স্বঘোষিত ‘শান্তির দূত’ ট্রাম্প আটকে গেলেন ‘অনন্ত যুদ্ধে’?

৯/১১ বার্ষিকী একদম দরজায় সজোরে কড়া নাড়ছে। ঠিক সে সময় ইরানের বিরুদ্ধে ট্রাম্পের নেয়া এই পদক্ষেপ বিদেশি নীতি বিশ্লেষকদের মনে করিয়ে দিচ্ছে আফগানিস্তান ও ইরাকের সেই দীর্ঘ ও বিতর্কিত যুদ্ধের স্মৃতি।

নয়া দিগন্ত অনলাইন
ডোনাল্ড ট্রাম্প
ডোনাল্ড ট্রাম্প |সংগৃহীত

ডোনাল্ড ট্রাম্প যখন দ্বিতীয় মেয়াদে হোয়াইট হাউসে ফেরার প্রচারণা চালাচ্ছিলেন, তখন তাঁর মূল সুরই ছিল—তিনি হবেন এক ‘শান্তির প্রেসিডেন্ট’। নতুন কোনো সংঘাত শুরু করা নয়, বরং বিদেশের মাটিতে মার্কিন যুদ্ধগুলো বন্ধ করাই হবে তাঁর প্রধান কাজ। কিন্তু ২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বরের সেই ভয়াবহ সন্ত্রাসী হামলার প্রায় সিকি শতাব্দী পর, আজ ট্রাম্প নিজেই এক অপ্রিয় ও নিজের তৈরি করা সংকটে জড়িয়ে পড়েছেন। বিশ্লেষকেরা এ সংকটকে তাঁর রাজনৈতিক জীবনের ‘অনন্ত যুদ্ধ’ (ফরেভার ওয়ার) বলে আখ্যা দিচ্ছেন।

বার্তা সংস্থা রয়টার্স বৃহস্পতিবার (১০ সেপ্টেম্বর) এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে, ৯/১১ বার্ষিকী একদম দরজায় সজোরে কড়া নাড়ছে। ঠিক সে সময় ইরানের বিরুদ্ধে ট্রাম্পের নেয়া এই পদক্ষেপ বিদেশি নীতি বিশ্লেষকদের মনে করিয়ে দিচ্ছে আফগানিস্তান ও ইরাকের সেই দীর্ঘ ও বিতর্কিত যুদ্ধের স্মৃতি। প্রশ্ন উঠছে, আমেরিকা কি আবারও অতীতের ভুল থেকে কোনো শিক্ষা নিতে ব্যর্থ হলো? নাকি এবারও তাদের কাছে যুদ্ধ থেকে বের হওয়ার কোনো স্পষ্ট কৌশল বা ‘এগজিট স্ট্র্যাটেজি’ নেই?

আন্তর্জাতিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান ‘সেন্টার ফর ইন্টারন্যাশনাল পলিসি’-র গবেষক সিনা তোসি বলেন, 'মধ্যপ্রাচ্যে আর কোনো অনির্দিষ্টকালের যুদ্ধে না জড়ানোর যে নীতি ওয়াশিংটনে তৈরি হয়েছিল, ট্রাম্প তা ভেঙে ফেলেছেন। এর ফলে তাঁর উত্তরসূরিকে হয়তো যুক্তরাষ্ট্র-ইরান এক দীর্ঘস্থায়ী সামরিক মুখোমুখি পরিস্থিতির দায়ভারের ভারি বোঝা বহন করতে হবে।'

অবশ্য ট্রাম্প প্রশাসনের দাবি, ৯/১১-পরবর্তী যুদ্ধগুলোর সঙ্গে ইরানের এই অভিযানকে মেলানো ভুল। সে সময় ইরাক ও আফগানিস্তানে হাজার হাজার পদাতিক সৈন্য পাঠিয়ে সরকার উৎখাত এবং ভূমি দখলের চেষ্টা করা হয়েছিল। কিন্তু এবার আমেরিকা মূলত বিমান ও নৌ শক্তির ওপর নির্ভর করছে। যদিও এতে ইরানের সামরিক ও অর্থনৈতিক ক্ষতি হয়েছে, কিন্তু তেহরানের শাসনব্যবস্থা ভেঙে পড়েনি।

যুদ্ধের দীর্ঘ ছয় মাস পেরিয়ে যাওয়ার পর মার্কিন সেনারা এখন এক ধরনের ক্ষয়িষ্ণু দ্বন্দ্বে বন্দি। এই সপ্তাহে তেলের ট্যাংকারে দুপক্ষের পাল্টাপাল্টি হামলা সেই ইঙ্গিতই দেয়। আগামী নভেম্বরে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচন। বিশ্লেষকেরা সতর্ক করছেন, এই যুদ্ধ তত দিন গড়ালে ট্রাম্পের রিপাবলিকান পার্টির জন্য ক্যাপিটল হিলের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়বে। তেলের পথ বন্ধ হওয়ায় মার্কিন নাগরিকদেরও জ্বালানির অতিরিক্ত দাম মেটাতে হচ্ছে।

হোয়াইট হাউসের মুখপাত্র অ্যানা কেলি অবশ্য দাবি করেছেন, ট্রাম্প একাই সাহসিকতার সঙ্গে ইরানের পারমাণবিক হুমকির মোকাবেলা করেছেন। পাশাপাশি কঠোর অবরোধের মাধ্যমে তাদের অর্থনীতি পঙ্গু করে দিয়েছেন। তবে ৯/১১-পরবর্তী যুদ্ধের ইতিহাসের সঙ্গে এই সংঘাতের মিল নিয়ে রয়টার্সের প্রশ্নের সরাসরি জবাব দেননি হোয়াইট হাউসের এ মুখপাত্র।

বিশ্লেষকদের মতে, ইরাক ও আফগানিস্তানে বুশ প্রশাসন যেভাবে প্রতিপক্ষের প্রতিরোধ ক্ষমতাকে খাটো করে দেখেছিল, ট্রাম্প ও তাঁর উপদেষ্টারাও ইরানের টিকিয়ে রাখার ক্ষমতা এবং বিশ্ব জ্বালানি সরবরাহ বিঘ্নিত করার শক্তিকে ভুল হিসাব করেছেন। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইসরায়েলের সঙ্গে যৌথভাবে ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’ নামে ট্রাম্প যে অভিযান শুরু করে, তার পেছনে ৯/১১-এর মতো কোনো জাতীয় ট্রমা বা জরুরি কারণ ছিল না। অনেক বিশ্লেষকের মতে, এটি ছিল ট্রাম্পের একান্ত নিজস্ব পছন্দের যুদ্ধ।

আফগানিস্তানের তালেবানের মতো ইরানও হয়তো সেই নীতিই অনুসরণ করছে, ধৈর্য ধরে যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক সমর্থন ক্ষয় হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করছে। তার ওপর বুশের সময় তাও কিছু কিছু মার্কিন মিত্র দেশ সাথে ছিল, কিন্তু গ্রিনল্যান্ড দখল, ন্যাটো নিয়ে প্রশ্ন ও শুল্কনীতির কারণে ট্রাম্পের এই যুদ্ধে ইউরোপীয় বা এশীয় মিত্রদের সহায়তা মিলছে না বললেই চলে।

ইরাক বা আফগানিস্তান যুদ্ধ শুরু হওয়ার সময় মার্কিন জনগণের সমর্থন ছিল, যা পরে কমে যায়। কিন্তু ট্রাম্পের ইরান যুদ্ধ শুরু থেকেই আমেরিকানদের কাছে অপ্রিয়। এমনকি তাঁর ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ আন্দোলনের অনুসারীরাও এই তৎপরতার সমালোচনা করছেন।

তবে ট্রাম্পের সমর্থকেরাও পিছিয়ে নেই। ওয়াশিংটনভিত্তিক গবেষণাপ্রতিষ্ঠান ‘ফাউন্ডেশন ফর ডিফেন্স অব ডেমোক্রেসিস’-এর প্রধান মার্ক ডুবোভিটজের দাবি, 'এ কোনো অনন্ত যুদ্ধ নয়। ট্রাম্প বরং ৪৭ বছর ধরে যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে ইরানের চালানো যুদ্ধের উপযুক্ত জবাব দিচ্ছেন।'