নেপালে যেভাবে ‘কৃত্রিম লেক’ ভেঙে নেমে এলো মৃত্যুর স্রোত

নেপালের বন্যা পূর্বাভাস বিভাগের প্রধান বিনোদ পারাজুলি বলেন, বরফধস ও ভূমিধসের ফলে নদীর প্রবাহ আটকে গিয়ে সেখানে একটি অস্থায়ী লেক তৈরি হয়। পরে সেটি ভেঙে পড়লে বিপুল পরিমাণ পানি ও ধ্বংসাবশেষ নিচের দিকে নেমে আসে।

নয়া দিগন্ত অনলাইন

নেপাল-তিব্বত সীমান্তবর্তী এলাকায় বুধবারের ভয়াবহ আকস্মিক বন্যায় শতাধিক মানুষের মৃত্যু হয়েছে। এখনো কয়েক শ মানুষ নিখোঁজ রয়েছেন। চীন-নেপাল সীমান্তের একটি নদীতে বরফধস ও ভূমিধসে বিপুল পরিমাণ ধ্বংসাবশেষ জমে পানি প্রবাহ বন্ধ হয়ে সাময়িক একটি কৃত্রিম লেক তৈরি হয়েছিল। পরে সেই বাধ ভেঙে জমে থাকা পানি, কাদা ও ধ্বংসাবশেষ একসঙ্গে তীব্র স্রোতে নিচের দিকে নেমে আসে। এতে মুহূর্তের মধ্যে তলিয়ে যায় বিস্তীর্ণ এলাকা।

নেপালের হাইড্রোলজি ও মেটেওরোলজি বিভাগের কর্মকর্তাদের বরাত দিয়ে কাঠমান্ডু পোস্ট জানিয়েছে, স্থানীয় মিতেরি সেতু থেকে প্রায় ২০ কিলোমিটার উজানে নদীতে বিপুল পরিমাণ ধ্বংসাবশেষ জমেছিল। চীনের সরবরাহ করা স্যাটেলাইট ছবিতে বিষয়টি ধরা পড়ে।

নেপালের বন্যা পূর্বাভাস বিভাগের প্রধান বিনোদ পারাজুলি বলেন, বরফধস ও ভূমিধসের ফলে নদীর প্রবাহ আটকে গিয়ে সেখানে একটি অস্থায়ী লেক তৈরি হয়। পরে সেটি ভেঙে পড়লে বিপুল পরিমাণ পানি ও ধ্বংসাবশেষ নিচের দিকে নেমে আসে।

তিনি বলেন, অস্থায়ী লেক তৈরির আগে ও পরের স্যাটেলাইট ছবি বিশ্লেষণ করা হয়েছে। এতে বরফধস ও ভূমিধসের চিহ্ন দেখা গেছে। বরফ ও ধ্বংসাবশেষ মিলে সেখানে একটি প্রাকৃতিক বাঁধ তৈরি হয়েছিল।

বিনোদ পারাজুলি বলেন, শুধু স্বচ্ছ পানি প্রবাহিত হলে আকস্মিক বন্যাটি এতটা ধ্বংসাত্মক হতো না। উজানে বিপুল পরিমাণ ধ্বংসাবশেষ জমে থাকায় পানি নেমে আসার সময় সেগুলোও স্রোতের সঙ্গে ভেসে আসে। ফলে বন্যার ধ্বংসক্ষমতা বহুগুণ বেড়ে যায়।

এর আগে কাঠমান্ডু বিশ্ববিদ্যালয়ের এক অধ্যাপকও নদীতে বরফধসের কারণে পানি আটকে যাওয়ার কথা জানিয়েছিলেন। তাঁর ধারণা, তিব্বতে সংঘটিত ৪ দশমিক ৪ মাত্রার ভূমিকম্পের কারণে বরফের স্তর নড়ে গিয়ে আটকে থাকা পানি হঠাৎ নিচের দিকে নেমে আসতে পারে। তবে আকস্মিক বন্যার সঙ্গে ভূমিকম্পের সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে কি না, তা এখনো নিশ্চিত নয়।

১০৩ লাশ উদ্ধার, নিখোঁজ শত শত
ভয়াবহ বন্যার কয়েক ঘণ্টা পর নেপালে অন্তত ১০৩ জনের লাশ উদ্ধার করা হয়েছে বলে জানিয়েছে দেশটির পুলিশ। দুর্যোগের প্রায় আট ঘণ্টা পরও ৩৮৪ পর্যটকের কোনো খোঁজ পাওয়া যায়নি। নেপালের পর্যটন বোর্ড জানিয়েছে, নিখোঁজদের মধ্যে ২৯১ জন বিদেশী নাগরিক।

নিখোঁজদের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র, ভারত, অস্ট্রেলিয়া, মালয়েশিয়া ও যুক্তরাজ্যের নাগরিক রয়েছেন বলে জানিয়েছে পর্যটন বোর্ড।

চীনের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম সিসিটিভির তথ্য অনুযায়ী, তিব্বতের গিরংয়েও বন্যায় তিনজন নিহত এবং ২৬৫ জন নিখোঁজ রয়েছেন। নেপাল সীমান্তের তিব্বত বাণিজ্যকেন্দ্রে ভূমিধসে ব্যাপক হতাহতের ঘটনা ঘটেছে বলে জানিয়েছে চীনা কর্তৃপক্ষ। নিখোঁজদের উদ্ধারে ‘সর্বাত্মক’ অভিযান চালানোর নির্দেশ দিয়েছেন দেশটির প্রেসিডেন্ট সি চিন পিং।

নেপালের রাজু ভাদেল (৫৬) জানান, বুধবার সকালে তার ভগ্নিপতি ফোন করে জানান, পুরো বাড়ি বন্যার পানিতে ভেসে গেছে। পরিবারের তিন সদস্যকে উদ্ধার করা গেলেও তাঁর এক ভাই এখনো নিখোঁজ।

নেপাল পুলিশের প্রকাশিত ছবিতে নদীর তীব্র স্রোতে বাড়িঘর ভেসে যেতে দেখা গেছে। এএফপির ছবিতে কাদামাটির নিচে চাপা পড়া একটি বাড়ির শুধু ওপরের অংশ দৃশ্যমান ছিল।

উদ্ধার তৎপরতা জোরদার
দুর্যোগের পর নেপাল সেনাবাহিনী হেলিকপ্টার ও দুর্যোগ মোকাবিলা কর্মী মোতায়েন করেছে। নদীর তীরবর্তী এলাকার বাসিন্দাদের নিরাপদ স্থানে সরে যেতে সতর্ক করেছে পুলিশ। বেশ কয়েকটি মহাসড়কও বন্ধ করে দেয়া হয়েছে।

কাঠমান্ডুভিত্তিক ইন্টারন্যাশনাল সেন্টার ফর ইন্টিগ্রেটেড মাউন্টেন ডেভেলপমেন্টের (ইসিমোড) রিমোট সেন্সিং ও জিও ইনফরমেশন বিশ্লেষক সার্থক শ্রেষ্ঠ বলেন, প্রাথমিক মূল্যায়নে চীন সীমান্তে বড় কোনো অস্বাভাবিকতা ধরা পড়েনি। তাঁদের ধারণা, নেপাল অংশে পাথুরে বরফধসের কারণে লেন্দে নদীর গতিপথ আটকে গিয়ে ধারাবাহিকভাবে তীব্র বন্যার সৃষ্টি হয়েছে।

বন্যায় নেপালের বিদ্যুৎ অবকাঠামোও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। দেশটির বিদ্যুৎ কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, জলবিদ্যুৎ ও সৌরবিদ্যুৎ মিলিয়ে প্রায় ৪৩০ মেগাওয়াট উৎপাদন সক্ষমতা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এতে বিদ্যুৎ উৎপাদন, সঞ্চালন ও বিতরণে বিঘ্ন ঘটছে।

আবারো বন্যা ও ভূমিধসের শঙ্কা
দুর্যোগের পর নতুন করে বন্যা ও ভূমিধসের আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। ইসিমোডের জলবায়ু ও পরিবেশ ঝুঁকি বিভাগের প্রধান চিয়াংগং ঝাং বলেন, নেপাল-চীন সীমান্তের নদীর উজানে এখনো প্রতিবন্ধকতা তৈরি হয়ে রয়েছে। ফলে যেকোনো সময় দ্বিতীয় দফায় বন্যা দেখা দিতে পারে।

চীনের রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম সিসিটিভি জানিয়েছে, নেপাল অংশের ভূমিধসের কারণে তিব্বতের জিরং বন্দরে ব্যাপক হতাহত ও নিখোঁজের ঘটনা ঘটেছে। প্রকাশিত ভিডিওতে তীব্র স্রোতের সঙ্গে গাছের ডালপালা ও ধ্বংসাবশেষ ভেসে আসতে এবং সড়ক পানিতে ডুবে যেতে দেখা গেছে।

তিব্বতের শিগাতসের ট্রাফিক কর্তৃপক্ষও জানিয়েছে, ওই এলাকার সড়কগুলো ভূমিধসের ঝুঁকিতে রয়েছে এবং চলাচলের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। বার্তা সংস্থা সিনহুয়ার তথ্য অনুযায়ী, গত বছরের জুলাইয়েও জিরং বন্দরের কাছে ভূমিধসে ১৭ জন নিখোঁজ হয়েছিলেন।

জুন থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত দক্ষিণ এশিয়ায় বর্ষা মৌসুমে প্রায়ই বন্যা ও ভূমিধসের ঘটনা ঘটে। বিজ্ঞানীরা বলছেন, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে এ অঞ্চলে চরম আবহাওয়ার প্রকোপ ও তীব্রতা বাড়ছে।

তবে এবারের দুর্যোগের তাৎক্ষণিক কারণ হিসেবে বরফধস, ভূমিধস ও নদীর প্রবাহ আটকে কৃত্রিম জলাধার তৈরির বিষয়টিই এখন পর্যন্ত সবচেয়ে জোরালোভাবে সামনে এসেছে। পাশাপাশি উজানে আরও কোনো বাধা তৈরি হয়েছে কি না, তা পর্যবেক্ষণ করছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।

সূত্র : কাঠমান্ডু পোস্ট, বিবিসি, রয়টার্স, সিনহুয়া