২৭ জানুয়ারি ২০২১
`

পাটকল বন্ধ নয়, দূর করতে হবে পাটশিল্পের প্রতিবন্ধকতা

পাটকল বন্ধ নয়, দূর করতে হবে পাটশিল্পের প্রতিবন্ধকতা - ছবি : সংগৃহীত

‘সোনালি আঁশ’ খ্যাত বাংলাদেশের পাট বিশ্বব্যাপী সমাদৃত। আমাদের দেশেই পৃথিবীর সবচেয়ে উন্নতমানের পাট উৎপাদন হয়। স্বাধীনতার পরও দেড় যুগ ধরে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনে পাট মুখ্য ভূমিকা পালন করেছে। বর্তমানেও পাটের উৎপাদন রেকর্ড মাত্রায় পৌঁছেছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ৪৫ লাখ কৃষকের সম্পৃক্ততায় দেশে প্রায় ৯০ লাখ বেল পাট আঁশ উৎপাদিত হচ্ছে, যা বিশ্বে মোট উৎপাদনের এক-তৃতীয়াংশ।

ইউরোপের ২৮টিসহ বিশ্বের বেশির ভাগ দেশ প্লাস্টিক নিষিদ্ধ করে টেকসই, পরিবেশবান্ধব, সবুজ উন্নয়নের লক্ষ্যে পাটপণ্যের দিকে ঝুঁকেছে। যা আমাদের জন্য সম্ভাবনার নতুন দিগন্ত উন্মোচন করলেও বাস্তব চিত্র কিন্তু ভিন্ন। আমাদের জিডিপির ৩-৪ শতাংশ আসে কাঁচা পাট ও পাটজাত পণ্য রফতানি করে। ৮০-৯০ শতাংশ কাঁচা পাট আমরা রফতানি করি। বাকি সামান্য পাট প্রক্রিয়াজাতকরণ করে পাটপণ্য তৈরিতে সক্ষম হই। অন্য দিকে রফতানিকৃত কাঁচা পাটের বেশির ভাগই কিনে নেয় ভারত। সেসব কাঁচা পাট অত্যাধুনিক মেশিনে প্রক্রিয়াজাতকরণ করে বহুমুখী পণ্য উৎপাদন করছে দেশটি। বিশ্ববাজারের চাহিদার সাথে তাল মিলিয়ে পাটপণ্য রফতানি করে আয় করছে বিপুল বৈদেশিক মুদ্রা। পাট উৎপাদনের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ভারতের সমকক্ষ হলেও পাটজাত পণ্যের বৈশ্বিক বাজারে ভারত অনেক এগিয়ে। প্রসঙ্গত, ১৮ শতকের পরে ইউরোপের পাটকলগুলো পূর্ব বাংলার পাটের ওপর নির্ভরশীল ছিল। পূর্ব বাংলার পাট দিয়েই ইউরোপে তৈরি হতো জুট ব্যারন মানের ধনিক শ্রেণী।

বিশ্বের শীর্ষ পাট উৎপাদনকারী দেশ হয়েও আমরা দুর্ভাগ্যজনকভাবে লাভবান হতে পারছি না। বর্তমানে দেশে ৩০৭টি পাটকলের মধ্যে সরকারি ২৫টি ও বেসরকারি ২৮২টি। বেসরকারিগুলোতে আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে এবং দক্ষ ব্যবস্থাপনার ফলে মুনাফা অর্জন করে সচল থাকলেও সরকারি পাটকলগুলোর অবস্থা শোচনীয়। বিজেএমসির তত্ত্বাবধানে সরকারি পাটকলগুলো ৪৮ বছরের মধ্যে চার বছর কিছুটা লাভ দেখাতে পারলেও বাকি ৪৪ বছর অব্যাহতভাবে লোকসান দিয়ে এসেছে। ফলস্বরূপ প্রতি বছর সরকারকে হাজার হাজার কোটি টাকার ক্ষতিপূরণ দিয়ে পাটকলগুলো সচল রাখতে হয়েছে। যার ক্ষতির পরিমাণ ১০ হাজার কোটি টাকার বেশি। তাই গত ১ জুলাই ‘শতভাগ’ পাওনা বুঝিয়ে দিয়ে, ২৪ সহস্রাধিক শ্রমিককে ‘গোল্ডেন হ্যান্ডশেক’এর আওতায় রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকলগুলোর উৎপাদনকার্যক্রম বন্ধের সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত করেছে সরকার।

যখন বৈশ্বিক বাজারে পাটপণ্যের স্বর্ণালি সম্ভাবনা উঁকি দিচ্ছে এবং পাট উৎপাদনকারী দেশগুলো সেই সুযোগ লুফে নিচ্ছে, তখন দেশজ পাটকল বন্ধের ঘোষণা হতাশাজনক। সরকারি পাটকলগুলোর লোকসানের প্রধান কারণ হিসেবে বিজেএমসির অব্যবস্থাপনা, সময় মতো পাট কেনার সিদ্ধান্ত গ্রহণের অভাব ও দুর্নীতিকে বিশেষভাবে দায়ী করা হচ্ছে। এ ছাড়া নেতৃত্ব ও কর্মপরিকল্পনা প্রণয়নের অভাব, বৈশ্বিক বাজারে জায়গা করে নিতে কৌশলগত ত্রুটি, আধুনিক প্রযুক্তির অভাব, অদক্ষ ও বেশিসংখ্যক শ্রমিক নিয়োগের ফলে বছরের পর বছর লোকসান গুনতে হয়েছে রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকলগুলোয়। ফলে কলগুলো বন্ধ করে দিতে বাধ্য হয় সরকার।

সরকারি পাটকল বন্ধ করে দেয়ায় পাটের বাজার সঙ্কুচিত হয়ে গেছে। ফলে মৌসুমের পাট বিক্রি করতে সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছেন কৃষক। কৃষি অর্থনীতিবিদদের আশঙ্কা, এবার দাম না পেয়ে চাষিরা পাট চাষে আগ্রহ হারালে উৎপাদন কমে যাবে। তাতে পাটসঙ্কটে পড়বে বেসরকারি পাটকলগুলো। কিন্তু এতে শুধু পাটকলের সাথে জড়িত কৃষক ও শ্রমিকই ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন না, বরং আমরা স্বর্ণালি সুযোগ ক্রমে হারিয়ে ফেলছি ।

পাট এমন একটি পণ্য যার কিছুই ফেলনা নয়। সিনথেটিকের ব্যবহার পরিহার করে পরিবেশবান্ধব টেকসই উন্নয়নের লক্ষ্যে জ্যামিতিক হারে বিশ্বে পাটের চাহিদা বাড়ছে। পাটের আঁশ দিয়ে তৈরি করা হয় সোনালি ব্যাগ। পৃথিবীতে প্রতি বছর ৫০০ বিলিয়ন পচনশীল শপিং ব্যাগের চাহিদা রয়েছে। শুধু যুক্তরাষ্ট্রেই যার চাহিদা দেড় হাজার কোটি টাকার বেশি । এ ছাড়া পাট থেকে তৈরি হয় ‘ভিসকস’ সুতা, যা উৎপাদন করতে পারলে আমাদের গার্মেন্টস সেক্টরে আমদানি ব্যয় কমিয়ে আনা সম্ভব। পাশাপাশি পাট থেকে বস্তা, ফ্যাব্রিক, হ্যান্ড ব্যাগ, কার্পেট, শাড়ি, পর্দা, জুতা, সোফা, শোপিসসহ শত শত রকমের পণ্য তৈরি করা সম্ভব। মধ্যপ্রাচ্য, ইউরোপ, আমেরিকাতে পাটজাত এসব পণ্যের বিশেষ চাহিদা ও বৃহৎ বাজার রয়েছে। বর্তমানে পাটপাতা দিয়ে অর্গানিক চা তৈরির কৌশল আবিষ্কৃত হয়েছে। গুণগত মানসম্মত এ চা উৎপাদন ও রফতানি শুরু করেছে জার্মানি। অন্য দিকে, পাটকাঠি পুড়িয়ে যে ছাই হয়; তাতে আছে অ্যাকটিভেটেড কার্বন। সেটি দিয়ে তৈরি করা যায় ব্যাটারি, ওষুধ, প্রসাধনীসহ নানাবিধ সামগ্রী। ইতোমধ্যেই পাটকাঠি পোড়ানো ছাই চীনে রফতানির উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে। অন্য দিকে, ২০১৭ সালে ১৯টি পণ্যে পাটের মোড়ক ব্যবহার বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। যা আইনতভাবে বাস্তবায়ন করা গেলে বছরে ১০০ কোটি টাকার পাটের বস্তার ব্যবহার বাড়বে দেশেই। এক গবেষণায় দেখা গেছে, এক হেক্টর জমিতে যে পরিমাণ পাট উৎপাদন হয়, তা ১০০ দিনে প্রকৃতি থেকে ১৫ টন কার্বন-ডাই-অক্সাইড শোষণ করে এবং ১১ টন অক্সিজেন প্রকৃতিকে দান করে। যা জলবায়ু পরিবর্তন ও বৈশ্বিক উষ্ণায়নের মতো কঠিন সময়ে প্রকৃতির ভারসাম্য রক্ষায় এক আশীর্বাদস্বরূপ।

পাট শিল্পের এই অপার সম্ভাবনার দিকে লক্ষ্য রেখে পরিপূর্ণ আধুনিকায়ন করে ক্রমানুসারে পাটকলগুলো আবার পুর্নোদ্দমে চালু করাই হবে জাতীয় স্বার্থে বুদ্ধিমানের কাজ। যদিও রাষ্ট্রায়ত্ত সব পাটকল যৌথ (পিপিপি) বা বেসরকারি অংশীদারিত্বে ছেড়ে দেয়ার কথা ভাবছে সরকার। বিগত প্রত্যেক বছরে সরকারি পাটকলগুলোতে সরকারকে যে পরিমাণ ক্ষতিপূরণ দিতে হয়েছে, তার কিয়দংশ ব্যয় করে কারখানাগুলো আধুনিকায়ন করা সম্ভব। কলগুলোর পুরনো সব যন্ত্রপাতি বদলে ফেলে সেখানে নতুন, উন্নত ও আধুনিক যন্ত্রপাতি স্থাপনের পরিকল্পনা সময়ের দাবি। তবে সেগুলো ব্যবহারে দক্ষ অভিজ্ঞতাসম্পন্ন শ্রমিক নিয়োগ করতে হবে। সে ক্ষেত্রে আমাদের দেশের দক্ষ গ্র্যাজুয়েট বেকারদের জন্য নতুন কর্মসংস্থান তৈরি হবে। যার ফলে কম সময়ে ও কমসংখ্যক শ্রমিক দিয়ে কয়েক গুণ বেশি পণ্য উৎপাদন সম্ভব হবে। আধুনিক যন্ত্রপাতি ব্যবহার করে পাটপণ্যের বহুমুখীকরণ করা সম্ভব হবে।

এখন আমরা প্রতি টন কাঁচা পাট রফতানি করে ৫০০-৬০০ ডলার পাই। কিন্তু মিলগুলো আধুনিকায়ন করার পর সেখানে পাটের শাড়ি, ফ্যাব্রিকস, কভার ইত্যাদি পণ্য তৈরি করা যাবে। এর মাধ্যমে প্রতি টন পাট থেকে ১০ হাজার ডলারের পণ্য উৎপাদন করা সম্ভব হবে। এতে আমরা বৈশ্বিক বাজারের চাহিদা অনুযায়ী পণ্য উৎপাদন ও জোগান দিতে সক্ষম হবো। তবে সব প্রচেষ্টার সফলতা পেতে সুষ্ঠু কর্মপরিকল্পনা তথা দক্ষ ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করতে হবে। বিজেএমসি, ট্রেড ইউনিয়নগুলোর দুর্নীতি দমন করতে হবে। দক্ষ ও অভিজ্ঞতাসম্পন্ন ব্যবস্থাপক সরকারি-বেসরকারি যৌথ উদ্যোগে সুনির্ধারিত দাম নিশ্চিত করে বৈশ্বিক বাজারে পণ্য সরবরাহ করবে।

পাটজাত পণ্য উৎপাদন ও রফতানিই আমাদের মূল লক্ষ্য নয়, বরং নিজেদের পাটপণ্যের ব্যবহারে সবাইকে আগ্রহী হতে হবে। তাহলে দেশেই পাটের একটি বড় বাজার তৈরি হবে। সরকারি-বেসরকারি পাটকলগুলোর পাশাপাশি পাটের বাজারে নতুন উদ্যোক্তাদের সুযোগ করে দিতে হবে। এ জন্য সরকারিভাবে বিভিন্ন সুবিধা প্রদান করা যেতে পারে। তৈরী পোশাক শিল্প থেকে বাংলাদেশ সর্বোচ্চ পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা আয় করে। যদিও এই শিল্পের যাবতীয় সব কাঁচামাল আমদানি করতে হয়। আমরা শুধু ফ্যাব্রিকসকে প্রসেসিং করে পোশাক তৈরি করি ও রফতানি করে ব্যাপক লাভবান হচ্ছি। কিন্তু যেই সোনালি কাঁচামাল, আমরা নিজেরাই ব্যাপক হারে উৎপাদন করি, সেটির সদ্ব্যবহার নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হচ্ছি। পাট প্রসেসিং করে রফতানি নিশ্চিত করতে পারলে তা পোশাক শিল্পের থেকেও দ্বিগুণ লাভজনক হবে। যেভাবে লাভবান হচ্ছে ভারত।

পৃথিবী এখন প্রকৃতি ও পরিবেশকে সংরক্ষণ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। সুতরাং পাটশিল্পে সম্ভাবনার আলো ছড়িয়ে পড়েছে বিশ্বে। ঠিক এই রকম বৈশ্বিক বাস্তবতায় দাঁড়িয়ে আমাদের পাটশিল্পের সমস্যা ও সম্ভাবনা খুঁজতে হবে। পরিবেশবান্ধব পাটকে বিশ্বময় ছড়িয়ে দেয়ার প্রস্তুতি গ্রহণ করতে হবে। নিজেদের উন্নতি অন্যদের হাতে তুলে না দিয়ে, কাঁচা পাট রফতানির পরিমাণ কমিয়ে এনে নিজেরা প্রক্রিয়াজাতকরণের উদ্যোগ নিতে হবে। তাই পাটকলগুলো ক্রমে খুলে দিয়ে, পাটশিল্পের সব প্রতিবন্ধকতা চিহ্নিত করে সেগুলো বন্ধের ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। এখনি সময় নিজেদের কাঁচামাল ব্যবহারে সমৃদ্ধি অর্জন করার, উন্নত দেশ গড়ার।

নওরিন তামান্না, শিক্ষার্থী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।



আরো সংবাদ