অর্থনৈতিক প্রতিবেদক
আগাম কোনো ধরনের পূর্বাভাস ছাড়াই সূচকের বড় ধরনের পতন ঘটেছে দেশের দুই পুঁজিবাজারে। লেনদেনের শুরুতে সূচকের আচরণ বেশ ভালো থাকলেও পরে সৃষ্টি হওয়া বিক্রয়চাপ সামাল দিতে পারেননি বিনিয়োগকারীরা। আগের দিন বৃহস্পতিবার বিক্রয়চাপ কিছুটা সহনীয় থাকলেও গতকাল তা মাত্রা ছাড়িয়ে যায়। এতে দিনের বাকি সময় বিক্রয়চাপে অস্থির ছিল বাজারগুলো। ফলে দেশের দুই পুঁজিবাজারেই লেনদেনে অংশ নেয়া সিকিউরিটিজের বেশির ভাগই দরপতনের শিকার ছিল।
প্রধান পুঁজিবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) প্রধান সূচক ডিএসইএক্স গতকাল ৬৬ দশমিক ৭৬ পয়েন্ট অবনতি ঘটে। বৃহষ্পতিবার পাঁচ হাজার ৮৭১ দশমিক ০৬ পয়েন্ট থেকে লেনদেন শুরু করা সূচকটি দিনশেষে স্থির হয় পাঁচ হাজার ৮০৪ দশমিক ২৯ পয়েন্টে। একই সময় বাজারটির দুই বিশেষায়িত সূচক ডিএসই-৩০ ও ডিএসই শরিয়াহ হারায় যথাক্রমে ২৩ দশমিক ৯৩ ও ১৬ দশমিক ১১ পয়েন্ট। অনুরূপভাবে দেশের দ্বিতীয় পুঁজিবাজার চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জে (সিএসই) সার্বিক মূল্যসূচক সিএএসপিআই ১৫৮ দশমিক ১৩ পয়েন্ট হারায় গতকাল। ১৫ হাজার ৭৭৮ দশমিক ৪২ পয়েন্ট থেকে লেনদেন শুরু করা সূচটি গতকাল লেনদেন শেষে নেমে আসে ১৫ হাজার ৬২০ দশমিক ৩৯ পয়েন্টে। একই সময় বাজারটির দুই বিশেষায়িত সূচক সিএসই-৩০ ও সিএসসিএক্স সূচকের অবনতি ঘটে যথাক্রমে ১৪২ দশমিক ৯৯ ও ৯৭ দশমিক ১৯ পয়েন্ট।
পুঁজিবাজার বিশ্লেষকদের মতে, বাজার এখনো ঠিকভাবে দাঁড়াতেই পারেনি। এরই মধ্যে গোটা মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে শুরু হওয়া যুদ্ধ সামনের দিনগুলোতে কোনদিকে মোড় নিতে পারে তা এখনো স্পষ্ট নয়। তবে ইতোমধ্যে জ¦ালানিসহ অন্য খাতগুলোতে এর প্রভাব পড়তে শুরু করেছে। পুঁজিবাজারও এর বাইরে নয়।
এ বছরের শুরুতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল একযোগে ইরানের বিভিন্ন স্থাপনার ওপর একের পর এক নজিরবিহীন হামলা চালায়। ইরানও বসে থাকেনি। একপর্যায়ে তারাও পাল্টা হামলা চালাতে শুরু করে। এ সময় পুরো বিশ^ জ্বালানি তেলের সঙ্কটে পড়ে। এ সময় প্রায় দুই মাস টানা পতন ঘটতে থাকে পুঁজিবাজারের। এরই প্রেক্ষাপটে নতুন করে শুরু হওয়া এ যুদ্ধ কোনদিকে মোড় নেয় তা সবার অজানা। তারপরও বিনিয়োগকারীরা নিজেদের বড় লোকসান থেকে বাঁচাতে অর্জিত মুনাফা তুলে নেয়ার চেষ্টায় বিক্রয়চাপ বাড়িয়ে দেন। ফলে অবনতি ঘটে সূচকের।
সূচকের বড় ধরনের অবনতি ডিএসইর লেনদেনেও বড় ধরনের প্রভাব ফেলে। এদিন ঢাকা স্টকে ৯৩৮ কোটি টাকার লেনদেন নিষ্পত্তি হয়, যা আগের দিনের চাইতে ২৭৩ কোটি টাকা কম। বুধবার ডিএসইর লেনদেন ছিল এক হাজার ২১১ কোটি টাকা। তবে লেনদেন কিছুটা বেড়েছে চট্টগ্রাম স্টকে। এখানে ১৬ কোটি টাকা থেকে ২০ কোটিতে পৌঁছে লেনদেন।
গতকাল মতিঝিলে অবস্থিত বিভিন্ন ব্রোকার হাউজ ও মার্চেন্ট ব্যাংকের ট্রেডিং ফোরে উপস্থিত বিনিয়োগকারীদের সাথে দিনের বাজার পরিস্থিতি সম্পর্কে জানতে চাইলে তারা নয়া দিগন্তকে বলেন, মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে সঙ্ঘাত সৃষ্টি হলে আগেরবারের মতো পুরো বিশে^ এর প্রভাব পড়তে পারে। তৈরি হতে পারে জ¦ালানি সঙ্কট। এ শঙ্কা থেকেই বিনিয়োগকারীরা দ্রুত মুনাফা তুলে নিতে গিয়ে বিক্রয়চাপের মুখে পড়ছে পুঁজিবাজার। আগামী সপ্তাহের শুরুতে বাজার কেমন আচরণ করে তা বুঝা যাবে যুদ্ধ পরিস্থিতির ওপর। যদি যুদ্ধ পরিস্থিতির বড় ধরনের অবনতি না ঘটে তাহলে পুঁজিবাজার আবার স্বাভাবিক আচরণে ফিরবে। আর যুদ্ধ পরিস্থিতির অবনতি ঘটলে বাজারে পতনের ধারাবাহিকতা অব্যাহত থাকার আশঙ্কা রয়েছে।
গতকাল পুঁজিবাজারে বেশির ভাগ খাত দরপতনের শিকার ছিল। কোনো কোনো খাতে দর হারায় শতভাগ কোম্পানি। এ খাতগুলো ছিল সিমেন্ট, সিরামিকস, কাগজ শিল্ট, চামড়া, তথ্য প্রযুক্তি ও টেলিকমিউনিকেশন খাত। তা ছাড়া বড় খাতগুলোতে হাতেগোনা দু-একটি কোম্পানি ছাড়া অন্যগুলো দর হারায়। এদের মধ্যে ছিল ব্যাংক, টেক্সটাইলস, ওষুধ ও রসায়ন, ব্যাংক বহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠান, বিমা ও মিউচুয়াল ফান্ড। মূলত, এ খাতগুলো মূলধন সমৃদ্ধ হওয়ায় সূচকে তার প্রভাব পড়ে বেশি। ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে লেনদেনে অংশ নেয়া ৩৮৯টি সিকিউরিটিজের মধ্যে ৩১০টি দরপতনের শিকার ছিল, যা মোট লেনদেন হওয়া কোম্পানির ৮০ শতাংশ। এ সময় মূল্যবৃদ্ধির তালিকায় ছিল ৫৯টি কোম্পানি ও ফান্ড। দর অপরিবর্তিত ছিল ২০টির। অন্য দিকে চট্টগ্রাম শেয়ারবাজারে লেনদেনে অংশ নেয়া ২৬২টি কোম্পানি ফান্ডের মধ্যে ৫৪টির মূল্যবৃদ্ধির বিপরীতে দর হারায় ১৮৬টি। এখানে দর অপরিবর্তিত ছিল ২২টির।
ঢাকা স্টকে গতকাল লেনদেনের শীর্ষে ছিল শার্প ইন্ডাস্ট্রিজ। ৩৪ কোটি ৩৯ লাখ টাকায় কোম্পানিটির ৯৬ লাখ ৩১ হাজার শেয়ার হাতবদল হয় গতকাল। ২৩ কোটি ২৪ লাখ টাকায় ৭২ লাখ ৭৭ হাজার শেয়ার বেচাকেনা করে লেনদেনের দ্বিতীয় স্থানে ছিল সিটি ব্যাংক। লেনদেনের দিক থেকে ডিএসইর শীর্ষ দশ কোম্পানির অন্যগুলো ছিল যথাক্রমে এমএল ডাইং, সামিট অ্যালাইয়েন্স পোর্ট, কুইন সাউথ টেক্সটাইলস, আইটি কনসালটেন্ট, লাভেলো আইসক্রিম, আইপিডিসি ফাইনান্স, ফার ইস্ট নিটিং অ্যান্ড ডাইং ও এশিয়াটিক ল্যাবরেটরিজ।
গতকাল ডিএসইতে মূল্যবৃদ্ধির শীর্ষে উঠে আসে এমএল ডায়িং। কোম্পানিটির মূল্যবৃদ্ধি হার ছিল ৫ দশমিক ৮১ শতাংশ। ৩ দশমিক ৯৫ শতাংশ মূল্যবৃদ্ধি এ তালিকায় দ্বিতীয় কোম্পানি ছিল শাশা ডেনিমস। মূল্যবৃদ্ধিতে ডিএসইর শীর্ষ ১০ কোম্পানির অন্যগুলো ছিল যথাক্রমে তাকাফুল ইন্স্যুরেন্স, প্যারামাউন্ট ইন্স্যুরেন্স, মালেক স্পিনিং মিলস, প্রভাতি ইন্স্যুরেন্স ও দেশবন্ধু পলিমার।
এ দিন ডিএসইতে দরপতনের শীর্ষে উঠে আসে রাষ্ট্রায়ত্ত কোস্পানি শ্যামপুর সুগার মিলস। কোম্পানিটি ৮ দশমিক ৭১ শতাংশ দর হারায় গতকাল। ৭ দশমিক ২৫ শতাংশ দর হারিয়ে তালিকার দ্বিতীয় কোম্পানি ছিল আরেক রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান উসমানিয়া গ্লাস শিট ফ্যাক্টরি।
ডিএসইতে দরপতনে শীর্ষ দশ কোম্পানির অন্যগুলো ছিল যথাক্রমে রেনউইক যজ্ঞেশ^র, বেস্ট হোল্ডিং হোটেল অ্যান্ড রিসোর্ট, সিএপিএম আইবিবিএল মিউচুয়াল ফান্ড, ফার্স্ট বাংলাদেশ ফিক্সড ইনকাম ফান্ড, ঝিল বাংলা সুগার মিলস, ডিবিএইচ ফার্স্ট মিউচুয়াল ফান্ড, পিইচপি ফার্স্ট মিউচুয়াল ফান্ড ও ট্রাস্ট ব্যাংক ফার্স্ট মিউচুয়াল ফান্ড।



