মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের এক সাংবাদিককে দেশটির ভেতরে চীনা সরকারের অ্যাজেন্ট হিসেবে কাজ করার দায়ে দুই বছরের ফেডারেল কারাদণ্ড দেয়া হয়েছে। দেশটির বিচার বিভাগ মঙ্গলবার (১ সেপ্টেম্বর) এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানিয়েছে।
টেক্সাসের বাসিন্দা ৫১ বছর বয়সী থমাস ওয়েয়ার পাউকেন দ্বিতীয় চলতি বছরের শুরুতে দোষ স্বীকার করেন। তার আইনজীবী চার্লস বার্নহ্যাম জানান, পাউকেনের আপিল করার কোনো পরিকল্পনা নেই।
বিচার বিভাগের বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী, পাউকেন আরো ৩৬ মাস নজরদারির অধীনে মুক্ত থাকবেন। তবে এ সময়ে তিনি বিদেশ ভ্রমণ করতে পারবেন না। তাকে ফেব্রুয়ারিতে গ্রেফতার করা হয়েছিল।
ওয়াশিংটন ও বেইজিংয়ের মধ্যে উত্তেজনা অব্যাহত থাকার মধ্যে যথাযথভাবে তথ্য প্রকাশ না করে চীনা সরকারের হয়ে কাজ করার অভিযোগে কয়েকজনের বিরুদ্ধে ফেডারেল পর্যায়ে মামলা হয়। তারই ধারাবাহিকতায় সর্বশেষ ঘটনা এটি।
বিচার বিভাগের সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জাতীয় নিরাপত্তাবিষয়ক সহকারী অ্যাটর্নি জেনারেল জন এ আইজেনবার্গ বলেন, চীনের রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা মন্ত্রণালয়ের (এমএসএস) কার্যক্রমে সহায়তা, নিয়োগ ও সম্ভাব্য অ্যাজেন্টদের কাছ থেকে সংবেদনশীল তথ্য সংগ্রহের জন্য পাউকেন অর্থের বিনিময়ে নিজের দেশের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করেছেন।
২০১০ সালে চীনে যাওয়ার পর পাউকেন বিভিন্ন চীনা সংবাদ সংস্থায় সাংবাদিক হিসেবে কাজ করেন। এর মধ্যে রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম সিসিটিভিও রয়েছে। সর্বশেষ তিনি চীনের রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা সিনহুয়ার একজন সম্পাদক হিসেবে কাজ করছিলেন। ২০২৪ সাল থেকে তিনি এই পদে ছিলেন।
তার আইনজীবী বলেন, পাউকেন তার দায় স্বীকার করেছেন এবং আদালতের সাজাকে সম্মান করেন। তবে সরকার আদালতে স্বীকার করেছে, পাউকেন চীনাদের কোনো গোপনীয় তথ্য দেননি।
আদালতের নথি অনুযায়ী, ২০১৯ সাল থেকে ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত পাউকেন এমন কয়েকজনের নির্দেশনায় কাজ করেন, যারা চীনা সরকারের হয়ে কাজ করেন বলে তিনি জানতেন। তাদের মধ্যে একজনের নাম ‘ক্যাথি’, যার সাথে তার ২০১৭ সালে পরিচয় হয়।
এফবিআইয়ের বিশেষ অ্যাজেন্ট টিমোথি জে হিলির ২৭ ফেব্রুয়ারি দাখিল করা ফেডারেল আদালতের হলফনামা অনুযায়ী, ‘ক্যাথি’ তাকে বলেছিলেন, তার তৈরি প্রতিবেদনগুলো চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং পড়তেন।
বিচার বিভাগ জানিয়েছে, ‘ক্যাথি’র সাথে কাজ করার জন্য পাউকেন কমপক্ষে এক লাখ ডলার পেয়েছেন।
প্রতিবেদন লেখার পাশাপাশি ‘ক্যাথি’ পাউকেনকে গোপনীয় তথ্য সরবরাহ করতে সক্ষম ব্যক্তিদের নিয়োগ করতেও বলেছিলেন। এক ঘটনায় হলফনামায় ‘পারসন ১’ হিসেবে চিহ্নিত এক ব্যক্তির সাথে দেখা করে তাকে একটি স্যামসাং ফোন, একটি কম্পিউটার এবং সিগন্যাল ও টেলিগ্রামের পাসওয়ার্ড দেয়ার নির্দেশ দেয়া হয়। পাশাপাশি তাকে নেটডিস্ক ব্যবহারের সুযোগ দেয়ার কথাও ছিল।
২০২৫ সালের জানুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্রে ফেরার সময় কাস্টমস অ্যান্ড বর্ডার প্রোটেকশনের (সিবিপি) কর্মকর্তারা পাউকেনকে থামান। সিবিপি ও এফবিআই কর্মকর্তাদের জিজ্ঞাসাবাদে পাউকেন বলেন, ট্রাম্প প্রশাসনে চাকরি পাওয়ার চেষ্টা করা ওই ব্যক্তি চীনকে গোপনীয় তথ্য সরবরাহ করবেন—এ বিষয়ে তিনি ‘৮০ শতাংশ নিশ্চিত’ ছিলেন।
তবে হলফনামা অনুযায়ী, পাউকেন ওই ব্যক্তিকে তা না করার পরামর্শ দিয়েছিলেন। হলফনামায় বলা হয়, পাউকেন তদন্তকারীদের আরো জানিয়েছিলেন, বছরের পর বছর ‘ক্যাথি’ সাধারণত যুক্তরাষ্ট্রে তার ভ্রমণের খরচ বহন করতেন এবং প্রায়ই তার স্ত্রীর ব্যাংক হিসাবে অর্থ পাঠাতেন।
চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বুধবার এ রায় নিয়ে মন্তব্যের জন্য করা অনুরোধের তাৎক্ষণিক কোনো জবাব দেয়নি।
চীনের সাথে কাজ করার সময় টেক্সাসের বাসিন্দা পাউকেন তার বাবার অনুরোধে ‘টম ম্যাকগ্রেগর’ ছদ্মনাম ব্যবহার করতেন। তার বাবার নামও থমাস পাউকেন এবং তিনি চীনে ছেলের কাজ থেকে নিজেকে দূরে রাখতে চেয়েছিলেন।
পাউকেন তার আসল নাম থমাস ডব্লিউ পাউকেন দ্বিতীয় নামে দু’টি বইও প্রকাশ করেন। এর একটি ২০১৯ সালে যুক্তরাষ্ট্র-চীন সম্পর্ক নিয়ে এবং অন্যটি ২০২৩ সালে চীনের মূল ভূখণ্ডে হংকংয়ের বিপরীতে অবস্থিত শহর শেনঝেন নিয়ে প্রকাশিত হয়।
পাউকেনের বাবা ১৯৯০-এর দশকে টেক্সাস রিপাবলিকান পার্টির সাবেক চেয়ারম্যান ছিলেন এবং এক দশকেরও বেশি আগে গভর্নর পদে নির্বাচন করেছিলেন।
ম্যাকগ্রেগরের নামে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে সর্বশেষ পাবলিক পোস্টে পাউকেন তার স্ত্রী ও সন্তানের সাথে ভ্রমণের ছবি শেয়ার করে লিখেছিলেন, ‘আমি ও আমার পরিবার ওয়াশিংটন ডিসিতে ভ্রমণ উপভোগ করছি।’
ওই মাসের পরেই তাকে গ্রেফতার করা হয়।
সূত্র : ইউএনবি



