পুশইন

সীমান্ত কি নাগরিকত্বের বিচারক হতে পারে

সীমান্তে পুশইন কেবল প্রশাসনিক পদক্ষেপ নয়; এটি ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক ঘটনাবলীর সঙ্গেও যুক্ত হয়ে পড়েছে।

মোস্তাফিজুর রহমান

রাষ্ট্রের অধিকার আছে সীমান্ত রক্ষা করার। কিন্তু একইসঙ্গে মানুষেরও অধিকার আছে ন্যায্য প্রক্রিয়া, পরিচয় যাচাই এবং মানবিক আচরণ পাওয়ার। যদি কোনো মানুষকে রাতের অন্ধকারে, পরিচয় যাচাই ছাড়া, দুই রাষ্ট্রের মাঝখানে ফেলে রাখা হয়, তাহলে সে শুধু একটি অবৈধ অভিবাসী নয়; সে আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার একটি নৈতিক ব্যর্থতার প্রতীক।

বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তে সাম্প্রতিক পুশব্যাক বা পুশইন ঘটনাগুলোকে কেবল সীমান্ত ব্যবস্থাপনার সমস্যা হিসেবে দেখলে ভুল হবে।

পুশব্যাক এবং পুশইন শব্দ দু’টি রাজনৈতিকভাবে নিরপেক্ষ নয়। বরং এটি দুই রাষ্ট্রের দৃষ্টিভঙ্গিগত সংঘাতের প্রতিফলন। এটিকে সীমান্ত ব্যবস্থাপনার সমস্যা হিসেবে দেখলে ভুল হবে। এটি এখন মানবাধিকার, নাগরিকত্ব, রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব, আঞ্চলিক নিরাপত্তা এবং দক্ষিণ এশিয়ার ভূরাজনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নে পরিণত হয়েছে।

উদ্বেগজনক বিষয় হলো, এই ঘটনাগুলোর কেন্দ্রে রয়েছে মানুষ-নারী, শিশু, শ্রমজীবী অভিবাসী, এমনকি এমন ব্যক্তিরাও যাদের নাগরিকত্ব নিয়ে স্পষ্টতা নেই। বিভিন্ন প্রতিবেদনে দেখা যাচ্ছে, অনেককে বাংলাদেশি বলে দাবি করে সীমান্তে ঠেলে দেয়া হয়েছে। কিন্তু পরে তাদের মধ্যে ভারতীয় নাগরিকও পাওয়া গেছে। কিছু ক্ষেত্রে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর সদস্যদেরও এই প্রক্রিয়ায় জড়িত থাকার অভিযোগ রয়েছে।

কুড়িগ্রাম, খাগড়াছড়ি, মৌলভীবাজার এবং বেনাপোল সীমান্ত এলাকায় সাম্প্রতিক ঘটনাগুলোতে দেখা গেছে, কিছু মানুষকে হঠাৎ করে সীমান্তবর্তী শূন্য-অঞ্চলে রেখে যাওয়া হয়েছে, যেখানে তারা কার্যত কোনো রাষ্ট্রের সুরক্ষা পাচ্ছে না।

আরও উদ্বেগজনক হলো, কিছু মানুষকে “নো-ম্যানস ল্যান্ড”-এ আটকে পড়তে হয়েছে, যেখানেও তারা কার্যত কোনো রাষ্ট্রের সুরক্ষা পাচ্ছে না। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনের দৃষ্টিতে এটি অত্যন্ত সমস্যাজনক পরিস্থিতি।

বাংলাদেশের অবস্থান মূলত দু’টি নীতির উপর দাঁড়িয়ে আছে

১. যদি কেউ বাংলাদেশি নাগরিক হন, তবে তাকে ফিরিয়ে নেয়া হবে।

২. কিন্তু তা অবশ্যই কূটনৈতিক ও আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ করে হতে হবে।

বাংলাদেশ দীর্ঘদিন ধরে বলে আসছে যে, একতরফাভাবে মানুষকে সীমান্তে ঠেলে দেয়া আন্তর্জাতিক রীতি ও দ্বিপক্ষীয় সমঝোতার পরিপন্থি। এই কারণে Border Guard Bangladesh বা বিজিবি সীমান্তে অতিরিক্ত সতর্কতা জোরদার করেছে। একই সাথে একাধিক “পুশইন” প্রচেষ্টা প্রতিহত করেছে।

এক্ষেত্রে ভারতের অবস্থান কি?

ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি এই সংকটের একটি গুরুত্বপূর্ণ চালিকাশক্তি। বিশেষত পশ্চিমবঙ্গ ও আসামে “অবৈধ অভিবাসন” বহু বছর ধরে একটি রাজনৈতিক ইস্যু। ভারতের বিভিন্ন রাজনৈতিক শক্তি অবৈধ অভিবাসনকে জাতীয় নিরাপত্তা ও জনসংখ্যাগত ভারসাম্যের প্রশ্ন হিসেবে উপস্থাপন করে আসছে।

ফলে সীমান্তে পুশব্যাক কেবল প্রশাসনিক পদক্ষেপ নয়; এটি ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক ঘটনাবলীর সঙ্গেও যুক্ত হয়ে পড়েছে।

এই প্রেক্ষাপটে সাম্প্রতিক নয়াদিল্লিতে অনুষ্ঠিত হয়েছে বিজিবি বিএসএফের উচ্চপর্যায়ের ডিরেক্টর জেনারেল স্তরের সীমান্ত সমন্বয় বৈঠক।

এই বৈঠকে মূলত পুশইন বা পুশব্যাক, সীমান্ত হত্যা, অবৈধ অনুপ্রবেশ এবং প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া নিয়ে আলোচনা হয়। বাস্তবে এই বৈঠকটি এখন একটি গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক চাপ-নিরসন মঞ্চে পরিণত হয়েছে, যেখানে সীমান্ত উত্তেজনা ব্যবস্থাপনাই প্রধান এজেন্ডা।

বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের নতুন বাস্তবতা

২০২৪ সালের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক একটি নতুন পর্যায়ে প্রবেশ করেছে। পূর্ববর্তী সময়ে যে মাত্রার রাজনৈতিক ঘনিষ্ঠতা ছিল, বর্তমানে তার পরিবর্তে উভয় পক্ষের মধ্যে একটি সতর্ক দূরত্ব দেখা যাচ্ছে।এই পরিস্থিতিতে পুশইন বা পুশব্যাক ইস্যু একটি প্রতীকী গুরুত্বও বহন করছে। কারণ এটি শুধু সীমান্ত নয়, পারস্পরিক আস্থার প্রশ্নকে সামনে নিয়ে এসেছে।

দক্ষিণ এশিয়ার ভূরাজনৈতিক প্রেক্ষাপট

দক্ষিণ এশিয়ার বৃহত্তর ভূরাজনীতির দিক থেকেও বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশ বর্তমানে ভারত, চীন, যুক্তরাষ্ট্র এবং অন্যান্য আঞ্চলিক শক্তির সঙ্গে ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তোলার চেষ্টা করছে।অন্যদিকে ভারত তার পূর্বাঞ্চলীয় নিরাপত্তা, উত্তর-পূর্বাঞ্চলের স্থিতিশীলতা এবং অভিবাসন নিয়ন্ত্রণকে কৌশলগত অগ্রাধিকার হিসেবে বিবেচনা করে।

এই প্রেক্ষাপটে সীমান্ত প্রশ্ন একটি নিরাপত্তা ইস্যুতে পরিণত হয়েছে। তবে এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ তাত্ত্বিক পরিবর্তন লক্ষ্য করা যায়-অভিবাসনকে নিরাপত্তা ইস্যু হিসেবে দেখা শুরু হলে মানবিক বিবেচনা ধীরে ধীরে পেছনে পড়ে যায়, যা দীর্ঘমেয়াদে আঞ্চলিক অস্থিরতা তৈরি করতে পারে।

এই সংকটের কেন্দ্রে একটি মৌলিক প্রশ্ন রয়েছে। সেই প্রশ্নটি হচ্ছে রাষ্ট্রের সীমান্ত কি মানুষের মর্যাদার চেয়ে বড়?

রাষ্ট্রের অধিকার আছে সীমান্ত রক্ষা করার। কিন্তু একইসঙ্গে মানুষেরও অধিকার আছে ন্যায্য প্রক্রিয়া, পরিচয় যাচাই এবং মানবিক আচরণ পাওয়ার। যদি কোনো মানুষকে রাতের অন্ধকারে, পরিচয় যাচাই ছাড়া, দুই রাষ্ট্রের মাঝখানে ফেলে রাখা হয়, তাহলে সে শুধু একটি “অবৈধ অভিবাসী” নয়; সে আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার একটি নৈতিক ব্যর্থতার প্রতীক।

এই সংকটের সমাধান কোনো একক নিরাপত্তা-ভিত্তিক পদক্ষেপে সম্ভব নয়

বর্তমান সংকটের অন্যতম মূল সমস্যা হলো-একতরফা পরিচয় নির্ধারণ ও দ্রুত ফেরত পাঠানোর প্রক্রিয়া।

এই অবস্থায় প্রস্তাবিত Joint Verification Mechanism (JVM) হবে একটি দ্বিপক্ষীয় প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা, যেখানে:

  • দুই দেশের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, সীমান্তরক্ষী বাহিনী ও ইমিগ্রেশন ইউনিট সমন্বিতভাবে কাজ করবে।
  • সন্দেহভাজন ব্যক্তির ক্ষেত্রে তাৎক্ষণিক যৌথ যাচাই প্রক্রিয়া” চালু থাকবে।
  • একটি যৌথ ‘Arbitration Cell’ থাকবে, যেখানে পরিচয় নিয়ে বিরোধ নিষ্পত্তি হবে।
  • একতরফা পুশব্যাক আইনত নিষিদ্ধ করার জন্য দ্বিপক্ষীয় প্রটোকল থাকবে।

বাংলাদেশ-ভারত সীমান্ত সংকটকে যদি কেবল নিরাপত্তার দৃষ্টিতে দেখা হয়, তাহলে এটি ক্রমেই আরও জটিল ও মানবিক বিপর্যয়ের দিকে যাবে। কিন্তু যদি এটিকে একটি যৌথ প্রশাসনিক, প্রযুক্তিনির্ভর এবং মানবিক কাঠামোর মধ্যে আনা যায়, তাহলে এটি সমাধানযোগ্য। যেখানে রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব থাকবে, কিন্তু মানুষের মর্যাদা হবে সবার উপরে।

বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তে পুশব্যাকআসলে তিনটি সংকটের সমন্বয়

১. মানবিক সংকট

২. কূটনৈতিক সংকট এবং

৩. ভূরাজনৈতিক সংকট।

দীর্ঘমেয়াদে এর সমাধান কাঁটাতারের মাধ্যমে নয়, বরং স্বচ্ছ নাগরিকত্ব যাচাই, যৌথ সীমান্ত ব্যবস্থাপনা, মানবাধিকারের প্রতি শ্রদ্ধা এবং আন্তঃরাষ্ট্রিক আস্থার পুনর্গঠনের মাধ্যমে সম্ভব। অন্যথায় সীমান্তে আটকে পড়া মানুষগুলোর মতোই দুই দেশের সম্পর্কও এক ধরনের “নো-ম্যানস ল্যান্ড”-এ আটকে যেতে পারে।

সীমান্ত কি নাগরিকত্বের বিচারক হতে পারে

বাংলাদেশ-ভারত সীমান্ত কোনো সাধারণ সীমারেখা নয়। এটি একদিকে উপনিবেশ-পরবর্তী রাষ্ট্র গঠনের অসম্পূর্ণতা; অন্যদিকে ইতিহাস, ভাষা, ধর্ম, পরিবার, বাজার, নদী, জমি ও চলাচলের দীর্ঘ সামাজিক বাস্তবতার ওপর টানা একটি রাজনৈতিক রেখা।

১৯৪৭ সালের দেশভাগ, ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ, ছিটমহল সমস্যা, নদীভাঙন, সীমান্ত হাট, অনানুষ্ঠানিক শ্রমচলাচল, গরু ও পণ্য পাচার, বিয়ে-আত্মীয়তার আন্তসীমান্ত সম্পর্ক-সব মিলিয়ে এই সীমান্তে রাষ্ট্রের কল্পনা এবং সমাজের বাস্তবতা কখনো পুরোপুরি এক হয়নি। ফলে যখন নাগরিকত্বকে কঠোরভাবে প্রমাণের বিষয় করা হয়, তখন সবচেয়ে বেশি বিপদে পড়ে সেই মানুষগুলো, যাদের জীবন নিজেই সীমান্তের মতো তরল, জটিল ও নথিহীন।

বর্তমান উত্তেজনার তাৎক্ষণিক প্রেক্ষাপটে ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি গুরুত্বপূর্ণ। বিজেপি দীর্ঘদিন ধরে ‘অবৈধ অনুপ্রবেশ’, ‘বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারী’ এবং জাতীয় নিরাপত্তার ভাষাকে নির্বাচনী রাজনীতির কেন্দ্রে এনেছে। নাগরিকত্ব সংশোধন আইন বা সিএএ সেই বৃহত্তর রাজনীতির আইনি রূপ।

সিএএর ঘোষিত যুক্তি হলো প্রতিবেশী তিন দেশ অর্থাৎ বাংলাদেশ, পাকিস্তান ও আফগানিস্তান থেকে ধর্মীয় নিপীড়নের কারণে ভারতে আশ্রয় নেওয়া নির্দিষ্ট অমুসলিম সংখ্যালঘুদের নাগরিকত্বের পথ সহজ করা। কিন্তু এর রাজনৈতিক ও সামাজিক বিতর্কের কেন্দ্র হলো এর ‘রিলিজিয়াস ফিল্টারিং’; কিছু ধর্মীয় গোষ্ঠীকে সুরক্ষা দেওয়া হলেও মুসলমানরা সেই কাঠামোর বাইরে থাকে।

আইনটি ভারতের অভ্যন্তরীণ বিষয় হলেও এর ‘সিম্বলিক জিওগ্রাফি’ বাংলাদেশকে সরাসরি স্পর্শ করে। কারণ, আইনটির ভাষায় বাংলাদেশকে এমন এক রাষ্ট্র হিসেবে উল্লেখ করা হয়, যেখান থেকে ধর্মীয় নিপীড়নের কারণে মানুষ ভারতে গেছে। বাংলাদেশের জন্য এটি কূটনৈতিকভাবে সংবেদনশীল; ভারতের জন্য এটি অভ্যন্তরীণ নাগরিকত্ব ও নিরাপত্তা রাজনীতির অংশ।

এই জায়গাতেই সংকটের গভীরতা। সিএএ নিজে থেকে সরাসরি কাউকে বাংলাদেশে ঠেলে দেওয়ার আইন নয়। কিন্তু সিএএ, এনআরসি, ‘ইলিগাল ইনফিলট্রেটর রেটরিক’ এবং সীমান্ত পুলিশিং যখন একই রাজনৈতিক পরিবেশে কাজ করে, তখন নাগরিকত্বের প্রশ্ন প্রশাসনিক তৎপরতা, নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি এবং সীমান্তবাস্তবতার সঙ্গে মিশে যায়।

যারা সিএএর আওতায় পড়ে না, বিশেষত দরিদ্র, মুসলমান, বাংলাভাষী, নথিহীন বা কম নথিযুক্ত মানুষ, তারা সহজেই সন্দেহের কাঠামোর মধ্যে পড়ে। এখানে ‘বাংলাভাষী’ পরিচয়ই অনেক সময় জাতীয়তার সন্দেহে রূপ নেয়। এর ফলে ভারতীয় মুসলমান, বহু প্রজন্ম ধরে বসবাসকারী দরিদ্র মানুষ, শ্রমজীবী পরিবার, নদীভাঙনে বাস্তুচ্যুত জনগোষ্ঠী এবং সীমান্তবর্তী অঞ্চলের নথিহীন মানুষ—সবাই প্রশাসনিকভাবে ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে ওঠে।

সীমান্তের সমাজতত্ত্ব মানুষের সামাজিক জীবনকে সম্পূর্ণভাবে ধারণ করতে পারেনি

এই সংকটের ইতিহাসও গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তের সমাজতত্ত্ব এমন যে এখানে রাষ্ট্রীয় নাগরিকত্ব সব সময় মানুষের সামাজিক জীবনকে সম্পূর্ণভাবে ধারণ করতে পারেনি।

রংপুর-কোচবিহারের ছিটমহল, সিলেট-আসাম-মেঘালয় অঞ্চলের চলাচল, সাতক্ষীরা-উত্তর চব্বিশ পরগনা বা যশোর-নদীয়া অঞ্চলের আত্মীয়তা ও বাজার, কুড়িগ্রাম ও চরাঞ্চলের নদীভাঙন-এসব জায়গায় মানুষের জীবন বহুদিন ধরে ‘সীমান্তের ঊর্ধ্বে’ ছিল; রাষ্ট্র এসেছে পরে। রাষ্ট্র যখন আসে, তখন সে নথি, আইন, সীমানা, চেকপোস্ট, বাহিনী ও সন্দেহ নিয়ে আসে। সমাজ যখন থাকে, তখন থাকে স্মৃতি, সম্পর্ক, বেঁচে থাকা, অভাব, কাজ, ভাষা ও ভৌগোলিক দুর্বলতা। এই দুই বাস্তবতার সংঘর্ষই সীমান্ত সংকটের মূল সমাজতত্ত্ব।

ভূরাজনৈতিক দিক থেকে বিষয়টি জটিল

ভূরাজনৈতিক দিক থেকেও বিষয়টি জটিল। বাংলাদেশ ভারতের জন্য শুধু প্রতিবেশী নয়, উত্তর-পূর্ব ভারতের ল্যান্ড কানেক্টিভিটি, নিরাপত্তা, বাণিজ্য, নদী, বিদ্যুৎ, ট্রানজিট ও আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার জন্য বাংলাদেশ অপরিহার্য। অন্যদিকে বাংলাদেশের জন্য ভারত বৃহত্তম প্রতিবেশী, বাজার, নদী-উৎসের দেশ, নিরাপত্তা সহযোগী এবং একই সঙ্গে এক অসম শক্তির প্রতিবেশী।

ফলে সীমান্তে উত্তেজনা শুধু স্থানীয় আইনশৃঙ্খলার প্রশ্ন নয়; এটি ‘বাইলেটারাল ট্রাস্ট আর্কিটেকচার’-এর পরীক্ষা। একটি গুলি, একটি পুশইন, একটি ভুল বক্তব্য, একটি ভাইরাল ভিডিও অথবা একটি স্থানীয় উত্তেজনা দ্রুত জাতীয়তাবাদী রাজনীতিতে রূপ নিতে পারে। দক্ষিণ এশিয়ায় রাষ্ট্রগুলো প্রায়ই অভ্যন্তরীণ বৈধতার সংকটকে সীমান্ত জাতীয়তাবাদের ভাষায় অনুবাদ করে-এ ঘটনাও তার বাইরে নয়।

সার্ক পুনরুজ্জীবন মাইলফলক হতে পারে সীমান্ত সমস্যা সমাধানে

নরেন্দ্র মোদি ভারতের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে প্রথমবার শপথ নিয়েছিলেন ২০১৪ সালের ২৬ মে। দ্বিতীয় দফা শপথ নিলেন ২০১৯ সালের ৩০ মে। ওই দুই শপথ অনুষ্ঠানের মধ্যে এমন অনেক কিছুই ছিল, যা দক্ষিণ এশিয়ার জন্য তাৎপর্যপূর্ণ। এর মধ্যে একটি হলো ২০১৪ সালের শপথ অনুষ্ঠানে সাড়ম্বরে ঘোষণা দিয়ে ‘সার্ক নেতৃবৃন্দ’কে আমন্ত্রণ জানানো হয়। দ্বিতীয় শপথে সার্ককে বাদ রেখে দাওয়াত দেওয়া হয় ‘বিমসটেক’ নেতৃত্বকে। সেটাও ঘোষণা দিয়ে।

‘প্রতিবেশী প্রথম’ নীতি ও ‘সাগর’ ভিশনকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে নরেন্দ্র মোদির টানা তৃতীয়বারের শপথ গ্রহণ করেন ২০২৪ সালের ৯ জুন। সাগর ভিশন বা ‘সিকিউরিটি অ্যান্ড গ্রোথ ফর অল ইন দ্য রিজন’ হলো ভারত মহাসাগরের দেশগুলোর সঙ্গে ভূরাজনৈতিক সম্পর্ক রক্ষার মোদি সরকারের একটি নীতি। এই শপথে বাংলাদেশসহ প্রতিবেশী দেশগুলো অংশ নিলেও সার্ক এখানে গুরুত্ব পায়নি।

গঠনগত এই ভিন্নতার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হলো ভারত চাইছে সার্কের মৃতদেহের ওপর বিমসটেক সক্রিয় হয়ে উঠুক। কারণ, মোদি প্রথম দফায় ক্ষমতা এসে সার্কভুক্ত দেশগুলোয় গাড়ি চলাচলের যে প্রস্তাব দেন, পাকিস্তান তাতে শীতল প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছিল। সার্ক স্যাটেলাইট বিষয়েও তাদের আগ্রহ ছিল কম। একই সময়ে পাকিস্তান চীনের সঙ্গে অর্থনৈতিক করিডর গড়তে শুরু করে। ভারত এই পরিস্থিতির উত্তর দেয় ১৯তম সার্ক সম্মেলন বন্ধ করিয়ে, যা ২০১৬ সালের নভেম্বরে পাকিস্তানে হওয়ার কথা ছিল। পাকিস্তানকে সার্কের চেয়ারম্যান হিসেবে দেখতে অনিচ্ছুক ভারত, যার জন্য তারা বিমসটেককে পুনরুজ্জীবিত করে।

প্রকাশ্যে অবশ্য নয়াদিল্লি বলছে, সার্ক জোট হিসেবে অর্থনৈতিকভাবে একদম সফল ছিল না। প্রায় তিন দশক একসঙ্গে পথচলার পরও সদস্যদেশগুলো পারস্পরিক অর্থনীতির ১০ ভাগও সমন্বিত করতে পারেনি। মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি করেও সেটা করা যায়নি। বিমসটেক দিয়ে ভারত সেটাই করতে চায়। কিন্তু সার্কের যেকোনো ব্যর্থতার দায় যে বড় সদস্যদেশের ঘাড়েই বর্তায়, সেটা ভারতীয় কূটনীতিবিদেরা স্বীকার করতে অনিচ্ছুক।

ঢাকার বড় কূটনৈতিক সফলতার স্মারক সার্ক

সার্কের শুকিয়ে মরা বাংলাদেশের জন্য সুখকর নয়। বিশ্বে ঢাকার বড় কূটনৈতিক সফলতার স্মারক ছিল সার্ক। বাংলাদেশই এই জোটধারণার প্রস্তাবক। এর প্রতিষ্ঠায় প্রচুর খেটেছেও বাংলাদেশ। ১৯৮৫ সালে ঢাকাতেই এর যাত্রা।

নেপালের জন্যও সার্কের অপমৃত্যু বেদনাদায়ক। কাঠমান্ডুতে রয়েছে এই জোটের সচিবালয়। জোটের বর্তমান চেয়ারম্যানও তারা। তবে ভারত যখন সার্ককে ক্রমে নিষ্ক্রিয় করে ফেলছে, বাংলাদেশ তাতে জোরালো কোনো আপত্তি তোলেনি। নিঃসন্দেহে বাংলাদেশের কূটনীতিতে এটা গুরুত্বপূর্ণ এক অবস্থানবদল।

দক্ষিণ এশিয়ায় নিরাপত্তাহীনতা, অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা ও রাজনৈতিক অবিশ্বাসের পেছনে বড় কারণ সার্কের অচলাবস্থা।

সার্কের অচলাবস্থা এক-দুই দিনে হয়নি

সার্কের অচলাবস্থাটি এক-দুই দিনে হয়নি। দীর্ঘদিন ধরেই বেড়ে উঠেছে পারস্পরিক অবিশ্বাস, অসম আচরণ ও রাজনৈতিক-মনস্তাত্ত্বিক দূরত্বের বিষবৃক্ষ। স্বাভাবিক দ্বিপক্ষীয় কূটনৈতিক চর্চা দিয়ে এই দূরত্ব আর ঘুচবে না। কারণ, দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক আবেগ, অহংকার ও শক্তির অহমিকার রাজনীতির কাদায় আটকে গেছে।

আঞ্চলিক ঐক্য দুর্বল হলে কোনো দেশের সার্বভৌমত্ব নিরাপদ থাকে না

ভেনেজুয়েলার মতো দেশে একপক্ষীয় ও রক্তক্ষয়ী মার্কিন হস্তক্ষেপ দেখিয়ে দিয়েছে- আঞ্চলিক ঐক্য দুর্বল হলে কোনো দেশের সার্বভৌমত্বই নিরাপদ থাকে না। মধ্যপ্রাচ্যে আরব লিগের ব্যর্থতা কিংবা আফ্রিকার বিভিন্ন অঞ্চলে আঞ্চলিক সংহতির অভাবের ফলও একই রকম। বিপরীতে ইউরোপীয় ইউনিয়ন, আসিয়ান কিংবা লাতিন আমেরিকার মারকোসর দেখিয়েছে- আঞ্চলিক সহযোগিতা কেবল অর্থনৈতিক নয়, রাজনৈতিক নিরাপত্তারও প্রধান ভিত্তি।

ইউরোপীয় ইউনিয়নের কারণে ছোট দেশ যেমন পর্তুগাল, গ্রিস বা বাল্টিক রাষ্ট্রগুলোও বৈশ্বিক অর্থনীতি ও রাজনীতিতে একটি সম্মিলিত শক্তির অংশ হয়ে কথা বলার সুযোগ পাচ্ছে। ইউরোপীয় ইউনিয়ন না থাকলে এই দেশগুলোর কেউই আজ এককভাবে যুক্তরাষ্ট্র, চীন বা রাশিয়ার সঙ্গে সমানে সমানে দর-কষাকষি করতে পারত না।

দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর জোট আসিয়ান সক্ষম না থাকলে ইন্দোনেশিয়া, ভিয়েতনাম, থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়ার মতো দেশগুলো এককভাবে কখনোই বৈশ্বিক উৎপাদন ও সরবরাহ চেইনের কেন্দ্রে উঠে আসতে পারত না। আসিয়ানের ছাতার নিচে তারা রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, পারস্পরিক আস্থা ও বিনিয়োগের নিরাপত্তা নিশ্চিত করেছে। ফলে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া চীন-যুক্তরাষ্ট্র বাণিজ্য দ্বন্দ্বের মধ্যেও একটি বিকল্প উৎপাদনকেন্দ্র হিসেবে গড়ে উঠেছে।

আঞ্চলিক জোট রাজনৈতিক নিরাপত্তার একটি অমোঘ ঢালও বটে! লাতিন আমেরিকার মারকোসর জোটভুক্ত ব্রাজিল, আর্জেন্টিনা, উরুগুয়ে ও প্যারাগুয়ে যখন একক বাজার ও শুল্কব্যবস্থার দিকে এগিয়েছে, তখনই এ অঞ্চল বৈশ্বিক কৃষিপণ্য ও শিল্পপণ্যের বাজারে নিজেদের অবস্থান শক্ত করতে পেরেছে। মারকোসর বর্তমানে পুরোপুরি সফল বা কার্যকর নয়। তবু জোট কার্যকর থাকার সময় সদস্যরাষ্ট্রগুলো এককভাবেও অনেক বেশি শক্তিশালী ছিল, বিশেষ করে ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য আলোচনায়।

আঞ্চলিক জোট দুর্বল হয়ে পড়লে প্রতিটি দেশই ক্ষতিগ্রস্ত হয়। মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো ভাষা, সংস্কৃতি ও ধর্মে এতটা কাছাকাছি হওয়া সত্ত্বেও আরব লিগ কার্যকর রাজনৈতিক ঐক্য গড়ে তুলতে ব্যর্থ হয়েছে। ফলাফল ইরাক, লিবিয়া, সিরিয়া ও ইয়েমেন—প্রতিটি দেশ আলাদা আলাদাভাবে বহিরাগত শক্তির হস্তক্ষেপের শিকার হয়েছে।

আফ্রিকান ইউনিয়নের অভিজ্ঞতাও শিক্ষণীয়। যখন জোট কিছুটা সক্রিয় ছিল, তখন গণতান্ত্রিক রূপান্তর ও সংঘাত নিয়ন্ত্রণেও সাফল্য ছিল। যখনই জোট দুর্বল থেকেছে, দেশগুলো গৃহযুদ্ধ, সামরিক অভ্যুত্থান ও বহিরাগত প্রভাবের কাছে অসহায় হয়েছে।

দক্ষিণ এশিয়ার কোনো দেশই এককভাবে নিরাপদ নয়

দক্ষিণ এশিয়ায় সার্ক অচল হয়ে পড়ার ফলও একই রকম। ভারত, পাকিস্তান, বাংলাদেশ, নেপাল বা শ্রীলঙ্কা- কোনোটিই এককভাবে নিরাপদ নয়। ভারত মনে করতে পারে, সে একা শক্তিশালী। বাস্তবে আঞ্চলিক অবিশ্বাস ও দূরত্ব ভারতের কৌশলগত নিরাপত্তাকেই দুর্বল করছে। বাংলাদেশ, নেপাল বা শ্রীলঙ্কা মনে করতে পারে, দ্বিপক্ষীয় ভারসাম্য রক্ষা করেই চলা যাবে। বাস্তবে বহুপক্ষীয়তা ছাড়া বড় শক্তির চাপের মুখে টিকতে পারা কঠিন।

বাংলাদেশের নতুন সরকারের একটি নতুন কূটনৈতিক অধ্যায় শুরু হওয়া উচিত ছিল প্রথম দিনই সার্ক পুনরুজ্জীবনের উদ্যোগ নেওয়ার মাধ্যমে। এটিই ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার একমাত্র সম্মানজনক পথ। আঞ্চলিক জোটে কোনো পক্ষকে মাথা নত করতে হয় না। উদ্যোগের সহজ ভাষ্য-সার্ক শক্তিশালী হলে লাভ সবার।

আর সার্ক শক্তিশালী হলে সীমান্ত সমস্যা নিয়ে আলোচনা অনেক সহজ হতো। সার্ক পুনরুজ্জীবন মাইলফলক হতে পারে সীমান্ত সমস্যা সমাধানে।