আগামী ২৭ অক্টোবরের তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ সাধারণ নির্বাচনের আগে ইসরাইলের সাবেক সেনাপ্রধান গাদি আইজেনকোট প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে উঠে এসেছেন।
২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের হামলার পর সৃষ্ট সংকটের প্রেক্ষাপটে নেতানিয়াহুর নেতৃত্বের মূল্যায়নের নির্বাচন হিসেবেই এবারের ভোটকে ব্যাপকভাবে দেখা হচ্ছে। এমন এক গুরুত্বপূর্ণ সময়ে আইজেনকোটের উত্থান ঘটেছে।
সম্প্রতি প্রকাশিত চ্যানেল-১২-এর এক জনমত জরিপে দেখা গেছে, আইজেনকোটের নতুন দল ‘ইয়াশার’ ১২০ সদস্যের নেসেটে নেতানিয়াহুর লিকুদ পার্টির চেয়ে এগিয়ে রয়েছে। জরিপে ইয়াশারের জন্য ২৩টি এবং লিকুদের জন্য ২২টি আসনের পূর্বাভাস দেয়া হয়েছে।
একই জরিপে ৬৬ বছর বয়সী আইজেনকটকে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে সবচেয়ে উপযুক্ত মনে করেছেন ৪৩ শতাংশ উত্তরদাতা। নেতানিয়াহুর পক্ষে মত দিয়েছেন ৩৪ শতাংশ।
৭ অক্টোবরের হামলার পর ভবিষ্যৎ ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার দাবি অপ্রাসঙ্গিক বলে উড়িয়ে দেয়া আইজেনকোট লেবাননে ইসরাইলের অসম মাত্রার সামরিক জবাব দেওয়ার কৌশলেরও অন্যতম প্রবর্তক।
তিনি ১০ দফা নির্বাচনী কর্মসূচি নিয়ে প্রচার চালাচ্ছেন। তার দাবি, এর মাধ্যমে ইসরাইলের নিরাপত্তা, জাতীয় ঐক্য এবং গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলো পুনর্গঠন করা সম্ভব হবে।
২০১৫ থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত ইসরাইলি সেনাবাহিনীর প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করা আইজেনকোট ‘দাহিয়া নীতি’ প্রণয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিলেন বলে কৃতিত্ব দেয়া হয়। লেবাননের রাজধানী বৈরুতের হিজবুল্লাহর শক্ত ঘাঁটি দাহিয়া উপশহরের নাম অনুসারে এ নীতির নামকরণ করা হয়।
হিজবুল্লাহ যোদ্ধা ও অস্ত্র বেসামরিক বাড়িঘর এবং অবকাঠামোর মধ্যে লুকিয়ে রাখে- এমন ধারণার ভিত্তিতে প্রণীত এ নীতিতে বলা হয়, ইসরাইলের জনবসতিতে দূরপাল্লার হামলা হলে শত্রুপক্ষের জনবসতিপূর্ণ এলাকায় ভয়াবহ পাল্টা হামলা চালানো হবে।
তার বেসামরিক কর্মসূচির শীর্ষে রয়েছে হামাসের ২০২৩ সালের সীমান্তপারের রক্তক্ষয়ী হামলার বিষয়ে রাষ্ট্রীয় তদন্ত কমিশন গঠনের প্রতিশ্রুতি। ওই হামলার জেরেই গাজা যুদ্ধ শুরু হয়, যা পরে আঞ্চলিক সংঘাতে রূপ নেয়। এ ঘটনায় গোয়েন্দা ব্যর্থতার অভিযোগ ওঠে নেতানিয়াহু সরকারের বিরুদ্ধে।
এ ধরনের তদন্ত কমিশন গঠনের দাবিতে কয়েক হাজার ইসরাইলি বহুবার বিক্ষোভ করেছেন। তবে নেতানিয়াহুর জোট সরকার এমন একটি কমিশনের প্রস্তাব দিয়েছে, যার সদস্যদের নির্বাচন করবেন রাজনীতিকরা।
আইজেনকট আরো প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, সেনাবাহিনীকে আরো শক্তিশালী করা এবং দেশের সীমান্ত সুরক্ষা জোরদারের লক্ষ্যে একটি ‘নতুন দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় নিরাপত্তা নীতি’ প্রণয়ন করবেন।
এছাড়া তিনি বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, আইনের শাসন, সংখ্যালঘুদের অধিকার এবং স্বাধীন গণমাধ্যম রক্ষার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন।
আইজেনকটের নির্বাচনী প্রচারে বলা হয়, ‘এসব পদক্ষেপের মাধ্যমে আমরা নিশ্চিত করব, ইসরাইল একটি ইহুদি, গণতান্ত্রিক, শক্তিশালী, উন্নত এবং নিরাপদ রাষ্ট্র হিসেবে গড়ে উঠবে।’
তবে ইসরাইল-ফিলিস্তিন সংঘাত নিয়ে তার সামগ্রিক অবস্থান এখনো পুরোপুরি স্পষ্ট নয়।
গাজায় যুদ্ধের সময় তার ছেলে গাল এবং দুই ভাতিজা নিহত হওয়ার পর আইজেনকোটের প্রতি জনসমর্থন তুলনামূলকভাবে বেড়েছে।
সর্বজনীন সামরিক সেবা চালুর দাবি তার নির্বাচনী প্রচারের অন্যতম প্রধান ইস্যুতে পরিণত হয়েছে। এ কারণে কট্টর রক্ষণশীল ইহুদি দলগুলোর সাথে নেতানিয়াহুর জোটের বিরোধিতার সামনের সারিতেও রয়েছেন তিনি।
জোটসঙ্গীদের সাথে নেতানিয়াহুর এমন একটি আইন এগিয়ে নেওয়ার সমালোচনা করেছেন আইজেনকট, যার মাধ্যমে বহু হারেদি ইহুদি পুরুষকে সামরিক সেবা থেকে অব্যাহতি দেয়ার সুযোগ রাখা হয়েছে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেয়া এক পোস্টে তিনি লেখেন, ‘এটি এমন একটি সরকার, যা নির্মম যুদ্ধের মধ্যেই সেনাবাহিনীকে দুর্বল করার পথ বেছে নিয়েছে। অথচ এই দেশের সেরা ছেলে-মেয়েরা সব ফ্রন্টে দায়িত্ব পালন করছে।’
নেতানিয়াহুর মতো ইসরাইলের অভিজাত পরিবারে নয় আইজেনকোটের, তার জন্ম মরক্কো থেকে আসা অভিবাসী পরিবারে। তিনি দেশের প্রান্তিক এলাকায় বেড়ে উঠেছেন।
সাম্প্রতিক এক ব্লগে কলামিস্ট নাদাভ আইয়াল লিখেছেন, ‘নেতানিয়াহুর মতো হতে চাওয়া রাজনীতিকদের ভিড়ে আইজেনকোট এক ভিন্ন প্রজন্মের মানুষ। জায়নবাদের ঐতিহ্যগত নিরাপত্তা ভাবনার সাথে তার সংযোগ অনেক বেশি।’
গবেষক এলোভিৎসের মতে, আইজেনকটের সংযত ব্যক্তিত্বই তার সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক শক্তি হয়ে উঠতে পারে।
যদিও বিরোধী নেতা ইয়াইর লাপিদ ও নাফতালি বেনেট এখনো প্রতিদ্বন্দ্বিতায় রয়েছেন। বর্তমান জনমত জরিপে দেখা যাচ্ছে, নেতানিয়াহুকে পরাজিত করার ক্ষেত্রে তাদের কেউই আইজেনকোটের মতো শক্ত অবস্থানে নেই।
সূত্র : এএফপি/বাসস



