একদিকে যুদ্ধ, সংঘাত ও দুর্যোগের ঘনঘটা, অন্যদিকে সহায়তার হাত গুটিয়ে নেওয়া দাতা দেশগুলো—এই দুয়ের জাঁতাকলে পড়ে বিশ্বজুড়ে ভেঙে পড়ার মুখে আন্তর্জাতিক ত্রাণব্যবস্থা। গত কয়েক বছরে হু হু করে কমেছে বৈদেশিক অনুদান। ফলে চরম মানবিক সংকটে পড়া কোটি কোটি মানুষ আজ বেঁচে থাকার ন্যূনতম সাহায্য থেকেও বঞ্চিত হচ্ছেন। সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন নারী, শিশু, বয়োবৃদ্ধ এবং ভিটেমাটিহারা সাধারণ মানুষ।
দ্য গার্ডিয়ান, বৃহস্পতিবার (১০ সেপ্টেম্বর) জানিয়েছে, শীর্ষস্থানীয় আলন্যাপ নামের একটি গবেষণা সংস্থার তৈরি 'স্টেট অব দ্য হিউম্যানিটেরিয়ান সিস্টেম ২০২৬' শিরোনামের এক নতুন প্রতিবেদনে এই করুণ চিত্র উঠে এসেছে। এতে দেখা যায়, তহবিল সংকটের কারণে শুধু গত বছরই বিশ্বজুড়ে প্রায় ৬ কোটি ৪০ লাখ মানুষ কোনো ধরনের ত্রাণ সহায়তা পাননি। ২০২২ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে বৈশ্বিক ত্রাণ সহায়তা কমেছে প্রায় ৩০ শতাংশ। ফলে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে গড়ে ওঠা এই বিশ্বজনীন ত্রাণ কাঠামো এখন ইতিহাসের অন্যতম বড় সংকোচনের মুখোমুখি। ২০২৫ সালে তহবিল নামতে নামতে প্রায় ৩৩.৩ বিলিয়ন ডলারে এসে ঠেকেছে, অথচ ২০২২ সালেও তা ছিল রেকর্ড ৪৭.৫ বিলিয়ন ডলার।
প্রতিবেদনের সহ-লেখক জেনিফার ডোহরটি বলেন, 'অর্থায়ন কমে যাওয়া এবং রাজনৈতিক নানা কড়াকড়ির খড়গ সমানভাবে সবার ওপর পড়েনি। এর সবচেয়ে করুণ শিকার হয়েছেন নারী, শিশু, প্রবীণ ও বাস্তুচ্যুত মানুষেরা।' তিনি জানান, শুধু ২০২৫ সালেই ত্রাণ খাতের প্রায় ২৩ শতাংশ কর্মী চাকরি হারিয়েছেন। ফলে বিশেষায়িত সেবাকেন্দ্রগুলো বন্ধ হয়ে গেছে এবং জরুরি সাহায্য পৌঁছে দেওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে। সবচেয়ে বড় ধাক্কাটা এসেছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের তরফ থেকে। দেশটির আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থা বা ইউএসএআইডি ২০২৫ সালে তাদের অনুদান এক লাফে ৫৫ শতাংশ কমিয়ে দিয়েছে। শুধু যুক্তরাষ্ট্রই নয়, বিশ্বের শীর্ষ ২০টি দাতা দেশের মধ্যে ১৩টি দেশই তাদের অনুদানের বরাদ্দ ছাঁটাই করেছে। এতে একদিকে যেমন টাকার অঙ্ক কমেছে, অন্যদিকে দাতা সরকারগুলোর শর্তের বেড়াজালও বেড়েছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়েছে ভুক্তভোগীদের ওপর—২০২১ সালে যেখানে সংকটাপন্ন প্রতি ব্যক্তির জন্য ১৭৮ ডলার বরাদ্দ ছিল, ২০২৫ সালে তা নেমে এসেছে মাত্র ৯০ ডলারে। অথচ জিনিসপত্রের দাম ও সংকট বাড়ায় এখন প্রতি মানুষের জন্য প্রয়োজন অন্তত ২৫৫ ডলার।
যাদের ওপর খড়গ, তাদের ঘরেই আগুন
ত্রাণ সংকটে যে দেশগুলো চরম দুর্ভোগে পড়েছে, তার অন্যতম উদাহরণ ইয়েমেন। সাহায্য কমে যাওয়ায় সে দেশে পুষ্টিহীনতা আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে। বন্ধ হয়ে গেছে শিশু টিকাদান কর্মসূচি, যার ফলে ডিপথেরিয়ার মতো মারাত্মক রোগের প্রাদুর্ভাব নতুন করে ছড়িয়ে পড়ছে।
আন্তর্জাতিক সংস্থা 'অ্যাকশন ফর হিউম্যানিটি'র ইয়েমেন প্রধান মোহাম্মদ বাহাশওয়ান সেখানকার এক হৃদয়বিদারক বাস্তবতা তুলে ধরে বলেন, 'সমস্যাগুলো এখন আর একা আসে না। একটি পরিবারের হয়তো একমাত্র আয়ের উৎস বন্ধ, পেটে দানাপানি নেই, ঘরে অপুষ্টিতে ভুগছে ছোট শিশুটি—এমন অবস্থাতেও মাইলের পর মাইল হেঁটে কিংবা ধারদেনা করে তাদের হাসপাতালের দিকে ছুটতে হচ্ছে।' তবে অর্থ সংকটই একমাত্র সমস্যা নয়; বেসামরিক মানুষ ও ত্রাণকর্মীদের নিরাপত্তা দিতে ব্যর্থ হচ্ছে রাষ্ট্রগুলো। উল্টো অনেক ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক হামলার পেছনে সরকারের ভূমিকাই দেখা যাচ্ছে। প্রতিবেদনে বলা হয়, স্বাস্থ্যকর্মীদের ওপর মোট আক্রমণের ৬৪ শতাংশের জন্যই বিভিন্ন দেশের সরকার সরাসরি দায়ী। বিমান হামলা এবং সামরিক অভিযানের কারণে চরম ঝুঁকিতে কাজ করতে হচ্ছে সহায়তাকর্মীদের।
আমলাতন্ত্রের জাঁতাকলে আশা যখন স্থানীয়রা
আন্তর্জাতিক এই বিশাল ব্যবস্থার গলদ যখন প্রকট, তখন অন্ধকার মেঘে কিছুটা আলোর দিশা দেখাচ্ছে স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা ও প্রবাসী নেটওয়ার্কগুলো। তারাই এখন একদম প্রান্তিক পর্যায়ে নিজেদের সর্বস্ব দিয়ে মানুষের পাশে দাঁড়াচ্ছে। তবে খেদ প্রকাশ করে গবেষকেরা জানিয়েছেন, আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো এসব স্থানীয় উদ্যোগের সঙ্গে ঠিকঠাক সমন্বয় করতে পারছে না। ভিয়েনাভিত্তিক সংস্থা 'গ্রাউন্ড ট্রুথ সলিউশনস'-এর প্রধান নির্বাহী মেগ স্যাটলার মনে করেন, আন্তর্জাতিক মানবিক সাহায্য ব্যবস্থা বর্তমান সময়ের সাথে খাপ খাওয়াতে ব্যর্থ হয়েছে। তিনি বলেন, 'সাহায্য পাওয়া মানুষগুলোর সাথে কথা বললে তাদের যন্ত্রণাটা স্পষ্ট বোঝা যায়। এখন ত্রাণ বলতে শুধু 'কোনোমতে প্রাণ বাঁচানো'কে বোঝানো হচ্ছে। কিন্তু সন্তানকে স্কুলে পাঠানো কিংবা ছোটখাটো ব্যবসা শুরু করে নিজের পায়ে দাঁড়ানোর মতো সহায়তা আর পাওয়া যাচ্ছে না। ফলে মানুষ চিরতরে ত্রাণের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ার ঝুঁকিতে পড়ছে।'



