হরমুজ, মালাক্কাসহ গুরুত্বপূর্ণ প্রণালীগুলো শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে ভূরাজনৈতিক উত্তেজনার কেন্দ্র

ঐতিহাসিক ও কৌশলগত কারণে হরমুজ, মালাক্কাসহ প্রধান সামুদ্রিক প্রণালীগুলো আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের মূল ভিত্তি এবং ভূরাজনৈতিক উত্তেজনার প্রধান কেন্দ্র।

নয়া দিগন্ত অনলাইন
গুরুত্বপূর্ণ প্রণালীগুলো মানচিত্র
গুরুত্বপূর্ণ প্রণালীগুলো মানচিত্র |সংগৃহীত

হরমুজ ও বিশ্বের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক প্রণালী ষোড়শ শতাব্দী থেকে বৈশ্বিক বাণিজ্যের অন্যতম ভিত্তি হিসেবে কাজ করে আসছে। একইসাথে এগুলো ইতিহাসজুড়ে ভূরাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতারও উৎস হয়ে উঠেছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, ইরান যখন হরমুজ প্রণালীর ওপর তার নিয়ন্ত্রণ আরো জোরদার করছে, তখন ইয়েমেনে তাদের মিত্র হুউছি বিদ্রোহীরা সৌদি আরবের বন্দর থেকে এবং বন্দরের উদ্দেশে লোহিত সাগর হয়ে চলাচলকারী জাহাজে বিঘ্ন ঘটাতে চায়। তারা সুয়েজ খালে যেতে জাহাজগুলোকে যে বাব আল-মান্দেব প্রণালী অতিক্রম করতে হয়, সেখানকার নৌ চলাচলেও ব্যাঘাত ঘটাতে পারে।

উপসাগর ও লোহিত সাগরে প্রবেশের এই দুটি পথ আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে বিবেচিত প্রায় এক ডজন প্রণালীর মধ্যে অন্যতম।

তেল ও গ্যাসবাহী ট্যাংকার, বাল্ক ক্যারিয়ার এবং কাঁচামাল ও পণ্যবোঝাই কনটেইনার জাহাজ এসব সংকীর্ণ প্রাকৃতিক নৌপথ দিয়ে চলাচল করে।

১৯৮২ সালের ১০ ডিসেম্বর মন্টেগো বে-তে স্বাক্ষরিত জাতিসঙ্ঘের সমুদ্র আইনকে সমুদ্রের এক ধরনের সংবিধান হিসেবে বিবেচনা করা হয়। বোর্দোর সায়েন্সের প্রভাষক এবং জিওপলিটিক্স অব মেরিটাইম স্পেসেস গ্রন্থের লেখক সিলভাঁ ডোমের্গ বলেন, এই সনদে প্রণালীকে এমন একটি প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্য হিসেবে স্বীকৃতি দেয়া হয়েছে, যেখানে কোনো ধরনের টোল আরোপ করা যাবে না এবং অবাধ নৌ চলাচলের নীতি নিশ্চিত করা হয়েছে।

অন্যদিকে পানামা বা সুয়েজের মতো কৃত্রিম খালগুলোর ক্ষেত্রে সেগুলোর নিয়ন্ত্রণকারী রাষ্ট্র টোল আদায় করতে পারে।

ডোমের্গ বলেন, ‘মন্টেগো বে সনদে অনুসমর্থন না করলেও ইরান এতদিন পর্যন্ত প্রথাগত আন্তর্জাতিক আইনের ভিত্তিতে সেটি মেনে চলেছে।’

তিনি বলেন, ভারতগামী সমুদ্রপথ প্রথম উন্মুক্ত করা পর্তুগাল ১৫০৭ সালেই হরমুজের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করেছিল। এর উদ্দেশ্য ছিল মসলা ও প্রাচ্যের সম্পদের ওপর একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত করা।

‘সমুদ্র কারো একার নয়’

তবে বিখ্যাত এক বিতর্কের পর সপ্তদশ শতাব্দীর শুরুতে ডাচ আইনজ্ঞ ও দার্শনিক হুগো গ্রোটিয়াসের মারে লিবেরুম বা ‘মুক্ত সমুদ্র’ তত্ত্ব প্রতিষ্ঠা পায়। সেই ধারণা অনুযায়ী, দূরপাল্লার আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের জন্য প্রণালীগুলো অপরিহার্য, কারণ ‘সমুদ্র কারও একার নয়।’

ডোমের্গ বলেন, ‘নৌ চলাচলের স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে হলে প্রথমেই প্রণালীগুলো দিয়ে অবাধ যাতায়াত নিশ্চিত করতে হতো।’

তার মতে, নেদারল্যান্ডস এ নীতি গ্রহণ করে এবং সমুদ্রে অবাধ চলাচলের পক্ষে অবস্থান নেয়। পরে ব্রিটেন এবং এরপর যুক্তরাষ্ট্রও একই নীতি অনুসরণ করে। যুক্তরাষ্ট্র এখনো মন্টেগো বে সনদের প্রায় সব বিধান মেনে চলে, যদিও দেশটিও সনদটি অনুসমর্থন করেনি।

তবে ডোমের্গ বলেন, অবাধ নৌ চলাচলের নীতি থাকা সত্ত্বেও ব্রিটেন তার উপনিবেশ বিস্তারের কৌশল অনেকাংশে গুরুত্বপূর্ণ প্রণালিগুলোর ভৌগোলিক অবস্থানের ওপর ভিত্তি করেই নির্ধারণ করেছিল।

ব্রিটেনের প্রধান সামরিক ঘাঁটিগুলো গড়ে তোলা হয়েছিল কৌশলগত নৌপথের পাশে। এশিয়ায় তাদের সবচেয়ে বড় ঔপনিবেশিক নৌঘাঁটি ছিল সিঙ্গাপুরে। এর মাধ্যমে তারা মালাক্কা প্রণালির ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেছিল। বর্তমানে চীন থেকে বিশ্বের সবচেয়ে বেশি সমুদ্রপথের পণ্যবাহী জাহাজ এই প্রণালী দিয়ে চলাচল করে।

ব্রিটেন বাব আল-মান্দেব প্রণালী ও লোহিত সাগরের প্রবেশমুখের কাছে সোকোত্রা দ্বীপেও সামরিক ঘাঁটি স্থাপন করেছিল।

ইউরোপে বাল্টিক সাগরের প্রবেশপথ নিয়ন্ত্রণকারী ডেনিশ প্রণালিগুলো- ওরেসুন্ড ও কাটেগাট ঊনবিংশ শতাব্দীতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ছিল।

ডোমের্গ বলেন, এসব প্রণালীর মাধ্যমে ডেনমার্ক দীর্ঘদিন টোল আদায় করেছিল। এগুলোর কৌশলগত গুরুত্বও রয়েছে, কারণ এগুলো বাল্টিক অঞ্চলের শক্তিগুলোর, বিশেষ করে রাশিয়ার, আটলান্টিক মহাসাগরে প্রবেশের পথ নিয়ন্ত্রণ করে।

ব্যতিক্রমী তুরস্ক

বর্তমানে যেসব গুরুত্বপূর্ণ প্রণালীতে এখনো টোল আদায় করা হয়, তার মধ্যে রয়েছে তুরস্কের বসফরাস ও দারদানেলিস প্রণালী। এগুলো ১৯৩৬ সালের মন্ট্রো চুক্তির আওতায় পরিচালিত হয়।

ডোমের্গ বলেন, ‘দীর্ঘমেয়াদে অন্যান্য প্রণালীকে ঘিরেও নতুন প্রশ্ন সামনে আসবে।’ তিনি দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় চীনের ঘোষিত আঞ্চলিক দাবির প্রেক্ষাপটে তাইওয়ান প্রণালী এবং সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া ও ইন্দোনেশিয়ার মধ্যে অবস্থিত মালাক্কা প্রণালীর কথা উল্লেখ করেন।

তিনি বলেন, ‘তাইওয়ান প্রণালীতে ইতোমধ্যে ‘বালুর যুদ্ধ’ চলছে। চীনের নির্মাণ খাতের জন্য চীনা জাহাজ তাইওয়ানের দাবিকৃত নৌসীমা থেকে সামুদ্রিক বালু সংগ্রহ করছে। এটি উসকানিমূলক পদক্ষেপ।’

ডোমের্গ জানান, ইরান যেদিন সন্ধ্যায় হরমুজ প্রণালীতে টোল চালুর পরিকল্পনা ঘোষণা করে, সেদিনই মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী বলেন, এটি খুবই ভালো ধারণা এবং মালাক্কা প্রণালীতেও একই ব্যবস্থা চালুর কথা তিনি বিবেচনা করতে পারেন। তবে পরে তিনি ওই অবস্থান থেকে সরে আসেন।

ডোমের্গ বলেন, ‘মালাক্কা প্রণালীতে যদি টোল আরোপ করা হয়, তাহলে পূর্ব এশিয়ার বাণিজ্যিক কেন্দ্র হিসেবে সিঙ্গাপুর তার জৌলুস ও মর্যাদার একটি বড় অংশ হারাবে।’

সূত্র : বাসস