ইউরোপজুড়ে চলমান তীব্র তাপপ্রবাহ ফ্রান্সে ভয়াবহ রূপ ধারণ করেছে। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে তাপমাত্রা ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াস অতিক্রম করায় জনজীবন কার্যত স্থবির হয়ে পড়েছে। প্রচণ্ড গরমে অসুস্থ হয়ে পড়ছেন হাজার হাজার মানুষ। স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থার ওপর চাপ বাড়ছে প্রতিদিন।
এদিকে তাপপ্রবাহ-সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন দুর্ঘটনা ও স্বাস্থ্য জটিলতায় ইতোমধ্যে অর্ধশতাধিক মানুষের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। পরিস্থিতি মোকাবিলায় জরুরি সতর্কতা জারি করেছে ফরাসি সরকার।
ফরাসি আবহাওয়া অধিদফতর মেতেও-ফ্রঁস জানিয়েছে, চলতি জুন মাসে দেশের বহু অঞ্চলে কয়েক দশকের মধ্যে সর্বোচ্চ তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে। দক্ষিণ, মধ্য ও পশ্চিমাঞ্চলের বিস্তীর্ণ এলাকায় দিনের তাপমাত্রা ৪০ থেকে ৪৪ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে ওঠানামা করছে। অনেক স্থানে রাতের তাপমাত্রাও ২৫ ডিগ্রির নিচে নামছে না। ফলে মানুষের শরীর পর্যাপ্ত বিশ্রাম ও স্বাভাবিক তাপমাত্রায় ফিরে আসার সুযোগ পাচ্ছে না।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই ধরনের ‘ট্রপিক্যাল নাইট’ বা অস্বাভাবিক উষ্ণ রাত মানবস্বাস্থ্যের জন্য অত্যন্ত বিপজ্জনক। এতে হৃদরোগ, শ্বাসকষ্ট ও কিডনি জটিলতার ঝুঁকি বহুগুণ বেড়ে যায়। বয়স্ক মানুষ, শিশু, গর্ভবতী নারী এবং দীর্ঘমেয়াদি রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিরা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছেন।
তীব্র গরমের কারণে হাসপাতালগুলোতে রোগীর চাপ অস্বাভাবিকভাবে বেড়েছে। প্যারিস, মার্সেই, লিয়োঁ, তুলুজ এবং বোর্দোর হাসপাতালগুলোতে হিটস্ট্রোক, পানিশূন্যতা ও শ্বাসপ্রশ্বাসজনিত সমস্যায় আক্রান্ত রোগীদের জন্য অতিরিক্ত শয্যার ব্যবস্থা করতে হয়েছে। জরুরি চিকিৎসা বিভাগগুলোতে দিনরাত কাজ করছেন চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীরা।
গরমের কারণে মৃত্যুর ঘটনাগুলোও উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে।
আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অধিকাংশ মৃত্যু ঘটেছে প্রচণ্ড তাপ থেকে বাঁচতে গিয়ে নদী, খাল, হ্রদ ও অনিরাপদ জলাশয়ে সাঁতার কাটতে নেমে। অনেকেই স্রোতের টানে বা গভীর পানিতে ডুবে প্রাণ হারিয়েছেন।
এছাড়া কয়েকজন বয়স্ক ব্যক্তির মৃত্যু হয়েছে নিজ নিজ বাসভবনে অতিরিক্ত গরমে অসুস্থ হয়ে পড়ার পর। দক্ষিণ-পূর্ব ফ্রান্সে একটি গাড়ির ভেতরে দুই শিশুর মৃত্যুর ঘটনাও দেশজুড়ে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। প্রাথমিক তদন্তে ধারণা করা হচ্ছে, অতিরিক্ত তাপমাত্রাই ওই মৃত্যুর অন্যতম কারণ।
পরিস্থিতির প্রভাব পড়েছে দেশের পর্যটন খাতেও। প্রতি বছর লাখো পর্যটকের পদচারণায় মুখর থাকা ফ্রান্সের বেশ কয়েকটি বিখ্যাত দর্শনীয় স্থান তাদের কার্যক্রম সীমিত করতে বাধ্য হয়েছে। তুলুজের ন্যাচারাল হিস্ট্রি মিউজিয়াম শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা বিকল হয়ে যাওয়ায় সাময়িকভাবে বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে।
কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, ভবনের অভ্যন্তরে তাপমাত্রা নিরাপদ সীমা অতিক্রম করায় দর্শনার্থী ও কর্মীদের নিরাপত্তার স্বার্থে এ সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে।
বিশ্বখ্যাত লুভ্র মিউজিয়াম ও আইফেল টাওয়ারেও দর্শনার্থীদের জন্য বিশেষ নির্দেশনা জারি করা হয়েছে। গরমের তীব্রতা বিবেচনায় কিছু সময়ের জন্য প্রবেশ সীমিত করা হচ্ছে এবং খোলার সময়সূচিতে পরিবর্তন আনা হয়েছে।
পর্যটকদের ছাতা, টুপি ও পর্যাপ্ত পানি সাথে রাখার পরামর্শ দেয়া হচ্ছে। অনেক পর্যটক বাধ্য হয়ে দিনের পরিবর্তে ভোর কিংবা সন্ধ্যায় দর্শনীয় স্থানগুলো ঘুরে দেখছেন।
তাপপ্রবাহের নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে শিক্ষা ও পরিবহন খাতেও। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের শত শত স্কুলে ক্লাসের সময় কমিয়ে আনা হয়েছে। কোথাও কোথাও স্কুল সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হয়েছে। অতিরিক্ত তাপমাত্রার কারণে রেললাইন প্রসারিত হওয়ার ঝুঁকি থাকায় কিছু রুটে ট্রেনের গতি কমিয়ে দেয়া হয়েছে। সড়ক ও বিদ্যুৎ অবকাঠামোর ওপরও বাড়তি চাপ তৈরি হয়েছে।
কৃষি খাতেও দেখা দিয়েছে উদ্বেগ। দীর্ঘ সময় ধরে বৃষ্টিপাত না হওয়া এবং অতিরিক্ত তাপমাত্রার কারণে ফসলের উৎপাদন কমে যাওয়ার আশঙ্কা করছেন কৃষকরা। আঙ্গুর, ভুট্টা ও বিভিন্ন ফলের বাগান ক্ষতির মুখে পড়তে পারে বলে সতর্ক করেছেন কৃষি বিশেষজ্ঞরা। অনেক অঞ্চলে বনাঞ্চলে দাবানলের ঝুঁকিও বেড়ে গেছে।
জলবায়ু বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ইউরোপে ক্রমবর্ধমান তাপপ্রবাহ জলবায়ু পরিবর্তনের সরাসরি প্রভাব। গত দুই দশকে ফ্রান্সে তাপপ্রবাহের সংখ্যা এবং স্থায়িত্ব উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।
২০০৩ সালের ভয়াবহ তাপপ্রবাহে দেশটিতে প্রায় ১৫ হাজার মানুষের মৃত্যু হয়েছিল। বর্তমান পরিস্থিতি সেই ট্র্যাজেডির স্মৃতি আবারও সামনে নিয়ে এসেছে।
ফরাসি সরকার দেশজুড়ে সতর্কতা জোরদার করেছে। স্থানীয় প্রশাসনকে জরুরি আশ্রয়কেন্দ্র প্রস্তুত রাখতে বলা হয়েছে। নাগরিকদের দিনের সবচেয়ে গরম সময়ে বাইরে না যাওয়া, পর্যাপ্ত পানি পান করা, একা বসবাসকারী বয়স্কদের খোঁজ নেয়া এবং প্রয়োজন ছাড়া শারীরিক পরিশ্রম না করার পরামর্শ দেয়া হয়েছে।
আবহাওয়াবিদদের পূর্বাভাস অনুযায়ী, আগামী কয়েক দিন তাপপ্রবাহ অব্যাহত থাকতে পারে। ফলে ফ্রান্সের লাখো মানুষ এখনও চরম গরমের সাথে লড়াই করছেন।
বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, পরিস্থিতির দ্রুত উন্নতি না হলে প্রাণহানি ও স্বাস্থ্যঝুঁকি আরো বাড়তে পারে।



