হিমালয়ে ট্র্যাজেডি, অবশেষে কি চোখ খুলল মিডিয়ার?

তবে এই সপ্তাহে নেপালের মর্মান্তিক বন্যার ঘটনায় সেই চিত্র বদলে গেছে; চরম রক্ষণশীল মিডিয়াগুলোও নির্দ্বিধায় এই বিপর্যয়কে জলবায়ু পরিবর্তনের ফসল হিসেবে চিহ্নিত করছে।

নয়া দিগন্ত অনলাইন
কাদাঁয় ডুবে আছে ঘর-বাড়ি, দৃশ্যটি নেপালের
কাদাঁয় ডুবে আছে ঘর-বাড়ি, দৃশ্যটি নেপালের |সংগৃহীত

'

নেপালের ভয়াবহ বন্যা কি আন্তর্জাতিক সাংবাদিকতার মোড় ঘুরিয়ে দিচ্ছে? এ প্রশ্ন এখন শোনা যাচ্ছে।

হিমালয়কন্যা নেপালে প্রাণঘাতী বন্যায় এ পর্যন্ত ১,১০০ জনেরও বেশি মানুষের মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করা হয়েছে, আর নিখোঁজ রয়েছেন অন্তত ৪,০০০ জন। ভবন, রাস্তাঘাট ও সেতু ভাসিয়ে নেয়া এই অভূতপূর্ব দুর্যোগ বিশ্ববাসীকে স্তব্ধ করে দিয়েছে। তবে কেবল ধ্বংসলীলাই নয়, এই ট্র্যাজেডি আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে জলবায়ু পরিবর্তনের ধাক্কা তুলে ধরার ক্ষেত্রে এক নতুন মোড় উন্মোচন করেছে। দীর্ঘদিন ধরে অলস পদক্ষেপে চলা জলবায়ু বিষয়ক সাংবাদিকতায় অবশেষে দৃষ্টিভঙ্গির বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত মিলছে।

পাকিস্তানের ইংরেজি দৈনিক দ্য এক্সপ্রেস ট্রিবিউন সোমবার (৭ সেপ্টেম্বর) জানিয়েছে, বিজ্ঞানীদের অকাট্য প্রমাণ থাকা সত্ত্বেও অতীতে দুর্যোগের খবরে 'জলবায়ু পরিবর্তন' শব্দটি ব্যবহার করতে চরম অনীহা দেখাত শীর্ষ মিডিয়াগুলো। ২০২৪ সালে আমেরিকার দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলে আঘাত হানা মারাত্মক সুপার-স্টর্ম 'হ্যারিকেন হেলেন', ২০২৫ সালে লস অ্যাঞ্জেলেস ছারখার করে দেওয়া স্মরণকালের ভয়াবহ দাবানল কিংবা ২০২৬ জুড়ে ইউরোপ ও এশিয়ায় রেকর্ড মাত্রার তীব্র তাপপ্রবাহের খবরেও বিশ্ব উষ্ণায়নের কথা খুব একটা আসেনি। তবে এই সপ্তাহে নেপালের মর্মান্তিক বন্যার ঘটনায় সেই চিত্র বদলে গেছে; চরম রক্ষণশীল মিডিয়াগুলোও নির্দ্বিধায় এই বিপর্যয়কে জলবায়ু পরিবর্তনের ফসল হিসেবে চিহ্নিত করছে।

জাতিসংঘের পরিবেশ কর্মসূচি (ইউএনইপি) গত সপ্তাহেই সতর্ক করেছে যে, অভূতপূর্ব মাত্রায় কার্বন নিঃসরণ কমানো হলেও বিশ্বের তাপমাত্রা প্রাক-শিল্পায়ন যুগের চেয়ে অন্তত ১.৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস বৃদ্ধি পাবে। বোল্ডারের ইউনিভার্সিটি অব কলোরাডোর বিশেষজ্ঞ অল্টন সি বায়ার্স নেপাল বন্যা নিয়ে এক আলোচনায় বলেন, হিমবাহের বরফ যত গলবে, এ ধরনের বিপর্যয়ের মাত্রা ও পুনরাবৃত্তি ততই বাড়বে।

এখন দ্য গার্ডিয়ান, এএফপি, দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমস, এপি, ব্লুমবার্গ কিংবা ডয়চে ভেলে একা নয়, তাদের পথে হেঁটেছে অন্যরাও। আমেরিকান প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদের প্রথম বছরে মার্কিন টিভি নেটওয়ার্কগুলোতে জলবায়ু কভারেজ ৩৫% কমে গিয়েছিল। কিন্তু সেই চিত্র এখন পাল্টেছে। এনবিসি নিউজ সরাসরি হিমবাহ গলনের পরিসংখ্যান দেখিয়ে আন্তর্জাতিক দুর্যোগের যোগসূত্র প্রকাশ করছে।

এমনকি সিবিএস নিউজের সিইও বারি ওয়াইস—যিনি প্রতিষ্ঠানটির পুরো জলবায়ু বিভাগ ছাঁটাই করেছিলেন এবং জলবায়ু সচেতনতাকে 'ওক' (Woke) বা তথাকথিত অতি-উদারপন্থী সস্তা পপুলিজম বলে তুচ্ছতাচ্ছিল্য করতেন—তাঁর নেটওয়ার্কও এখন সুর বদলেছে। সিবিএস ইভনিং নিউজ ও মর্নিং শো বিশেষজ্ঞ ড্যানিয়েল সোয়েনকে উদ্ধৃত করে আগস্টের শেষ সপ্তাহে স্পষ্ট জানিয়েছে, বিশেষজ্ঞদের মতে এই হিমবাহ ধস ও চরম আবহাওয়া মূলত জলবায়ু পরিবর্তনের সাথেই সম্পর্কিত।

মূলত সামাজিক ও পরিবেশগত সচেতনতা বোঝাতে ওক' (Woke) ব্যবহৃত হলেও যুক্তরাষ্ট্রের ডানপন্থী বা রক্ষণশীল রাজনীতিতে শব্দটি একটি তিরস্কারমূলক অর্থ বহন করে। সেখানে পরিবেশ রক্ষা বা জলবায়ু পরিবর্তনের মতো বৈজ্ঞানিক সত্যকে কোনো বাস্তব সমস্যা না ভেবে বামপন্থী বা অতি-উদারপন্থীদের ফ্যাশনেবল এজেন্ডা হিসেবে গণ্য করে 'ওক' বলে খোঁচা দেওয়া হয়।

সাংবাদিকদের এই সাহসী পদক্ষেপে গতি এনে দিয়েছেন নেপালের রাজনৈতিক নেতৃত্ব। নেপালের পররাষ্ট্রমন্ত্রী শিশির খানাল সরাসরি সংবাদমাধ্যমে বলেন, এই বিপর্যয়ের পেছনে দায়ী বৈশ্বিক উষ্ণায়ন এবং কাঠমান্ডু এখন বড় দূষণকারী দেশগুলোর কাছে ক্ষতিপূরণ দাবি করছে। তথ্যটি রয়টার্স, সিএনএন, বিবিসি-সহ বিশ্ব মিডিয়ার প্রধান শিরোনাম হয়।

অবশ্য প্রথাগত জলবায়ু-অস্বীকারকারীরা চুপ বসে নেই। ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল বিজ্ঞানভিত্তিক ব্যাখ্যা এড়িয়ে পুরো বিষয়টিকে 'পশ্চিমী মিডিয়ার জল্পনা' বলে উড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেছে। অন্যদিকে ইন্টারনেটের ষড়যন্ত্রকারীরা আলাস্কার হাপ নামের একটি গবেষণা প্রকল্পকে নেপাল বন্যার কারণ বলে গুজব ছড়ায়। তবে এএফপির ফ্যাক্ট-চেক ইউনিট দ্রুত ভুয়া বলে প্রমাণ করে বিশ্ব উষ্ণায়নকেই প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত করে।

নেপালের এই চরম ট্র্যাজেডি জলবায়ুসংকটের সবচেয়ে নির্মম সত্যটিকে আবার সামনে নিয়ে এসেছে: যারা সবচেয়ে কম দূষণ ঘটায়, তারাই প্রথম ও সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। লেখক বিল ম্যাককিবেন যেমনটা হিসাব করে দেখিয়েছেন, একজন আমেরিকান বছরে গড়ে ১৪ টন কার্বন নিঃসরণ করলেও একজন নেপালি করে মাত্র ০.৪ টন!

২০২৩ সালের কোপ২৮ সম্মেলনে গঠিত 'লস অ্যান্ড ড্যামেজ ফান্ড'-এ অনুদান সামান্য হলেও চলতি সপ্তাহে 'দ্য নেশন' জানিয়েছে, নেপালকে একটি প্রতীকী ক্ষতিপূরণ দেওয়ার বিষয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে। অন্যদিকে, ১৯৮১ সালেই এক্সনের মতো শীর্ষ জ্বালানি কোম্পানিগুলো তাদের অভ্যন্তরীণ গবেষণায় জানত যে কার্বন নিঃসরণ মানবজাতির জন্য ভয়াবহ বিপর্যয় ডেকে আনবে, কিন্তু তারা গবেষণা ফলাফল গোপন রেখেছিল। সাংবাদিকতার মূল দায়িত্ব যদি হয় পরাশক্তিকে জবাবদিহির মুখোমুখি দাঁড় করানো, তবে বিগ অয়েল বা শীর্ষ খনিজ তেল কোম্পানিগুলোর মুনাফার খেসারত যে নেপালের সাধারণ মানুষ দিচ্ছে, তা স্পষ্ট করার এখনই উপযুক্ত সময়।