জাতীয় সংসদে ২০২৫-২৬ অর্থবছরের ৫৬ হাজার ১১৭ কোটি ৫৯ লাখ ৪১ হাজার টাকার সম্পূরক বাজেট পাস হয়েছে। একইসাথে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী জানিয়েছেন, অর্থনীতি পুনর্গঠন, সরকারি ব্যয়ে মিতব্যয়িতা নিশ্চিত করা এবং সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি সম্প্রসারণ বর্তমান সরকারের অন্যতম প্রধান অগ্রাধিকার। বৈশ্বিক অস্থিরতা, অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক দুর্বলতা ও উচ্চ মূল্যস্ফীতির চাপ মোকাবেলায় সরকার ধারাবাহিকভাবে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করে যাচ্ছে।
সোমবার (১৫ জুন) ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের দ্বিতীয় অধিবেশনের সপ্তম দিনে জাতীয় সংসদে নির্দিষ্টকরণ (সম্পূরক) বিল, ২০২৬ পাসের মাধ্যমে ২০২৬ সালের ৩০ জুন সমাপ্য অর্থবছরের জন্য সংযুক্ত তহবিল থেকে মঞ্জুরীকৃত অর্থের অনধিক ৫৬ হাজার ১১৭ কোটি ৫৯ লাখ ৪১ হাজার টাকা ব্যয়ের অনুমোদন দেয়া হয়।
অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বিলটি উত্থাপন করে পাসের প্রস্তাব করলে তা সর্বসম্মতিক্রমে গৃহীত হয়।
এর আগে বিধান অনুযায়ী ২৫টি মঞ্জুরি দাবি সংশ্লিষ্ট মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রীরা সংসদে উত্থাপন করলে সেগুলো পৃথকভাবে পাস হয়। এসব দাবির বিপরীতে বিরোধী দলের ২০ জন সদস্য ৩০৪টি ছাঁটাই প্রস্তাব আনেন। অর্থ বিভাগ, পরিকল্পনা বিভাগ, বাণিজ্য মন্ত্রণালয়, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়, স্থানীয় সরকার বিভাগ, পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়, খাদ্য মন্ত্রণালয় এবং দুর্নীতি দমন কমিশনের মঞ্জুরি দাবির ওপর আনা ছাঁটাই প্রস্তাব নিয়ে আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়। পরে কণ্ঠভোটে সব ছাঁটাই প্রস্তাব নাকচ হয়ে যায়।
আলোচনায় অংশ নেন জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্য শাহজাহান চৌধুরী (চট্টগ্রাম-১৫), মো: আব্দুল গফুর (কুষ্টিয়া-২), মো: কামরুল হাসান (ময়মনসিংহ-৬), মোহাম্মদ নাজিবুর রহমান (পাবনা-১), জি এম নজরুল ইসলাম (সাতক্ষীরা-৪), মো: আব্দুল আলীম (বাগেরহাট-৪), অধ্যাপক মো: মুজিবুর রহমান (রাজশাহী-১), আলফারুক আব্দুল লতীফ (নীলফামারী-২), মো: আমির হামজা (কুষ্টিয়া-৩), মো: আব্দুল বারী সরদার (রাজশাহী-৪), মো: মাসুদ পারভেজ (চুয়াডাঙ্গা-১), মো: রুহুল আমিন (চুয়াডাঙ্গা-২), শেখ মনজুরুল হক (রাহাদ) (বাগেরহাট-২), এনসিপির আখতার হোসেন (রংপুর-৪), খেলাফত মজলিসের মোহাম্মদ আবুল হাসান এবং স্বতন্ত্র সদস্য বেগম রুমিন ফারহানা (ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২)।
চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ৬২টি মন্ত্রণালয় ও বিভাগের জন্য মোট বাজেট ছিল ৭ লাখ ৯০ হাজার কোটি টাকা। বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও বিভাগের ব্যয় হ্রাস-বৃদ্ধির ফলে সংশোধিত বাজেটের আকার দাঁড়িয়েছে ৭ লাখ ৮৮ হাজার কোটি টাকা।
সংশোধিত বাজেটে ২৭টি মন্ত্রণালয়, বিভাগ ও অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের বরাদ্দ ৫৬ হাজার ১১৭ কোটি ৫৯ লাখ টাকা বৃদ্ধি করা হয়েছে। বিপরীতে ৩৫টি মন্ত্রণালয় ও বিভাগের বরাদ্দ ৫৯ হাজার ৩৪৮ কোটি ৬৭ লাখ টাকা কমানো হয়েছে।
গত ১১ জুন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী জাতীয় বাজেটের সাথে সম্পূরক বাজেট সংসদে উপস্থাপন করেন।
সম্পূরক বাজেটে সবচেয়ে বেশি ২৮ হাজার ৬৫৫ কোটি ৫৪ লাখ ৫ হাজার টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে অর্থ বিভাগে। দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ১২ হাজার ৪০৭ কোটি ৮৩ লাখ ৮৮ হাজার টাকা পরিকল্পনা বিভাগে এবং তৃতীয় সর্বোচ্চ ৪ হাজার ৯২৩ কোটি ৪৮ লাখ ৫৪ হাজার টাকা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ে। এছাড়া পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের জন্য ২ হাজার ১৭৭ কোটি ৪ লাখ ৮১ হাজার টাকা এবং স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের জন্য ১ হাজার ৮০৯ কোটি ৫৬ লাখ ১০ হাজার টাকা বরাদ্দ অনুমোদন দেয়া হয়েছে।
এছাড়া, জাতীয় সংসদ খাতে ১৬ কোটি ৫৯ লাখ ৬০ হাজার টাকা, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টে ১৯ কোটি ৭৭ লাখ ৫৪ হাজার টাকা, আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগে ১ হাজার ৬৯০ কোটি ৮১ লাখ ৭৯ হাজার টাকা, ধর্ম মন্ত্রণালয়ে ২২০ কোটি ৪১ লাখ ২২ হাজার টাকা, নির্বাচন কমিশনে ১ হাজার ৩৮৯ কোটি ৬৫ লাখ ৮০ হাজার টাকা, তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগে ৭২২ কোটি ৪৬ লাখ ১৫ হাজার টাকা, বাংলাদেশ সরকারি কর্ম কমিশনে ৩০ কোটি ১ লাখ ৮৭ হাজার টাকা, তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ে ১১২ কোটি ৫৮ লাখ ১০ হাজার টাকা, মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে ১৫ কোটি ৬৭ লাখ ৭৬ হাজার টাকা, বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগে ২১ কোটি ৯৭ লাখ ৪২ হাজার টাকা, বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে ৩০১ কোটি ৯৩ লাখ ৪০ হাজার টাকা, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে ৫৯ কোটি ৯৭ লাখ ৯২ হাজার টাকা, আইন ও বিচার বিভাগে ৮৪ কোটি ৭৪ লাখ ৩৬ হাজার টাকা, জননিরাপত্তা বিভাগে ১৭১ কোটি ৬৮ লাখ ১৩ হাজার টাকা, লেজিসলেটিভ ও সংসদ বিষয়ক বিভাগে ৮৭ লাখ ৮৫ হাজার টাকা, মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়ে ২৯৩ কোটি ৩৫ লাখ ৫৯ হাজার টাকা, প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ে ৭৫ কোটি ৬১ লাখ ৯৫ হাজার টাকা, বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়ে ৪৫ লাখ ৪৫ হাজার টাকা, ভূমি মন্ত্রণালয়ে ৯৭ কোটি ৭১ লাখ ৩ হাজার টাকা, খাদ্য মন্ত্রণালয়ে ৬৮৩ কোটি ৯১ লাখ ৩ হাজার টাকা, মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ে ১২২ কোটি ১৯ লাখ ৩২ হাজার টাকা এবং দুর্নীতি দমন কমিশনে ১১ কোটি ৬৮ লাখ ৭৫ হাজার টাকা ব্যয়ের অনুমোদন দেয়া হয়েছে।
সম্পূরক বাজেটের ওপর সমাপনী বক্তব্যে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, ‘বর্তমান সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকেই জনগণের জীবনমান উন্নয়ন এবং দেশের অর্থনীতিকে পুনরুজ্জীবিত করার লক্ষ্যে ধারাবাহিকভাবে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করছে। বৈশ্বিক অস্থিরতা, অর্থনীতির অভ্যন্তরীণ দুর্বলতা এবং উচ্চ মূল্যস্ফীতির চাপ মোকাবেলা করে অর্থনীতিকে পুনর্গঠন করা সরকারের অন্যতম প্রধান অগ্রাধিকার।’
তিনি বলেন, ‘সরকারি ব্যয়ের প্রতিটি ক্ষেত্রে অপচয় কমানো, অগ্রাধিকারহীন ব্যয় সংকোচন এবং প্রশাসনিক ব্যয়ে মিতব্যয়িতা নিশ্চিত করার চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে। একইসাথে সরকারের নির্বাচনী ইশতেহার বাস্তবায়নের কার্যক্রমও এগিয়ে নেয়া হচ্ছে।’
অর্থমন্ত্রী বলেন, ‘বৈশ্বিক পরিস্থিতির কারণে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে ভর্তুকি সমন্বয় করতে হলেও সরকার সামাজিক সুরক্ষা কার্যক্রম সম্প্রসারণ করেছে। ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ড এবং ইমাম, পুরোহিত ও মুয়াজ্জিনদের জন্য সম্মানী প্রদানের মতো উদ্যোগের মাধ্যমে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিকে আরো শক্তিশালী করা হয়েছে। এসব কার্যক্রম বাস্তবায়নের জন্য সম্পূরক বাজেটে ব্যয় ও ঘাটতির কিছু সমন্বয় করা হয়েছে।’
তিনি জানান, ‘মূল বাজেটে সরকারি নিট ব্যয় ধরা হয়েছিল ৭ লাখ ৯০ হাজার কোটি টাকা। তবে নির্বাচন-পূর্ববর্তী সময়ে সরকারি ব্যয়, বিশেষ করে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) বাস্তবায়নের গতি কিছুটা মন্থর হওয়ায় সংশোধিত বাজেটে ব্যয় ২ হাজার কোটি টাকা কমিয়ে ৭ লাখ ৮৮ হাজার কোটি টাকা নির্ধারণের প্রস্তাব করা হয়েছে।’
সংশোধিত বাজেটে বাজেট ঘাটতি ২ লাখ কোটি টাকা প্রস্তাব করা হয়েছে, যা মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) ৩ দশমিক ৩ শতাংশের সমান বলেও জানান অর্থমন্ত্রী।
সম্পূরক বাজেট নিয়ে প্রাণবন্ত ও গঠনমূলক আলোচনার জন্য সংসদ সদস্যদের ধন্যবাদ জানিয়ে তিনি বলেন, ‘তাদের গুরুত্বপূর্ণ মতামত ও পরামর্শ সরকারের নীতিনির্ধারণে সহায়ক হবে।’
সমাপনী বক্তব্যে স্পিকারের মাধ্যমে জাতীয় সংসদের সকল সদস্যের প্রতি সম্পূরক আর্থিক বিবৃতিতে বর্ণিত দায়যুক্ত ব্যয় ব্যতীত অন্যান্য ব্যয় বাবদ দাবিকৃত মঞ্জুরি অনুমোদনের আহ্বান জানান অর্থমন্ত্রী।
তার সংক্ষিপ্ত সমাপনী বক্তব্যের পর পৃথকভাবে মঞ্জুরি দাবি পাস এবং নির্দিষ্টকরণ (সম্পূরক) বিল, ২০২৬ অনুমোদনের মধ্য দিয়ে ২০২৫-২৬ অর্থবছরের সম্পূরক বাজেট চূড়ান্তভাবে পাস হয়।



