সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভা বয়কট বিরোধীদের

কমিটিকে মাত্র ২ কার্যদিবস সময় বেঁধে দেয়া ‘রাবার স্ট্যাম্প’ বানানোর শামিল- নাজিবুর রহমান

Printed Edition
সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভা বয়কট বিরোধীদের
সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভা বয়কট বিরোধীদের

সংসদ প্রতিবেদক

গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার বিল এবং জাতীয় মানবাধিকার কমিশন (এনএইচআরসি) সংক্রান্ত দু’টি বিলের পর্যালোচনাকে কেন্দ্র করে সংসদীয় স্থায়ী কমিটিতে সরকারি ও বিরোধী দলের বিরোধ চূড়ান্ত রূপ নিয়েছে। প্রস্তাবিত আইন দু’টিকে ‘দুর্বল’ ও ‘আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে দায়মুক্তির সুযোগ দেয়ার রূপরেখা’ আখ্যা দিয়ে সংসদীয় স্থায়ী কমিটির বৈঠক বয়কট এবং ওয়াকআউট করেছেন বিরোধী দলের সংসদ সদস্যরা।

গতকাল রোববার পৃথক সময়ে অনুষ্ঠিত দু’টি সংসদীয় কমিটির বৈঠকে এ ঘটনা ঘটে। গুমের অভিযোগের তদন্ত স্বাধীন কোনো সংস্থার পরিবর্তে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে রাখা এবং মানবাধিকার কমিশন অধ্যাদেশ একতরফাভাবে বাতিল করে দুর্বল আইন আনার প্রতিবাদ জানান বিরোধী সদস্যরা।

স্বরাষ্ট্রসংক্রান্ত কমিটিতে হট্টগোল, ওয়াকআউট

গতকাল রোববার বিকেলে জাতীয় সংসদ ভবনে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির সভাপতি জয়নুল আবেদীনের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত বৈঠকে ‘গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার বিল, ২০২৬’ পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে প্রতিবেদন তৈরির বিষয়ে আলোচনা শুরু হয়। আলোচনা শেষে কমিটি বিলটি সংসদে পাঠানোর চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিলে তার প্রতিবাদে বৈঠক থেকে বের হয়ে যান বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্য মো: নূরুল ইসলাম বুলবুল ও মো: আবদুল বাতেন।

বৈঠক থেকে বেরিয়ে বিরোধীদলীয় সংসদ সদস্য নূরুল ইসলাম বুলবুল সাংবাদিকদের বলেন, ‘সরকার আগে আরো শক্তিশালী আইন প্রণয়নের কথা বললেও সংসদে অত্যন্ত দুর্বল একটি বিল উপস্থাপিত হয়েছে। বিশেষ করে বিলের ১৪ নম্বর ধারায় গুমের অভিযোগ তদন্তের ভার আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ওপরই ন্যস্ত করা হয়েছে। যাদের বিরুদ্ধে গুমের অভিযোগ, তাদের হাতেই তদন্তের দায়িত্ব দেয়া মূলত বাহিনীকে দায়মুক্তি দেয়ার একটি অপচেষ্টা।’

তিনি অভিযোগ করেন, বিলটি ‘জনবান্ধব’ বা ‘ভিকটিমবান্ধব’ না হয়ে সম্পূর্ণ ‘আইনশৃঙ্খলা বাহিনীবান্ধব’ হয়েছে। স্বাধীন মানবাধিকার কমিশন বা কোনো স্বতন্ত্র কমিশনের হাতে তদন্তের ভার না দিলে ভুক্তভোগীরা কখনো বিচার পাবেন না। গণভোটের রায় ও সামগ্রিক সংবিধান সংস্কারের ধারাকে বাইপাস করে সরকার নিজেদের মতো বিতর্কিত বিল পাস করার চেষ্টা করছে বলেও তিনি অভিযোগ তোলেন।

সংসদীয় রীতিনীতি ভঙ্গের পাল্টা অভিযোগ

এ দিকে বিরোধী সদস্যদের সভা থেকে বেরিয়ে যাওয়ার বিষয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সংক্রান্ত স্থায়ী কমিটির সভাপতি জয়নুল আবেদীন মন্তব্য করেন, কমিটিতে যেকোনো ধারা নিয়ে বিরোধিতা বা সংশোধনী দেয়ার অধিকার সদস্যদের রয়েছে। তবে সভা বয়কট করে ওয়াকআউট করা সংসদীয় রীতিনীতির সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।

বৈঠকে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির অন্য সদস্যদের মধ্যে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দীন আহমদ, স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম, হুইপ রকিবুল ইসলাম, হুইপ মিয়া নুরুদ্দিন আহমেদ অপু, শিরিন সুলতানাসহ এবং সংশ্লিষ্ট শীর্ষ বেসামরিক ও পুলিশ কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। বৈঠকে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়, গত ছয় মাসে দেশে কোনো বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড ও রাজনৈতিক নিপীড়ন ঘটেনি।

মানবাধিকার কমিশন বিল নিয়ে আইন কমিটিতেও বয়কট

এর আগে গতকাল সকালে ‘জাতীয় মানবাধিকার কমিশন (এনএইচআরসি) বিল, ২০২৬’-এর পর্যালোচনা নিয়ে আইন মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির কার্যক্রম সম্পূর্ণ বয়কটের ঘোষণা দেন বিরোধী সদস্যরা।

এ বিষয়ে জামায়াতে ইসলামীর সংসদীয় দলের মুখপাত্র নাজিবুর রহমান জানান, সংশ্লিষ্ট অংশীজন ও আন্তর্জাতিক মানদণ্ড উপেক্ষা করে আগের অধ্যাদেশ একতরফাভাবে বাতিল করা হয়েছে। প্রস্তাবিত নতুন এনএইচআরসি বিলটি আন্তর্জাতিক স্বীকৃত মানদণ্ড যেমন- ‘প্যারিস প্রিন্সিপলস’ ও ‘জিএএনএইচআরআই’-এর সাথে সম্পূর্ণ অসঙ্গতিপূর্ণ।

নাজিবুর রহমান ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “কমিটিকে মাত্র দুই কার্যদিবসের মধ্যে প্রতিবেদন জমা দেয়ার নির্দেশ দেয়া হয়েছে। এত বড় ও স্পর্শকাতর বিষয়ে বিশেষজ্ঞ বা নাগরিক সমাজের মতামত নেয়ার কোনো সুযোগ রাখা হয়নি। এটি সংসদীয় স্থায়ী কমিটিকে একটি স্বাধীন পর্যালোচনাকারী প্রতিষ্ঠানের পরিবর্তে সরকারের ‘রাবার স্ট্যাম্পে’ পরিণত করার স্পষ্ট রূপ।”

পরপর দু’টি স্পর্শকাতর মানবাধিকার কেন্দ্রিক আইন প্রণয়ন ঘিরে জাতীয় সংসদ ও স্থায়ী কমিটিতে তৈরি হওয়া এই রাজনৈতিক উত্তাপ এখন পুরো দেশের রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে চলে এসেছে।