নেপাল ও চীনের তিব্বতের সীমান্তবর্তী এলাকায় ভয়াবহ বন্যায় নিখোঁজ মানুষের সংখ্যা রোববার (৩০ আগস্ট) তিন হাজার ৪৪ জনে পৌঁছেছে। এদিকে, উদ্ধারকারীরা বেঁচে থাকা ব্যক্তিদের সন্ধানে হাঁটুসমান ও গভীর কাদার মধ্যে তল্লাশি চালিয়ে যাচ্ছেন।
গত বুধবারে হিমালয় অঞ্চলে সুনামির মতো আঘাত হানা এই ভয়াবহ দুর্যোগের পর সর্বশেষ পরিস্থিতি তুলে ধরা হলো:
মৃত ও নিখোঁজের সংখ্যা বাড়ছে
নেপাল এবং তিব্বতের দায়িত্বশীল চীনা কর্তৃপক্ষের দেয়া তথ্য অনুযায়ী, নিখোঁজ মানুষের মোট সংখ্যা তিন হাজার ৪৪। এখন পর্যন্ত ৭৩৪টি লাশ উদ্ধার করা হয়েছে।
নেপাল জানিয়েছে, দেশটিতে দুই হাজার ৪৯৮ জনের সাথে কোনো যোগাযোগ করা যাচ্ছে না। নিখোঁজদের মধ্যে শত শত বিদেশী নাগরিকও রয়েছেন।
চীনের স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল তিব্বতের বড় একটি অংশ বিদেশী সাংবাদিকদের জন্য কার্যত দুর্গম হয়ে থাকায় সেখানে দুর্যোগের প্রকৃত ভয়াবহতা স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি। বিশেষ করে একাধিক গ্রাম ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় সেখানে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ নিয়ে পূর্ণাঙ্গ তথ্য পাওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে।
চীনের রাষ্ট্রীয় বার্তাসংস্থা সিনহুয়া জানিয়েছে, তিব্বতে ৫৪৬ জন নিখোঁজ এবং ১৬ জন নিহত হয়েছেন।
সুড়ঙ্গে আটকা ১০০ জনের বেশি
নেপালের সেনাবাহিনীর উদ্ধারকারী দল ‘অত্যন্ত কঠিন’ পরিস্থিতির মধ্যে একাধিক পানিবিদ্যুৎ প্রকল্পের সুড়ঙ্গে আটকা পড়া ১০০ জনের বেশি মানুষকে উদ্ধারে কাজ করছে।
বরফ ও পাথর মিশ্রিত ভয়াবহ পানির স্রোত যেসব নদী দিয়ে নেমে আসে, সেসব নদীর ওপর থাকা পানিবিদ্যুৎ প্রকল্পে কর্মরত ৯৩৩ জন নিখোঁজ শ্রমিকের মধ্যে সুড়ঙ্গে আটকে পড়া এসব মানুষও রয়েছেন।
এ ধরনের উদ্ধার অভিযানে ব্যাপক অভিজ্ঞতা থাকা ভারত ১১ সদস্যের একটি বিশেষায়িত উদ্ধারকারী দল পাঠিয়েছে। চীনও সহায়তার জন্য নয় সদস্যের একটি সুড়ঙ্গ উদ্ধারকারী দল পাঠিয়েছে।
পুনর্গঠনে ‘কয়েক বিলিয়ন ডলার’ লাগতে পারে
নেপালের পররাষ্ট্রমন্ত্রী শিসির খানাল জানিয়েছেন, দুর্যোগের পর দেশের পুনর্গঠনে ‘কয়েক বিলিয়ন ডলার’ পর্যন্ত ব্যয় হতে পারে।
তিনি বলেন, ‘আমরা ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ ও প্রয়োজনীয়তা নিয়ে গবেষণা করব। এরপর পরিকল্পনা নেয়া হবে। তবে এরই মধ্যে আমি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে সহায়তার আহ্বান জানাচ্ছি।’
উদ্ধারকেন্দ্রে স্বজনদের ভিড়
নেপালের বিদুর শহরের একটি সেনাঘাঁটিতে স্বজনদের ভিড় দেখা গেছে। এটি উদ্ধার কার্যক্রমের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। সেখানে দেয়ালে উদ্ধার হওয়া ব্যক্তিদের নামের তালিকা টাঙিয়ে দেয়া হয়েছে।
স্বজনদের তালিকায় নিজের ছেলের নাম খুঁজছিলেন কালকা শারদা।
তিনি বলেন, ‘আমি আমার ছেলেকে খুঁজতে এখানে এসেছি। সে পানিবিদ্যুৎ কেন্দ্রে শ্রমিক হিসেবে কাজ করত। কিন্তু তালিকায় তার নাম খুঁজে পাচ্ছি না। কর্তৃপক্ষও কিছু বলছে না।’
হিমবাহ পর্যবেক্ষণ বাড়াচ্ছে ভারত
মারাত্মক এই বন্যা হিমবাহ ভেঙে পড়ার কারণে সৃষ্টি হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এ ঘটনার কয়েক দিন পর চীন ও নেপাল সীমান্তবর্তী হিমালয় অঞ্চলে নজরদারি বাড়িয়েছে ভারত।
ভারতের হিমালয়ঘেঁষা উত্তরাখণ্ড রাজ্যের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনামন্ত্রী মদন কৌশিক বলেন, ‘নেপালের সাথে আমাদের সীমান্ত রয়েছে। প্রতিবেশী দেশ হিসেবে এবং একই ধরনের ভৌগোলিক পরিস্থিতির কারণে আমরা ওই অঞ্চলের সব হিমবাহ ও পরিচিত হিমবাহ-হ্রদ পর্যবেক্ষণের জন্য আমাদের বিভাগকে নির্দেশ দিয়েছি।’
আন্তর্জাতিক সহায়তার প্রস্তাব
রেড ক্রসের হিসাবে জানা গেছে, নেপালে এই দুর্যোগে ৯৩ হাজার মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
শুক্রবার নেপাল আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে আর্থিক সহায়তার পাশাপাশি বিশেষায়িত উদ্ধার সরঞ্জাম ও জনবল পাঠানোর আহ্বান জানিয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে ভারী মালামাল বহনে সক্ষম ড্রোন, ডিএনএ পরীক্ষার কিট এবং লাশ সংরক্ষণের জন্য হিমায়িত রাখার ইউনিট।
এখন পর্যন্ত কানাডা ৫০ লাখ কানাডীয় ডলার (৩৬ লাখ মার্কিন ডলার) মানবিক সহায়তা দেয়ার ঘোষণা দিয়েছে। ইউরোপীয় ইউনিয়ন ২০ লাখ ইউরো (২৩ লাখ মার্কিন ডলার) দেয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।
চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংও শুক্রবার নেপালকে সহায়তার প্রস্তাব দিয়েছেন।
যুক্তরাষ্ট্র শনিবার জানিয়েছে, তারা নেপালকে ৩৬ লাখ মার্কিন ডলার মানবিক সহায়তা দেবে।
মার্কিন পররাষ্ট্র দফতর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেয়া এক পোস্টে জানিয়েছে, ‘জীবন রক্ষাকারী মানবিক সহায়তা হিসেবে ৩৬ লাখ ডলারের বেশি অর্থ দেয়ার মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র নেপালের জনগণের পাশে রয়েছে। এর মধ্যে বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত সর্বোচ্চ ১০ হাজার পরিবারকে তিন মাস পর্যন্ত জরুরি খাদ্য সহায়তা দেয়ার অর্থও রয়েছে।’
সূত্র : বাসস



