যুক্তরাষ্ট্রের খনি অঞ্চলে আশঙ্কাজনকভাবে বাড়ছে ‘ব্ল্যাক লাং’ রোগ

দীর্ঘদিন ধরে বারবার কয়লার ধুলা শ্বাসের সাথে ফুসফুসে ঢুকলে সেখানে ক্ষত ও দাগ তৈরি হয়। ফলে ধীরে ধীরে শ্বাস নিতে কষ্ট হয়। এই রোগে ফুসফুসের যে ক্ষতি হয়, তা স্থায়ী চিকিৎসার মাধ্যমে আগের অবস্থায় ফিরিয়ে নেয়া যায় না।

নয়া দিগন্ত অনলাইন
‘ব্ল্যাক লাং’ কয়লাখনি শ্রমিকদের ফুসফুসের রোগ নামে পরিচিত
‘ব্ল্যাক লাং’ কয়লাখনি শ্রমিকদের ফুসফুসের রোগ নামে পরিচিত |সংগৃহীত

একসময় ছেলের সাথে মাছ ধরতে যেতে খুব ভালোবাসতেন জন। কিন্তু পশ্চিম ভার্জিনিয়ার কয়লাখনিতে ২০ বছর কাজ করার পর ৪৫ বছর বয়সে এসে এখন সামান্য শারীরিক পরিশ্রম করাও তার জন্য প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে।

‘আমি কিছুই করতে পারি না,’ বললেন শক্তপোক্ত গড়নের এই ব্যক্তি। কথা বলতেও তার কষ্ট হচ্ছিল।

জন বলেন, ‘আমি শ্বাস নিতে পারি না, আর এতে আমার জীবনের সবকিছুই বদলে গেছে।’

সাবেক নিয়োগকর্তার বিরুদ্ধে করা একটি মামলার সাথে যুক্ত থাকায় নিজের পরিচয় গোপন রাখতে ‘জন’ ছদ্মনাম ব্যবহার করছেন তিনি। চিকিৎসকেরা তার কোল ওয়ার্কার্স নিউমোকোনিওসিস শনাক্ত করেছেন, যা সাধারণভাবে ‘ব্ল্যাক লাং’ বা কয়লাখনি শ্রমিকদের ফুসফুসের রোগ নামে পরিচিত।

দীর্ঘদিন ধরে বারবার কয়লার ধুলা শ্বাসের সাথে ফুসফুসে ঢুকলে সেখানে ক্ষত ও দাগ তৈরি হয়। ফলে ধীরে ধীরে শ্বাস নিতে কষ্ট হয়।

এই রোগে ফুসফুসের যে ক্ষতি হয়, তা স্থায়ী চিকিৎসার মাধ্যমে আগের অবস্থায় ফিরিয়ে নেয়া যায় না। একপর্যায়ে রক্তে পর্যাপ্ত অক্সিজেন পৌঁছাতে না পারায় রোগটি প্রাণঘাতীও হতে পারে।

প্রতি তিনজনের একজন আক্রান্ত
অ্যাপালাচিয়া-অ্যাপালাচিয়ান পর্বতমালাকে ঘিরে গড়ে ওঠা বিশাল অঞ্চল, যার মধ্যে পুরো পশ্চিম ভার্জিনিয়া এবং আরো প্রায় এক ডজন অঙ্গরাজ্যের কিছু অংশ রয়েছে-যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম প্রধান কয়লাখনি অঞ্চল।

এ অঞ্চলে প্রায় ৩০ হাজার কয়লাখনি শ্রমিক কাজ করেন। জনের মতো দুর্ভোগে ভোগা শ্রমিকের সংখ্যাও কম নয়।

যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট ফর অকুপেশনাল সেফটি অ্যান্ড হেলথ (এনআইওএসএইচ) চলতি মাসে প্রকাশিত এক গবেষণায় জানিয়েছে, ২৫ বছরের বেশি সময় ধরে খনিশিল্পে কাজ করা শ্রমিকদের প্রতি তিনজনের একজন ব্ল্যাক লাং রোগে আক্রান্ত।

গবেষণার সহলেখক ও এনআইওএসএইচের মহামারি বিশেষজ্ঞ স্কট লেনি বলেন, ১৯৭০-এর দশক থেকে হিসাব করলে বর্তমান পরিস্থিতি সবচেয়ে খারাপ হওয়াটা অত্যন্ত উদ্বেগজনক।

কেন ফের বাড়ছে এ রোগ?
অ্যাপালাচিয়া অঞ্চলে গত ২০ বছর বা তারও বেশি সময় ধরে ব্ল্যাক লাং রোগের হার বাড়ছে। এর আগে কয়লার ধুলার সংস্পর্শ সীমিত করতে বিভিন্ন বিধিনিষেধ চালু হওয়ায় রোগটির হার কমে এসেছিল।

বিশেষজ্ঞদের মতে, বর্তমান পরিস্থিতির অন্যতম প্রধান কারণ সিলিকা। কয়লার তুলনায় সিলিকা প্রায় ২০ গুণ বেশি ক্ষতিকর।

সহজে উত্তোলনযোগ্য কয়লা শেষ হয়ে যাওয়ার পর খনি শ্রমিকদের আরো গভীরে পাথরের স্তরে খনন করতে হচ্ছে। এতে বাতাসে সূক্ষ্ম সিলিকা ধুলা ছড়িয়ে পড়ছে।

লেনির ব্যাখ্যা অনুযায়ী, সিলিকার এই বাড়তি সংস্পর্শের কারণে আগের তুলনায় আরো বেশি সংখ্যক শ্রমিক কম বয়সেই এবং আরো গুরুতরভাবে অসুস্থ হয়ে পড়ছেন।

ওক হিল শহরের একটি বিশেষায়িত ক্লিনিকে ব্ল্যাক লাং রোগে আক্রান্ত সবচেয়ে কম বয়সী রোগীর বয়স ছিল মাত্র ৩০ বছর। পরীক্ষায় তার শরীরে ব্ল্যাক লাং রোগের সবচেয়ে গুরুতর ধরন ‘প্রগ্রেসিভ ম্যাসিভ ফাইব্রোসিস’ শনাক্ত হয়।

নিউ রিভার হেলথের ব্রিদিং সেন্টার অ্যান্ড ব্ল্যাক লাং ক্লিনিকের পরিচালক এমেরি বলেন, ‘এটা এখন আর দাদার সময়ের রোগ নয়। এখন এটি স্বামীদের রোগ, ছেলেদের রোগ।’

তার ভাষ্য অনুযায়ী, চল্লিশের কোঠায় থাকা কয়েকজন রোগী এখন দুই ফুসফুস প্রতিস্থাপনের অপেক্ষমাণ তালিকায় রয়েছেন। তাদের বেঁচে থাকার বাস্তবসম্মত একমাত্র আশাই এখন ফুসফুস প্রতিস্থাপন।

তিনি বলেন, ‘উপসর্গের চিকিৎসা করা যায়, কিন্তু ব্ল্যাক লাং রোগের কোনো নিরাময় নেই।’

‘পুরোপুরি প্রতিরোধযোগ্য রোগ’
পরিস্থিতি মোকাবেলায় যুক্তরাষ্ট্রের মাইন সেফটি অ্যান্ড হেলথ অ্যাডমিনিস্ট্রেশন (এমএসএইচএ) ২০২৪ সালে সিলিকার সংস্পর্শের অনুমোদিত মাত্রা কমিয়ে একটি নতুন বিধিমালা গ্রহণ করে। বিজ্ঞানীদের মতে, নতুন মাত্রাটি তুলনামূলকভাবে নিরাপদ।

তবে খনি মালিকদের বিভিন্ন সংগঠন এই বিধিমালার বিরুদ্ধে মামলা করেছে। তাদের দাবি, নিয়ম মেনে চলা হচ্ছে কি-না, তা নির্ধারণে সরকারের নির্ধারিত মানদণ্ড অত্যন্ত কঠোর।

একটি ফেডারেল আপিল আদালত পরে বিধিমালাটি স্থগিত করেন। ফলে এটি কখনো কার্যকর হয়নি এবং এমএসএইচএ অনির্দিষ্টকালের জন্য এর বাস্তবায়ন স্থগিত রেখেছে।

যুক্তরাষ্ট্রের খনি মালিকদের প্রধান লবিং সংগঠন ন্যাশনাল মাইনিং অ্যাসোসিয়েশন এএফপিকে জানিয়েছে, তারা সিলিকার অনুমোদিত মাত্রা কমানোর বিষয়টিকে সম্পূর্ণভাবে সমর্থন করে।

তবে সংগঠনটির মুখপাত্র অ্যাশলি বার্ক বলেন, সাম্প্রতিক ব্ল্যাক লাং রোগের ঘটনা বর্তমান খনি শিল্পের পরিস্থিতির পুরোপুরি প্রতিফলন করে না। কারণ রোগের উপসর্গ দেখা দিতে অনেক সময় লাগে। গত দুই দশকে খনিতে ধুলার মাত্রা ব্যাপকভাবে কমেছে।

খনি শ্রমিকদের অধিকার নিয়ে কাজ করা বেসরকারি সংস্থা অ্যাপালাচিয়ান সিটিজেনস ল’ সেন্টারের এক গবেষণায় দেখা গেছে, ২০২৫ সালে এমএসএইচএ যেসব খনি পরীক্ষা করেছে, প্রতি পাঁচটির একটিতে সিলিকা ধুলার মাত্রা বিপজ্জনক পর্যায়ে ছিল। এর মধ্যে প্রায় ১০টি খনিতে সিলিকার মাত্রা এমএসএইচএ-এর প্রস্তাবিত, কিন্তু এখনো কার্যকর না হওয়া সীমার দ্বিগুণ ছিল।

ন্যাশনাল ব্ল্যাক লাং অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি ও সাবেক খনিশ্রমিক গ্যারি হেয়ারস্টন বলেন, কিছু কোম্পানি ধুলা পরিদর্শকদের এড়িয়ে চলার উপায় জানে।

নিজেও ব্ল্যাক লাং রোগে আক্রান্ত হেয়ারস্টনের অভিযোগ, ‘তারা কয়লাখনি শ্রমিকদের নিয়ে চিন্তিত নয়। তাদের কাছে আমরা শুধু একটি সংখ্যা।’

তার ভাষায়, ‘তারা শুধু কত কয়লা উত্তোলন করছে, সেটাই নিয়ে চিন্তা করে।’

প্রায় ৪০ বছর ধরে ভ্যালি হেলথ সিস্টেমসের ব্ল্যাক লাং রোগীদের নিয়ে কাজ করা ডেবি উইলসের কাছে পরিস্থিতি আরো উদ্বেগজনক। কারণ তার মতে, এই রোগটি ‘সম্পূর্ণভাবে প্রতিরোধযোগ্য।

তিনি বলেন, ‘কারো এই রোগে আক্রান্ত হওয়ার কথা নয়। কিন্তু খনিতে ধুলা নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা সঠিকভাবে ব্যবহার না করলে এবং খনি যথাযথভাবে পরিচালনা না করলে শ্রমিকেরা আক্রান্ত হবেন।’

সূত্র: বাসস