নেপালে গত সপ্তাহের ভয়াবহ বন্যায় এখনো যারা নিখোঁজ রয়েছেন, তাদের আর জীবীত উদ্ধারের আশা পরিত্যাগ করেছেন স্বজনরা। এর পরিপ্রেক্ষিতে প্রতীকী শেষকৃত্য পালন করছেন শোকাস্তব্ধ নেপালবাসী।
নেপালের সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত জেলাগুলোর একটি নুয়াকোটে নিখোঁজ স্বজনদের মৃত ধরে নিয়ে কয়েকটি পরিবার এ ধরনের প্রতীকী শেষকৃত্য পালন করেছে। হিন্দু ধর্মীয় রীতিতে দাহ গুরুত্বপূর্ণ শেষকৃত্য। স্বজনের লাশ না পেলেও এই আনুষ্ঠানিকতা পালন কিছু পরিবারের জন্য আধ্যাত্মিক স্বস্তির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
নুয়াকোটের মুকুন্দ রিজাল জানান, তার কয়েকজন চাচাতো ভাই ও তাদের মেয়েদের এখনো সন্ধান পাওয়া যায়নি। এ কারণে পরিবার তাদের প্রতীকী শেষকৃত্য সম্পন্ন করেছে।
ত্রিশূলী নদীর তীরে এক পুরোহিত নিখোঁজ পরিবারের সদস্যদের প্রতীক হিসেবে খড় দিয়ে তৈরি অবয়ব তৈরি করেন। পরে সেগুলো ছোট ছোট কাঠের স্তূপ দিয়ে ঢেকে আগুন ধরিয়ে দেয়া হয়। প্রতীকী চিতাগুলোর চারপাশে হিন্দু দেবতাদের উদ্দেশ্যে বিভিন্ন সামগ্রী রাখা হয় এবং স্বজনরা শেষকৃত্যের আনুষ্ঠানিকতায় অংশ নেন।
নিখোঁজ পর্যটকদের কেউ কেউ যোগাযোগ করেছেন
এদিকে, আগে নিখোঁজ হিসেবে তালিকাভুক্ত কয়েকজন বিদেশী পর্যটক কর্তৃপক্ষের সাথে যোগাযোগ করেছেন বলে কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।
নেপাল পর্যটন বোর্ডের মুখপাত্র সুনীল শর্মা জানিয়েছেন, আগে নিখোঁজ হিসেবে তালিকাভুক্ত কমপক্ষে আরো পাঁচ পর্যটক সাম্প্রতিক দিনগুলোতে ই-মেইল বা ফোনে কর্তৃপক্ষের সাথে যোগাযোগ করেছেন।
দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, বন্যার পর ৩২৪ জন বিদেশী নাগরিককে উদ্ধার করা হয়েছে। তবে ৩৯টি দেশের আরো ৫৯০ জন এখনো নিখোঁজ রয়েছেন।
নেপালের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, ২৬ আগস্টের ভয়াবহ বন্যায় এ পর্যন্ত এক হাজার ২০৪ জন নিহত এবং চার হাজার ২০০ জনের বেশি নিখোঁজ রয়েছেন।
অস্ট্রেলিয়ার প্রধানমন্ত্রী অ্যান্থনি আলবানিজ গতকাল বুধবার জানান, দুর্যোগে নিখোঁজ অস্ট্রেলীয়দের সংখ্যা ৪৩ থেকে কমে ৩৮ জনে দাঁড়িয়েছে। রাতভর পাঁচজনকে নিরাপদ অবস্থায় শনাক্ত করা হয়েছে।
পালাউয়ে একটি আঞ্চলিক সম্মেলনে সাংবাদিকদের তিনি বলেন, ‘এই পুরো ট্র্যাজেডির মধ্যেও কিছু ইতিবাচক খবর পাওয়া যাচ্ছে। আজ আরো পাঁচ অস্ট্রেলীয়কে নিরাপদ বলে নিশ্চিত করা হয়েছে। অবশ্যই আমরা আরো ইতিবাচক খবরের আশা করছি এবং কর্তৃপক্ষের সাথে সমন্বয় করে আমরা সবকিছু করার চেষ্টা করছি।’
বৃহস্পতিবার অস্ট্রেলিয়া সরকার জানিয়েছিল, অনুসন্ধান ও উদ্ধার কার্যক্রমে সহায়তার জন্য কয়েক দিনের মধ্যে ড্রোন পরিচালনাকারীদের একটি দল নেপালে পাঠানো হবে।
ধারণা করা হচ্ছে, হিমালয়ে একটি হিমবাহ ধসে পাথর, বরফ ও গলিত পানি নিচের উপত্যকায় নেমে আসার পর এই দুর্যোগের সূত্রপাত হয়। এতে নিচের দিকে নদীগুলোর পানি দ্রুত বেড়ে যায়। বন্যার পানির তোড়ে ঘরবাড়ি, ভবন, সড়ক ও সেতু ভেসে যায় এবং কাদা ও পাথরও নদীর স্রোতে নিচের দিকে চলে আসে।
এদিকে, নেপালের কর্তৃপক্ষ উদ্ধার হওয়া লাশগুলো শনাক্ত না হওয়া পর্যন্ত অস্থায়ী কবরে দাফন করছে। নিখোঁজ ব্যক্তিদের সাথে লাশ মিলিয়ে দেখতে ডিএনএ নমুনা সংরক্ষণ, মুখের বৈশিষ্ট্যের ছবি তোলা এবং অন্যান্য শনাক্তকারী তথ্য নথিভুক্ত করা হচ্ছে। পরে লাশ শনাক্ত হলে পরিবারের কাছে তা হস্তান্তরের উদ্যোগ নেয়া হবে।
কাঠমান্ডুতে আশ্রয় নিচ্ছেন বন্যার্তরা
বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত অনেক মানুষ আশ্রয়ের জন্য নেপালের রাজধানী কাঠমান্ডুতে চলে আসছেন।
কাঠমান্ডু থেকে প্রায় ১১০ কিলোমিটার পশ্চিমে তিমুরে শহরের প্রায় ৪০০ বাসিন্দা বর্তমানে ইয়েলো গুম্বা মঠে আশ্রয় নিয়েছেন। স্থানীয় বাসিন্দা ও স্বজনরা এই আশ্রয়কেন্দ্রের ব্যবস্থা করেছেন। ব্যক্তি ও বিভিন্ন দাতব্য সংস্থার দেয়া ত্রাণসামগ্রীও সেখানে সরবরাহ করা হচ্ছে।
২১ বছর বয়সী রিয়া তামাংও তার ১০ মাসের শিশুকে নিয়ে ওই মঠে আশ্রয় নিয়েছেন। বন্যার পানি বাড়তে থাকায় তিনি বাড়ি থেকে পালিয়ে আসেন। দুর্যোগে তিনি তার দাদা-দাদিকে হারিয়েছেন।
রিয়া বলেন, ‘বাড়ি থেকে সবার শেষে আমি বের হয়েছিলাম। পালিয়ে আসাটা খুব কঠিন ছিল।’
চীনের সীমান্তবর্তী গিয়িরং শহরে রাঁধুনির কাজ করা তার স্বামীও বেঁচে গেছেন। বর্তমানে ভিডিও কলের মাধ্যমে তারা একে অপরের সাথে যোগাযোগ রাখছেন।
উদ্ধারকাজে চীনের সড়ক নির্মাণ
চীনের অংশে নেপাল সীমান্তের গিয়িরং বন্দরে দুর্যোগকবলিত এলাকায় পৌঁছানোর জন্য উদ্ধারকারী দল একটি অস্থায়ী সড়ক নির্মাণের কাজ শেষ করেছে বলে বুধবার দেশটির রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম সিসিটিভি জানিয়েছে।
বন্যায় সীমান্তের ক্রসিং কমপ্লেক্সটি ভেসে যাওয়ার পর সেখানে ভারী যন্ত্রপাতি নিয়ে অনুসন্ধান চালানোর জন্য প্রবেশপথ তৈরি করা হয়েছে। ক্রসিংয়ের দিকে যাওয়া সড়কটি পানির নিচে তলিয়ে গিয়ে কাদা ও পাথরে চাপা পড়েছিল।
চীনের রাষ্ট্রীয় বার্তাসংস্থা সিনহুয়ার তথ্য অনুযায়ী, দেশটিতে কমপক্ষে ২১ জন নিহত এবং ৫৪১ জন এখনো নিখোঁজ রয়েছেন।
সূত্র : ইউএনবি



