প্রকৃতির ত্রিমুখী আক্রমণ: ধোঁয়া, আগুন আর বন্যায় বিপর্যস্ত মার্কিন জনজীবন

একদিকে জ্বলছে বনভূমি, অন্যদিকে ভাসছে জনপদ; বৈশ্বিক উষ্ণায়নের চরম মূল্য দিচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র

নয়া দিগন্ত অনলাইন
দাবানলের ধোঁয়ার চাদর ভেদ করে এম্পায়ার স্টেট বিল্ডিংয়ের পাশে সূর্য উঠছে।
দাবানলের ধোঁয়ার চাদর ভেদ করে এম্পায়ার স্টেট বিল্ডিংয়ের পাশে সূর্য উঠছে। |সংগৃহীত

এক অভূতপূর্ব প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের মুখোমুখি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। ইরান, রাশিয়া বা কোনো বাহ্যিক শত্রু নয়, এবারের গ্রীষ্মে দেশটির জনজীবনকে অস্থির করে তুলেছে খোদ প্রকৃতি।

রয়টার্স শনিবার (১৮ জুলাই) জানিয়েছে, ধোঁয়া, দাবদাহ, দাবানল আর বন্যার ত্রিমুখী আক্রমণে একযোগে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে দেশের তিন প্রান্ত।

একদিকে ধোঁয়া, অন্যদিকে আগুন

কানাডার দাবানলের বিষাক্ত ধোঁয়ায় ছেয়ে গেছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পূর্ব উপকূল। গ্রেট লেকস থেকে শুরু করে ওয়াশিংটন ডিসি পর্যন্ত আকাশ এখন কমলা-বাদামি। আমেরিকার প্রায় এক-তৃতীয়াংশ মানুষ অর্থাৎ ১০ কোটিরও বেশি বাসিন্দা এখন চরম ঝুঁকিপূর্ণ বাতাসের মুখোমুখি। শিকাগোর বাতাস বিশ্বের দ্বিতীয় শীর্ষ দূষিত বাতাসের তালিকায় জায়গা করে নিয়েছে।

অন্যদিকে, দেশের পশ্চিম প্রান্তে দাবানল দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে। মাত্র একদিনের ব্যবধানে দাবানলের সংখ্যা প্রায় দুই ডজন বেড়ে এখন ১৫টি অঙ্গরাজ্যে মোট ৬৮টি বড় ধরনের আগুন জ্বলছে। প্যাসিফিক নর্থওয়েস্টে বজ্রপাতের পর রাতারাতি ১৭টি নতুন অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। ১৭ হাজার ৪০০ জনের বেশি কর্মী, ১৪০টি হেলিকপ্টার এবং সামরিক বিমান আগুন নেভাতে দিনরাত কাজ করছে। চলতি বছর ইতোমধ্যে প্রায় ৩৭ লাখ ২০ হাজার একর এলাকা পুড়ে ছাই হয়ে গেছে।

বন্যায় ভাসছে দক্ষিণ প্রান্ত

আগুন ও ধোঁয়ার সমান্তরালে দেশের দক্ষিণ প্রান্তে চলছে বন্যার তাণ্ডব। টেক্সাসের হিল কান্ট্রিতে টানা তিন দিন ধরে ভয়াবহ আকস্মিক বন্যা চলছে। কোনো কোনো এলাকায় গত মঙ্গলবার থেকে ২৭ ইঞ্চির বেশি বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। টেক্সাসের গভর্নর গ্রেগ অ্যাবট জানান, বন্যায় এ পর্যন্ত দুইজনের মৃত্যুর খবর নিশ্চিত হওয়া গেছে। শত শত মানুষকে পানি থেকে উদ্ধার করা হয়েছে। আবহাওয়া অফিস জানিয়েছে, বৃষ্টি কমলেও নদীগুলোর পানি আরও বাড়তে পারে।

বিপর্যয়ের মূলে জলবায়ু পরিবর্তন

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ জেসি বারম্যানের মতে, একসাথে একাধিক প্রাকৃতিক দুর্যোগের এই মিলন পরিস্থিতিকে আরও বেশি বিপজ্জনক করে তুলেছে। জলবায়ু বিজ্ঞানী মাইকেল মান জানিয়েছেন, মানুষের তৈরি জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বায়ুমণ্ডলের জেট স্ট্রিম বা বায়ুপ্রবাহ আটকে যাওয়ার ঘটনা ১৯৫০ সালের পর থেকে তিন গুণ বেড়েছে। ফলে চরম আবহাওয়া কোনো একটি অঞ্চলে দীর্ঘ সময় ধরে আটকে থেকে ধ্বংসযজ্ঞ চালাচ্ছে।

বিজ্ঞানীরা বলছেন, তাপমাত্রা বাড়ার ফলে মাটি থেকে দ্রুত আর্দ্রতা শুষে নিচ্ছে বাতাস, যা বনাঞ্চলকে শুকনো ও আগুন লাগার উপযোগী করে তুলছে। আবার উষ্ণ বাতাস বেশি পরিমাণে জলীয় বাষ্প ধরে রাখতে পারে বলেই টেক্সাসের মতো জায়গায় হচ্ছে রেকর্ড ভাঙা ভারী বৃষ্টি। অর্থাৎ, জলবায়ু পরিবর্তন একই সাথে খরা, দাবানল এবং অতিরিক্ত বৃষ্টির ঝুঁকি বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে।