দেশে খাদ্যশস্যের পর্যাপ্ত ও অত্যন্ত সন্তোষজনক সরকারি মজুত রয়েছে। খাদ্য মন্ত্রণালয়ের সর্বশেষ তথ্যানুযায়ী, গত ২৩ জুলাই ২০২৬ তারিখ পর্যন্ত দেশের সরকারি গুদামগুলোতে চাল, গম ও ধান মিলিয়ে ফ্লোটিং মজুতসহ মোট ২৩ লাখ ৭৪ হাজার ৭৬৩ মেট্রিক টন খাদ্যশস্য মজুত রয়েছে।
সাধারণত বাংলাদেশে নিরাপদ খাদ্য মজুতের সর্বনিম্ন পরিমাণ ধরা হয় ১৩ লাখ ৫০ হাজার মেট্রিক টন। বর্তমান মজুত নিরাপদ সীমার চেয়ে প্রায় ১০ লাখ ২৪ হাজার টন বেশি, যা দেশের খাদ্য নিরাপত্তা ব্যবস্থা অত্যন্ত সুদৃঢ় থাকার প্রমাণ দেয়। এদিকে বর্তমান বিএনপি সরকার দায়িত্ব নেয়ার পর দেশব্যাপী সরকারি খাদ্য সংরক্ষণাগারের ক্যাপাসিটি (ক্ষমতা ও মজুতের সার্বিক পরিমাণ) আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে ৩৪ লাখ মেট্রিক টনে উন্নীত করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এ লক্ষ্য বাস্তবায়নে ইতোমধ্যে খাদ্য মন্ত্রণালয় কাজ শুরু করেছে।
খাদ্য অধিদফতরের চলতি বছরের ২৩ জুলাই পর্যন্ত সর্বশেষ প্রতিবেদন মতে, সরকারি গুদামে বর্তমানে ১৯ লাখ ৬০ হাজার ৭৪৬ মেট্রিক টন চাল এবং ২ লাখ ৯৫ হাজার ৬৮৯ মেট্রিক টন গম মজুত রয়েছে। এছাড়া ১ লাখ ৬৮ হাজার ৬০৫ মেট্রিক টন ধান মজুত রয়েছে, যা চালের আকারে হিসাব করে (১০০ কেজি বা ১০০ মণ ধান প্রসেসিং/ভাঙালে পরিমাপের ভিত্তিভেদে ৬৫ কেজি/মণ বা ৩৯.৬০ কেজি/মণ চাল পাওয়া যায়) মোট মজুতে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এছাড়া ফ্লোটিং চালের মজুত দাঁড়িয়েছে ৮ হাজার ৭৩৫ মেট্রিক টনে।
চলতি ২০২৫-২০২৬ অর্থবছরে অভ্যন্তরীণ বোরো সংগ্রহ অভিযানে ২৩ জুলাই পর্যন্ত সর্বমোট ১৩ লাখ ৬৫ হাজার ৪৩১ মেট্রিক টন ধান ও চাল সংগৃহীত হয়েছে। এর মধ্যে ৪ লাখ ৫৯ হাজার ৪৯৮ মেট্রিক টন ধান, ৯ লাখ ৮৯ হাজার ৪২০ মেট্রিক টন সেদ্ধ চাল এবং ৭৬ হাজার ৮১৪ মেট্রিক টন আতপ চাল রয়েছে। এ সময়সীমার মধ্যে সর্বমোট ৫২৩ মেট্রিক টন গম সংগৃহীত হয়েছে।
এদিকে চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথম ২৩ দিনে (১ জুলাই ২০২৬ থেকে ২৩ জুলাই ২০২৬) মোট ৩ লাখ ২০ হাজার ৮০০ মেট্রিক টন খাদ্যশস্য দেশে আমদানি করা হয়েছে। এর মধ্যে সরকারি পর্যায়ে আমদানি করা হয়েছে ১১ লাখ ৬৫ হাজার মেট্রিক টন। এরমধ্যে চাল ৭ লাখ ৮৩ হাজার টন ও গম ৩ লাখ ৮২ হাজার টন। এছাড়া বেসরকারি পর্যায়ে ৩ লাখ ৯ হাজার ১৫০ মেট্রিক টন খাদ্যশস্য আমদানি করা হয়েছে। এরমধ্যে চাল ২ লাখ ৯৪ হাজার টন ও গম ১৫ হাজার ১৫০ টন। এই সময়ে খাদ্য সাহায্য হিসেবে কোনো আমদানির প্রয়োজন হয়নি।
খাদ্য মন্ত্রণালয় সংশ্লিষ্ট দফতরগুলো থেকে জানানো হয়, বাজারে খাদ্যদ্রব্যের পর্যাপ্ত সরবরাহ বজায় রাখা, বাজারমূল্য স্থিতিশীল রাখা এবং সরকারি বিতরণ ব্যবস্থা নির্বিঘ্ন রাখার লক্ষ্যে খাদ্যশস্যের মজুত ও সংগ্রহ অভিযান সফলভাবে তদারকি করা হচ্ছে।
এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে খাদ্য মন্ত্রণালয়ের সংগ্রহ অধিশাখার যুগ্মসচিব মোহাম্মদ কামরুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, চলতি মৌসুমে আমাদের অভ্যন্তরীণ খাদ্যশস্য সংগ্রহ অভিযান অত্যন্ত সফল ও সন্তোষজনকভাবে বাস্তবায়িত হচ্ছে। কৃষক ও চালকল মালিকদের সক্রিয় সহযোগিতায় এবং মন্ত্রণালয়ের সুসংহত ব্যবস্থাপনার ফলে আমরা লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী কাজ করতে সক্ষম হয়েছি।
তিনি বলেন, বর্তমানে সরকারি গুদামগুলোতে চাল ও গমের পর্যাপ্ত ও নিরাপদ মজুদ রয়েছে। এই মজুদ যে কোনো পরিস্থিতি মোকাবিলা এবং দেশের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিতে অত্যন্ত মজবুত ভিত্তি যোগাবে। বাজারে চালের মূল্য স্থিতিশীল রাখতে এবং সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীর আওতায় সরকারি খাদ্য বিতরণ কার্যক্রম নির্বিঘ্ন রাখতে আমরা প্রস্তুত রয়েছি। সাধারণ মানুষের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণে খাদ্য মন্ত্রণালয় সবসময় সতর্ক ও তৎপর রয়েছে।
খাদ্য মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন খাদ্য পরিকল্পনা ও পরিধারণ ইউনিটের (এফপিএমইউ) গবেষণা পরিচালক ফিরোজ আল মাহমুদ বলেন, জনগণের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কাজ করছে সরকার। ক্রমবর্ধমান চাহিদার সাথে তাল মিলিয়ে মজুত ও মজুতের ক্যাপাসিটি বাড়ানোর কাজ চলছে।
খাদ্য অধিদফতরের সার্বিক সংগ্রহ ও সরবরাহ ব্যবস্থাপনা প্রসঙ্গে অধিদফতরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক মো: জামাল হোসেন সরকারি বলেন, খাদ্য নিরাপত্তার বর্তমান পরিস্থিতি অত্যন্ত সন্তোষজনক। সরকারি গুদামগুলোতে খাদ্যশস্যের পর্যাপ্ত মজুত নিশ্চিতের পাশাপাশি আমরা তা সঠিকভাবে সংরক্ষণ ও গুণগত মান বজায় রাখার ওপর সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিচ্ছি।
তিনি আরো যোগ করেন, দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে প্রান্তিক কৃষকদের কাছ থেকে স্বচ্ছ ও সুশৃঙ্খল প্রক্রিয়ায় বোরো ধান ও চাল সংগ্রহ কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। সংগ্রহ কেন্দ্রগুলোতে যেন কোনো প্রকার অনিয়ম না হয় এবং কৃষকরা যেন ন্যায্যমূল্য পান, সে বিষয়ে জিরো টলারেন্স নীতি অনুসরণ করা হচ্ছে। এছাড়া সরকারি বিতরণ ব্যবস্থা (ওএমএস, খাদ্যবান্ধব কর্মসূচি ইত্যাদি) সচল রাখতে গুদামগুলো থেকে নিয়মিত ও নির্বিঘ্নে খাদ্যশস্য সরবরাহ নিশ্চিত করা হচ্ছে।
তিনি বলেন, আগে আমাদের মজুত কাপাসিটি ছিল ২৪ লাখ মেট্রিক টনের মতো, যা বর্তমানে বেড়ে ২৭ লাখ মেট্রিক টনে উন্নীত করা হয়েছে।
বিএনপি সরকারের নির্বাচনী ইশতেহারে ‘ক্যাপাসিটি’ আগামী পাঁচ বছরে ৩৪ লাখ মেট্রিক টনে উন্নীত করার লক্ষ্যমাত্রার কথা জানিয়ে তিনি বলেন, সেই লক্ষ্যে কাজ চলছে।
জামাল হোসেন বলেন, এতদিন নিরাপদ লক্ষ্যমাত্রা ধরা হত ১৩ লাখ ৫০ হাজার মেট্রিক টন। তবে বর্তমান সরকার বর্ধিত জনসংখ্যা এবং ‘সোশ্যাল সেফটি নেটওয়ার্ক’ বেড়ে যাওয়ায় নিরাপদ খাদ্য মজুতের লক্ষ্যমাত্রা ১৬ লাখ মেট্রিক টনে উন্নীত করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
সূত্র : বাসস



