পরমাণু নজরদারির ছদ্মবেশে রাজনৈতিক খেল : জাতিসংঘে ত্রিমুখী আঘাতের মুখে এবার ইরান

জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে তেহরানের পারমাণবিক নথি পাঠাতে আইএইএর বোর্ড অব গভর্নরস একটি বিতর্কিত প্রস্তাব অনুমোদন করেছে।

নয়া দিগন্ত অনলাইন
আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার গভর্নর বোর্ডের বৈঠকের দৃশ্য
আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার গভর্নর বোর্ডের বৈঠকের দৃশ্য |প্রেসটিভি

আন্তর্জাতিক আণবিক শক্তি কর্তৃপক্ষের বা আইএইএর প্রস্তাবের কড়া সমালোচনা করে পারমাণবিক অস্ত্র বিস্তার রোধ চুক্তি বা এনটিপি ‘চূড়ান্ত পতনের’ হুঁশিয়ারি দিয়েছে ইরান। তেহরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে রাজনীতি এবং যুদ্ধকালীন বাস্তবতা এড়িয়ে যাওয়ার অভিযোগ তুলে এই মার্কিনঘেঁষা অবস্থানকে চূড়ান্ত ভণ্ডামি বলে আখ্যা দিয়েছে দেশটি।

ইরানের ইংরেজি চ্যানেল প্রেসটিভি, বৃহস্পতিবার (১০ সেপ্টেম্বর) জানিয়েছে, জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে তেহরানের পারমাণবিক নথি পাঠাতে আইএইএর বোর্ড অব গভর্নরস একটি বিতর্কিত প্রস্তাব অনুমোদন করেছে। যুক্তরাষ্ট্র, ব্রিটেন, ফ্রান্স ও জার্মানির তৈরি এই প্রস্তাবটির পক্ষে ২৩টি দেশ ভোট দেয়। আর বিরুদ্ধে ভোট দিয়েছে রাশিয়া, চীন ও নাইজার। আটটি দেশ ভোটদানে বিরত ছিল। এই প্রস্তাবের মাধ্যমে গত ২০ বছরের মধ্যে প্রথমবারের মতো ইরানকে পারমাণবিক অঙ্গীকার লঙ্ঘনের অভিযোগে নিরাপত্তা পরিষদে পাঠানো হলো। এমন তৎপরতা নিশ্চিতভাবেই এক নতুন বিশ্ব উত্তেজনার জন্ম দিচ্ছে।

আইএইএ-তে নিযুক্ত ইরানের মিশন সোশ্যাল মিডিয়া এক্স-এ (সাবেক টুইটার) দেয়া এক বিবৃতিতে এই সর্বসম্মতবিহীন ভাবে পাস করা প্রস্তাবের তীব্র নিন্দা জানিয়েছে। ইরানের মিশন সতর্ক করে বলেছে, এ ধরনের সিদ্ধান্ত পুরো এনটিপি ব্যবস্থার কার্যকারিতাকে ক্ষুণ্ণ করবে এবং সার্বিক অপ্রসার কাঠামোর চরম ধসের পথ উন্মোচন করবে। বর্তমানে চলমান পরমাণু সংকট ও অচলাবস্থার জন্য সরাসরি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলকে দায়ী করেছে তেহরান।

ইরানি মিশন তাদের বক্তব্যে তেহরানকে ‘আত্মসমর্পণ’ করানো ও তেলসম্পদ দখলের যুক্তরাষ্ট্রের উচ্চাকাঙ্ক্ষাকে একটি ‘দিবা স্বপ্ন’ বলে উড়িয়ে দিয়েছে। গত দুই বছর ধরে মার্কিন মিত্র ও তাদের আঞ্চলিক শক্তির যৌথ সর্বাত্মক যুদ্ধ সত্ত্বেও যে স্বপ্ন ব্যর্থ হয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়। ইরানি মিশন পশ্চিমের দ্বিচারিতা তুলে ধরে প্রশ্ন তোলে—কীভাবে একদিকে আইএইএ-তে ‘কূটনৈতিক সমাধানের’ ফাঁকা বুলি দেয়া হয়, আর অন্যদিকে আন্তর্জাতিক আইন ও জাতিসংঘের সনদকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে হামলা চালানো হয়?

ইরান জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল তাদের ‘শান্তিপূর্ণ ও সুরক্ষিত পারমাণবিক কেন্দ্রগুলোতে’ বোমা হামলা চালিয়ে বেসামরিক নাগরিকদের ওপর ভয়াবহ বিপর্যয় ডেকে এনেছে। একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ১৬৮ জন শিশু হত্যা এবং একটি বিয়ের অনুষ্ঠানে হামলাসহ হাজার হাজার নিরীহ মানুষ হত্যার মতো যুদ্ধাপরাধের কথা উল্লেখ করে তেহরান সাফ জানিয়ে দিয়েছে, আইএইএ-তে পক্ষপাতদুষ্ট প্রস্তাব পাস করিয়ে তারা এই পরাজয়ের কলঙ্ক ঢাকতে পারবে না।

অন্যদিকে ইরানের উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রী কাজেম গারিবাবাদি আইএইএ ও পশ্চিমা শক্তিগুলোর যুক্তিহীন আচরণের কঠোর সমালোচনা করে বলেছেন, “তারা প্রথমে ইরানের সামরিক ও সুরক্ষিত পারমাণবিক স্থাপনায় হামলা চালিয়ে স্বাভাবিক পরিদর্শন ও যাচাইকরণ প্রক্রিয়া ব্যাহত করল। আর এখন সেই পরিদর্শনের অভাবকেই অজুহাত বানিয়ে বোর্ড অব গভর্নরসে প্রস্তাব পাস করছে!” তিনি এটিকে চরম কূটনৈতিক দেউলিয়াত্ব এবং একটি ব্যর্থ সামরিক ও রাজনৈতিক কৌশলকে বাঁচানোর মরিয়া চেষ্টা বলে আখ্যা দেন।

আইএইএ-র এই ভোটাভুটির পর সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে ভিয়েনায় জাতিসংঘে নিযুক্ত ইরানের রাষ্ট্রদূত রেজা নাজাফি এ সিদ্ধান্তকে একটি ‘রাজনৈতিক হাতিয়ার’ বলে উড়িয়ে দেন। যুদ্ধ পরিস্থিতির মধ্যে ভবিষ্যতে পরিদর্শকদের প্রবেশের বিষয়ে ইরানের অবস্থান পরিষ্কার করে তিনি বলেন, “পরিস্থিতি এবং নিরাপত্তা যতটা অনুমতি দেবে, ইরান ঠিক ততটাই সহযোগিতা করবে।”

উল্লেখ্য, ২০২৫ সালের জুনে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ সামরিক হামলার পর থেকেই ইরান কিছু পারমাণবিক স্থাপনায় পরিদর্শকদের প্রবেশাধিকার সীমিত করে। এরপর ২০২৬ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে পুরোদমে যুদ্ধ শুরু হলে বিদ্যুৎ ও বেসামরিক অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় পরিস্থিতি আরো জটিল হয়। যদিও ২০২৫ সালের জুনের হামলার আগে আইএইএ-র অবাধ প্রবেশাধিকার ছিল।

কূটনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, নিরাপত্তা পরিষদে ইরানের নথি পাঠানোর এই পদক্ষেপ মূলত একটি প্রতীকী চাল। যুক্তরাষ্ট্র চায় বিদ্যমান অর্থনৈতিক অবরোধ ও নৌ-অবরোধের ওপর অতিরিক্ত কূটনৈতিক চাপ সৃষ্টি করতে। তবে নিরাপত্তা পরিষদে যেকোনো শাস্তিমূলক ব্যবস্থার চেষ্টা রাশিয়া ও চীনের ভেটো ক্ষমতার কারণে আটকে যাবে। কারণ, এই দুই দেশই জাতিসংঘের পারমাণবিক নজরদারি সংস্থাকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহারের তীব্র বিরোধী।