ব্যাংক থেকে দুই লাখ টাকা ঋণ নিয়ে কিস্তি দিতে দেরি হলেই মোবাইল ফোনে এসএমএস, বাড়িতে নোটিশ, শেষে মামলা; অন্যদিকে হাজার কোটি টাকা নিয়ে বছরের পর বছর ফেরত না দেয়া অনেক ঋণ খেলাপিকে দেয়া হয় নীতি সুবিধা- বাংলাদেশে এমন অভিযোগ শুনতে পাওয়া যায় অহরহই।
ধাপে ধাপে বাংলাদেশে খেলাপি ঋণের পরিমাণ বিশাল আকার ধারণ করেছে, যা ক্রমশই আরো বড় হচ্ছে।
২০০৯ সালে দেশে খেলাপি ঋণ ছিল ২২ হাজার কোটি টাকা। ২০২৪ সালের জুনে তা দাঁড়ায় দুই লাখ এক হাজার কোটিতে।
এই সংখ্যা ২০২৬ সালের মার্চে গিয়ে ঠেকেছে পাঁচ লাখ ৮৮ হাজার ৭০৪ কোটিতে। অর্থাৎ দুই দশকেরও কম সময়ে বাংলাদেশে খেলাপি ঋণের বোঝা সাড়ে পাঁচ লাখ কোটির বেশি বেড়েছে।
পরিস্থিতি সামলাতে বাংলাদেশ ব্যাংকের নীতি সহায়তাসহ নানা পদক্ষেপের পরও খেলাপি ঋণের সবশেষ তথ্য আরো ভয়াবহ।
২০২৫ সালের জুন শেষে ব্যাংক খাতে খেলাপির স্থিতি ছয় লাখ ছয় হাজার পাঁ কোটি টাকা দাঁড়িয়েছে, যা মোট বিতরণকৃত ঋণের ৩২ দশমিক ৭৮ শতাংশ বলেই দাবি করা হচ্ছে। বাংলাদেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বরাত দিয়ে এই তথ্য প্রকাশ হয়েছে বাংলাদেশের একাধিক স্থানীয় গণমাধ্যমে।
তবে খেলাপি ঋণের সমাধান হিসেবে কঠোর বা শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয়ার বদলে সরকার ও বাংলাদেশ ব্যাংক আবারো ‘ছাড়’ দেয়ার নীতিতেই হাটছে।
মূলত, ছাড় দিয়েই খেলাপি ঋণগ্রস্তদের কাছ থেকে অর্থ আদায় করতে চায় বাংলাদেশ ব্যাংক। কিন্তু এই যুক্তি কতটা কাজে আসবে?
অর্থনীতিবিদদের অনেকে বলছেন, বর্তমানে দেশের আর্থিক খাতের যে ভঙ্গুর অবস্থা তাতে খেলাপি ঋণের টাকা উদ্ধারে, খুব বেশি বিকল্প কৌশল নেই বাংলাদেশ ব্যাংকের হাতে।
কিন্তু যে কৌশল বাংলাদেশ ব্যাংক নিয়েছে তার সফলতা এর বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া এবং রাজনৈতিক স্বদিচ্ছার ওপর নির্ভর করছে বলেই মনে করেন আর্থিক খাত সংশ্লিষ্টরা।
ঋণ দেয়ার ক্ষেত্রে কঠোর মনিটরিং না থাকলে পরিস্থিতি আরো খারাপ হতে পারে বলেই মনে করেন তারা।
অর্থনীতিবিদরা বলছেন, বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাত বাঁচাতে নীতি সহায়তার পাশাপাশি কঠোর হওয়ার দৃষ্টান্তও জরুরি, নইলে ছয় লাখ কোটি আগামী বছর আট লাখ কোটি হতে সময় লাগবে না।
শাস্তি কেন হয় না?
২০২৪ সালে আন্দোলনের মুখে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর থেকেই বাংলাদেশের আর্থিক প্রতিষ্ঠানের খারাপ অবস্থা নিয়ে আলোচনা চলছে।
সরকার পরিবর্তনের পর খাতাকলমে নানা পদক্ষেপ নেয়া হলেও খেলাপি ঋণের পরিমাণ কমার পরিবর্তে বরং এখনো বেড়েই চলেছে।
খেলাপি ঋণ বৃদ্ধির পেছনে মূলত তিনটি কারণ কাজ করেছে বলে মনে করেন বিশ্লেষকরা।
তারা বলছেন, রাজনৈতিক প্রভাবে অপরিণামদর্শী ঋণ, তদারকির অভাব এবং ব্যাংক পরিচালকদের নামে-বেনামে ঋণ।
গত দুই দশকে দেশের কয়েকটি শিল্প গোষ্ঠী এবং ব্যাংকের আর্থিক কেলেঙ্কারি খেলাপি ঋণের পরিমাণ বাড়িয়েছে বলেই অভিযোগ।
পরিস্থিতি এমন অবস্থায় পৌঁছেছে যে, খেলাপির বিপরীতে ব্যাংকগুলোকে নির্দিষ্ট হারে অর্থ প্রভিশন আকারে জমা রাখার যে নিয়ম রয়েছে, সেটিও রাখতে পারছে না অনেক ব্যাংক। ফলে তারল্য সঙ্কট আরো গভীর হচ্ছে।
পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে ঋণ খেলাপি নিয়ন্ত্রণে নানা কঠোর পদক্ষেপ নেয়ার রীতি রয়েছে।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে বড় খেলাপিদের ক্রেডিট স্কোর শূন্য হয়ে যায়, ফলে তারা নতুন কোনো ঋণ পায় না। চীনেও খেলাপিদের ‘সামাজিক ক্রেডিট ব্ল্যাকলিস্ট’-এ ফেলা হয়।
আর প্রতিবেশী দেশ ভারতে ‘ইনসলভেন্সি অ্যান্ড ব্যাংক্রাপ্টসি কোড’-এর মাধ্যমে বড় খেলাপি কোম্পানির সম্পদ নিলাম করা হয়।
কিন্তু বাংলাদেশে অর্থঋণ আদালত এবং খেলাপি ঋণ আদায়ে আইন থাকলেও বড় খেলাপিদের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান পদক্ষেপ নেয়ার উদাহরণ কম।
বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্ট বা বিআইবিএম-এর অধ্যাপক ড. মো: আহসান হাবীব বলছেন, ‘বিদ্যমান আইনে আমরা উইলফুল ডিফল্টারের (স্বেচ্ছায় যারা ঋণ পরিশোধ করে না) ক্ষেত্রে কঠিন পদক্ষেপ এখনো পর্যন্ত নিতে পারিনি, এটা একদম পরিষ্কার।’
এছাড়া এই ধরনের পরিস্থিতিতে ব্যবস্থা নেয়ার ক্ষেত্রে বেশ কিছু আইনি জটিলতা রয়েছে বলেও মনে করেন অর্থনীতিবিদরা।
তারা বলছেন, অর্থঋণ আদালতে মামলা নিষ্পত্তিতে পাঁচ থেকে সাত বছরের দীর্ঘ সময় লাগে। ফলে ব্যাংকগুলো নিজেরাই মামলা করতে খুব একটা আগ্রহী হয় না। আর মামলা করলে তাদের আর্থিক প্রতিবেদন খারাপ দেখানোর বিষয়টিও রয়েছে।
এছাড়া বড় খেলাপিরা বেশিভাগই শিল্প গ্রুপ। তাদের কারখানায় লাখো শ্রমিক, রফতানিতে বড় অবদান। সরকার ও ব্যাংক মনে করে, এদের চাপ দিলে কারখানা বন্ধ হবে, বেকারত্ব বাড়বে।
ফলে এসব প্রতিষ্ঠান বা ঋণগ্রহীতা শিল্পগোষ্ঠীকে ‘বাঁচিয়ে রাখার’ নীতিই বারবার নেয়া হয়। মামলা করলেও তা বছরের পর বছর ঝুলে থাকে। এর মধ্যে তারা রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে পুনঃতফসিল বা অবলোপনের সুযোগ তৈরি হয়।
ঋণ খেলাপি দেওয়ানি বিষয় হওয়ায় ব্যাংককে মামলা করে টাকা আদায় করতে হয়। যেখানে বড় খেলাপিরা সেরা আইনজীবী দিয়ে মামলা দীর্ঘায়িত করে।
বেসরকারি ব্যাংকের ক্ষেত্রে আরেকটি বড় সমস্যা হলো, রক্ষকেরই ভক্ষক হওয়ার প্রবণতা। অর্থাৎ অনেক সময় ব্যাংকের পরিচালক নিজেই আত্মীয়দের কোম্পানির নামে ঋণ নেন, যেখানে জবাবদিহির ঘাটতি তৈরি হয়।
ছাড় প্রসঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংক
গত ৩১ আগস্ট ক্ষতিগ্রস্ত ঋণগ্রহীতা প্রতিষ্ঠানের ব্যবসা ও আর্থিক ব্যবস্থা পুনর্গঠনে নীতি সহায়তা দিয়ে একটি সার্কুলার জারি করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক।
যেখানে এক হাজার কোটি টাকার বেশি খেলাপি ঋণগ্রস্তকে ঋণ পুনঃতফসিল বা নবায়নের পর পরিশোধের জন্য ১৫ বছর সময় দেয়ার কথা বলা হয়েছে।
এছাড়া প্রথম দুই বছর কোনো কিস্তি দেয়া লাগবে না বলেও উল্লেখ করা হয়েছে।
যারা এই সুযোগ নিতে চান তাদের সেপ্টেম্বর মাসের মধ্যেই আবেদন করতে বলা হয়েছে। যা আগামী ডিসেম্বরের মধ্যেই নিষ্পত্তি করবে ব্যাংকগুলো।
এর আগে ২০২৫ সালের ১৬ সেপ্টেম্বরও একটি প্রজ্ঞাপন দিয়েছিল বাংলাদেশ ব্যাংক। যেখানে ব্যাংকার ও গ্রাহক সম্পর্কের ভিত্তিতে বিদ্যমান খেলাপি ঋণের স্থিতির ওপর কমপক্ষে দুই শতাংশ নগদ অর্থ জমা দেয়ার কথা বলা হয়েছিল।
ঋণ নিয়মিত হলে দুই বছরের গ্রেস পিরিয়ডসহ (ঋণ পরিশোধে বিরতি) তা পরিশোধে ১০ বছর সময় দেয়া হবে বলে জানানো হয়েছিল।
একই সাথে অর্থনীতিতে গতি ফেরাতে সেপ্টেম্বর থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত ভর্তুকি সুদে ৬০ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা তহবিলের ঘোষণাও দেয়া হয়েছে।
বড় ঋণ খেলাপিদের এসব সুযোগ দেয়ার বিষয়টি নিয়ে নানা আলোচনা সমালোচনা চলছে।
এ বিষয়ে ব্যাখা দিয়ে, সম্প্রতি একটি বিবৃতিও দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। যেখানে তিনটি বিষয়কে প্রধান কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
প্রথমত, বৈশ্বিক প্রভাব- বাংলাদেশ ব্যাংক বলছে, মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ ও জ্বালানি সঙ্কটে রফতানিমুখী শিল্পের উৎপাদন ব্যাহত হয়েছে। ফলে ঋণ পরিশোধ সক্ষমতা কমেছে।
দ্বিতীয়ত, সুদের চাপ- বাজারভিত্তিক সুদহারে ব্যবসায়ীদের সুদ ব্যয় বেড়েছে, কিন্তু বিক্রি কমায় পরিশোধ কঠিন হয়েছে।
এবং তৃতীয়ত, ১৮ মাসের রোডম্যাপ- খেলাপি কমাতে বাংলাদেশ ব্যাংক যে রোডম্যাপ ঘোষণা করেছে, তার অংশ হিসেবেই বৃহৎ ঋণগ্রহীতাদের অতিরিক্ত সময় দেয়া হচ্ছে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের যুক্তি, মামলা করে ১০ বছরে যে টাকা আসবে না, আলোচনার মাধ্যমে ৫০ শতাংশ এখনই আদায় হলে ব্যাংকের তারল্য বাড়বে। এছাড়া, কারখানা চালু থাকলে কর্মসংস্থানও বাঁচবে।
সমালোচনা ও বাস্তবতা
বড় ঋণ খেলাপিদের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ব্যাংক যে ছাড় দেয়ার নীতি গ্রহণ করেছে তা নিয়ে নানা সমালোচনা রয়েছে।
অর্থনীতিবিদদের অনেকেই বলছেন, ঋণ পুনঃতফসিল করা হলে কাগজেকলমে খেলাপি কমলেও ব্যাংকের লকারে কত টাকা ফেরত আসতে পারে এ নিয়ে সংশয় আছে।
এছাড়া, ভালো ঋণ গ্রহীতাদের সাথে বৈষম্যের পাশাপাশি এর ফলে ‘অপরাধ করে পার পাওয়ার’ সংস্কৃতি তৈরি হতে পারে বলেও মনে করেন অনেকে।
বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ বা সিপিডি-এর সম্মাননীয় ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান বলছেন, ‘এগুলোর সুযোগ নিয়ে ডিফল্টাররা আরো ডিফল্টের দিকে চলে যেতে পারে। এ কারণেই বাংলাদেশ ব্যাংক এই বিষয়টিকে ব্যাংক ক্লায়েন্ট রিলেশনের ওপর দিয়েছে। এক্ষেত্রে ব্যাংকেরও একটা বড় দায়িত্ব থাকবে।’
এক্ষেত্রে ব্যাংক পরিচালকদের জবাবদিহি, রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত কমিশন, অর্থঋণ আদালতে দ্রুত বিচার, খেলাপিদের বিদেশ ভ্রমণ ও নতুন ব্যবসায় নিষেধাজ্ঞাসহ বেশ কিছু কঠোর পদক্ষেপ নেয়ারও পরামর্শ দিচ্ছেন অর্থনীতিবিদরা।
বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্ট বা বিআইবিএম এর অধ্যাপক ড. মো: আহসান হাবীব বলছেন, ‘আমাদের উইলফুল ডিফল্টারের যে কালচার সেটা ভাঙা খুব সহজ না। খুবই শক্ত হাতে পদক্ষেপ নেয়ার প্রয়োজন। কিন্তু এখনো কেন্দ্রীয় ব্যাংক সেরকম শক্ত জায়গায় যায়নি।’
তিনি বলেন, ‘এই বেনিফিটগুলো যেন উইলফুল ডিফল্টাররা অপব্যবহার করতে না পারে। আর এটা যে স্বল্প সময়ের জন্যই দেয়া হয়, লংটার্ম নয়।’
এই সব পদক্ষেপের পরও যারা ঋণের অর্থ ফেরত দেবে না তাদের ক্ষেত্রে কী ধরনের শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয়া হবে সেটিও কেন্দ্রীয় ব্যাংককে ঠিক করতে হবে বলেই মনে করে করেন এই অর্থনীতিবিদ।
তবে এই পরিকল্পনার সফলতা বা ব্যর্থতা রাজনৈতিক সদিচ্ছার ওপর নির্ভর করছে বলেই মনে করেন মোস্তাফিজুর রহমান।
তিনি বলছেন, ‘যতক্ষণ না পর্যন্ত পলিটিক্যালি ব্যাংকগুলোকে প্রভাবিত করা না হচ্ছে, ততক্ষণ পর্যন্ত হয়ত এসব পদক্ষেপ একটা সুস্থ ধারায় ফেরার ক্ষেত্রে কিছুটা সহযোগিতা করবে।’
তার কথায়, ‘কিছু কিছু রিস্কি সিদ্ধান্ত নিতে হবে, খুব শিগগিরই এখান থেকে বের হওয়া যাবে না। বাংলাদেশ ব্যাংক এখন লোনগুলো রেগুলারাইজ করার চেষ্টা করছে। মূলত ব্যালেন্সশিটগুলো ক্লিয়ার করার চেষ্টা করছে।’
কিন্তু মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে আনা, দেশী-বিদেশী বিনিয়োগ আনার মাধ্যমে সামষ্টিক অর্থনীতিতে স্বাভাবিক প্রবণতা আনতে আরো সময় লাগবে বলেই মনে করেন তিনি।
সূত্র : বিবিসি



