অধিকৃত পশ্চিম তীরের তিনটি শরণার্থী শিবির থেকে গত বছর পুরো ফিলিস্তিনি জনগোষ্ঠীকে জোরপূর্বক সরিয়ে দেয়ার ঘটনা মানবতাবিরোধী অপরাধের পর্যায়ে পড়তে পারে বলে সতর্ক করেছে জাতিসঙ্ঘ।
শুক্রবার (৪ সেপ্টেম্বর) প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে জাতিসঙ্ঘের মানবাধিকারবিষয়ক দফতর এ কথা জানিয়েছে। তবে প্রতিবেদনটি প্রত্যাখ্যান করেছে ইসরাইল।
জাতিসঙ্ঘের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে অধিকৃত পশ্চিম তীরের উত্তরাঞ্চলে ইসরাইল যে সামরিক অভিযান শুরু করেছিল, তার ফলে ৩৩ হাজারের বেশি মানুষ জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত হন।
‘অপারেশন আয়রন ওয়াল’ নামে ওই অভিযান শুরুর সময় ইসরাইলি সেনাবাহিনী, পুলিশ ও অন্যান্য নিরাপত্তা বাহিনী শরণার্থী শিবিরগুলোতে প্রবেশ করে।
জাতিসঙ্ঘের দাবি, এ সময় বেসামরিক মানুষ নিহত হন, শত শত বাড়িঘর ধ্বংস করা হয় ও বিভিন্ন অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
প্রতিবেদনে আরো বলা হয়, ইসরাইলি বাহিনী শিবিরগুলোর পানি ও বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে এবং সেখানে মানবিক সহায়তা পৌঁছানোর পথও অবরুদ্ধ করে রাখে। পরে তারা বাড়ি বাড়ি গিয়ে বাসিন্দাদের শিবির ছেড়ে যেতে বাধ্য করে।
অভিযান শুরুর কয়েক দিনের মধ্যেই ইসরাইলি নিরাপত্তা বাহিনী শিবিরগুলোর ওপর নিয়ন্ত্রণ আরো শক্ত করে এবং সেখানকার পুরো জনগোষ্ঠীকে জোরপূর্বক সরিয়ে দেয়, বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
জাতিসঙ্ঘ সতর্ক করে বলেছে, জেনিন, নূর শামস ও তুলকারেমের মতো শরণার্থী শিবির থেকে ৩৩ হাজারের বেশি ফিলিস্তিনি শরণার্থীকে দীর্ঘ সময় ধরে পরিকল্পিতভাবে বাস্তুচ্যুত করার ঘটনা ‘জোরপূর্বক স্থানান্তর’ নামের মানবতাবিরোধী অপরাধের বিষয়ে গুরুতর উদ্বেগ তৈরি করছে।
জাতিসঙ্ঘের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জুলাই পর্যন্ত এই তিনটি শিবির থেকে বাস্তুচ্যুত ৩৩ হাজার ৩৬২ জন ফিলিস্তিনি শরণার্থীকে নিজ নিজ বাড়িতে ফিরতে দেয়া হয়নি।
‘জাতিগত নিধনের’ আশঙ্কা
জাতিসঙ্ঘের মানবাধিকারবিষয়ক দফতর বলেছে, বিমান হামলা, সাঁজোয়া বুলডোজার ও নিয়ন্ত্রিত বিস্ফোরণের মাধ্যমে পুরো শিবিরকে বসবাসের অযোগ্য করে তোলা, বাসিন্দাদের জোর করে সরিয়ে দেয়া ও তাদের ফিরে আসতে বাধা দেয়া— আন্তর্জাতিক আইনের অধীনে গ্রহণযোগ্য নয়।
জাতিসঙ্ঘ আরো বলেছে, ইসরাইলের এসব পদক্ষেপ সমষ্টিগত শাস্তির শামিল হতে পারে এবং ‘জাতিগত নিধন’ বা ‘এথনিক ক্লিনজিংয়ের’ আশঙ্কা তৈরি করছে।
তবে জেনেভায় ইসরাইলের মিশন জাতিসঙ্ঘের প্রতিবেদনটি প্রত্যাখ্যান করে বলেছে, জাতিসঙ্ঘের মানবাধিকারবিষয়ক দফতর নিরপেক্ষতা, স্বাধীনতা ও পক্ষপাতহীনতার নীতি থেকে সরে গিয়ে ‘নিন্দনীয় কর্মকাণ্ডের কেন্দ্রবিন্দুতে’ পরিণত হয়েছে।
ইসরাইল দাবি করেছে, জাতিসঙ্ঘের প্রতিবেদনটি ভুল তথ্য ছড়াচ্ছে এবং সেখানে তারা সন্ত্রাসী হামলার হুমকির বিষয়টি উল্লেখ করেনি।
১৯৬৭ সাল থেকে ইসরাইলের দখলে থাকা পশ্চিম তীরে ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর ইসরাইলে হামাসের হামলার পর গাজা উপত্যকায় যুদ্ধ শুরু হলে সহিংসতা আরো বেড়ে যায়।
২০২৫ সালের ২১ জানুয়ারি ‘অপারেশন আয়রন ওয়াল’ শুরু হওয়ার পর পশ্চিম তীরে সহিংসতা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পায়। গাজায় একটি ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার মাত্র ৪৮ ঘণ্টা পর এই অভিযান শুরু হয়েছিল।
২০২৫ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি ইসরাইল ঘোষণা করে, তাদের সেনাবাহিনী পশ্চিম তীরের ওই তিনটি শরণার্থী শিবির খালি করেছে। পশ্চিম তীরে মোট ১৯টি শরণার্থী শিবিরের মধ্যে এগুলো তিনটি।
ইসরাইলের প্রতিরক্ষামন্ত্রী কাটজ বলেন, তিনি সেনাদের নির্দেশ দিয়েছিলেন— খালি করা শরণার্থী শিবিরগুলোতে আগামী এক বছর বা তারও বেশি সময় ধরে অবস্থান করার জন্য প্রস্তুত থাকতে। একইসাথে বাসিন্দাদের ফিরে আসা ও ‘সন্ত্রাসবাদের পুনরুত্থান’ ঠেকানোর নির্দেশও দেয়া হয়েছিল।
জাতিসঙ্ঘের মানবাধিকারবিষয়ক প্রধান ভলকার তুর্ক শুক্রবার বলেন, এই অভিযান যেভাবে পরিচালনা করা হয়েছে, তাতে মনে হচ্ছে এর উদ্দেশ্য ছিল যত বেশি সম্ভব ফিলিস্তিনিকে ওই এলাকা থেকে উচ্ছেদ করা এবং সেখানে আরো অবৈধ ইসরাইলি বসতি স্থাপনের সুযোগ তৈরি করা।
এমন কর্মকাণ্ড আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘনের ঘটনাকে আরো বাড়িয়ে দিচ্ছে বলে অভিমত তার।
সূত্র : বাসস



