মার্কিন হামলার জবাবে ইরানের পাল্টা হামলা

যুক্তরাষ্ট্রের চালানো সাম্প্রতিক হামলার জবাবে ইরান বুধবার (২ সেপ্টেম্বর) বাহরাইন, কুয়েত ও জর্ডানে মার্কিন স্বার্থসংশ্লিষ্ট লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালিয়েছে। এর আগে ইরান ‘কঠোর শাস্তি’ দেয়ার হুমকি দিয়েছিল।

নয়া দিগন্ত অনলাইন
ইরানের পতাকা ও ক্ষেপণাস্ত্র
ইরানের পতাকা ও ক্ষেপণাস্ত্র |ফাইল ছবি

যুক্তরাষ্ট্রের চালানো সাম্প্রতিক হামলার জবাবে ইরান বুধবার (২ সেপ্টেম্বর) বাহরাইন, কুয়েত ও জর্ডানে মার্কিন স্বার্থসংশ্লিষ্ট লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালিয়েছে। এর আগে ইরান ‘কঠোর শাস্তি’ দেয়ার হুমকি দিয়েছিল।

ইরানের রেড ক্রিসেন্ট জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের চালানো হামলায় একটি বিয়ের অনুষ্ঠানে চারজন নিহত হয়েছেন।

ইরানের সংবাদমাধ্যম তাসনিমের বরাতে দেশটির ইসলামী বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি) জানিয়েছে, বুধবার ভোরে জর্ডানে অবস্থিত মার্কিন মেরিন কর্পসের ক্যাম্প টিটিনে ‘তীব্র ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলা’ চালানো হয়েছে।

জর্ডানের সেনাবাহিনী জানিয়েছে, ইরান থেকে ছোড়া ১০টি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র তারা ভূপাতিত করেছে। তবে আকাবা উপসাগরের তীরে ইসরাইল ও সৌদি আরবের সীমান্তের কাছে অবস্থিত ওই মার্কিন প্রশিক্ষণকেন্দ্রে কোনো ক্ষয়ক্ষতি বা হতাহতের খবর নিশ্চিত করেনি তারা।

আরো তিনটি ক্ষেপণাস্ত্র জনবসতিহীন এলাকায় পড়েছে বলে জানিয়েছে জর্ডানের সেনাবাহিনী।

কুয়েতেও ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার খবর পাওয়া গেছে। দেশটির সেনাবাহিনী জানিয়েছে, ইরানের হামলার জবাবে তারা পাল্টা ব্যবস্থা নিচ্ছে।

এদিকে, বাহরাইনে এএফপির সাংবাদিকরা বুধবার ভোরে আকাশপথে হামলার সতর্ক সঙ্কেত শুনেছেন।

রোববার ওয়াশিংটন ইরানের বিভিন্ন লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালানোর মধ্য দিয়ে সর্বশেষ দফার সংঘাত শুরু হয়। কয়েক সপ্তাহের মধ্যে এটিই ছিল ইরানে যুক্তরাষ্ট্রের প্রথম পরিচিত হামলা। এরপর ইরান জর্ডান ও সংযুক্ত আরব আমিরাতে অবস্থানরত মার্কিন সেনাদের লক্ষ্য করে হামলা চালায়। পাশাপাশি দু’টি তেলবাহী জাহাজেও হামলা হয়, যদিও এসব হামলার দায় কেউ স্বীকার করেনি।

মঙ্গলবার যুক্তরাষ্ট্র আবারো ইরানে হামলা চালায়। ইরানের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন জানায়, দেশটির দক্ষিণাঞ্চলে কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালীর কাছে এবং উপসাগরের একটি দ্বীপে বিস্ফোরণের শব্দ শোনা গেছে। দক্ষিণাঞ্চলীয় কেরমান প্রদেশের একটি বিমানবন্দরেও মার্কিন বাহিনী হামলা চালিয়েছে বলে জানানো হয়।

ইরানের রেড ক্রিসেন্ট জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষেপণাস্ত্র হামলার ছোড়া ধ্বংসাবশেষ কুহেস্তাক শহরের একটি বাড়িতে আঘাত করে। সেখানে একটি বিয়ের অনুষ্ঠান চলছিল। এতে এক শিশুসহ চারজন নিহত এবং ৫০ জনের বেশি আহত হয়েছেন।

ইরানের সরকারি বার্তাসংস্থা ইরনা জানিয়েছে, ‘চাবাহার ও কোনারাক এলাকায় চারটি ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হেনেছে।’

তবে এতে কোনো ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে কি-না, তা জানানো হয়নি।

মঙ্গলবারের মার্কিন হামলায় বেসামরিক মানুষের হতাহতের বিষয়ে কোনো বিশ্বাসযোগ্য তথ্য পেয়েছে কি না— এ প্রশ্নের জবাবে যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ডের (সেন্টকম) মুখপাত্র ক্যাপ্টেন টিম হকিন্স বলেন, ‘মার্কিন সামরিক বাহিনী কখনো বেসামরিক মানুষকে লক্ষ্য করে হামলা চালায় না। আইআরজিসি এর বিপরীত।’

এর আগে সেন্টকম সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে জানিয়েছিল, হরমুজ প্রণালীতে বাণিজ্যিক জাহাজ ও ওই অঞ্চলে মোতায়েন মার্কিন সেনাদের ওপর আইআরজিসির সাম্প্রতিক হামলার চেষ্টার জবাব হিসেবেই যুক্তরাষ্ট্রের হামলা চালানো হয়েছে।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেন, ‘বড় ও শক্তিশালী’ এই হামলাগুলো চালানো হয়েছে ইরানের হরমুজ প্রণালীতে সমুদ্রপথে মাইন বসানোর ব্যর্থ চেষ্টা ও জর্ডানে মার্কিন সামরিক ঘাঁটিতে আটটি ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়ার জবাবে।’

তার দাবি, আটটি ক্ষেপণাস্ত্রই সফলভাবে ভূপাতিত করা হয়েছে।

এর আগে আইআরজিসির মুখপাত্র হোসেইন মোহেবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, ওয়াশিংটন ‘তাদের নতুন হামলার জন্য অনুতপ্ত হবে’ এবং ‘আগ্রাসীদের জন্য কঠোর শাস্তি অপেক্ষা করছে’।

তেলবাহী জাহাজে হামলা
ছয় মাস ধরে চলা যুদ্ধের পরও ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে অচলাবস্থা কাটেনি। ইরান হরমুজ প্রণালী বন্ধ রেখেছে এবং যুক্তরাষ্ট্র ইরানের বন্দরগুলোর ওপর পাল্টা অবরোধ অব্যাহত রেখেছে।

ওয়াশিংটন জানিয়েছে, রোববার তারা লারাক দ্বীপে ইরানের রকেট উৎক্ষেপণকারী ব্যবস্থা লক্ষ্য করে হামলা চালিয়েছে। হরমুজ প্রণালীর গুরুত্বপূর্ণ নৌপথে তেহরান যাতে মাইন স্থাপন করতে না পারে, সে উদ্দেশ্যেই এই হামলা চালানো হয়েছে বলে দাবি করেছে যুক্তরাষ্ট্র।

ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের ইরানে হামলার মধ্য দিয়ে মধ্যপ্রাচ্যের এই যুদ্ধ শুরু হয়। ওই হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি নিহত হন।

হরমুজ প্রণালীতে বাণিজ্যিক জাহাজে হামলার পর যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে থাকা ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতি ভেঙে পড়ে। যুদ্ধ শুরুর আগে বিশ্বের মোট তেল সরবরাহের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এই প্রণালী দিয়ে পরিবহন করা হতো।

গ্রিসভিত্তিক সামুদ্রিক ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা প্রতিষ্ঠান মারিস্কস মঙ্গলবার জানিয়েছে, আগের দিন রাতে দু’টি অপরিশোধিত তেলবাহী জাহাজে ‘অজ্ঞাত বস্তুর’ আঘাত লাগে।

এর একটি ঘটনার কথা এর আগেই জানিয়েছিল যুক্তরাজ্যের মেরিটাইম ট্রেড অপারেশনস সংস্থা।

তারা জানিয়েছিল, এতে কোনো হতাহত বা পরিবেশগত ক্ষতির খবর পাওয়া যায়নি।

এদিকে ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান মঙ্গলবার বলেছেন, যুদ্ধ বন্ধের লক্ষ্যে কোনো চুক্তিতে ফেরার বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্র যে পদক্ষেপই নিক, ইরানও তার সমান জবাব দেবে।

তিনি সতর্ক করে বলেন, যুক্তরাষ্ট্র যদি আবার ‘চাপ ও হুমকির নীতি’ গ্রহণ করে, তাহলে কূটনৈতিক সমাধানের পথ বাধাগ্রস্ত হতে পারে।

সূত্র : বাসস