ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার চুক্তির পর দু’পক্ষই তাদের জনগণের কাছে এই চুক্তিকে সাফল্য হিসেবে উপস্থাপন করেছে। কিন্তু এখানে বিশ্লেষকরা ব্যাখ্যা করেছেন, কেউই নিজের দেশে এই বিজয়ের বিষয়টি পুরোপুরি প্রতিষ্ঠিত করাতে পারেনি। আবার উভয় পক্ষের দেশীয় সমালোচকরা বলছেন, চুক্তিতে অতিরিক্ত ছাড় দেয়া হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের সাথে এই চুক্তি ইরানের জন্য যুদ্ধবিরতির মতোই গুরুত্বপূর্ণ আরেকটি বিষয়। আত্মসমর্পণ না করেও যুদ্ধে টিকে থাকাই শুধু নয়; বরং আরো শক্তিশালী হয়ে ওঠার দাবি করার একটি সুযোগ এটি।
শুরু থেকেই যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলকে পরাজিত করা তেহরানের মূল লক্ষ্য ছিল না; বরং লক্ষ্য ছিল সঙ্ঘাত থেকে এমন অবস্থায় বেরিয়ে আসা, যাতে ইসলামিক প্রজাতন্ত্র অক্ষত থাকে, নেতৃত্ব কার্যকর থাকে এবং তাদের দরকষাকষির অবস্থান পুরোপুরি ভেঙে না পড়ে।
এই চুক্তি যেটিকে মূলত বলা হচ্ছে সমঝোতা স্মারক (এমওইউ), এটি ইরানকে বলার সুযোগ করে দিয়েছে যে, তারা তা অর্জন করেছে।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানের পৃথকভাবে স্বাক্ষরিত এই দলিলে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে আলোচনার জন্য ৬০ দিনের কাঠামো নির্ধারণ করা হয়েছে।
পাশাপাশি এতে সব ফ্রন্টে সামরিক কার্যক্রম অবিলম্বে বন্ধ, লেবাননসহ সার্বভৌমত্বের পারস্পরিক সম্মান, হরমুজ প্রণালী পুনরায় খুলে দেয়া এবং ইরানি জাহাজ চলাচলের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের নৌ অবরোধ প্রত্যাহারের বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়েছে।
এদিকে হরমুজ প্রণালী দিয়ে নিরাপদ বাণিজ্যিক চলাচল নিশ্চিত করতে সহায়তা, পারমাণবিক অস্ত্র অর্জনের চেষ্টা করবে না বলে অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করা এবং উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম ও সমৃদ্ধকরণ কর্মসূচির ভবিষ্যৎ নিয়ে আলোচনায় বসতে সম্মত হয়েছে তেহরান।

যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিশ্রুতিগুলো তুলনামূলকভাবে বিস্তৃত
এমওইউ অনুযায়ী, ওয়াশিংটন নৌ অবরোধ প্রত্যাহার শুরু করবে, ইরানি তেল রফতানির জন্য ছাড় দেবে, ইরানের জব্দ বা নিয়ন্ত্রিত করে রাখা সম্পদ উন্মুক্ত করবে, নিষেধাজ্ঞা শিথিলের পথে অগ্রসর হবে এবং আঞ্চলিক অংশীদারদের সাথে ইরোনের জন্য অন্তত ৩০০ বিলিয়ন ডলারের পুনর্গঠন ও অর্থনৈতিক উন্নয়ন পরিকল্পনা এগিয়ে নেবে।
এতে বোঝা যায়, কেন ইরানের সমালোচকদের প্রতিক্রিয়া এখন পর্যন্ত তুলনামূলক নীরব। ইরানের নেতৃত্বকে চুক্তিকে সাফল্য হিসেবে উপস্থাপনের মতো যথেষ্ট উপাদান রয়েছে সমঝোতায়। যেমন— সার্বভৌমত্বের স্বীকৃতি, অবরোধ প্রত্যাহারের প্রতিশ্রুতি, নিষেধাজ্ঞা শিথিলের সম্ভাবনা এবং পুনর্গঠন তহবিলের উল্লেখ।
তবে এই নীরবতা দীর্ঘস্থায়ী হওয়ার সম্ভাবনা কম
ইরানের সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনির প্রাথমিক প্রতিক্রিয়াও ছিল সাবধানতার সাথে ভারসাম্যপূর্ণ। তিনি চুক্তি এগোতে সম্মত হয়েছেন। পাশাপাশি স্পষ্ট করেছেন, এটি গ্রহণ করা হয়েছে ইরানের সর্বোচ্চ জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের দায়িত্বে।
এদিকে যুদ্ধের দুই পক্ষের মধ্যে সবচেয়ে জটিল বিষয়গুলো স্থগিত রাখা হয়েছে, সমাধান হয়নি। উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের ভবিষ্যৎ, সমৃদ্ধকরণের পরিমাণ এবং ক্ষতিগ্রস্ত পারমাণবিক স্থাপনাগুলোর পুনর্গঠন এখন আলোচনায় তীব্র চাপের বিষয় হবে।
এর ফলে তেহরানের নেতৃত্বের জন্য এক ধরনের সমস্যা তৈরি হচ্ছে। রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম, রেভল্যুশনারি গার্ড কোর, পার্লামেন্ট ও কট্টরপন্থি ব্যক্তিত্বরা সপ্তাহের পর সপ্তাহ তাদের সমর্থকদের বলে এসেছেন, ইরান যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলকে পরাজিত করেছে। তাই প্রত্যাশা এখন অনেক উঁচু।
সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম বা পারমাণবিক অবকাঠামো নিয়ে যেকোনো সমঝোতাকে সমালোচকরা বিজয় ঘোষণার পর দেয়া ছাড় হিসেবে তুলে ধরতে পারেন। কিন্তু কোনো সমঝোতা না করাও সমান ঝুঁকিপূর্ণ। যদি তেহরান উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম বা পারমাণবিক কর্মসূচির ভবিষ্যৎ নিয়ে এগোতে অস্বীকার করে, তাহলে প্রক্রিয়াটি ভেঙে পড়তে পারে এবং যুদ্ধবিরতিও চাপের মুখে পড়তে পারে।

অন্যদিকে ওয়াশিংটন ও ইসরাইলের সেই মতকে জোরদার করবে যারা মনে করে, ইরান শুধু সময় নেয়ার জন্যই এই সমঝোতা চুক্তিতে ব্যবহার করেছে এবং এতে উভয় পক্ষ আবার যুদ্ধের দিকে চলে যেতে পারে।
ইরানের পার্লামেন্টের স্পিকার ও আলোচক দলের প্রধান মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ আলোচনাকে দৃঢ় ভঙ্গিতে উপস্থাপন করার চেষ্টা করেছেন। তিনি রাষ্ট্রীয় টিভিতে বলেন, ‘আমি কূটনীতিক নই, কিন্তু আমি ভালো করেই জানি কিভাবে আমেরিকাকে বোঝাতে হয়।’
মোজতবা খামেনির প্রতিক্রিয়া সেই কাজকে আরো কঠিন করে তুলেছে। তিনি জানান, নীতিগতভাবে তার ভিন্ন মতামত আছে, তবে প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান সর্বোচ্চ জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের প্রধান হিসেবে ইরান ও তার মিত্রদের অধিকার রক্ষার দায়িত্ব নেয়ায় তিনি এমওইউ অনুমোদন করেছেন।
সূত্র : বিবিসি



