জবির ভিসি ভবন

১১ একরের ক্যাম্পাসে ঐতিহ্য আর প্রশাসনের ব্যস্ত স্নায়ুকেন্দ্র

প্রধান ফটক পেরিয়ে কড়ই ও কৃষ্ণচূড়ার ছায়া মাড়িয়ে কয়েক কদম এগোলেই চোখে পড়ে একটি পুরোনো, গম্ভীর স্থাপনা। এটাই বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস চ্যান্সেলর (ভিসি) ভবন।

  • সুমাইয়া ইয়াসমিন

পুরান ঢাকার ব্যস্ত সড়ক পেরিয়ে রায়সাহেব বাজার থেকে সদরঘাটমুখী পথে এগোলেই বাহাদুর শাহ (ভিক্টোরিয়া) পার্ক। এর বিপরীতে বাংলাদেশ ব্যাংকের শাখার পাশ ঘেঁষে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের (জবি) প্রধান ফটক। প্রধান ফটক পেরিয়ে কড়ই ও কৃষ্ণচূড়ার ছায়া মাড়িয়ে কয়েক কদম এগোলেই চোখে পড়ে একটি পুরোনো, গম্ভীর স্থাপনা। এটাই বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস চ্যান্সেলর (ভিসি) ভবন—যেখান থেকে প্রতিদিন পরিচালিত হয় বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসন, নীতিনির্ধারণ এবং গুরুত্বপূর্ণ দাপ্তরিক কার্যক্রম।

Jagannath University-02

মাত্র ১১ একরের ছোট্ট ক্যাম্পাসের প্রায় কেন্দ্রস্থলে দাঁড়িয়ে থাকা ভবনটি জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক প্রাণকেন্দ্র। শিক্ষার্থী, শিক্ষক, কর্মকর্তা-কর্মচারী থেকে শুরু করে দর্শনার্থী—প্রতিদিন অসংখ্য মানুষের পদচারণায় মুখর থাকে ভবনটি। বিশ্ববিদ্যালয়ের গুরুত্বপূর্ণ সভা, সিদ্ধান্ত গ্রহণ, বিভিন্ন প্রশাসনিক ফাইল নিষ্পত্তি কিংবা শিক্ষার্থীদের স্মারকলিপি—সবকিছুর কেন্দ্রবিন্দু এই ভবন।

জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসের সঙ্গেও জড়িয়ে আছে এ ভবনের অস্তিত্ব। ১৮৫৮ সালে প্রতিষ্ঠিত জগন্নাথ স্কুল থেকে কলেজ এবং পরে ২০০৫ সালে বিশ্ববিদ্যালয়ে রূপান্তরের দীর্ঘ পথচলার নীরব সাক্ষী এটি। ব্রিটিশ আমলের স্থাপত্যশৈলীর প্রভাব এখনো স্পষ্ট ভবনটির চওড়া দেয়াল, উঁচু ছাদ, খিলানঘেরা বারান্দা ও পুরোনো ধাঁচের সিঁড়িতে। সময়ের প্রয়োজন মেনে বিভিন্ন সময়ে সংস্কার করা হলেও মূল স্থাপত্যরীতি অক্ষুণ্ণ রাখার চেষ্টা করা হয়েছে।

বিশ্ববিদ্যালয়ে রূপান্তরের পর পুরোনো এই ভবনেই স্থান পায় ভিসি কার্যালয়, ট্রেজারারের দপ্তর, সিন্ডিকেট কক্ষসহ প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ অফিসগুলো। তবে সময়ের সঙ্গে শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও প্রশাসনিক কার্যক্রম বেড়েছে বহুগুণ, কিন্তু ভবনের পরিসর সেই আগের মতোই রয়ে গেছে।

Jagannath University-03

এই ভবনের সবচেয়ে বড় বাস্তবতা হলো জায়গার সংকট। দেশের বড় পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর প্রশাসনিক ভবনের মতো এখানে নেই বিস্তৃত প্রাঙ্গণ, বড় গাড়ি পার্কিং কিংবা প্রশস্ত লাউঞ্জ। ভবনের প্রতিটি কক্ষ, করিডোর এবং বারান্দা যেন প্রয়োজনের তাগিদে পুরোপুরি ব্যবহৃত হচ্ছে। সীমিত জায়গার মধ্যেই প্রতিদিন সামাল দিতে হয় একটি পূর্ণাঙ্গ পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক চাপ।

তবু ব্যস্ততার মাঝেও ভবনটির আলাদা এক আবহ রয়েছে। দিনের বিভিন্ন সময়ে এখানে দেখা যায় শিক্ষক-কর্মকর্তাদের ব্যস্ত আনাগোনা, প্রশাসনিক বৈঠকের প্রস্তুতি কিংবা বিভিন্ন বিভাগের প্রতিনিধিদের অপেক্ষা। আবার দাবি-দাওয়া নিয়ে আসা শিক্ষার্থীদেরও প্রথম গন্তব্য এই ভবন। ফলে প্রশাসন ও শিক্ষার্থীদের সংযোগের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ স্থানও এটি।

শুধু প্রশাসনিক ভবন হিসেবেই নয়, শিক্ষার্থীদের কাছেও ভিসি ভবন একটি পরিচিত ল্যান্ডমার্ক। ক্লাসের ফাঁকে ভবনের সামনের চত্বর কিংবা আশপাশের ছায়াঘেরা জায়গায় বসে আড্ডা, আলোচনা কিংবা বিভিন্ন সাংগঠনিক কর্মসূচির পরিকল্পনা করতে দেখা যায় শিক্ষার্থীদের। পুরোনো স্থাপত্যের সঙ্গে ক্যাম্পাসজীবনের এই মেলবন্ধন ভবনটিকে দিয়েছে আলাদা পরিচয়।

Jagannath University-04

এদিকে কেরানীগঞ্জে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের নতুন ক্যাম্পাস নির্মাণের কাজ এগিয়ে চলছে। সেখানে আধুনিক সুযোগ-সুবিধাসম্পন্ন প্রশাসনিক ভবন ও ভিসি কার্যালয়ের পরিকল্পনা রয়েছে। নতুন ক্যাম্পাস চালু হলে প্রশাসনিক কার্যক্রম আরও বিস্তৃত পরিসরে পরিচালনার সুযোগ তৈরি হবে বলে আশা করছে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ।

Jagannath University-05

তবে সেই দিন আসা পর্যন্ত পুরান ঢাকার এই ঐতিহ্যবাহী ভবনই বহন করে চলবে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক দায়িত্ব। আধুনিকতার জৌলুস না থাকলেও, ইতিহাস, ঐতিহ্য এবং সীমাবদ্ধতার মধ্যেও দায়িত্ব পালনের যে গল্প—জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি ভবন যেন তারই এক নীরব প্রতীক।
লেখক: নয়া দিগন্তের ইন্টার্ন শিক্ষার্থী।