ইরানের ‘কাসেম বাসির’ ক্ষেপণাস্ত্র যেভাবে সমুদ্রযুদ্ধের সমীকরণ বদলে দিয়েছে

ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মুখোমুখি সংঘাতের সমীকরণে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ‘কাসেম বাসির’-এর অন্তর্ভুক্তিকে পারস্য উপসাগর, ওমান সাগর এবং আরব সাগরের উত্তরাঞ্চলে মার্কিন নৌবাহিনীর জন্য হুমকির ক্ষেত্রে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন হিসেবে বিবেচনা করা যায়।

নয়া দিগন্ত অনলাইন
ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র ‘কাসেম বাসির’
ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র ‘কাসেম বাসির’ |সংগৃহীত

ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মুখোমুখি সংঘাতের সমীকরণে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ‘কাসেম বাসির’-এর অন্তর্ভুক্তিকে পারস্য উপসাগর, ওমান সাগর এবং আরব সাগরের উত্তরাঞ্চলে মার্কিন নৌবাহিনীর জন্য হুমকির ক্ষেত্রে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন হিসেবে বিবেচনা করা যায়।

এক হাজার ২০০ কিলোমিটার পাল্লার ‘কাসেম বাসির’ ক্ষেপণাস্ত্রটি ৪ সেপ্টেম্বর প্রথমবারের মতো ইরানের ইসফাহান থেকে উত্তর আরব সাগরে অবস্থানরত একটি মার্কিন বিমানবাহী রণতরীকে লক্ষ্য করে নিক্ষেপ করা হয়।

মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড বা সেন্টকম জানিয়েছে, ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাত এড়াতে ওই রণতরীকে প্রতিরক্ষামূলক কৌশল অবলম্বন করতে হয়েছে।

ইরানের জাতীয় নিরাপত্তাবিষয়ক উচ্চ পরিষদের সচিব মোহসেন রেজাই এ বিষয়ে বলেন, ‘৪৮ ঘণ্টা আগে আমরা প্রথমবারের মতো একটি মার্কিন যুদ্ধজাহাজের ওপর দিয়ে ইরানের অ্যান্টি-ডেস্ট্রয়ার ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষা করেছি।’

তিনি আরো বলেন, ‘এই বিশেষ ক্ষেপণাস্ত্রটি আমেরিকানদের জন্য নরক তৈরি করেছিল এবং তারা পালিয়ে যায়।’

মার্কিন জাতীয় নিরাপত্তা বিশ্লেষক ব্র্যান্ডন ওয়েইকার্ট এ বিষয়ে বলেন, ইরানিরা ‘কাসেম বাসির’ নিক্ষেপ করেছে, যা একটি মধ্যম-পাল্লার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র।

তার ভাষায়, এটি ইরানের সর্বশেষ এবং সবচেয়ে উন্নত অ্যান্টি-শিপ ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র। উড্ডয়নের শেষ পর্যায়ে এই ক্ষেপণাস্ত্রে গতিপথ পরিবর্তনের জন্য ম্যানুভারিং থ্রাস্টার রয়েছে।

ব্র্যান্ডন ওয়েইকার্ট বলেন, এটি বিমানবাহী রণতরী শিকারের জন্য তৈরি একটি ক্ষেপণাস্ত্র এবং এটিকে ভূপাতিত করা অত্যন্ত কঠিন।

তার মতে, ইরানিদের পক্ষ থেকে এটি ছিল একটি সতর্কবার্তা—‘প্রণালি থেকে বেরিয়ে যাও, নইলে আমরা তোমাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেব; আর তোমরাও আমাদের ঠেকাতে পারবে না’।

তবে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় মনে রাখা দরকার যে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ‘কাসেম বাসির’-এর গুরুত্ব কেবল এর পাল্লা বা গতির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। কঠিন জ্বালানিচালিত প্রপালশন, জিপিএস-নির্ভরতা ছাড়াই স্বতন্ত্র নির্দেশনা, চূড়ান্ত পর্যায়ে গতিপথ পরিবর্তনের সক্ষমতা এবং তুলনামূলক বেশি নির্ভুলতার সমন্বয়—এসব সক্ষমতা যুদ্ধক্ষেত্রে পুরোপুরি প্রমাণিত হলে মার্কিন নৌবহরের কার্যক্রমের হিসাবকে আরো জটিল করে তুলতে পারে।

২০২৫ সালের মে মাসে ক্ষেপণাস্ত্রটি উন্মোচনের সময় নির্ভরযোগ্য বিভিন্ন সূত্রে এর পাল্লা কমপক্ষে এক হাজার ২০০ কিলোমিটার বলে উল্লেখ করা হয়েছিল। পাশাপাশি এর প্রধান বৈশিষ্ট্য হিসেবে উন্নত নির্দেশনা ব্যবস্থা এবং জিপিএসের ওপর নির্ভর না করেই লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানার সক্ষমতার কথা বলা হয়।

চলতি বছরের সেপ্টেম্বরের শুরুর দিকের সংঘর্ষ নিয়ে প্রকাশিত বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইসলামী বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর নৌ ইউনিট একটি মার্কিন বিমানবাহী রণতরী ও একটি ডেস্ট্রয়ারের দিকে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করে। সেন্টকম জানায়, মার্কিন যুদ্ধজাহাজগুলো কৌশলগতভাবে অবস্থান পরিবর্তন করে ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাত এড়াতে সক্ষম হয় এবং এতে কোনো হতাহতের ঘটনাও ঘটেনি। তবে সেন্টকম ব্যবহৃত ক্ষেপণাস্ত্রগুলোর সঠিক ধরন প্রকাশ করেনি।

মার্কিন যুদ্ধজাহাজের বিরুদ্ধে ‘কাসেম বাসির’ ব্যবহারের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বার্তা হলো—এই ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থা স্থলভাগের স্থির লক্ষ্যবস্তুতে হামলার প্রচলিত ভূমিকা থেকে বেরিয়ে জাহাজবিধ্বংসী বা অ্যান্টি-শিপ মিশনের দিকে অগ্রসর হচ্ছে।

একটি বিমানবাহী রণতরীকে লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করার প্রধান সমস্যা কেবল ক্ষেপণাস্ত্রকে নির্দিষ্ট এলাকায় পৌঁছে দেয়া নয়, বরং লক্ষ্যবস্তু শনাক্ত করা, সেটিকে ট্র্যাক করা এবং ক্ষেপণাস্ত্রের চূড়ান্ত পর্যায়ে লক্ষ্যবস্তুর অবস্থান সম্পর্কে তথ্য হালনাগাদ করা। একটি বিমানবাহী রণতরী ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপের মুহূর্ত থেকে সেটির ওয়ারহেড চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছানো পর্যন্ত কয়েক কিলোমিটার দূরে সরে যেতে পারে। ফলে ব্যালিস্টিক অ্যান্টি-শিপ ক্ষেপণাস্ত্রের জন্য চূড়ান্ত পর্যায়ে একটি অনুসন্ধানী সিকার এবং লক্ষ্যবস্তুর অবস্থান নির্ধারণের জন্য সেন্সরের একটি সমন্বিত নেটওয়ার্ক প্রয়োজন।

এ ক্ষেত্রে কাসেম বাসিরের সম্ভাব্য সুবিধা হলো চূড়ান্ত পর্যায়ে ইলেকট্রো-অপটিক্যাল ও ইনফ্রারেড নির্দেশনা ব্যবস্থার ব্যবহার। জিপিএসনির্ভর নির্দেশনার বিপরীতে এ ধরনের ব্যবস্থা প্রচলিত রেডিও জ্যামিংয়ের কারণে তুলনামূলক কম ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে এবং চূড়ান্ত পর্যায়ে গতিপথ সংশোধনে ব্যবহৃত হতে পারে। এই বৈশিষ্ট্যই মার্কিন ইলেকট্রনিক যুদ্ধ সক্ষমতার বিরুদ্ধে ক্ষেপণাস্ত্রটিকে বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ করে তুলতে পারে।

দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো ওয়ারহেডের গতি ও ম্যানুভার করার সক্ষমতা। কাসেম বাসির সম্পর্কে প্রকাশিত তথ্য থেকে উচ্চ গতিতে পুনঃপ্রবেশ এবং চূড়ান্ত পর্যায়ে গতিপথ পরিবর্তনের সক্ষমতার ইঙ্গিত পাওয়া যায়। একটি ম্যানুভারিং ওয়ারহেডের কারণে ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা কেবল একটি নির্দিষ্ট ব্যালিস্টিক গতিপথের পূর্বাভাসের ভিত্তিতে প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নিতে পারে না।

এর ফলে মার্কিন যুদ্ধজাহাজের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার সিদ্ধান্ত নেয়ার সময় কমে যায় এবং ‘এজিস’-এর মতো ব্যবস্থা ও সমুদ্রভিত্তিক ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরোধী ইন্টারসেপ্টরগুলোর জন্য কাজটি আরো কঠিন হয়ে ওঠে।

তবে কোনো ক্ষেপণাস্ত্রকে শনাক্ত ও প্রতিহত করা কঠিন হওয়ার অর্থ এই নয় যে সেটিকে প্রতিহত করা অসম্ভব। মার্কিন বিমানবাহী রণতরীর ক্যারিয়ার স্ট্রাইক গ্রুপে রয়েছে বহুস্তরীয় প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা—দূরপাল্লার রাডার, এজিস-সজ্জিত ডেস্ট্রয়ার, ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরোধী ইন্টারসেপ্টর, ইলেকট্রনিক যুদ্ধ ব্যবস্থা, ডিকয় বা বিভ্রান্তিকর লক্ষ্যবস্তু এবং আগাম সতর্কতামূলক বিমান।

এ কারণেই একটি নির্ভুল ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রকে নির্ভরযোগ্য ‘ডেস্ট্রয়ার-ধ্বংসকারী’ বা ‘বিমানবাহী রণতরী-বিধ্বংসী’ অস্ত্রে রূপান্তর করা একটি স্থির ঘাঁটিকে লক্ষ্য করার চেয়ে অনেক বেশি কঠিন।

তবে কাসেম বাসিরের কৌশলগত প্রভাব সরাসরি আঘাতের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। যদি একটি বিমানবাহী রণতরী ঝুঁকি কমানোর জন্য ইরানের উপকূল থেকে শত শত কিলোমিটার অতিরিক্ত দূরত্ব বজায় রাখতে বাধ্য হয়, তাহলে সেটিকে ডুবিয়ে না দিয়েও ইরান তার অপারেশনাল উদ্দেশ্যের একটি অংশ অর্জন করতে পারে।

দূরত্ব বৃদ্ধি পেলে বিমানবাহী রণতরী থেকে উড্ডয়নকারী যুদ্ধবিমানগুলোর উড়ান সময় বাড়বে, আকাশে জ্বালানি সরবরাহের প্রয়োজন বাড়বে, সহায়ক বিমানগুলোর ওপর চাপ বৃদ্ধি পাবে এবং মার্কিন আক্রমণাত্মক অভিযান আরো জটিল হয়ে উঠবে।

সামরিক পরিভাষায় এটি ‘অ্যান্টি-অ্যাকসেস/এরিয়া ডিনায়াল’ বা প্রবেশাধিকার প্রতিরোধ ও নির্দিষ্ট অঞ্চলে কার্যক্রম সীমিত করার কৌশলের অংশ—অর্থাৎ কোনো নির্দিষ্ট এলাকায় শত্রু বাহিনীর প্রবেশ ও অবস্থানকে আরো ব্যয়বহুল ও ঝুঁকিপূর্ণ করে তোলা।

কাসেম বাসিরের হুমকি আরো গুরুতর হয়ে ওঠে যখন এটিকে একটি বহুস্তরীয় সামরিক নেটওয়ার্কের অংশ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের সাথে অ্যান্টি-শিপ ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র, ড্রোন, মনুষ্যবিহীন নৌযান এবং সমন্বিত একযোগে হামলার সংমিশ্রণ একটি নৌবহরের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে ভিন্ন গতি, উচ্চতা ও গতিপথের একাধিক লক্ষ্যবস্তুর মুখোমুখি করতে পারে।

এ ধরনের পরিস্থিতিতে আক্রমণকারী অস্ত্রের একটি বড় অংশ প্রতিহত করা গেলেও প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা অতিরিক্ত লক্ষ্যবস্তুতে পরিপূর্ণ হয়ে পড়া এবং দ্রুত বিপুলসংখ্যক ইন্টারসেপ্টর ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার হয়ে যাওয়ার বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।

চলতি বছরের বিভিন্ন প্রতিবেদনও ইঙ্গিত দিয়েছে যে, ম্যানুভারিং ওয়ারহেড ব্যবহারে ইরানের অগ্রগতি মার্কিন বিশ্লেষকদের দৃষ্টিতে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করার কাজকে আরো জটিল করে তুলতে পারে।

তবে কাসেম বাসিরকে এমন কোনো অস্ত্র হিসেবে বিবেচনা করা উচিত নয়, যা একাই মার্কিন নৌ-শক্তির শ্রেষ্ঠত্বকে বিলুপ্ত করে দিতে পারে। কিন্তু ইরান-যুক্তরাষ্ট্রের সামুদ্রিক সংঘাতে এর আবির্ভাব যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নৌসম্পদ—বিমানবাহী রণতরী ও ডেস্ট্রয়ারগুলোর ওপর হুমকির মাত্রা বাড়াতে পারে।

এই ক্ষেপণাস্ত্রের প্রকৃত গুরুত্ব হলো—এটি মার্কিন যুদ্ধজাহাজগুলোর জন্য প্রয়োজনীয় নিরাপদ দূরত্ব বাড়াতে পারে, প্রতিরক্ষায় আরো বেশি সম্পদ নিয়োজিত করতে বাধ্য করতে পারে এবং ইরানের কাছাকাছি পানিসীমায় তাদের স্বাধীনভাবে পরিচালনার সুযোগ সীমিত করতে পারে।

যদি প্রকৃত যুদ্ধক্ষেত্রে চলমান লক্ষ্যবস্তুর বিরুদ্ধে এর চূড়ান্ত পর্যায়ের নির্দেশনা ও আঘাত হানার সক্ষমতা প্রমাণিত হয়, তাহলে পারস্য উপসাগর ও ওমান সাগর মার্কিন বড় যুদ্ধজাহাজগুলোর জন্য আগের চেয়ে আরো বেশি ঝুঁকিপূর্ণ পরিবেশে পরিণত হতে পারে—যেখানে উপস্থিত থাকার অর্থ হবে উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি ঝুঁকি ও ব্যয় মেনে নেয়া।

সূত্র : পার্সটুডে