ফ্রান্স, ইতালি ও স্পেনে ভয়াবহ দাবানল, ৩ দমকলকর্মীর প্রাণহানি

ইউরোপীয় বন দাবানল তথ্যমতে, ২০২৫ সালে স্পেনে দাবানলে ৩ লাখ ৯৩ হাজার হেক্টরের বেশি এলাকা পুড়ে গেছে। দেশটির সাম্প্রতিক ইতিহাসে এটিই সর্বোচ্চ ক্ষয়ক্ষতি।

নয়া দিগন্ত অনলাইন
প্রতীকী ছবি

ইতালির সিসিলি, ফ্রান্সের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চল এবং স্পেনের মধ্যাঞ্চলে বুধবার ভয়াবহ দাবানল ছড়িয়ে পড়ায় তিন দমকলকর্মীর মৃত্যু হয়েছে। পাশাপাশি কয়েক হাজার মানুষকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেয়া হয়েছে।

ইতালির দক্ষিণাঞ্চলীয় সিসিলি দ্বীপে তাপমাত্রা ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াস ছাড়িয়ে যায়। গরম বাতাসের ঝাপটায় আগুন আরো ছড়িয়ে পড়ে। কয়েক দিন ধরেই সেখানে দাবানল জ্বলছে। খবর বার্তা সংস্থা এএফপির।

সিসিলি অঞ্চলের প্রধান রেনাতো স্কিফানি বলেন, আগুন নিয়ন্ত্রণে প্রায় ৬ হাজার দমকলকর্মী, বনরক্ষী ও সিভিল প্রোটেকশনের সদস্য কাজ করছেন। তাদের সহায়তায় পানি নিক্ষেপকারী বিমানও ব্যবহার করা হচ্ছে। তিনি জানান, এখনো ৫০টি স্থানে দাবানল জ্বলছে।

বিজ্ঞানীরা একমত যে, জীবাশ্ম জ্বালানি পোড়ানোর ফলে সৃষ্ট জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে দাবানল ও তাপপ্রবাহের মতো চরম আবহাওয়ার ঘটনা আরো ঘন ঘন এবং আরো ভয়াবহ হয়ে উঠছে।

ইতালির স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মাত্তেও পিয়ানতেদোসি বলেন, আগুন নেভানোর সময় অসুস্থ হয়ে একজন দমকলকর্মীর মৃত্যু হয়েছে।

ইতালির সিভিল প্রোটেকশন সংস্থার একজন মুখপাত্র এএফপিকে বলেন, সিসিলির পরিস্থিতি ‘গুরুতর’। অত্যধিক তাপমাত্রা ও অত্যন্ত শুষ্ক মাটির কারণে আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে।

প্রতিবেশী কালাব্রিয়া অঞ্চলেও ১৬০টির বেশি দাবানলের ঘটনা ঘটেছে। স্থানীয় সিভিল প্রোটেকশনের প্রধান বলেন, এসব আগুন ইচ্ছাকৃতভাবে লাগানো হয়েছে। তার অভিযোগ, ‘দুর্বৃত্তরা’ আগুন ছড়িয়ে দিতে দাহ্য তরলে ভেজানো কাপড় ভবঘুরে বিড়ালের লেজে বেঁধে দিয়েছে।

ফ্রান্সে মঙ্গলবার বোর্দো বিমানবন্দরের কাছে দাবানল নিয়ন্ত্রণে কাজ করার সময় দুই দমকলকর্মীর মৃত্যু হয়।

ফ্রান্সের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী লরাঁ নুনেজ বুধবার নিহত দমকলকর্মীদের পরিবারের সাথে সাক্ষাৎ করেন। এ সময় শ্রমিক সংগঠনগুলো অভিযোগ করে, দমকলকর্মীরা চরম ক্লান্তি এবং প্রয়োজনীয় সম্পদের ঘাটতির মধ্যে কাজ করছেন।

দেশটির দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে দুটি বড় দাবানলে কয়েক হাজার মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছেন। এর মধ্যে বোর্দোর কাছে মনোরম আরকাশঁ বেসিন এলাকায় একটি দাবানলে এক হাজার ৪০০ হেক্টরের বেশি এলাকা পুড়ে গেছে।

দমকল কর্মকর্তা ক্যাপ্টেন উইলফ্রিড স্নাইডার এএফপিকে বলেন, ‘আমরা অত্যন্ত ঘনভাবে দাঁড়িয়ে থাকা পাইনগাছে ভরা একটি বনের আগুনের সাথে লড়ছি।’ তিনি আগুনের তীব্রতাকে ‘বিরল’ বলে মন্তব্য করেন।

ল্য পোর্জের মেয়র মার্শাল জানিনেত্তি বলেন, বনপথ পরিষ্কারের কাজে ব্যবহৃত কোনো যন্ত্র থেকে আগুনের সূত্রপাত হয়ে থাকতে পারে। তবে বিষয়টি এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত হয়নি।

প্রশাসন জানায়, সতর্কতামূলক ব্যবস্থা হিসেবে ল্য পোর্জে প্রায় ৭০০ মানুষকে বাড়িঘর ছাড়তে হয়েছে। এছাড়া তিন হাজারের বেশি ক্যাম্পারকেও অন্যত্র সরিয়ে নেয়া হয়েছে।

দক্ষিণ ফ্রান্সের আরেকটি এলাকায় বনাচ্ছাদিত পাহাড়ে ছড়িয়ে পড়া একটি দাবানল বুধবার সকালেই নিয়ন্ত্রণে আনার চেষ্টা চলছিল বলে কর্মকর্তারা জানান। আগুনটি কয়েক শত মানুষকে বাড়িঘর ছাড়তে বাধ্য করেছে। এতে লন্ডনের হিথ্রো বিমানবন্দরের দ্বিগুণ আয়তনের এলাকা পুড়ে গেছে।

মঙ্গলবার ভার অঞ্চলে আগুনের সূত্রপাত হয়। এরপর তা অপ্রত্যাশিত দ্রুতগতিতে ছড়িয়ে পড়ে। এতে প্রায় ৪০০ মানুষকে সরিয়ে নিতে হয় এবং দুই হাজার ৫৫০ হেক্টর এলাকা পুড়ে যায়।

মার্সেই ও নিস শহরের মধ্যবর্তী ভূমধ্যসাগরীয় উপকূলীয় এ অঞ্চলে প্রায় ১ হাজার দমকলকর্মী এবং বিশেষায়িত পানি নিক্ষেপকারী বিমান আগুন নিয়ন্ত্রণে কাজ করছে।

মোট ৪ হাজার ৬০০ মানুষকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেয়া হয়েছে। জিরোন্দ অঞ্চলের প্রিফেক্ট সোফি ব্রোকা আরো কয়েক শ’ মানুষকে এলাকা ছাড়ার আহ্বান জানিয়েছেন।

স্পেনে মাদ্রিদের দক্ষিণে টলেডো শহরের আশপাশের কয়েকটি এলাকায় বুধবার বড় ধরনের দাবানল ছড়িয়ে পড়লে সেখানকার বাসিন্দাদের সরে যেতে নির্দেশ দেয়া হয়।

সিভিল গার্ড জানিয়েছে, দাবানলের কারণে সংশ্লিষ্ট এলাকার বাসিন্দাদের মোবাইল ফোনে জরুরি সতর্কবার্তা পাঠানো হয়েছে। কয়েকটি প্রধান সড়কও বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। টলেডো রাজধানী মাদ্রিদ থেকে ৭৫ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত।

নতুন এ দাবানল ছড়িয়ে পড়ার সময় মাদ্রিদের প্রায় ১০০ কিলোমিটার উত্তরে আরেকটি ভয়াবহ দাবানল নিয়ন্ত্রণে কয়েক শত দমকলকর্মী কাজ করছিলেন। সেখানে ইতোমধ্যে ৩২ হাজার হেক্টর এলাকা পুড়ে গেছে।

ইউরোপীয় বন দাবানল তথ্যমতে, ২০২৫ সালে স্পেনে দাবানলে ৩ লাখ ৯৩ হাজার হেক্টরের বেশি এলাকা পুড়ে গেছে। দেশটির সাম্প্রতিক ইতিহাসে এটিই সর্বোচ্চ ক্ষয়ক্ষতি।