটেড (বাপেক্স) পটিয়ার গ্যাসক্ষেত্রে পুনরায় প্রাথমিক জরিপ চালায় বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। পরবর্তী সময়েও কয়েক দফা অনুসন্ধান হলেও বাস্তব অগ্রগতি হয়নি।

স্থানীয় সূত্রের দাবি, পটিয়ার গ্যাসক্ষেত্রে ১৯৫৩ সালে গ্যাস পাওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হলেও রহস্যজনকভাবে খননকৃত কূপের মুখ সিসা দিয়ে বন্ধ করে দেয়া হয়। এ ঘটনায় সে সময় পাকিস্তান সরকার সংশ্লিষ্ট বিদেশী প্রতিষ্ঠান বার্মা অয়েল কোম্পানির বিরুদ্ধে মামলাও করেছিল বলে স্থানীয়দের দাবি। একই ধরনের ঘটনা বাঁশখালীর দোচাইল্যা পাহাড়ের কয়েকটি কূপ এবং লোহাগাড়ার কুমিরাঘোনা গ্যাসক্ষেত্রেও ঘটেছিল বলে তারা অভিযোগ করেন। তবে এসব দাবির বিষয়ে স্বাধীনভাবে নিশ্চিত হওয়া যায়নি।

বাঁশখালীর দোচাইল্যা এলাকায় ১৯৬০ সালে খনন করা কয়েকটি কূপে পাকিস্তান, কোরিয়া ও রাশিয়ার বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে একটি দল প্রাথমিক অনুসন্ধান চালায়। স্থানীয়দের ভাষ্য, ওই সময় কয়েকটি কূপ থেকে অপরিশোধিত তেলেরও নমুনা পাওয়া যায় এবং সম্ভাবনাময় একটি অনুসন্ধান প্রতিবেদন তৈরি করা হয়েছিল। কিন্তু এরপর আর কোনো অগ্রগতি হয়নি।

বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম এক্সপ্লোরেশন অ্যান্ড প্রোডাকশন কোম্পানির (বাপেক্স) সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক মর্তুজা আহমেদ ফারুক বলেন, দেশের বিভিন্ন জেলায় আবিষ্কৃত কয়েকটি গ্যাসকূপে উল্লেখযোগ্য গ্যাস মজুদের সম্ভাবনা রয়েছে। পটিয়া ও বাঁশখালীর গ্যাসক্ষেত্রে যৌথ অনুসন্ধানের জন্য চীনের সিনোপেক শেংলি নামের একটি প্রতিষ্ঠানের সাথে আলোচনা চলছে বলে তিনি জানান।

জানা গেছে, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দেশের বিভিন্ন স্থানে আবিষ্কৃত গ্যাসকূপে পুনরায় অনুসন্ধান কার্যক্রম শুরু হলেও পটিয়া ও বাঁশখালীর গ্যাসক্ষেত্রে এখনো বাণিজ্যিকভাবে গ্যাস উত্তোলনের উদ্যোগ নেয়া হয়নি। অন্য দিকে লোহাগাড়ার বড়হাতিয়া কুমিরাঘোনা গ্যাসক্ষেত্র নিয়েও দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি নেই বলে স্থানীয়দের অভিযোগ।

সম্প্রতি সরেজমিন বাঁশখালীর দোচাইল্যা পাহাড় ও পটিয়ার শ্রীমাই এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, বিভিন্ন স্থানে মাটির নিচ থেকে গ্যাস নির্গত হয়ে আগুন জ্বলছে। পটিয়ার পাহাড়ি ঝিরি ও ঝরনায় নিয়মিত বুদবুদ আকারে গ্যাস বের হতে দেখা যায়। স্থানীয়রা জানান, ওই বুদবুদের মুখে আগুন ধরালে তা জ্বলে ওঠে। এসব দৃশ্য স্থানীয়দের কাছে বহু বছরের পরিচিত হলেও এ নিয়ে কার্যকর উদ্যোগের অভাব রয়েছে বলে তাদের অভিযোগ।

২০২৪ সালের ২৮ আগস্ট বাপেক্সের তৎকালীন ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ শোয়েব মোবাইল ফোনে নয়া দিগন্তকে বলেছিলেন, এসব গ্যাসক্ষেত্র থেকে গ্যাস উত্তোলনের লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় কার্যক্রম চলমান রয়েছে। তবে এ বিষয়ে হালনাগাদ তথ্য জানতে গতকাল রোববার বাপেক্সের সদর দফতরে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

জ্বালানি বিশেষজ্ঞদের মতে, আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে দক্ষিণ চট্টগ্রামের এসব পুরনো গ্যাসক্ষেত্রে পুনরায় সমন্বিত ভূতাত্ত্বিক ও ভূকম্পন জরিপ চালানো প্রয়োজন। পর্যাপ্ত মজুদের প্রমাণ মিললে দেশীয় গ্যাস উৎপাদন বাড়িয়ে আমদানিনির্ভরতা কমানোর ক্ষেত্রে এসব ক্ষেত্র গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।