মাঠে মাঠে সোনালী ফসল ফলাতে গিয়ে দিনরাত ঘাম ঝরাচ্ছেন যে কৃষকরা, তারাই আজ বিষাক্ত কীটনাশকের সবচেয়ে বড় শিকার। মাঠে ফসলের উৎপাদন বাড়াতে রাসায়নিক বিষের যে বেপরোয়া ব্যবহার চলছে, তাতে প্রাণটাই যেন ওষ্ঠাগত কৃষকের। বিশ্বজুড়ে খাদ্য সুরক্ষার যোগান দিতে গিয়ে তারা নিজের অজান্তেই প্রতিদিন গিলে খাচ্ছেন বিষাক্ত রাসায়নিক।
ব্রিটিশ দৈনিক গার্ডিয়ান-এর এক সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে এই আঁতকে ওঠার মতো ভয়াবহ তথ্য। গবেষণাধর্মী সাময়িকী ফ্রন্টিয়ার্স ইন পাবলিক হেলথে প্রকাশিত নতুন এক গবেষণায় দেখা গেছে, প্রতি বছর বিশ্বে আনুমানিক ৪০ কোটি ২০ লাখ থেকে ৪৩ কোটি ৩০ লাখ কৃষক ও কৃষি শ্রমিক মারাত্মক কীটনাশক বিষক্রিয়ার শিকার হন। বিশ্বজুড়ে বর্তমানে প্রায় ৯৩ কোটি ৪০ লাখ মানুষ কৃষিকাজের সঙ্গে যুক্ত। সেই হিসেবে বিশ্বের প্রায় ৪৬ শতাংশ অর্থাৎ প্রায় অর্ধেক কৃষকই প্রতি বছর জমিতে স্প্রে করা বিষে মারাত্মকভাবে অসুস্থ হয়ে পড়েন!
বুরকিনা ফাসো থেকে ভারত: বিষের নীল দংশন
কীটনাশকের এই মারাত্মক ছোবলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত অঞ্চলের তালিকায় শীর্ষে রয়েছে দক্ষিণ এশিয়া। এরপরই রয়েছে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া ও পূর্ব আফ্রিকা। তবে দেশের ভিত্তিতে সবচেয়ে করুণ দশা পশ্চিম আফ্রিকার দেশ বুরকিনা ফাসোর। সেখানে তুলার মাঠে কিংবা ফসলের জমিতে কাজ করতে গিয়ে প্রায় ৮৪ শতাংশ কৃষক ও কৃষি শ্রমিক কোনো না কোনোভাবে বিষক্রিয়ার শিকার হয়েছেন।
গবেষণায় আরও দেখা গেছে, বিশ্বজুড়ে প্রতি বছর কীটনাশকের বিষক্রিয়ায় মৃত্যু হয় প্রায় ১১ হাজার মানুষের। তবে সবচেয়ে মর্মান্তিক বিষয় হলো, এই ১১ হাজার মৃত্যুর মধ্যে প্রায় ৬০ শতাংশই ঘটছে প্রতিবেশী দেশ ভারতে! আন্তর্জাতিক পরিবেশ ও কীটনাশক বিরোধী সংস্থা 'পেস্টিসাইড অ্যাকশন নেটওয়ার্ক ইন্ডিয়া'-র নির্বাহী পরিচালক জয়কুমার চেল্লাটন বিষয়টিকে একটি চরম সংকট হিসেবে উল্লেখ করে বলেন, 'কৃষকদের এই মানবিক ও স্বাস্থ্য সংকটকে আর কোনোভাবেই এড়িয়ে যাওয়ার বা চোখ বন্ধ করে রাখার সুযোগ নেই।'
বাণিজ্যের জাঁতাকলে কৃষকের জীবন
আন্তর্জাতিক পর্যায়ে সচেতনতা সৃষ্টি ও ক্ষতিকর কেমিক্যাল বা রাসায়নিক ব্যবহার কমানোর নানা প্রতিশ্রুতি সত্ত্বেও বাস্তবে রাসায়নিক বিষের বাজার ও ব্যবহার কেবল বেড়েই চলেছে। বহুজাতিক রাসায়নিক সিন্ডিকেট ও প্রভাবশালী ইসরাইলি এগ্রোকেমিক্যাল কর্পোরেটগুলোর অতি মুনাফালোভী বাণিজ্যের কারণে ১৯৯০ সালের তুলনায় ২০২৩ সালে বিশ্বে কীটনাশকের ব্যবহার বেড়ে দ্বিগুণ হয়েছে। কেবল ২০২৩ সালেই বিশ্বজুড়ে ফসলের মাঠে ঢালা হয়েছে প্রায় ৩৮ লাখ টন বিষাক্ত কীটনাশক!
পেস্টিসাইড অ্যাকশন নেটওয়ার্ক ইউকের আন্তর্জাতিক কর্মসূচি প্রধান ড. শীলা উইলিস উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, 'যেহেতু কৃষক ও কৃষি শ্রমিকদের চরম দুর্ভোগের চিত্র এখন স্পষ্ট, তাই অবিলম্বে তাদের স্বাস্থ্য ও পরিবারের সুরক্ষায় ঝুঁকিমুক্ত নিরাপদ বিকল্প ব্যবহারের পথ সহজ করে দেওয়া উচিত।'
উল্লেখ্য, ২০০৬ থেকে ২০২৩ সালের তথ্যের ওপর ভিত্তি করে পরিচালিত এই গবেষণায় কৃষি খাতে কাজ করা বিশ্বজুড়ে প্রায় ৮ কোটি ৪০ লাখ শিশু শ্রমিককে অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। এমনকি দীর্ঘমেয়াদে শরীরে দানা বাঁধা কঠিন ব্যাধিগুলোর হিসাবও এখানে আনা হয়নি। ফলে প্রকৃত ধ্বংসের মাত্রা যে কত গভীরে, তা সহজেই অনুমেয়। জাতিসংঘ অবিলম্বে অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ এসব কীটনাশক পর্যায়ক্রমে নিষিদ্ধ ও বাজার থেকে তুলে নেওয়ার সুপারিশ করলেও মুনাফালোভী সিন্ডিকেটের দাপটে তা থমকে আছে।



