রাজধানীর কৃষি বাজার থেকে শুরু করে গ্রামগঞ্জের হাট-বাজার—সর্বত্র এখন আমের মৌসুম। হিমসাগর, গোপালভোগ, লক্ষ্মণভোগ, ল্যাংড়া কিংবা হাঁড়িভাঙা—নানা জাতের আমে সেজে উঠেছে বাজার। কিন্তু পাকা আমের ঝুড়ির সামনে দাঁড়িয়ে অনেক ক্রেতার মুখে এখন একটি সাধারণ প্রশ্ন শোনা যায়—“ভাই, কার্বাইড বা ফরমালিন দেওয়া নেই তো?” আমের স্বাদ উপভোগের আগ্রহের চেয়েও বড় হয়ে উঠেছে অদৃশ্য এক ভয় ও সংশয়। দেশের প্রায় প্রতিটি বাজারেই এখন আম কেনার আগে রাসায়নিক ব্যবহারের বিষয়টি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করতে দেখা যায় ভোক্তাদের।
অথচ বাস্তবতা হলো, আম শুধু একটি ফল নয়; এটি বাংলাদেশের কৃষি, অর্থনীতি, কর্মসংস্থান এবং কূটনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। দেশে প্রতিবছর প্রায় ২৬ থেকে ২৭ লাখ টন আম উৎপাদিত হয়। এই বিপুল উৎপাদন শুধু তাজা ফল হিসেবে নয়, আচার, চাটনি, জুস, আমসত্ত্ব ও পাপড় শিল্পেরও প্রধান কাঁচামাল। এসব খাত গ্রামীণ নারী ও যুবকদের জন্য উল্লেখযোগ্য কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করছে। একই সঙ্গে বাংলাদেশের ফজলি, হিমসাগর ও হাঁড়িভাঙা আম বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রপ্রধান ও কূটনীতিকদের উপহার হিসেবে পাঠানো হচ্ছে, যা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে দেশের কৃষিপণ্যের সুনাম ও সম্ভাবনাকে তুলে ধরছে।
এক সময় জুন-জুলাই এলেই আম-কাঁঠালের ঘ্রাণে মুখর হয়ে উঠত চারপাশ। মানুষ নির্ভয়ে মৌসুমি ফল উপভোগ করত। কিন্তু বর্তমানে পাকা আম বাজারে এলেই অনেকের মনে প্রশ্ন জাগে—এটি কি স্বাভাবিকভাবে পেকেছে, নাকি রাসায়নিক ব্যবহার করা হয়েছে? বিস্ময়কর বিষয় হলো, বিদেশ থেকে আমদানি হওয়া আপেল, কমলা, আঙুর বা অন্যান্য ফলের নিরাপত্তা নিয়ে তেমন প্রশ্ন দেখা যায় না। বাস্তবে কিছু অসাধু ব্যবসায়ীর অনিয়ম থাকলেও দেশীয় আমকে ঘিরে অতিরঞ্জিত আতঙ্ক ও অপপ্রচার পুরো আমশিল্পের জন্য ক্ষতিকর হয়ে দাঁড়িয়েছে।
রংপুরের বদরগঞ্জের আম উদ্যোক্তা আল মাহমুদ হাসান বাণিজ্যিকভাবে হাঁড়িভাঙা আম চাষ করেন। তাঁর ভাষায়, একটি আম বাজারে পৌঁছানোর পেছনে কয়েক মাসের পরিচর্যা, রোগবালাই দমন, সেচ ব্যবস্থাপনা এবং প্রকৃতির সঙ্গে নিরন্তর সংগ্রাম জড়িয়ে থাকে। কিন্তু মৌসুমের শুরুতে যখন বাজারের সব আমকে সন্দেহের চোখে দেখা হয়, তখন সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হন সৎ চাষি ও উদ্যোক্তারা।
প্রকৃতপক্ষে আম পাকার বিষয়টি প্রকৃতির স্বাভাবিক নিয়মের অংশ। আবহাওয়া, তাপমাত্রা এবং ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে বিভিন্ন অঞ্চলে আম পাকার সময় ভিন্ন হয়। এ কারণেই সাতক্ষীরা বা চুয়াডাঙ্গার আম আগে পাকে, আবার রাজশাহী বা নওগাঁয় একই জাতের আম কিছুটা পরে পরিপক্ব হয়।
এই বাস্তবতাকে বিবেচনায় রেখে প্রতিবছর জেলা প্রশাসন ও কৃষি বিভাগ আম সংগ্রহের সময়সূচি বা ‘আম ক্যালেন্ডার’ ঘোষণা করে। ২০২৬ সালের ক্যালেন্ডার অনুযায়ী ১৫ মে থেকে গুটি আম, ২২ মে থেকে গোপালভোগ, ৩০ মে থেকে হিমসাগর বা ক্ষীরশাপাত, ১০ জুন থেকে ল্যাংড়া এবং ১৫ জুন থেকে আম্রপালি ও ফজলি সংগ্রহের অনুমতি দেওয়া হয়েছে। রংপুরের বিখ্যাত হাঁড়িভাঙা আম সাধারণত জুনের দ্বিতীয় সপ্তাহ থেকে বাজারে আসতে শুরু করে। অর্থাৎ প্রতিটি জাতের আমের একটি স্বাভাবিক পরিপক্বতার সময় রয়েছে। নির্ধারিত সময়ের অনেক আগে কোনো জাতের আম বাজারে এলে সতর্ক হওয়া উচিত, তবে মৌসুম অনুযায়ী বাজারে আসা আমকে অযথা সন্দেহ করার কোনো যৌক্তিক কারণ নেই।
আম নিয়ে সবচেয়ে বড় আতঙ্কের নাম ফরমালিন। অথচ এ বিষয়ে বৈজ্ঞানিক তথ্য অনেকটাই ভিন্ন কথা বলে। বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রাকৃতিকভাবেই ফলমূল ও শাকসবজিতে সামান্য পরিমাণ ফরমালডিহাইড থাকে, যা মানবস্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর নয়। ফরমালিন মূলত মাছ, মাংস বা প্রোটিনসমৃদ্ধ খাদ্যের পচনরোধে কার্যকর হলেও আমের মতো শর্করা ও আঁশসমৃদ্ধ ফলে এর ব্যবহার কার্যকর নয়। ফলে বাজারের প্রতিটি আমকে ফরমালিনযুক্ত মনে করার কোনো বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই।
২০১৪ সালে ফরমালিন আতঙ্কের কারণে বিপুল পরিমাণ আম ধ্বংস করা হয়েছিল। পরবর্তী বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, পরীক্ষায় শনাক্ত হওয়া উপাদানের বড় অংশই ছিল ফলের স্বাভাবিক উপাদান। এই অভিজ্ঞতা আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে কৃষিপণ্য নিয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণে আবেগ নয়, বিজ্ঞানভিত্তিক তথ্যই হওয়া উচিত প্রধান বিবেচ্য বিষয়।
ফল পাকানো নিয়েও সমাজে নানা বিভ্রান্তি রয়েছে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বৈজ্ঞানিকভাবে নিয়ন্ত্রিত ইথিলিন ব্যবহার করে ফল পাকানো একটি স্বীকৃত ও নিরাপদ পদ্ধতি। দূরবর্তী বাজার বা রপ্তানির জন্য শতভাগ পাকা আম গাছ থেকে সংগ্রহ করা সম্ভব নয়, কারণ পরিবহনের সময় তা দ্রুত নষ্ট হওয়ার ঝুঁকি থাকে। তাই পরিপক্ব কিন্তু সম্পূর্ণ পাকা নয়—এমন আম সংগ্রহ করে নিয়ন্ত্রিত পরিবেশে পাকানো হয়। এতে ফলের গুণগত মান বজায় থাকে এবং অপচয় কমে।
সমস্যা সৃষ্টি হয় তখন, যখন কিছু অসাধু ব্যবসায়ী অপরিপক্ব আম সংগ্রহ করে অননুমোদিত রাসায়নিক ব্যবহার করে দ্রুত পাকানোর চেষ্টা করেন। এতে ফলের বাইরের রং আকর্ষণীয় হলেও ভেতরের স্বাদ, গন্ধ ও পুষ্টিমান ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ভোক্তাদের নেতিবাচক অভিজ্ঞতার মূল কারণ এখানেই। তবে ভরা মৌসুমে অধিকাংশ আম স্বাভাবিকভাবেই পরিপক্ব থাকে এবং পরিবহনের সময়ই পেকে যায়। তাই এ সময়ে কৃত্রিমভাবে পাকানোর প্রয়োজনীয়তা খুবই সীমিত।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো পরীক্ষার ক্ষেত্রে বৈজ্ঞানিক নির্ভুলতা। অতীতে ত্রুটিপূর্ণ যন্ত্র বা অসম্পূর্ণ বিশ্লেষণের কারণে বিপুল পরিমাণ আম ধ্বংসের ঘটনা ঘটেছে। কৃষিপণ্য ধ্বংসের মতো সিদ্ধান্ত অবশ্যই আধুনিক পরীক্ষাগার ও বিজ্ঞানসম্মত পরীক্ষার ভিত্তিতে হওয়া উচিত। অন্যথায় কৃষক নিরুৎসাহিত হন এবং বাজারে অস্থিরতা সৃষ্টি হয়।
বর্তমানে আম উৎপাদনে ‘ফ্রুট ব্যাগিং’ প্রযুক্তির ব্যবহার দ্রুত বাড়ছে। গাছে থাকা অবস্থায় বিশেষ ব্যাগে আম ঢেকে রাখলে অতিরিক্ত কীটনাশক ছাড়াই ফল নিরাপদ ও দাগমুক্ত থাকে। পাশাপাশি ‘হট ওয়াটার ট্রিটমেন্ট’ প্রযুক্তি ব্যবহার করে আমের সংরক্ষণকাল বৃদ্ধি এবং রোগজীবাণু নিয়ন্ত্রণ করা হচ্ছে। এসব প্রযুক্তি বাংলাদেশের আমকে আন্তর্জাতিক বাজারে আরও প্রতিযোগিতামূলক করে তুলছে। মালয়েশিয়া, জাপান, যুক্তরাজ্য এবং ইউরোপের বিভিন্ন দেশে বাংলাদেশের আমের চাহিদা বৃদ্ধি পাওয়ায় এই খাত বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের একটি সম্ভাবনাময় ক্ষেত্র হয়ে উঠেছে। তবে এ সম্ভাবনা কাজে লাগাতে বিমানবন্দরভিত্তিক আধুনিক কোয়ারেন্টাইন সুবিধা ও কোল্ড চেইন অবকাঠামো আরও শক্তিশালী করা প্রয়োজন।
অসাধু ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ, ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর এবং স্থানীয় প্রশাসনের নিয়মিত বাজার তদারকি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একই সঙ্গে ভোক্তাদেরও সচেতন হতে হবে। আমের জাত ও মৌসুম সম্পর্কে ধারণা রাখা, নির্ধারিত সময়ের আগে বাজারে আসা আম সম্পর্কে সতর্ক থাকা এবং গুজব বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমভিত্তিক অপপ্রচারের পরিবর্তে স্বীকৃত গবেষণা প্রতিষ্ঠান ও কৃষি বিভাগের তথ্যের ওপর আস্থা রাখা জরুরি।
আম বাংলাদেশের কৃষি, অর্থনীতি ও সংস্কৃতির এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। হাজারো কৃষক, উদ্যোক্তা ও শ্রমিকের শ্রমে গড়ে ওঠা এই শিল্পকে কিছু অসাধু ব্যক্তির কর্মকাণ্ডের দায়ে বিচার করা অন্যায়। প্রয়োজন বিজ্ঞানভিত্তিক সচেতনতা, দায়িত্বশীল তদারকি এবং তথ্যনির্ভর জনসচেতনতা। জ্যৈষ্ঠের ভরা মৌসুমে আম শুধু একটি ফল নয়; এটি কৃষকের ঘাম, গ্রামীণ অর্থনীতির প্রাণশক্তি এবং বাংলার ঐতিহ্যের প্রতীক। তাই গুজব ও আতঙ্ক নয়, বিজ্ঞান ও সচেতনতাই হোক আমকে জানার এবং উপভোগ করার প্রধান ভিত্তি।
লেখক
ডেপুটি রেজিস্ট্রার
শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়
ই-মেইল: [email protected]



