০৫ এপ্রিল ২০২০

আইসিজের আদেশ বাস্তবায়নের দাবি রোহিঙ্গাদের

-

জাতিসঙ্ঘের সর্বোচ্চ আদালত ইন্টারন্যাশনাল কোর্ট অব জাস্টিসে (আইসিজে) মিয়ানমারের বিরুদ্ধে গণহত্যার অভিযোগ সংক্রান্ত মামলায় চারটি অন্তর্বর্তীকালীন আদেশ দিয়েছেন। এ কারণে কক্সবাজারের উখিয়া ও টেকনাফে অবস্থানরত রোহিঙ্গারা আনন্দিত ও উচ্ছ্বসিত। রোহিঙ্গারা বলছেন এ রায়ে অন্তত একটি ভিত্তি স্থাপিত হলো।
২০১৭ সালের আগস্টে রাখাইনে রোহিঙ্গাদের ওপর পূর্ব-পরিকল্পিত ও কাঠামোগত সহিংসতা জোরদার করে মিয়ানমার সেনাবাহিনী। সেনাবাহিনী রাখাইনে হত্যাকাণ্ড সংঘবদ্ধ ধর্ষণ, ঘরবাড়িতে অগ্নিসংযোগ শুরু করলে জীবন বাঁচাতে নতুন করে সাত লাখেরও বেশি রোহিঙ্গা বাংলাদেশে পালিয়ে আসে। এই নৃশংসতাকে ‘গণহত্যা’ আখ্যা দিয়ে ২০১৯ সালের ১১ নভেম্বর আইসিজেতে মামলা করে গাম্বিয়া। উক্ত মামলায় বিচারক রোহিঙ্গাদের সুরক্ষা নিশ্চিতে চারটি অন্তর্বর্তীকালীন আদেশ ঘোষণা করেন। এই রায় শুনতে বিকেল থেকে টেলিভিশনের সামনে ভিড় করতে থাকে শতশত রোহিঙ্গা। রায় শুনার পরে রোহিঙ্গারা উচ্ছ্বাস ও আনন্দ প্রকাশ করেন। তারা বলছেন, এ রায় একটি সম্মানজনক ও নিরাপদ প্রত্যাবাসনে ভূমিকা রাখবে। একইকথা বললেন রোহিঙ্গা কমিউনিটি নেতা ও আরাকান রোহিঙ্গা সোসাইটি ফর পিস অ্যান্ড হিউম্যান রাইটস (এআরএসপিএইচ)সহ সভাপতি মো: আব্দুর রহিম।
জাতিসঙ্গের সর্বোচ্চ আদালত আইসিজেএর রায় একটি মাইলফলক। মিয়ানমার যে রোহিঙ্গাদের ওপর গণহত্যা চালিয়েছে তা আজ প্রমাণিত। এ রায় রোহিঙ্গাদের সম্মানজনক ও নিরাপদ প্রত্যাবাসনকে ত্বরান্বিত করবে এমনটি প্রত্যাশা রোহিঙ্গাদের। আইসিজের রায় দেশে ফিরে যাওয়ার পথকে সুগম করবে বলে আশা তাদের। এ আদেশের মাধ্যমে রোহিঙ্গাদের অধিকার রক্ষায় বিশ্ব আদালত সোচ্চার হবে এমনটাই প্রত্যাশা আইন বিশেষজ্ঞদের।
উখিয়া-টেকনাফে আশ্রয় নেয়া রোহিঙ্গারা বলেছেন, মিয়ানমার সরকারের তদন্ত কমিটি প্রমাণ না পাওয়ার কথা বললেও ভুক্তভোগী রোহিঙ্গাদের কাছে জোনোসাইডের যথেষ্ট প্রমাণ রয়েছে। যা ইতোমধ্যে আদালতে উত্থাপন করা হয়েছে। এ আদেশের পাশাপাশি নাগরিকত্ব ফিরে পাওয়ার আশা করছেন রোহিঙ্গারা।
রোহিঙ্গাদের সংগঠন আরাকান রোহিঙ্গা সোসাইটি ফর পিস অ্যান্ড হিউম্যান রাইটসের (এআরএসপিএইচ) ভাইস চেয়ারম্যান আব্দুর রহিম বলেন, আইসিজের আদেশে রোহিঙ্গাদের বিজয় হয়েছে। এরকম একটি বিজয়ের আশায় ছিল বাংলাদেশে আশ্রিত রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী। তাদের ওপর চালানো গণহত্যার যথেষ্ট প্রমাণ আন্তর্জাতিক আদালতে উত্থাপন করা হয়েছে। মিয়ানমারের সেনারা যুগযুগ ধরে আমাদের ওপর জেনোসাইড চালিয়ে আসছিল। যা ২০১৭ সালের ২৫ আগস্টে বড় আকারে জনসম্মুখে এসেছে। আদালতের আদেশের দ্রুত বাস্তবায়ন দেখতে চাই। পাশাপাশি নিজ দেশে ফিরতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সহযোগিতা কামনা করছি।
রোহিঙ্গা নেতা আশহাব উল্লাহ বলেন, গণহত্যার কোনো প্রমাণ মেলেনি বলে এক প্রতিবেদনে দাবি করেছে মিয়ানমারের একটি তদন্ত প্যানেল, তা সর্ম্পূণ মিথ্যা ও বানোয়াট। ১৪০ পৃষ্ঠার ওই প্রতিবেদনে আমাদের মা-বোনদের ওপর পরিচালিত নির্যাতন ও ধর্ষণের ঘটনার কোনো চিত্র উল্লেখ করা হয়নি। এ প্যানেল সরকারের কথামতো প্রতিবেদন দিয়েছিল।
আশহাব উল্লাহ আরো বলেন, মুসলিম রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীকে নিশ্চিহ্ন করার জন্য মিয়ানমার জেনোসাইডের ঘটনা অনেক আগে থেকে ঘটিয়ে আসছিল। মিয়ানমার সরকার জেনোসাইডের ঘটনাকে ইচ্ছাকৃতভাবে অস্বীকার করছে। যাতে করে সেনাবাহিনীকে রক্ষা করা যায়। এমনকি সরকার সেদেশে শুধু রোহিঙ্গাদের জন্য আলাদা আইন তৈরি করেছে। আজকে আইসিজের দেয়া আদেশ তাদের চক্রান্তে বাধা হয়ে দাঁড়াল। যার জন্য খুশি রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী।
রোহিঙ্গা নেতা দিল মোহাম্মদ বলেন, ১১ লাখ রোহিঙ্গাকে নিজ দেশ থেকে বিতাড়িত ও নানা নির্যাতন করার পরও থেমে নেই মিয়ানমারের অত্যাচার। মিয়ানমারে অবস্থানরত প্রায় ছয় লাখ রোহিঙ্গার ওপর চলছে গণহত্যার উদ্দেশ্যে নির্যাতন। আইসিজের আদেশে রোহিঙ্গাদের বিজয় হয়েছে। আশা করছি সম্মান, নাগরিকত্ব ও মর্যাদা নিয়ে নিজ দেশে ফিরতে পারব। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়সহ রোহিঙ্গারা কৃতজ্ঞ আজ।
টেকনাফের লেদা শরণার্থী শিবির রোহিঙ্গা নেতা নুর বশর বলেন, গাম্বিয়া আইসিজেতে মিয়ানমারের বিরুদ্ধে মামলা করে রোহিঙ্গাদের যে উপকার করেছে, তার জন্য আমরা কৃতজ্ঞ। কুতুপালং ক্যাম্পের রোহিঙ্গা নুর মোহাম্মদ বলেন, মিয়ানমার সেনাবাহিনী তার ফুফাতো ভাইকে গুলি করে হত্যা করেছে; তার আপন দুই ভাই এখনো রাখাইনে বন্দী। মিয়ানমারে আমরা যে অত্যাচারের শিকার হয়েছি, আশা করছি এ রায়ে তার বিচার মিলবে।
ছৈয়দুল আমিন নামে আরেক রোহিঙ্গা বলেন, হেলিকপ্টার থেকে হামলা চালিয়ে তার এক ভাইকে হত্যা করা হয়েছে। তার বাবা-মাকেও আটক করে নিয়ে যাওয়া হয়। সে জানে না তারা এখন বেঁচে আছে কি না। নুরুল হক নামে এক রোহিঙ্গা বলেন, আন্তর্জাতিক আদালতের রায়ে আমাদের জমি ও নিরাপত্তা নিশ্চিত হবে। এর পাশাপাশি রাখাইনে নাগরিকত্ব ও অধিকার নিয়ে ফিরতে পারব।


আরো সংবাদ