০৭ জুলাই ২০২২, ২৩ আষাঢ় ১৪২৯, ৭ জিলহজ ১৪৪৩
`
সংসদে উঠছে রোববার

ইসি আইন নিয়ে রাজনৈতিক দল ও বিশিষ্টজনের মত নেয়া উচিত

বিশেষজ্ঞদের অভিমত
-

নির্বাচন কমিশন (ইসি) গঠনে অবশেষে আইন প্রণয়ন করতে যাচ্ছে সরকার। আইনমন্ত্রী আনিসুল হক বলেছেন, আগামী ২৩ জানুয়ারি রোববার সংসদে এই আইনটা উপস্থাপন করব। এরপর আমরা দুই তিন দিনের মধ্যে পাস করার চেষ্টা করব। এরই মধ্যে আইনের খসড়া আইন মন্ত্রণালয়ের লেজিসলেটিভ বিভাগের ওয়েবসাইটে দেয়া নির্দেশ দেয়া হয়েছে এবং এ বিষয়ে সবাই মতামত দিতে পারবেন। এই আইন অনুযায়ী নতুন নির্বাচন কমিশন গঠন হবে বলে জানান তিনি। তবে প্রস্তাবিত আইনের এই খসড়ায় সার্চ কমিটির মাধ্যমে নির্বাচন কমিশন গঠন এবং প্রধান নির্বাচন কমিশনার ও নির্বাচন কমিশনার হওয়ার জন্য যেসব শর্ত দেয়া হয়েছে তার একাধিক বিষয় নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন বিশেষজ্ঞরা। তাদের মতে, অনুসন্ধান কমিটিকেই বৈধভাবে সাংবিধানিক আইনে রূপ দেয়া হচ্ছে। আর তাড়াহুড়া না করে রাজনৈতিক দলসহ বিশিষ্টজনদের মতামত নিয়ে নির্বাচন কমিশন গঠন আইন করা উচিত বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা।

তারা বলেন, নৈতিক স্খলনজনিত ফৌজদারি অপরাধে কমপক্ষে দুই বছর কারাদণ্ডে দণ্ডিত হন তা হলে প্রধান নির্বাচন কমিশনার ও কমিশনার হতে পারবেন না। প্রস্তাবিত আইনে অন্তর্ভুক্ত এই কথার অর্থ দাঁড়ায় দুই বছরের কম দণ্ডিত ব্যক্তিও প্রধান নির্বাচন কমিশনার বা কমিশনার হতে পারবেন। আইনবিশেষজ্ঞদের মতে, এটা পারবেন না নৈতিক স্খলনের কারণে। ১ টাকা ঘুষ গ্রহণ প্রমাণিত হলেও তা নৈতিক স্খলন হবে। তা হলে কি সাজাপ্রাপ্তদের এখানে আনার জন্য এই আইন করা হচ্ছে?

তবে এ বিষয়ে আনিসুল হক বলেন, এখানে যদি বলা হয় শুধু সার্চ কমিটি গঠন করার জন্য তাহলে আমার মনে হয়, আইনটাকে সার্বিকভাবে দেখা হচ্ছে না। সংবিধানের ১১৮ অনুচ্ছেদে এটা রাষ্ট্রপতির নিয়োগ। সেজন্য আইনটা এ রকম হয়েছে। এখানে পার্লামেন্টে দেয়ার সুযোগ নেই। তিনি বলেন, এখানে সার্চ কমিটির ছয়জনের মধ্যে চারজন সাংবিধানিক পদে আছেন।

আইনমন্ত্রী বলেন, আমরা চাই এই আইনটা এই সংসদে পাস হোক। পাস হয়ে ১৪ ফেব্রুয়ারি এই ইলেকশন কমিশনের মেয়াদ শেষ হবে এবং নতুন ইলেকশন কমিশন হবে, সেই ইলেকশন কমিশন এই আইনের মাধ্যমে হোক। এটা আমাদের ইচ্ছা। আমরা চাচ্ছি আমাদের স্বার্থে না দেশের স্বার্থে এই আইনটা হোক। আগে কেন এই আইন হলো না এই প্রশ্নের জবাবে আইনমন্ত্রী বলেন, গত দুই বছর আমরা খুব একটা আইন করতে পারিনি। আমরা চেয়েছিলাম সবার অংশগ্রহণমূলক ইনক্লুসিভ আইন করতে, সেটা ইনক্লুসিভ হয়নি।

আইনমন্ত্রী বলেন, ২৩ জানুয়ারি রোববার সংসদে এই আইনটা উপস্থাপন করব। এরপর চেষ্টা করব আমরা যদি পারি দুই তিন দিনের মধ্যে পাস করব।

এ বিষয়ে সাবেক নির্বাচন কমিশনার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব:) ড. এম সাখাওয়াত হোসেন বলেন, আমি নির্বাচন কমিশন গঠনে আইন প্রণয়নের উদ্যোগকে সাধুবাদ জানাই। উদ্যোগটা অনেক দেরিতে হয়েছে। আমার কাছে যে প্রশ্নগুলো থেকে যাচ্ছে তা হলো- ইলেকশন কমিশন নিয়োগের ব্যাপারে যেটা পড়েছি বা জেনেছি সেই নিয়োগের বিষয় সেখানে নেই। আমি বিশ^াস করি, গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায়, এই পার্লমেন্টই গণতন্ত্রের কেন্দ্রবিন্দু। আমাদের উপমহাদেশে যেখানে স্বাধীন নির্বাচন কমিশন আছে সেখানে পার্লামেন্টের একটি ভূমিকা রয়েছে। পার্লামেন্ট ফাইনাল সিলেকশন করে। আর রাষ্ট্রপতি ফাইনালি নিয়োগ দেন। এটি অর্ধেকটা আধা আইন হয়েছে। খসড়া হয়েছে। আমি বলব পূর্ণ বা পুরোপুরি আইনটা হবে।

এম সাখাওয়াত হোসেন বলেন, আমি এ জন্য এটাকে সার্চ কমিটির আইন বলছি। এখানে নির্বাচন কমিশন নিয়োগের কথা বলা হচ্ছে সার্চ কমিটির মাধ্যমে। বলা হচ্ছে সার্চ কমিটি নামগুলো রাষ্ট্রপতির কাছে পাঠাবে। সার্চ কমিটির কাজ হচ্ছে শর্টলিস্ট করে নামগুলো পাঠান। আমি মনে করি এটা নিয়ে আরো কিছু চিন্তাভাবনার জায়গা আছে।

এ বিষয়ে সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী জেড আই খান পান্না দুই বছরের কম দণ্ডিত ব্যক্তিও প্রধান নির্বাচন কমিশনার বা কমিশনার হতে পারবেন, খসড়ায় এমন বিধান থাকার বিষয়ে বলেন, এটা পারবেন না নৈতিক স্খলনের কারণে। ১ টাকা ঘুষ গ্রহণ প্রমাণিত হলেও তা নৈতিক স্খলন হবে। তিনি বলেন, তা হলে কি এখানে সাজাপ্রাপ্তদের আনার জন্য এটা করা হয়েছে? তিনি বলেন, সংবিধানের ১১৮ অনুচ্ছেদে বলা আছে, নির্বাচন কমিশন গঠনে আইন করতে হবে। কিন্তু আইন করার ব্যাপারে আমরা সুনির্দিষ্ট মতে আসতে পারিনি। কিন্তু আমাদের প্রত্যাশা হলো- এই আইনে জনগণের আশা-আকাক্সক্ষার প্রতিফলন থাকতে হবে, যাতে নির্বাচনটা সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও সুন্দরভাবে হয়। এখানে অনুসন্ধান কমিটিকেই বৈধভাবে সাংবিধানিক আইনে রূপ দেয়া হচ্ছে।

তিনি বলেন, সরকার অনুসন্ধান কমিটির বিষয়টাকে এখন আইন হিসেবে করে নিচ্ছে। তারা সংসদে সংখ্যাগরিষ্ঠ, তাই সহজেই সংসদে পাস করিয়ে নিতে পারবে। এটা তাদের জন্য সুবিধাজনক। বিরোধীদল বিএনপি বলছে, এই সরকারের অধীনে তারা কোনো নির্বাচনে অংশগ্রহণ করবে না। কিন্তু তাদেরও দাবি ছিল সংবিধান অনুযায়ী নির্বাচন করার জন্য একটা আইন করা হোক।

তিনি আরো বলেন, নির্বাচন কমিশনকে এমনভাবে শক্তিশালী করতে হবে, যাতে তারা নিজেরাই প্রতিষ্ঠান হিসেবে ক্ষমতা প্রয়োগ করতে পারে। নির্বাচনকালীন সরকারের ওপরও তারা কর্তৃত্ব দেখাতে পারে। যখন-তখন যেকোনো ডিসি, এসপিকে সরিয়ে দিতে পারবে। সে ধরনের ক্ষমতা যদি কমিশনকে দিয়ে দেয়া হয় এবং সেটি প্রয়োগ করার মানসিকতা যদি তাদের থাকে, তাহলেই পরিবর্তন আনা সম্ভব। আমার কাছে সবচেয়ে বড় ব্যত্যয় বলে মনে হয়, আমরা স্বাধীনতা কাকে বলে, সেটিই ভুলে গেছি। যেমন অনেকে বলেন বিচার বিভাগ স্বাধীন নয়। কিন্তু কেউ যদি ওপর থেকে বিচার বিভাগের ওপর কর্তৃত্ব ফলাতে চায় এবং বিচারক যদি সেটা অবজ্ঞা করেন বা না মানেন, তাহলে বিচারকের কোনো ক্ষতি হওয়ার আশঙ্কা নেই। এখানে ক্ষমতা বা স্বাধীনতা যে তার আছে, সেটি তো বিচারককে বুঝতে হবে। নির্বাচন কমিশনের ক্ষেত্রেও আমরা যতই সেটিকে প্রাতিষ্ঠানিক স্বাধীনতা দিই না কেন, তাদের তো আগে বুঝতে হবে কী ক্ষমতাটা তাদের আছে।

তিনি বলেন, প্রশ্ন হলো- আমরা আইনটি কেন চেয়েছি? জাতীয় নির্বাচন কিংবা স্থানীয় নির্বাচন যেটিই হোক না যেন, অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচন যেন হয়। মানুষ নির্বিঘেœ তাদের ভোট যেন দিতে পারেন। নির্বাচনকালে যেন প্রশাসনের ওপর নির্বাচন কমিশনের কর্তৃত্ব থাকে।

প্রসঙ্গত প্রধান নির্বাচন কমিশনার ও নির্বাচন কমিশনার নিয়োগ আইনের খসড়া সোমবার অনুমোদন দেয় মন্ত্রিসভা। ওই দিন বৈঠক শেষে সচিবালয়ে ব্রিফিংয়ে মন্ত্রিপরিষদ সচিব খন্দকার আনোয়ারুল ইসলাম বলেন, অনুসন্ধান কমিটির মাধ্যমে সিইসি ও ইসি নিয়োগ করা হবে। তিনি জানান, প্রধান নির্বাচন কমিশনারের বয়স ৫০ বছর হতে হবে। সরকারি আধা-সরকারি ও বিচার বিভাগের কোনো গুরুত্বপূর্ণ পদে ২০ বছরের অভিজ্ঞতা থাকতে হবে। মন্ত্রিপরিষদ সচিব বলেন, সিইসি ও কমিশনার নিয়োগের জন্য একটি সার্চ কমিটি গঠন করা হবে। ছয় সদস্যের এই সার্চ কমিটির প্রধান হিসেবে থাকবেন প্রধান বিচারপতির মনোনীত আপিল বিভাগের একজন বিচারপতি।

 


আরো সংবাদ


premium cement