০১ ডিসেম্বর ২০২০

১১ নদীর পানি বিপদসীমার উপরে, বন্যার অবনতির শঙ্কা

ভাঙন অব্যাহত : লাখ লাখ মানুষ গৃহহীন
দেওয়ানগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী অফিসারের কার্যালয় চত্বরে চলছে নৌকা : নয়া দিগন্ত -

দেশের ১১টি নদীর পানি ১৫টি পয়েন্ট বিপদসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। এতে দেশের উত্তর-পূর্বাংশের কুড়িগ্রাম, গাইবান্ধা, বগুড়া, জামালপুর, সিরাজগঞ্জ ও টাঙ্গাইল জেলা প্লাবিত হয়েছে। অন্য দিকে বন্যার পানিতে প্লাবিত হয়েছে সিলেট ও সুনামগঞ্জও। সুনামগঞ্জে লাখ লাখ লোক পানিবন্দী হয়ে পড়েছে। জামালপুরে তিনটি গুচ্ছগ্রাম ডুবে যাওয়ায় অনেকে গৃহহীন হয়েছেন। গোবিন্দগঞ্জে ভাঙনে ১৫টি পরিবারের বাড়িঘর নদীতে বিলীন হয়ে গেছে। বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র জানিয়েছে, বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকলে সার্বিক বন্যা পরিস্থিতির আরো অবনতি হতে পারে।
যে ১৫ পয়েন্ট দিয়ে পানি বিপদসীমার ওপরে প্রবাহিত হচ্ছে, সেগুলো হলো ধরলা নদীর কুড়িগ্রাম পয়েন্ট, ঘাগট নদীর গাইবান্ধা পয়েন্ট, ব্রহ্মপুত্র নদীর নুনখাওয়া ও চিলমারী পয়েন্ট, যমুনা নদীর ফুলছড়ি, বাহাদুরাবাদ, সারিয়াকান্দি, কাজিপুর, সিরাজগঞ্জ পয়েন্ট, আত্রাই নদীর বাঘাবাড়ি পয়েন্ট, ধলেশ্বরীর এলাসিন, পদ্মার গোয়ালন্দ, সুরমার কানাইঘাট ও সুনামগঞ্জ পয়েন্ট এবং পুরনো সুরমার দিরাই এলাকায় পানি বিপদসীমার ওপরে অবস্থান করছে।
সুরমায় ঢলের পানিতে প্লাবিত নিম্নাঞ্চল বন্যা পরিস্থিতির পর্যবেক্ষণে কন্ট্রোলরুম চালুর বিষয়ে পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের জনসংযোগ কর্মকর্তা আসিফ আহমেদ জানান, বন্যা পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ ও তথ্য সংগ্রহে কন্ট্রোল রুম চালু করা হয়েছে। কন্ট্রোল রুমের নম্বর হচ্ছে ০১৩১৮-২৩৪৫৬০।
বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্রের নির্বাহী প্রকৌশলী আরিফুজ্জামান ভূইয়া বলেন, এখন যে পরিস্থিতি আছে তা আগামী ৪-৫ দিন প্রায় একই রকম থাকবে। এরপর আবার বৃষ্টি শুরু হলে পানি বাড়তে পারে। এতে দেশের উত্তর-পূর্ব ও মধ্যাংশের যেসব এলাকা এখন প্লাবিত, সেখানে পানির উচ্চতা বাড়বে এবং নতুন নতুন এলাকা প্লাবিত হওয়ার শঙ্কা রয়েছে। তিনি আরো বলেন, এর মধ্যে সিলেট ও সুনামগঞ্জের পরিস্থিতি ভালো হবে। তবে আগামী সপ্তাহে ওই এলাকাগুলো আবার প্লাবিত হতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেন তিনি।
ধরলায় ভাঙনসতর্কীকরণ কেন্দ্রের পূর্বাভাসে বলা হয়, ব্রহ্মপূত্র-যমুনার পানি সমতল স্থিতিশীল আছে, যা আগামী ৪৮ ঘণ্টা পর্যন্ত অব্যাহত থাকতে পারে। গঙ্গা-পদ্মার পানি সমতল বৃদ্ধি পাচ্ছে, যা আগামী ৪৮ ঘণ্টা পর্যন্ত অব্যাহত থাকতে পারে। আবার মেঘনা অববাহিকার প্রধান নদীগুলোর পানি সমতল কমছে, যা আগামী ৪৮ ঘণ্টা পর্যন্ত অব্যাহত থাকতে পারে।
পূর্বাভাসে আরো বলা হয়, আগামী ২৪ ঘণ্টায় যমুনা নদীর আরিচা এবং ৪৮ ঘণ্টায় পদ্মা নদীর ভাগ্যকূল পয়েন্টে পানি বিপদসীমা অতিক্রম করতে পারে। এতে পরিস্থিতি আরো অবনতি হতে পারে। এ দিকে আগামী ২৪ ঘণ্টায় কুড়িগ্রাম, গাইবান্ধা, বগুড়া, জামালপুর, সিরাজগঞ্জ ও টাঙ্গাইল জেলার বন্যা পরিস্থিতি স্থিতিশীল থাকতে পারে।
বগুড়ায় যমুনার পানি বৃদ্ধি অব্যাহত : বগুড়া অফিস ও সারিয়াকান্দি সংবাদদাতা, বগুড়ায় যমুনা নদীর পানি গতকাল আরো বেড়ে বিপদসীমার ৬৬ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়। ফলে যমুনা নদীর চরাঞ্চলের ৬টি ইউনিয়নের প্রায় ৮০০ পরিবার গৃহহীন এবং ৭ হাজার ৫৩৫ হেক্টর জমির বিভিন্ন ধরনের ফসল তলিয়ে গেছে।
উপজেলা কৃষি অফিস জানায়, পানির নিচে ফসলের মধ্যে রয়েছে পাট, আউশ ধান, শাকসবজি, ভুট্টা। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা রাসেল মিয়া চালুয়াবাড়ী ইউনিয়নে বন্যাকবলিতদের মাঝে গতকাল বিকেলে খাদ্যসামগ্রী বিতরণ করেছেন। ক্ষতিগ্রস্ত ইউনিয়নগুলো হলো, চালুয়াবাড়ী, হাটশেরপুর, বোহাইল, কর্ণিবাড়ী, চন্দনবাইশা, কাজলা। গৃহহারা মানুষজন পানি উন্নয়ন বোর্ডের বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ ও উঁচু স্থানে আশ্রয় নিয়েছে।
ধুনট উপজেলার গোসাইবাড়ী ও ভাণ্ডারবাড়ী ইউনিয়নের যমুনার নিচু এলাকা পানিতে তলিয়ে গেছে। বৈশাখীর চরের মানুষের দুর্ভোগ শুরু হয়েছে।
সোনাতলায় ১০ হাজার মানুষ পানিবন্দী : সোনাতলা (বগুড়া) সংবাদদাতা জানান, বগুড়ার সোনাতলায় উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে উপজেলার ৯টি চরে বাড়ি ঘরের পানি উঠেছে। এতে করে প্রায় ১০ হাজার মানুষ পানিবন্দী হয়ে পড়েছে। এ ছাড়া শত শত হেক্টর জমির পাট ও আউশ ধান বন্যার পানিতে তলিয়ে গেছে।
উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর সূত্রে জানা গেছে, চলতি বছর বগুড়ার সোনাতলা উপজেলায় ১৭২০ হেক্টর জমিতে পাট ও ৩ হাজার ৫০০ হেক্টর জমিতে আউশ ধান রোপণ করা হয়েছে। ইতোমধ্যেই বন্যার পানিতে ৪৫০ হেক্টর পাট ও ১২ শ’ হেক্টর আউশ ধান পানির নিচে তলিয়ে গিয়েছে। প্রতিনিয়ত এভাবে পানি বাড়তে থাকলে প্রায় ৩০ হাজার মানুষ পানিবন্দী হয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। নদী উপকূলীয় মানুষগুলো তাদের পরিবার-পরিজন লইয়া বিপাকে পড়েছে।
সুনামগঞ্জে কয়েক লাখ লোক পানিবন্দী : সুনামগঞ্জ সংবাদদাতা জানান, টানা কয়েক দিনের ভারী বর্ষণ ও উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলের পানিতে সুনামগঞ্জের বিভিন্ন উপজেলার নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হচ্ছে। জেলা শহরের কিছু কিছু এলাকায় রাস্তাঘাট ও বাসাবাড়ি থেকে পানি নামতে শুরু করলেও জেলার ছাতক, দোয়ারাবাজার, তাহিরপর, জামালগঞ্জ, বিশ্বম্ভরপুর, দক্ষিণ সুনামগঞ্জ, দিরাই ও শাল্লাসহ ১১টি উপজেলায় ঘরবন্দী হয়ে পড়েছেন কয়েক লাখ মানুষ। অনেক পরিবার নিজেদের ঘরবাড়ি ছেড়ে আত্মীয়স্বজনদের বাড়িতে ও আশ্রয়কেন্দ্রে ঠাঁই নিয়েছেন। পানি বাড়ার কারণে জামালগঞ্জ-সুনামগঞ্জ সড়কের উজ্জ্বলপুর নামক স্থানে সড়ক ভেঙে জেলা সদরের সাথে উপজেলাবাসীর যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। এ ছাড়া সুনামগঞ্জ-তাহিরপুর, দিরাই-শাল্লা, বিশ্বম্ভরপুর ও ছাতক-দোয়ারার যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে।
এ দিকে জেলা শহরের আশপাশের দুই শতাধিকের উপরে অসহায় পরিবার সুনামগঞ্জ সরকারি কলেজে আশ্রয় নিয়ে মানবেতন জীবনযাপন করছে। ইতোমধ্যে জেলার সব ক’টি উপজেলায় আশ্রয়কেন্দ্র খোলা হয়েছে। অধিকাংশ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে আশ্রয়কেন্দ্র হিসেবে প্রস্তুত রাখা হয়েছে। সুনামগঞ্জ শহরের কাজির পয়েন্ট, উকিলপাড়া, নতুনপাড়া, বড়পাড়া সাহেববাড়ি ঘাট, ষোলঘর, হাজীপাড়া, জামতলাসহ অধিকাংশ এলাকার বাসাবাড়ি রাস্তাঘাটের পানি কিছুটা নামতে শুরু করলেও অধিকাংশ বাসাবাড়ি এখনো পানির নিচে রয়েছে। জেলার বিভিন্ন উপজেলা থেকে প্রাপ্ত খবরে জানা যায়, উপজেলা সদরের আশপাশ ও হাওর এলাকার বিভিন্ন গ্রামে বন্যায় ‘কোথাও বুক পানি, কোথাও কোমর সমান পানি হয়েছে।
এ দিকে জেলার বিভিন্ন উপজেলায় কোটি টাকার বেশি মাছের পোনা ভেসে গেছে। এছাড়া অবকাঠামোর ক্ষতি হয়েছে অনেক। সবচেয়ে বেশি মৎস্য সম্পদের ক্ষতি হয়েছে বিশ্বম্ভরপুর উপজেলায়।
ক্ষয়ক্ষতির বিষয়ে জামালগঞ্জ উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা বিশ্বজিত দেব বলেন, বন্যার্তদের মাঝে সরকারি সহায়তা প্রদান চলমান রয়েছে। মৎস্য চাষিদের জন্য প্রয়োজনীয় সহায়তার ব্যবস্থা করা হবে। বিশ্বম্ভরপুর উপজেলা চেয়ারম্যান সফর উদ্দিন বলেন, ‘আকস্মিক পাহাড়ি ঢল ও অতিবৃষ্টিতে সৃষ্ট বন্যায় মৎস্য চাষিরা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। আমি ইতোমধ্যেই অনেক এলাকায় খোঁজ নিয়ে তাদের সরকারিভাবে সহযোগিতা করার চেষ্টা করছি।
সুনামগঞ্জ-১ আসনের সংসদ সদস্য ইঞ্জিনিয়ার মোয়াজ্জেম হোসেন রতন বলেন, সরকারের পক্ষ থেকে বন্যার্তদের অব্যাহত সহায়তা চলমান রয়েছে। আমার নির্বাচনী এলাকায় (জামালগঞ্জ-তাহিরপুর-ধর্মপাশা ও মধ্যনগরে) সরেজমিন পরিদর্শন করে বন্যার্তদের খোঁজখবর নিচ্ছি। যেখানে সড়ক ভেঙে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়েছে সেখানে স্থানীয় প্রশাসন ও এলাকাবাসীকে নিয়ে আপাতত সমস্যার সমাধান করেছি। বন্যা পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে এসব ক্ষতিগ্রস্ত সড়কের কাজ পর্যায়ক্রমে শুরু হবে।
গোবিন্দগঞ্জে ভাঙনে ১৫ পরিবার গৃহহীন : গোবিন্দগঞ্জ (গাইবান্ধা) সংবাদদাতা জানান, উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলের পানি ও গত কয়েক দিনের বৃষ্টিতে গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জে করতোয়া নদীতে দেখা দিয়েছে তীব্র ভাঙন। এতে গত ৩ দিনে ১৫টি পরিবারের বসতভিটা নদীতে বিলীন হয়ে গেছে।
জানা গেছে, গোবিন্দগঞ্জ উপজেলার হরিরামপুর ইউনিয়নের পারধুন্দিয়া গ্রামের পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া করতোয়া নদীর ভাঙনে গত ৩ দিনে পারধুন্দিয়া গ্রামের ফুল মিয়া, লাল মিয়া, শাহারুল ইসলাম, সাহেব মিয়া, ওমর আলী, মনজু মিয়া, চান মিয়া, মশিউর রহমান, মোস্তাফিজুর রহমান, রফিকুল ইসলাম ও আব্দুল কাদেরসহ ১৫টি পরিবারের বসতভিটা নদীতে বিলীন হয়ে গেছে। ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের লোকজন কেউ বাঁধে, কেউ অন্যত্র আত্মীয়স্বজনের কাছে আশ্রয় নিয়েছে।
হরিরামপুর ইউপি চেয়ারম্যান শাহজাহান আলী সাজু জানান, নদীভাঙনে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের তালিকা করে উপজেলা নির্বাহী অফিসে দাখিল করা হয়েছে। পানি বৃদ্ধি অব্যাহত থাকলে ওই গ্রামটি সম্পূর্ণ নদীতে বিলীন হয়ে যাবে।
গোবিন্দগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা রামকৃষ্ণ বর্মণ জানান, হরিরামপুর ইউনিয়নের পারধুন্দিয়া গ্রামে ভাঙনে ১২-১৪টি পরিবারের ঘরবাড়ী নদীতে বিলীন হয়ে যাওয়ায় ক্ষতিগ্রস্ত ওই পরিবারগুলোকে স্থানীয় গুচ্ছগ্রামে থাকার ব্যবস্থা করে দেয়া হয়েছে এবং পরবর্তীতে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের তালিকা চূড়ান্ত করে সরকারিভাবে সাহায্য সহযোগিতার ব্যবস্থা করা হবে।
বাহাদুরাবাদ পয়েন্টে পানি বিপদসীমার ৮৫ সেন্টিমিটার উপরে : দেওয়ানগঞ্জ (জামালপুর) সংবাদদাতা জানান, জামালপুরের দেওয়ানগঞ্জে সার্বিক বন্যা পরিস্থিতির অবনতি হয়েছে। গত কয়েক দিনের প্রবল বর্ষণ, ভারত থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢল ও ব্রহ্মপুত্র, যমুনা নদ-নদীসহ শাখা নদীগুলোর পানি আকস্মিকভাবে বৃদ্ধি পাওয়ায় বিস্তীর্ণ এলাকা পানিতে ডুবে গেছে। নতুন নতুন এলাকা প্লাবিত হচ্ছে। দেওয়ানগঞ্জ-বেলতলী বাজার-বটতলী বাজার-মলমগঞ্জ বাজার সড়ক পানিতে ডুবে গেছে। রেলস্টেশন বেলতলী সড়কেও পানি। বাহাদুরাবাদ শাহজাতপুর হয়ে বকশীগঞ্জ যাওয়ার পথে ১টি ব্রিজ ধসে গেছে। এছাড়া দেওয়ানগঞ্জ-চর বাহাদুরাবাদ সড়কের মধুরবাড়ি মোড়ে ১টি ব্রিজ ভেঙে যাওয়ায় জন চলাচল দারুণভাবে ব্যাহত হচ্ছে। পাউবো সূত্রে জানা গেছে, মঙ্গলবার যমুনা নদীর পানি বাহাদুরাবাদ পয়েন্টে বিপদসীমার ৮৫ সেন্টিমিটার উপরে প্রবাহিত হচ্ছে। উপজেলা পরিষদ-দেওয়ানগঞ্জ রেলস্টেশন-হাসপাতাল রোড পানিতে ডুবে গেছে। দেওয়ানগঞ্জ উপজেলা পরিষদের অধিকাংশ বিভাগীয় দফতর পানিতে ডুবে যাওয়ায় নৌকায় চড়ে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীরা অফিসে যাওয়া-আসা করছেন এবং দফতর অন্যত্র স্থানান্তর করা হয়েছে। এতে স্বাভাবিক কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে। চুকাইবাড়ি ইউনিয়নের টিনের চর গুচ্ছুগ্রাম, গুজিমারী গুচ্ছুগ্রাম ও বাদেশশারিয়া বাড়ি গুচ্ছগ্রাম পানিতে নিমজ্জিত হয়েছে। এসব বাসিন্দা অস্থায়ী আশ্রয়কেন্দ্রে গিয়ে আশ্রয় নিয়েছে। উপজেলা নির্বাহী অফিসারের বাসভবনেও পানি উঠেছে। উপজেলা নির্বাহী অফিসার সুলতানা রাজিয়া আলাপকালে জানান, উপজেলা পরিষদ পানিতে নিমজ্জিত হওয়ায় মঙ্গলবার থেকে সরকারি গণগ্রন্থাগারে অস্থায়ী কার্যালয় হিসেবে অফিসের কার্যক্রম পরিচালনা শুরু হয়েছে। উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা বিভাগ সূত্রে জানা যায়, তারা ৮টি মেডিক্যাল টিম প্রস্তুত রেখেছে। নির্বাহী অফিসার সুলতানা রাজিয়া ও উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন অফিসার এনামুল হাসান জানান, ইতোমধ্যে বন্যার্তদের জন্য ৪টি আশ্রয়কেন্দ্র স্থাপন করা হয়েছে। এখানে শতাধিক পরিবার ইতোমধ্যে আশ্রয় নিয়েছে। তাদের মাঝে খাদ্যসামগ্রী, ২০০ মাস্ক ও হাত ধোয়ার সাবান বিতরণ করা হয়েছে।
রাজবাড়ীতে পদ্মার পানি বিপদসীমার উপর : রাজবাড়ী সংবাদদাতা জানান, রাজবাড়ীতে পদ্মা নদীর পানি বিপদসীমার উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। মঙ্গলবার বিকেল ৫টায় পদ্মায় রাজবাড়ী জেলার তিনটি পয়েন্টের মধ্যে গোয়ালন্দের দৌলতদিয়া গেজ পয়েন্টে ২১ সেন্টিমিটার পানি বৃদ্ধি পেয়ে এই পয়েন্টে পানি বিপদসীমার ১৮ সেন্টিমিটার উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। পানি বৃদ্ধির ফলে দৌলতদিয়া ঘাটের লঞ্চ টার্মিনালের রাস্তা তলিয়ে যাওয়ায় যাত্রীদের চলাচল ব্যাহত হচ্ছে।
রাজবাড়ী পানি উন্নয়ন বোর্ডের প্রধান করণিক ইউসুফ উদ্দিন খান জানান, রাজবাড়ীতে পদ্মার পানি পরিমাপের জন্য তিনটি পয়েন্ট রয়েছে। এগুলো হলো সদরের মহেন্দ্রপুর, পাংশার হাবাসপুর ও গোয়ালন্দের দৌলতদিয়া গেজ পয়েন্ট। এরমধ্যে সদরের মহেন্দ্রপুর ও পাংশার হাবাসপুর পয়েন্টে পানি বিপদসীমার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। অন্যদিকে গোয়ালন্দের দৌলতদিয়া পয়েন্টে গত ২৪ ঘণ্টায় ২১ সেন্টিমিটার পানি বৃদ্ধি পেয়ে তা বিপদসীমার ১৮ সেন্টিমিটার উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে।
এদিকে পানিবৃদ্ধির সাথে সাথেই গোয়ালন্দের দৌলতদিয়া ও দেবগ্রাম দুটি ইউনিয়নে দেখা দিয়েছে নদীভাঙন। ভাঙন আতঙ্কে রয়েছে প্রায় ৩ হাজার পরিবার। এই ২টি ইউনিয়নের চরাঞ্চলের অধিকাংশ মানুষ পানিবন্দী হয়ে পড়েছে।
দিরাই-শাল্লায় পানিবন্দী কয়েক হাজার পরিবার : দিরাই-শাল্লা (সুনামগঞ্জ) সংবাদদতা জানান, হাওরবেষ্টিত সুনামগঞ্জের দিরাই ও শাল্লা উপজেলা নিচু এলাকার শতাধিক গ্রামের বেশির ভাগ বাড়িঘর ব্যন্যার পানিতে তলিয়ে গেছে। এরই মধ্যে পানিবন্দী হয়ে পড়েছেন কয়েক হাজার পরিবার। দুই উপজেলার শতাধিক পরিবার পার্শ্ববর্তী বিদ্যালয়ের আশ্রয়কেন্দ্রে উঠেছেন বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট ইউপি চেয়ারম্যান। গবাদিপশু নিয়ে বিপাকে পড়েছেন পানিবন্দি মানুষগুলো। কয়েক দিনের টানা বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলে দুই উপজেলা মাঝ দিয়ে বহমান কুশিয়ারা ও কালনী নদীর পানি বিপদসীমার ১৮ সেন্টিমিটার উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে।
শাল্লা উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান ও উপজেলা দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কমিটির সভাপতি চৌধুরী আব্দুল্লাহ আল মাহমুদ জানান, বন্যার পানিবৃদ্ধি অব্যাহত রয়েছে। মনিটরিং সেলের মাধ্যমে বন্যা পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে।
জামালপুরে পানিবন্দী দুই লক্ষাধিক মানুষ : জামালপুর সংবাদদাতা জানান, জামালপুরে যমুনা নদীর পানি অপরিবর্তিত থাকলেও এখনো তা বিপদসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। বন্যাদুর্গত এলাকায় দেখা দিয়েছে খাদ্য, বিশুদ্ধ পানি ও গো-খাদ্যের অভাব। গতকাল মঙ্গলবার বেলা ৩টায় জেলার দেওয়ানগঞ্জ উপজেলার বাহাদুরাবাদ পয়েন্টে যমুনার পানি বিপদসীমার ৮৫ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে। পানিবন্দী হয়ে চরম দুর্ভোগ পোহাচ্ছে দুই লক্ষাধিক বন্যার্ত মানুষ।
জামালপুর কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর সূত্র জানায়, বন্যার পানিতে জেলার পাঁচটি উপজেলার ৬ হাজার ৪০৭ হেক্টর জমির ফসল তলিয়ে গেছে। নিমজ্জিত ফসলের মধ্যে পাট ৫ হাজার ৫৯৩ হেক্টর, আউশ ধান ১৭৭ দশমিক ৫ হেক্টর, সবজি ৪৭৮ দশমিক ৫ হেক্টর, রোপা আমন ধানের বীজ তলা ১২৩ হেক্টর, মরিচ ১১ হেক্টর, তিল ১৪ হেক্টর, বাদাম ২ হেক্টর, ভুট্টা ৫ হেক্টর এবং কলা ৩ হেক্টর।


আরো সংবাদ