০৩ ডিসেম্বর ২০২০

মহামারীর স্থবিরতা শিগগির কাটছে না

রাজনীতি-অর্থনীতিসহ বিপর্যস্ত জীবন জীবিকা
-

মহামারী করোনায় মারাত্মক ক্ষতির মধ্যে পড়েছে মানুষের জীবন-জীবিকা। বিশ্বব্যাপী ঝেঁকে বসা এই ভাইরাসের শিগগিরই বিদায় যেমন অনিশ্চিত, তেমনি এই ক্ষতি থেকে বেরিয়ে আসার পথও অনেক কঠিন। চরম ক্ষতির মুখে পরা অর্থনীতির চাকা পুরোপুরি সচল হতে দীর্ঘ সময় লাগবে, এমনটিই বলছেন বিশ্লেষকরা। অচলাবস্থা চলছে রাজনীতিতেও। মাঠের রাজনীতি ঘরবন্দী অবস্থা থেকে কবে নাগাদ মাঠে গড়াবে, তা কেউ বলতে পারছেন না। সাধারণ মানুষ ভীতি কাটিয়ে রাস্তায় বের হওয়ার চেষ্টা করলেও, তা জমজমাট হতে যে দীর্ঘ সময় লাগবে, সেটি স্পষ্ট। মানুষের চলাচল স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত পরিবহন, পর্যটনসহ সব ধরনের ব্যবসা-বাণিজ্যে যে মন্দাভাব চলছে, তা কাটার কোনো সুযোগ নেই। শিক্ষাখাতও পিছিয়ে গেছে প্রায় এক বছর।
অর্থনৈতিক স্থবিরতা কাটাতে সংক্রমণের ঝুঁকি নিয়েই জুনের শুরু থেকেই সব কিছু সীমিত পরিসরে খোলা রেখেছে সরকার। কিন্তু দেড় মাস পেরিয়ে গেলেও অবস্থার উল্লেখযোগ্য কোনো পরিবর্তন হয়নি। মানুষ এখনো নিয়ন্ত্রিতভাবেই জীবনযাপন করছে।
ব্র্যাক, ডেটা সেন্স ও উন্নয়ন সমন্বয়ের সাম্প্রতিক সমীক্ষা অনুযায়ী- করোনায় বাংলাদেশের ১০ কোটি ২২ লাখ মানুষের আয় কমে গেছে। আর পরিবার হিসাবে আয় কমেছে শতকরা ৭৪ ভাগ পরিবারের।
ওই সমীক্ষায় বলা হয়েছে, করোনায় অর্থনৈতিক ও স্বাস্থ্যগত ঝুঁকিতে থাকা ১০ কোটিরও বেশি মানুষের মধ্যে পাঁচ কোটি ৩৬ লাখ মানুষ চরম দরিদ্র অবস্থার মধ্যে আছেন। যাদের এখন দৈনিক আয় দুই ডলারের কম। তাদের মধ্যে চার কোটি ৭৩ লাখ উচ্চ অর্থনৈতিক ঝুঁকি এবং তিন কোটি ৬৩ লাখ মানুষ উচ্চ স্বাস্থ্যঝুঁকিতে রয়েছেন। এই সময়ে পোশাক খাতে বড় ধাক্কা লেগেছে। তৈরী পোশাক খাতে রফতানি ২০১৯-এর এপ্রিলের চেয়ে চলতি বছরের এপ্রিলে ৮৪ শতাংশ কমেছে।
করোনাকালে অনলাইন বা ডিজিটাল শিক্ষাকার্যক্রম অংশ নেয়া অনেক শিক্ষার্থীর পক্ষে সম্ভব হচ্ছে না। কারণ দেশে মাত্র ৩৪ শতাংশ পরিবারের স্মার্টফোন আছে। টিভি দেখার সুযোগ আছে ৫৪ শতাংশ পরিবারের। এর বাইরের শিশুরা ডিজিটাল মাধ্যমে পরিচালিত শিক্ষা থেকে বাদ পড়ে যাচ্ছে। করোনায় অর্থনৈতিক এবং স্বাস্থ্যঝুঁকিতে আছেন নিম্ন আয়ের মানুষ।
আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) প্রতিবেদন অনুযায়ী, বড় বিপর্যয়ে পড়েছে বাংলাদেশের অর্থনীতি। এরই মধ্যে তিনটি বড় খাত মারাত্মক ঝুঁকিতে রয়েছে। প্রথমত, পোশাক রফতানি তলানিতে নামায় মোট রফতানি আয়ে ধস নেমেছে। দ্বিতীয়ত, ২৬ মার্চ থেকে দুই মাসের অবরুদ্ধ (লকডাউন) অবস্থার কারণে অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে পুরোপুরি স্থবিরতা নেমে আসে। এতে দেশজ উৎপাদন ও চাহিদা বিপর্যয়ের মধ্যে পড়েছে। তৃতীয়ত, রেমিট্যান্স বা প্রবাসী আয় কমতে শুরু করেছে।
অর্থনীতির পাশাপাশি মন্দাবস্থা চলছে সব খাতে। করোনাকালে থমকে গেছে রাজনীতি। রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মানুষের মাঝে রাজনীতি নিয়ে এখন আগ্রহ অনেকটাই কমে গেছে। জীবন-জীবিকা হুমকির মুখে থাকায় মানুষ রাজনীতি নিয়ে মাথা ঘামানোর কোনো সুযোগ পাচ্ছে না। রাজনীতিবিদরাও সতর্ক জীবনযাপন করছেন। দলের নেতাদের খুব একটা দেখা যাচ্ছে না। সাংগঠনিক কর্মকাণ্ড নেই। খুব শিগগিরই এসব সচলও হচ্ছে না। করোনাকালে ডিজিটাল রাজনীতি কিছুটা চললেও তাতে সাধারণ মানুষের কোনো অংশগ্রহণ নেই।
দেশের শিক্ষা খাতে করোনা মারাত্মক প্রভাব ফেলেছে। অন্যান্য সেক্টর সীমিত পরিসরে চালু হলেও শিক্ষাব্যবস্থা এখনো লকডাউনে রয়েছে। করোনার কারণে উচ্চশিক্ষায় এক বছরের সেশন জট তৈরি পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। অনলাইনের মাধ্যমে এই খাত কিছুটা সচল রাখার চেষ্টা করা হচ্ছে। তাতে খুব একটা সাড়া পাওয়া যাচ্ছে না। বেসরকারি বহু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ইতোমধ্যে বন্ধ হয়ে গেছে। অনেক শিক্ষক সংসার চালাতে সাধারণ কাজ বেছে নিয়েছেন।
শ্রমজীবী মানুষ এই করনোয় দারুণভাবে বিপদে পড়েছেন। অনেকের চাকরি চলে গেছে। কেউ আছেন কম বেতনে। কেউ রুজি হারিয়ে রাজধানী ছেড়ে চলে গেছেন। নগরবাসীকে জীবন চালাতে কঠিন সংগ্রাম করতে হচ্ছে। করোনা ব্যক্তি বা পারিবারিক জীবনে যে প্রভাব ফেলেছে, তা থেকেও শিগগিরই মুক্তি নেই।
বিশ্লেষকরা বলছেন,করোনার ক্ষতি পুষিয়ে উঠতে দুই বছর বা তার চেয়েও বেশি সময় লেগে যেতে পারে।


আরো সংবাদ