দক্ষিণ আফ্রিকার অর্থনৈতিক প্রাণকেন্দ্র জোহানেসবার্গে ব্যাপক অবৈধ খনন কার্যক্রমের কারণে একটি ব্যস্ত সড়কের বড় অংশ ধসে পড়েছে।
শহরের বিভিন্ন এলাকায়ও একই চিত্র। ওয়েমার প্যান রোডে দেখা দিয়েছে অসংখ্য ফাটল ও গর্ত। শহরের মাটির নিচে স্বর্ণ ও অন্যান্য খনিজের সন্ধানে অবৈধ খননকারীরা বিস্ফোরণ ঘটিয়ে মাটি খুঁড়তে থাকায় এসব গর্ত ও ফাটল তৈরি হয়েছে। খবর বার্তা সংস্থা এএফপির।
স্থানীয় বাসিন্দা ও কর্মকর্তারা বলছেন, দিন-রাত চলা এই অবৈধ খনন কার্যক্রম জোহানেসবার্গের অবকাঠামোর ওপর ভয়াবহ চাপ তৈরি করছে। এতে পরিবহন ও বিদ্যুৎ ব্যবস্থা থেকে শুরু করে বাড়িঘর ও বিভিন্ন ভবনও ঝুঁকির মুখে পড়ছে। একইসাথে বিভিন্ন সশস্ত্র গ্যাংয়ের মধ্যে আধিপত্যের লড়াইকে কেন্দ্র করে অপরাধও বাড়ছে।
জোহানেসবার্গের কেন্দ্রের উত্তর-পশ্চিমে রুডেপোর্ট এলাকায় বসবাসকারী ৪৫ বছর বয়সী ভোনিন ট্রম্পেটার এএফপিকে বলেন, ‘শুরুতে মাটির নিচে বিস্ফোরণ ও কম্পনের কারণে আমাদের ফ্ল্যাট কাঁপত। আমরা সেটা অনুভব করতাম।’
তিনি বলেন, ‘এখন এলাকায় গোলাগুলির ঘটনাও ঘটছে। এটা খুবই ভয়ঙ্কর।’
দক্ষিণ আফ্রিকায় অবৈধ খনন কার্যক্রমে আশপাশের বিভিন্ন দেশ থেকে আসা হাজার হাজার দরিদ্র মানুষ যুক্ত হচ্ছেন। তারা একটানা কয়েক দিন পর্যন্ত মাটির গভীরে অবস্থান করে খননকাজ চালান।
স্থানীয়ভাবে তাদের ‘জামা জামা’ বলা হয়। জুলু ভাষায় এর অর্থ ‘যারা চেষ্টা করে’। এসব শ্রমিকের বেশিরভাগই ভারী অস্ত্র বহন করেন। তারা খনি কোম্পানিগুলোর পরিত্যক্ত গভীর খনিতে নেমে যান অথবা নিজেরাই নতুন সুড়ঙ্গ তৈরি করেন।
গৌতেং প্রদেশের আইনসভার সদস্য মাইকেল সান বলেন, এসব অবৈধ খননকারীরা বিদ্যুতের তার চুরি করে, পানির পাইপ ক্ষতিগ্রস্ত করে এবং রাস্তা খুঁড়ে ফেলে।
তিনি বলেন, ‘শেষ পর্যন্ত ভুগতে হয় কাদের? ভুগতে হয় সাধারণ বাসিন্দাদের।’
জোহানেসবার্গের কেন্দ্রের কাছে ডেনভার এলাকায় এক ব্যবসায়ী এএফপিকে তার কারখানার প্রবেশপথ থেকে প্রায় ১০০ মিটার দূরে একটি বিশাল গর্ত দেখান। তার দাবি, প্রতি সপ্তাহে বিপুলসংখ্যক অবৈধ খননকারী ওই গর্ত দিয়ে মাটির নিচ থেকে বের হয়ে আসেন।
৬৩ বছর বয়সী ওই ব্যবসায়ী পরিচয় প্রকাশ না করার অনুরোধ করে বলেন, ‘আমাদের ভবনগুলোর নিচে কী ঘটছে, তা নিয়ে আমরা খুবই উদ্বিগ্ন।’
প্রতিষ্ঠানের বিভিন্ন স্থানে থাকা ফাটল দেখিয়ে তিনি জানান, মাটির নিচে বিস্ফোরণের কারণেই এসব ফাটল তৈরি হয়েছে বলে তিনি মনে করেন।
জোহানেসবার্গের বিদ্যুৎ সরবরাহকারী সংস্থা শহরের বিদ্যুৎ নেটওয়ার্ক জানিয়েছে, অবৈধ খননের কারণে তাদের অবকাঠামো ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
বিদ্যুৎ নেটওয়ার্ক-এর মুখপাত্র আইজ্যাক মাঙ্গেনা বলেন, ‘মাটির নিচে খননকাজের কারণে ভূমির স্থিতিশীলতা নষ্ট হচ্ছে। এতে বিদ্যুৎ উপকেন্দ্র, ট্রান্সফরমার, বৈদ্যুতিক খুঁটি এবং বিদ্যুৎ সঞ্চালন টাওয়ারগুলো ঝুঁকির মধ্যে পড়েছে।’
তিনি আরো বলেন, ‘কিছু এলাকায় মাটির নিচে অবৈধ খনন কার্যক্রম বাড়তে থাকায় ইতোমধ্যে বিভিন্ন অবকাঠামো দেবে যেতে শুরু করেছে।’
অপরাধ ও অবৈধ খননের বিরুদ্ধে পুলিশের অভিযান জোরদার করতে গত মার্চে প্রেসিডেন্ট সিরিল রামাফোসা গৌতেং প্রদেশজুড়ে সেনা মোতায়েন করেন।
আফ্রিকার সবচেয়ে ধনী শহর হিসেবে পরিচিত জোহানেসবার্গের জন্ম হয়েছিল ১৮৮০-এর দশকের স্বর্ণের খনি আবিষ্কারকে কেন্দ্র করে। শহরের কিছু এলাকায় বৈধ খনন কার্যক্রম এখনো চলছে। তবে প্রধান সোনার খনি অঞ্চলের পাশে শত শত পরিত্যক্ত খনির সুড়ঙ্গও রয়েছে।
খনি বিশেষজ্ঞ ডেভিড ভ্যান ওয়াইক বলেন, এসব পরিত্যক্ত খনির কিছু অংশে ‘জামা জামা’রা আবার খনন চালাচ্ছে। অন্য অনেক খনি আবার অ্যাসিডযুক্ত পানিতে ভরে আছে, যা ভূমিতে বড় বড় গর্ত বা সিঙ্কহোল তৈরিতে ভূমিকা রাখছে।
তিনি সতর্ক করে বলেন, ‘অবকাঠামোর ক্ষয়ক্ষতির দিক থেকে পরিস্থিতি আরো খারাপ হতে যাচ্ছে।’
ভ্যান ওয়াইকের হিসাব অনুযায়ী, দক্ষিণ আফ্রিকায় ৩৪ হাজারের বেশি অবৈধ খননকারী রয়েছে।
তিনি বলেন, খনির বর্জ্য ফেলে তৈরি স্তূপের ওপর গড়ে ওঠা অনানুষ্ঠানিক বসতিগুলোর বাসিন্দারা অসুস্থ হয়ে পড়ছেন। তার আশঙ্কা, আরো অনেক বাড়িতে ফাটল ধরবে এবং সেগুলো সিঙ্কহোলে ধসে পড়তে পারে।’



